kalerkantho


'অভিমান' তার জীবনগাঁথা?

ভালো বাজাতেন বলে স্ত্রীর আঙুল কেটে দিয়েছিলেন রবি শংকর!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪৪



ভালো বাজাতেন বলে স্ত্রীর আঙুল কেটে দিয়েছিলেন রবি শংকর!

পাঁচ বছর ধরে পণ্ডিত রবি শংকর নেই। তাঁর সেতার থামলেও শিল্পীর অতীত কিন্তু পিছু ছাড়ে না। যদিও ধর্ম এবং মনুষত্ব বলে, পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাওয়া মানুষটি সব বিচারের উর্ধ্বে। কিন্তু সে মানুষটি-ই যদি যাওয়ার আগে দাগ রেখে যান নিজের প্রতিভার, চলে যাওয়ার পরেও তাঁর ভালো-মন্দ নিয়ে কাঁটা-ছেড়া হবেই। জীবন থেকে ছুটি পেলেও জমে থাকা স্মৃতি ফিরিয়ে আনে সেই মানুষটিকে।

রবি শংকর নিঃসন্দেহে গুণী। শিল্প রসিকদের মতে, রবি দেবী সরস্বতীর বরপুত্র। কিন্তু দেবী স্বয়ং যখন তাঁর ঘরে ঠাই পেতে চেয়েছিলেন, রবি শংকর কিন্তু খোলা মনে মেনে নিতে পারেননি। দেবীকে শ্রদ্ধার আসনে না বসিয়ে, তাঁকে ভালো না বেসে যন্ত্রণা দিয়েছিলেন মারাত্মক। শোনা কথা, সাধককে ছাপিয়ে যাওয়ার শাস্তি হিসেবে দেবীর আঙ্গুল কেটে দিয়েছিলেন!

বারাণসী থেকে ১৬০ কিমি দূরে মাইহারে অবস্থিত বাড়িটিকে আশপাশের পড়শী বলত সুরের বাড়ি। তার যুতসই কারণও ছিল। বাড়ির কর্তা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান। দেশের নানা প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে অগুন্তি ছেলে-মেয়ে সরোদ, সেতার শিখতে আসত। গুরুজির বড় মেয়েও ভীষণ ভালো সেতার বাজাতে পারতেন। গুরুজি নিজে হাতে তাঁকে তালিম দিয়েছিলেন। বড় ছেলে আলি আকবর সরোদের তালিম নিচ্ছেন বাবার কাছে। কিন্তু ছোট মেয়ে অন্নপূর্ণার বেলায় গুরুজি আশ্চর্য রকমের নির্লিপ্ত। সবার কাছে নিজেকে উজাড় করে দিলেও ছোট মেয়েকে গান-বাজনার ধারেপাশে ঘেঁসতে দিতেন না একদম। কারণ, বাজনা শিখিয়েছিলেন বলে শ্বশুরবাড়িতে বড্ড গঞ্জনা, অপমান শুনতে হয়েছিল বড় মেয়েকে।

কিন্তু গুরুজির ছোট মেয়ে অন্নপূর্ণা ছিলেন সুরের দেবীর সাক্ষাৎ আধার। তাই বাবা বাড়ি না থাকলেই তিনি দাদা আলি আকবর খাঁ’র চারপাশে ঘুরঘুর করতেন। দাদা ভুল করলে শুধরে দিয়ে বলতেন, ‘ভাইয়া, বাবা নে এইসা নেহি, এইসা শিখায়া….’ একদিন বাবার আড়ালে এভাবেই দাদার ভুল শোধরাচ্ছিলেন। আচমকা বাবাকে সামনে দেখে থমকে গেলেন মেয়ে। গুরুজি দেখলেন, বড় অবহেলা করেছেন কোলের সন্তানের প্রতি। সেই অভাব মেটাতে এবার দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে মেয়েকে শেখাতে বসলেন। প্রথমে রীতি মেনে ধ্রূপদ শেখালেন। তারপর সেতার তুলে দিলেন অন্নপূর্ণার হাতে।

১৯৪০-এ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মাইহারের বাড়িতে সেতার শিখতে কলকাতা থেকে এলেন রবীন্দ্র শংকর চৌধুরি বা রবি শংকর। দাদা বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর। তাঁর ইচ্ছাতেই রবির সেতার শেখা। ওস্তাদজির এই নতুন ছাত্র তখন মাত্র ১৮। আর অন্নপূর্ণা? মাত্র ১৩! সেতার শেখার ফাঁকে রবি লক্ষ্য করতেন গুরু কন্যাকে। খুব লাজুক। খুব আকর্ষণীয়। বড়বড়, উজ্জ্বল দু’টি চোখ। ব্যস, ওই পর্যন্তই। বরং গুরুজির এই মেয়েকে নিয়ে বেশি উত্সাহিত ছিলেন দাদা উদয়। তাঁর ইচ্ছেতেই ১৯৪১-এর ১৫ মে সকালে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হন অন্নপূর্ণা। বিকেলে রবির সঙ্গে বিয়ে। বিয়ের আগে রবি শুধু এটুকুই জেনেছিলেন, এই বিয়েতে মত আছে গুরুজির মেয়ের।

