kalerkantho


পদ্মাবতীর সত্যিকার গল্পটা আসলে কী, কী বলেছিলেন সুফি কবি?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৫৫



পদ্মাবতীর সত্যিকার গল্পটা আসলে কী, কী বলেছিলেন সুফি কবি?

মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সঞ্জয় লীলা বানশালি নির্মিত ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত হিন্দি সিনেমা পদ্মাবতী নিয়ে ভারতে চলছে তীব্র বিতর্ক। দেশটির রাজস্থান প্রদেশের রাজপুতানার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শ্রী রাজপুত কর্নি সেনা হুমকি দিয়েছে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক কেটে নেওয়া হবে।

সিনেমাটির বেশ কয়েকটি দৃশ্য বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে কর্নি সেনা। আর নয়তো পদ্মাবতীর মুক্তির দিন আগামী ১ ডিসেম্বর ভারতজুড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং হরতাল ডাকার হুমকিও দিয়েছে তারা।

ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল কংগ্রেসও কর্ণি সেনার দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করছে। রাজস্থান, বিহার এবং উত্তর প্রদেশের বেশ কয়েকটি সংগঠনও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ সিনেমাটি বিশেষভাবে রাজপুত সম্প্রদায়ের এবং সাধারণভাবে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হেনেছে।

পদ্মবতীর পেছনের ইতিহাস
পদ্মাবতী সিনেমাটি বানানো হয়েছে মধ্যযুগের সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর মহাকাব্য পদ্মাবত এর গল্প অবলম্বনে। যে সময়টাতে ভারতজুড়ে চলছিল ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার। যে আন্দোলনের ফসল ছিল তুলসীদাস, সুরদাস এবং কবিরের মতো আরো শতশত সাধু-সন্তুদের আবির্ভাব।

পদ্মাবত-এ এমন একটি গল্প বলা হয়েছে যাকে ঐতিহাসিকরা খুব একটা মূল্য দেন না এই বলে যে সেটি পুরোপুরি বানোয়াট এবং কাল্পনিক।

বাস্তবের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। রাজপুতানার চিতোর রাজ্যের রানী পদ্মাবতীকে নিয়ে এই গল্প ফাঁদেন জায়সী। যার প্রেমে পড়েছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী। যিনি ভারতজুড়ে তার ব্যাপকভাবে সামরিক বিজয় অভিযান এবং রাজধানী দিল্লিতে বাজার দর নিয়ন্ত্রণের জন্য বিখ্যাত।

আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর দুর্গে আক্রমণ করেন ১৩০৬ সালে। আর তার মৃ্ত্যু হয় ১৩১৬ সালে। জায়সী তার পদ্মাবত মহাকাব্য রচনা করেছিলেন ১৫৪০ সালে। প্রায় ২২৪ বছর পরে গিয়ে দিল্লি থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দূরে আমেথিতে বসে।

উত্তর ভারতীয় আওয়াধি গণ উপভাষায় রচিত প্রথম মহাকাব্য ছিল পদ্মাবত। এই ভাষার আরো দুজন বিখ্যাত কবি হলেন, তুলসীদাস এবং রামাছত্রিমানস।

জায়সী পদ্মাবতে কী লিখেছিলেন?
পদ্মাবত এর কেন্দ্রীয় চরিত্র পদ্মাবতীকে বর্ণনা করা হয় তার সময়ের সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে। তিনি ছিলেন সিংহলদ্বীপ (শ্রীলঙ্কা) এর রাজকন্যা। তার একটি অতিপ্রিয় তোতা পাখি ছিল হিরামন নামে। পাখিটিকে তিনি বন্ধু মনে করতেন।

কিন্তু পদ্মাবতীর বাবা গন্ধর্বসেন পাখির সঙ্গে তার কন্যার ওই সখ্যতা মেনে নিতে পারেননি। এবং পাখিটিকে মেরে ফেলার আদেশ দেন। কিন্তু পাখিটি পালিয়ে যায়। এক পাখি ব্যবসায়ী হিরামন নামের ওই পাখিটিকে ধরে ফেলেন। এবং চিতোরের রাজা রতন সেনের কাছে পাখিটিকে বিক্রি করে দেন।

