kalerkantho


'পিয়ানো'কে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের নাটক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৭:২০



'পিয়ানো'কে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের নাটক

ছোট্ট জেলা শহরে রাশেদের মিউজিক শপ। ঢোল তবলা, হারমোনিয়ম, ব্যাঞ্জো গিটার এইসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে হাতে গোনা কিছু এন্টিকও তার সংগ্রহে রয়েছে। যেমন পিলু রাজ এর বাশি। পিলু রাজ একসময়কার স্থানীয় বংশিবাদক, ‘রাখাল রাজা’ নামের এক বিখ্যাত যাত্রা পালায় অভিনয় করতেন। তার বাঁশির সুরে নাকি গ্রাম বাংলার মানুষের চেতনা অন্য এক ভূবনে চলে যেতো। এই ধরনের কিছু এন্টিক রাশেদ তার বাবার সংগ্রহ থেকেই পেয়েছে। এন্টিকের ইতিহাসও তার বাবার কাছেই শোনা। এন্টিকগুলো তার দোকানে সাজানো আছে। এন্টিকগুলো রেখে দোকানের জায়গা নষ্ট হচ্ছে আবার এগুলো অদ্ভূত এক কারণে ফেলতেও পারছেনা।

মরহুম পিতৃসুত্রে রাশেদ এই ব্যাবসার মালিক হয়েছে।  ঢোল তবলা হারমোনিয়ম গিটার ... তার খদ্দেরদের মূল চাহিদা এখন এগুলো। নীতিশ হাওলাদার নামের এক বুড়ো রাশেদের দোকানের একমাত্র কর্মচারী। রাশেদের বাবার সঙ্গে নীতিশের ছিল বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক। এই দোকানের সঙ্গে নীতিশের সম্পর্কটা আত্মার। বুড়োর চোখে মুখে চাপা এক ধরনের রহস্য আছে। অবিবাহিত এই বুড়ো রাশেদের পরিবারেরই সদস্য। এছাড়া স্ত্রী জেবা আর একমাত্র মেয়ে বৃষ্টিকে নিয়ে রাশেদের পারিবারিক গেরস্থালী। একটি অতি সাধারণ মধ্যেবিত্ত পরিবার। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া বৃষ্টির গান বাজনার ঝোক আছে। রাশেদের এটা পছন্দ না। বৃষ্টি গোপনে নীতিশের কাছে গানের তালিম নেয়। নীতিশ রাশেদের সামনে চুপচাপ গাম্ভীর্য ধরে রাখলেও সে চপল স্বভাবের লোক। রাশেদের অনুপস্থিতিতে খদ্দেরদের সঙ্গেও সে আড্ডা জমিয়ে তোলে।

এই পটভুমিতেই হঠাৎ একদিন আবির্ভাব ঘটে ৪০ বয়সী এক নারীর। ওই নারীর গাড়ি এসে থামে দোকানের সামনে। দোকানে ঢুকে অনুসন্ধানী চোখে নারী কিছু একটা খোঁজেন। দোকানের এক কোনায় ফেলে রাখা পুরানো একটা পিয়ানোর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কিছু কিনবে কিনা জানতে চাইলে নারী না সুচক জবার দেয়। মহিলার ভাব ভঙ্গীতে রাশেদ বিরক্ত হয়। সেদিনের মতো মহিলা চলে যায়। কিন্তু আরেকদিন আসে। একই ভাবে সেই পিয়ানোর দিকে তাকিয়ে থাকে। পিয়ানোটি রাশেদের বাবার সময় থেকেই সে দেখে এসেছে। ৮৭ সালের এক ঝড় বৃষ্টির রাতে রাশেদের বাবা এটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাশেদের বয়স তখন ১৬ বছর। মৃত্যুর আগে রাশেদের বাবা তার ডায়েরিতে লিখে রেখে গেছেন, পিয়ানোটি  বিক্রির জন্যে নয়। রাশেদ বিষয়টি অনেক ভেবেছে। নীতিশকেও জিজ্ঞেস করেছে ব্যাপারটি নিয়ে। কোন কোন খদ্দের আগ্রহ দেখালেও রাশেদ স্পষ্টতই বিক্রির জন্যে অসম্মতি জানিয়েছে। কিন্তু রাশেদের মনের মধ্যে ব্যাপারটি সংশয় আছে। এটিকে দুরে সড়িয়ে দিতে পারলে যেনো রাশেদ শান্তি পায়। মাঝে মাঝে ওর কাছে এরকমই মনে হয়।

হঠাৎ অবির্ভূত সেই নারী, পিয়ানোটির প্রতি আগ্রহী জেনে রাশেদ কিছুটা অবাক হয়। এরপর আরো একদিন নারীর আবির্ভাবে রাশেদ একটু সচকিত হয়। কোথায় যেনো একটা রহস্য আছে। নারী এবারে সরাসরি কেনার প্রস্তাব দেয়। স্বভাবতই রাশেদ না সূচক উত্তর জানায়। চলে যাবার সময়, নারীর একটা কার্ড রাশেদেকে দিয়ে যায়।