বিয়ে ভালোভাবে মিটলেও সমস্যা বাধালো সুরের মায়াজাল। এক পেশায় স্বামী-স্ত্রী। ওস্তাদ আমির খানের মতে, অন্নপূর্ণা ছিলেন গুরুজির ৮০ শতাংশ। আলি আকবর ৭০ আর রবি শংকর মাত্র ৪০ শতাংশ। ফলে, তেলে আর জলে মিশ খেলো না কোনদিন। এক মঞ্চে দু’জনে বাজাতে বসলে গুনীরা অন্নপূর্ণার সেতারের মুর্ছনায় মুগ্ধ হতেন। তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে খেই হারাতেন রবি। বাজানো শেষ হলে সবাই অন্নপূর্ণাকে ঘিরে ধরতেন। হাততালির শব্দে কান পাতা দায় হতো। এসব দেখে ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যেতেন রবি। শেষে খোলাখুলি বললেন স্ত্রীকে, বিয়ে টিকিয়ে রাখতে গেলে সেতার ছাড়তে হবে।

স্বামী, সংসারের মুখ চেয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করলেন অন্নপূর্ণা। তাঁর রেওয়াজ চলত বন্ধ দরজার ওপাশে। পরে এক সাক্ষাৎকারে অন্নপূর্ণা বলেছেন, ‘অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন আমায় ঘিরে ধরত, তখন মুখ নিচু করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতেন রবি। মুখ দেখেই বোঝা যেত, মনে মনে দারুণ অসন্তুষ্ট। বাড়ি ফিরে কথায় কথায় সেই ক্ষোভ উগরে দিতেন। চাইতেন, আমি যাতে নিজে থেকে অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিই।’ যদিও পরে আত্মজীবনী ‘রাগমালা’য় শিল্পী কৈফিয়ত দিয়েছেন, ‘আমি পাশে না বসলে অন্নপূর্ণা বাজাতেই চাইত না। খুব লাজুক ছিল তো। তাই অনেক লোকের সামনে নার্ভাস হয়ে পড়ত। কিন্তু আমার পক্ষেও তো সম্ভব হতো না সব সময় আগলানো। শেষে ও ছেড়েই দিল অনুষ্ঠান করা.’

এই গল্প কি বিশ্বাস করা যায়? বিশেষ করে আলাউদ্দিন খান সাহাব যাঁকে ‘দেবী সরস্বতী’ মেনে নিজের গুরুর থেকে শেখা ‘সুরবাহার’-এর যাবতীয় মন্ত্রগুপ্তি শিখিয়েছিলেন। জামাই রবিকেও শেখাননি। কেননা, অন্নপূর্ণার মনে কোনো লোভ ছিল না। বিখ্যাত হওয়ার তাগিদ ছিল না। সেতার, সুরবাহারের তারে নিজেকে সঁপে দিতেন নীরবে। যাই হোক, স্বামীকে ধরে রাখতে, সংসার-সন্তান বাঁচাতে বাবা কাম গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহাব আর মা সারদার ছবি ছুঁয়ে অন্নপূর্ণা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আর কোনোদিন অনুষ্ঠানে বাজাবেন ন। কিন্তু বন্ধ দরজার পিছনে স্ত্রীর রেওয়াজ রবির বুকের ভিতরটা জ্বালিয়ে দিত। যতবার স্ত্রী বাজাতেন, ততবার রবি বুঝতে পারতেন, স্ত্রীর কাছে তিনি কিচ্ছু না। তাই রাগে-হিংসায় জ্বলতে-জ্বলতে অন্নপূর্ণার আঙুল নাকি কেটে দিয়েছিলেন! এভাবেই সেতারের দুনিয়ায়, সুরের আকাশে উদিত হলেন রবি। অস্ত গেলেন অন্নপূর্ণা।

অন্নপূর্ণার বাজনা তারপরেও বন্ধ হয়নি। এত সহ্য করেও যখন স্বামীকে ধরে রাখতে পারলেন না তখন আজীবনের সখ্য জুড়লেন সেতারের সঙ্গে। কাটা আঙুল নিয়েই তিনি তৈরি করেছেন নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, নিত্যানন্দ হাল্দিপুরি, বসন্ত কাবরা, অমিত ভট্টাচার্য-র মতো দিকপাল ছাত্র। 

অন্নপূর্ণা-রবি শংকরের এই জীবনী-ই সেলুলয়েডে ধরেছেন পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, ‘অভিমান’ ছবিতে। পরে সেই ছবি দেখে হাহাকার করেছিলেন অন্নপূর্ণা, ‘ছবির দাবি মিটিয়ে ঋষি কি সুন্দর দুই শিল্পী দম্পতিকে ভালোবাসার বাঁধনে আবার জুড়ে দিলেন। কিন্তু ঈশ্বর তো আমার বেলায় তেমনটা করলেন না! আমি যে সারা জীবন ‘অধুরা’-ই থেকে গেলাম…!’  

- ইন্টারনেট



মন্তব্য