পাখিটির গুনে মুগ্ধ হয়ে রতন সেন পাখিটিকে পুষতে থাকেন। একদিন হিরামন পাখিটি রাজা রতন সেনের কাছে তার আগের মনিব পদ্মাবতীর অসাধারণ রুপ-গুনের বর্ণনা করে। আর তাতেই পদ্মাবতীর প্রেমে পড়ে যান রাজা রতন সেন। এরপর তিনি ১৬ হাজার দেহরক্ষী সহ সাধু-সন্তুর ছদ্মবেশে সিংহল যান পদ্মাবতীর সাক্ষাত লাভের জন্য।

রতন সেন এবং পদ্মাবতী
সিংহলদ্বীপ পৌঁছে রতনসেন শিব মন্দিরে গিয়ে পদ্মাবতীর দেখা পাওয়ার জন্য ঈশ্বরের কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকেন। পদ্মাবতীও একই মন্দিরে উপাসনা করতে আসতেন এবং রতন সেনের এই পাগলামির কথা তার কানে যায়। কিন্তু রতন সেনের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। এতে রতন সেন আরো পাগলামি করতে থাকেন। পদ্মাবতীর দেখা না পেয়ে তিনি এতটাই বেদনাহত এবং শোকাহত হন যে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

রতন সেন যখন আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন দেবতা শিব ও দেবি পার্বতী তার সামনে দেখা দেন এবং তাকে সিংহলদ্বীপের রাজপ্রাসাদে গিয়ে পদ্মাবতীকে পাওয়ার দাবি করতে বলেন। এরপর তিনি তপস্বী সাধুর বেশেই তার অনুসারীদের নিয়ে সিংহলদ্বীপের রাজদূর্গের দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু গন্ধর্বসেনের সেনারা তাকে সন্দেহবশত গ্রেপ্তার করে।

রতন সেনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলে তার দেহরক্ষীরা সিংহলদ্বীপের শাসকের কাছে তার আসল পরিচয় তুলে ধরেন এবং পদ্মাবতীর প্রেমে মাতোয়ারা হয়েই যে তিনি সিংহল এসেছেন সে কথাও বলেন। এতে গন্ধর্ব সেন বিস্মিত হয়ে রতন সেনের সঙ্গে তার মেয়ে পদ্মাবতীর বিয়ে দেন। এছাড়াও তাকে সিংহলের আরো ১৬ হাজার পদ্মীনি সুন্দরী নারী উপহার দেন। পদ্মীনি বলা হতো রুপ-গুনে সিংহলের সবেচেয়ে উৎকৃষ্ট নারীদেরকে।

পদ্মাবতী এবং নাগমতী
সিংহল থেকে ফেরার পথে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে রতন সেন ঝড়ের কবলে পড়েন। কিন্তু পদ্মাবতীর প্রতি তার ভালোবাসা এবং ভক্তি দেখে সমুদ্রের দেবতারা খুশি হন এবং তাকে ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা করে ভারতের মূল ভূমিতে পৌঁছাতে সাহাজ্য করেন। দেবতারা তাকে মূল্যবান নানা উপহারও দেন। সেসব নিয়ে রতন সেন এবং পদ্মাবতী পুরিতে (উড়িষ্যা) এসে ওঠেন।

চিতোর ফিরে আসার পর রতন সেনের প্রথম স্ত্রী নাগমতির সঙ্গে পদ্মাবতীর বিবাদ শুরু হয়। রতন সেন তাদের দুজনের বিবাদ মেটাতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে পড়েন। এসময়ই রাঘব চেতন নামের এক ব্রাহ্মণ পদ্মাবতীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। আর তা জানতে পেরে রাঘবকে হত্যার আদেশ দেন। কিন্তু রাঘব গোপনে পালিয়ে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির দরবারে চলে যান।