এরপর নারী আরো একদিন আসে, রাশেদ মত বদলেছে কিনা জানতে চায়। সেদিন তাদের মধ্যে অনেক কথা হয়। নারী তার শৈষবের কিছু স্মৃতি রাশেদের সঙ্গে শেয়ার করে। সেই স্মৃতির সঙ্গে একটা পিয়ানো মিলে মিশে ছিলো। নারী চলে যাবার পর তার কিছু কথা রাশেদের কাছে অসঙ্গত মনে হয়। ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি রাশেদকে একটু একটু করে ভাবায়। তার কাছে স্পষ্টতই মনে হয় তার বাবা মার সম্পর্কের মধ্যে কোথায় যেন একটু নির্লিপ্ত টানাপোড়েন ছিলো। হারমোনিয়মের সঙ্গে কি এর কোনও যোগাযোগ রয়েছে। রাশেদ এবারে নারীর জন্যে অপেক্ষা করে। এক সময় তার দেয়া কার্ডের ফোন নাম্বারে ফোন করে দ্যাখে ফোন বন্ধ। রাশেদ অস্থির হয়ে একদিন কার্ডে লেখা ঢাকার ঠিকানায় গিয়ে হাজির হয়। গিয়ে জানতে পারে, নারী দেশের বাইরে থাকেন, দেশে বেড়াতে এসেছিলেন আবার চলে গেছেন।

রাশেদ এবারে নীতিশের কাছে জানতে চায়, ‘এসবের মানে কি কাকা?’ নীতিশ নিশ্চুপ। রাশেদ রাতে ঘুমাতে পারে না। সে অস্থির হয়ে ওঠে। তার আচরণ বিরুপ হয়ে উঠে। বৃষ্টির দিনের শিতল ঠান্ডাতেও তার কপালে জমে থাকে ঘামের বিন্দু। নারীর সঙ্গে আলাপচারিতার সুত্রেই রাশেদের মনে একটা প্রশ্ন বার বার ঘুরতে থাকে, “ওর বাবা গান বাজনার এতো সমঝদার একজন মানুষ ছিলেন, সে নিজেও বাদ্য যন্ত্র নিয়েই তার জীবন পার করছে অথচ গান বাজনার প্রতি তার এতো বিরাগ কেন? বাবার ভাবনা, ভালোলাগা, দর্শনের কিছুই কেন তার মধ্যে থাকেবে না? সে কেন এমন রসহীন কঠিন একজন মানুষ?

রাশেদের জন্ম ১৯৭১ সালে... আর আমাদের গল্পটি অবশেষে একটি মুক্তি যুদ্ধের গল্প হয়ে ওঠে। গল্পটি এক বীরাঙ্গনা মায়ের গল্প হয়ে ওঠে। রাশেদের বাবার নাম শাহেদুর রহমান। সম্ভ্রান্ত সাংস্কৃতিক পরিবারের ছেলে। ১৯৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়। যুদ্ধ পরবর্তীতে সহযোদ্ধা বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ জানাতে তার বাড়িতে গিয়ে বন্ধুর বীরাঙ্গনা সন্তানসম্ভবা বোনকে দ্যাখে। এক  দেশ প্রেমিক যোদ্ধার স্বরুপেই শাহেদ মেয়েটিকে বিয়ে করে। পাক হানাদারের ঔরসজাত হয়েও রাশেদ বড় হয় শাহেদের পরিচয়েই। কিন্তু শাহেদ আগেই ছিলো বিবাহিত। রাশেদের মা সেটি জানতোও। কিন্তু আগের স্ত্রীকে নানা কারনে শাহেদ এই ঘটনা জানাতে পারেনি। অনেক দিন পর ৮৫ লের দিকে আগের স্ত্রী যখন এই ঘটনা জানতে পারে তখন শাহেদকে ছেড়ে চলে যায়। ততদিনে তাদের মেয়েটির বয়স বারো বছর। এই মেয়েটিকে শাহেদ পিয়ানো বাজিয়ে গান শেখাতো। মেয়েটিকে নিয়ে তার মা চলে যায়। মেয়েটির একমাত্র্র স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে শাহেদ পিয়ানোটি তার কাছে নিয়ে আসে। গল্পের নারীটিই সেই ছোট্ট মেয়েটি। বড় হয়ে মেয়েটি যখন তার বাবার এই ঘটনা জানতে পারে সে তখন ঠিকানা যোগাড় করে দেশে আসে আর সেই স্মৃতি জড়িত পিয়ানাটি কিনতে চায়।

আর হঠাৎ করেই রাশেদ বুঝতে পারে সে একজন যুদ্ধ শিশু।

মাসুম শাহরীয়াররের রচনা ও আবু হায়াত মাহমুদের পরিচালনায় এমন গল্পে নির্মিত হয়েছে নাটক 'পিয়ানো।' এতে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, তারিন, শেখ মাহবুবুর রহমান, নওশিন ইসলাম দিশা, আরুবা আফসান জারা।

আগামী ১৬ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৫ মিনিটে প্রচারিত হবে নাটকটি।

 



মন্তব্য