আলাউদ্দিন খিলজির প্রবেশ
পালানোর সময় রাঘবকে নিজের একটি চুড়ি উপহার দিয়েছিলেন পদ্মাবতী। আলাউদ্দিন খিলজি ওই সুন্দর চুড়ি দেখে রাঘবকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। ওই চুড়ির কথা বলতে গিয়েই রাঘব পদ্মাবতীর অসাধারণ রুপের বর্ণনা করেন। আর তা শুনে আলাউদ্দিন খিলজি পদ্মাবতীকে পাওয়ার জন্য লালায়িত হয়ে ওঠেন।

পদ্মাবতীকে পাওয়ার জন্য আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমণ করেন। কিন্তু রাজা রতন সেনকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। এরপর আলাউদ্দিন খিলজি চিতোরের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ আরোপ করেন। একসময় রতন সেন সমঝোতা করতে বাধ্য হন এবং আলাউদ্দিন খিলজিকে রাজদূর্গের ভেতরে নিয়ে যান। রতন সেনের সেনাপতি বাদল এবং গোরা অবশ্য রতন সেনকে নিষেধ করেছিলেন।

সেখানে পদ্মাবতীকে একনজর দেখার সুযোগ পান আলাউদ্দিন খিলজি। কিন্তু দিল্লি ফিরে যাওয়ার সময় আলাউদ্দিন খিলজি রতন সেনকে অপহরণ করে নিয়ে যান। এবং পদ্মাবতীকে তার কাছে চলে আসার আদেশ দেন।

আলাউদ্দিনের সঙ্গে কখনোই দেখা হয়নি পদ্মাবতীর
কিন্তু পদ্মাবতী তার অনুগত দুই সেনাপতি গোরা ও বাদলকে আদেশ দেন রতন সেনকে দিল্লি থেকে উদ্ধার করে আনার জন্য। গোরা এবং বাদল পদ্মাবতীর ছদ্মবেশ ধরে দিল্লি যান। এবং দিল্লির রাজপ্রাসাদে অতর্কিতে হামলা করে রতন সেনকে উদ্ধার করে চিতোর নিয়ে যান।

এসময় সেনাপতি গোরা মারা পড়েন। অপর সেনাপতি বাদল রতন সেনকে নিয়ে চিতোর ফিরে যান।

তবে গল্পে আরেকটি নতুন মোচড় দেন জায়সী। রতন সেন যখন চিতোর ছিলেন না সেসময় কুম্ভালনার এর শাসক দেবপাল পদ্মাবতীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

চিতোর ফিরে আসার পর তা জানতে পেরে দেবপালের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন রতন সেন। কিন্তু ওই যুদ্ধে তারা দুজনেই মারা পড়েন।

আর রতন সেনের মৃত্যুর খবর শুনে তার দুই স্ত্রী পদ্মাবতী এবং নাগমতি দুজনেই সতীত্ব রক্ষায় আগুনে জীবন্ত পুড়ে মরেন। ঠিক যেভাবে শিবের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী পার্বতী নিজের সতীত্ব রক্ষায় স্বেচ্ছায় আগুনে জীবন্ত পুড়ে মরেছিলেন।

এর পরে এক সময় আলাউদ্দিন খিলজি পুনরায় চিতোর দূর্গ অবরোধ করেন। আর ওই অবরোধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে রাজপ্রাসাদে থাকা সব নারী তাদের সতীত্ব রক্ষায় একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে তাতে ঝাপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে নেন। আর পুরুষরা সব যুদ্ধ করে মারা যান।

যুদ্ধের শেষে জায়সী ব্যাঙ্গ করে বলেন, আলাউদ্দিন খিলজি শুধু চিতোরের ইট-পাথরের দূর্গকেই ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কোনো মানুষকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে পারেননি। পদ্মাবতীও শুধু সেসময়ের ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালি শাসক আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্ন হিসেবেই রয়ে গেল!


মন্তব্য