kalerkantho


জসীম আহমেদের ‘দাগ’ দাগ কেটেছে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৮:২৪



জসীম আহমেদের ‘দাগ’ দাগ কেটেছে

‘অসাধারণ’ বলে যখন জসীম আহমেদকে জড়িয়ে ধরলেন সালাউদ্দিন জাকি. সিনহা লাউঞ্জ তখন করতালিতে মুখর। প্রশংসার বান,স্তুতি নেই। মোটামুটি সবাই সমঝদার,খুব ভাল ক্রিটিক না হলেও। সিনেমা দেখেন,নিয়মিত। মাত্র ১২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের সিনেমা,‘দাগ’। ধারণ করেছে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধকে,মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী সময়কে। ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবরে ৭০তম আসরে জন্য স্বল্পদর্ঘ্যৈ বিভাগে এটি নির্বাচিত হয়েছে।

সম্প্রতি দাগের একটি বিশেষ প্রদর্শনী হয়ে গেলো সিনিয়র সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সম্মানে। দাগের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ভিউস এন্ড ভিশনস এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

প্রদর্শনীর কথা বলার আগে জেনে নেয়া যাক গল্পটির কথা।
একাত্তরের কোনও এক রাতে শিলার ঘরে আশ্রয় নিতে এসেছিল জাফর,একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা।

লক্ষ্য ঢাকায় অপারশেন। জাফরের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় স্থানীয় রাজাকার,পাকস্তানি বাহিনীর দোসর খায়ের ,তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তারা জাফরকে খুঁজতে আসে শিলাদের  ঘরে। খুঁজে পায় না। হত্যা করে শিলার বাবাকে। এখান থেকে গল্পটি শুরু। কিন্তু গল্পের শেষটি অন্যান্য গল্পের মতো নয়। অসাধারণ মুন্সিয়ানায় গল্পটি শষে করেছেন জসীম আহমেদ, যিনি এটিকে সিনেমায় রূপ দিয়েছেন। গল্পটিতে তিনি তুলে ধরেছেনে প্রতিশোধ ,প্রতিরোধের এক অনন্যগাঁথা।
সিনেমাটি নিয়ে কথা হয় পরিচালক জসীম আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে ছবিটি নির্মিত । এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমাদের যে লড়াই  শুরু হয়েছিল তা এখনো শষে হয়নি। আমি সেই যুদ্ধের  কথাই বলতে চেয়েছি। জসীম জানান ,এটি তার প্রথম চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি টেলিভিশনে অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র ও কয়েকটি  নাটক নির্মাণ করেন। তার নির্মিত  প্রামাণ্যচত্রিরে বেশিরভাগই মুক্তযুদ্ধ নিয়ে । এবার বলা যাক প্রদর্শনী নিয়ে।
সালাউদ্দিন জাকি প্রদর্শনী শেষে যখন পরিচালক জসীম আহমেদকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এক কথায় অসাধারন’, এর পর সিনেমাটি সম্পর্কে আর কিছু বলার বাকি থাকেনা।   প্রবীণ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার, একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ৭১ টেলিভিশনের বার্তা পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, নিউজ ২৪ এর নির্বাহী পরিচালক হাসনাইন খোরশেদ, বিবিসির কাদির কল্লোল, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাবান মাহমুদ বা অন্যান্য মিডিয়া ব্যাক্তিত্বরা যখন উচ্ছ্বাস প্রশংসা করে বলছিলেন, ‘দাগ’ তাদের মনে দাগ কেটেছে তার পর দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় ‘দাগ’ চলচ্চিত্রটি কোনও সাধারন সিনেমা নয়। মাত্র ১৩ মিনিটের একটি সিনেমায় পরিচালক যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারের খুন, ধর্ষণ ও আবহমান বাঙালি নারীর ব্যর্থপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধে সমান অংশীদারিত্ব এবং স্বাধীনতা পরবর্তী রাজাকারদের পুনর্বাসনকে  উপজীব্য করে তুলেছেন তা এক কথায় অনন্য যা হল ভর্তি দর্শককে মুগ্ধ করেছে।
দর্শকদের কেউই সাধারন ছিলেন না, সবাই দেশের গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশিষ্টজন।
জসীম আহমেদের কাহিনী ও  পরিচালনার এ ছবিটি ২০১৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা বিভাগে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় কিনা জানা যাবে কিছু দিন পর। তবে শর্ট ফিল্ম কর্নারের নির্বাচনে ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে আসন্ন আসরে ছবিটির প্রদর্শন যা বাংলাদেশর স্বল্প দৈর্ঘ সিনেমার ইতিহাসে প্রথম। ভালো ছবি হলেই যে বড় উৎসবে পুরস্কার পাবে বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে অথবা জুরিরা আমাদের ইতিহাস, ত্যাগ ধরতে পারবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কোথাও থেকে পুরস্কার আসুক বা না আসুক ‘দাগ’ যে বাংলাদেশি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি বিয়ে ও বরযাত্রা দিয়ে শুরুতেই দেখানো হয়েছে পুরনো ঢাকার চিরায়ত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় আতশবাজি ও পটকার ব্যবহার যা আসলে ঢাকার ঐতিহ্যকেই ধারণ করে। কিন্তু এই আতশবাজি আর পটকার আওয়াজ ফুলশয্যার রাতেই নববধূ শিলাকে কাপিয়ে দেয়, তার মনে ভেসে ওঠে  ১৯৭১ সালের দুঃসহ স্মৃতি। এভাবেই ৭১ আর ৭৫ পরবর্তী সময়ের প্যরালাল গল্প মুন্সিয়ানার সাথেই বলেছেন নির্মাতা।  
মুক্তিযুদ্ধকালে বাবার সঙ্গে পুরনো ঢাকায় থাকতো শিলা। মুক্তিযোদ্ধা জাফর ছিলেন তার প্রেমিক ও হবু স্বামী। একরাতে জাফর বাসায় এসে জানায়, ঢাকায় গেরিলা আক্রমণ হবে। সেও এসেছে আক্রমণে অংশ নিতে। মুক্তিযুদ্ধকে নিজের যুদ্ধ গণ্য করা  শিলার বাড়িতে দু’দিন থেকে  যাওয়ার সময় জাফর বলে, ‘আমি এখানে থাকলে তোমাদের বিপদ হবে। ’ শিলা উত্তর দেয়, ‘ভয় পাইনা, ‘যুদ্ধটা কি তোমাদের একার?’
এই সংলাপের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শিলা বা নারীর ভূমিকাকেই স্পষ্ট করা হয়েছে।
জাফর চলে যাওয়ার পর প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙে শিলার। দরজায় কড়া নাড়ে পাকিস্তানিদের দোসর মুখ বাঁধা রাজাকার। জাফরের খোঁজ করে কোনো তথ্য না পেয়ে তারা শিলার বাবাকে খুন করে। দলনেতা রাজাকার খায়ের শ্লীলতাহানি করে শিলার। শিলা চিনতে পারে রাজাকার খায়েরকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শিলার মনে একাত্তরের দাগ ও ক্ষত রয়ে যায়। রাজাকার খায়েরের খোঁজ করে সে তাকে  বিয়ে করে। অসংখ্য নারীকে ধর্ষণকারী খায়ের অন্যদের মতো শিলাকেও ভুলে যায়। শিলার মনে প্রতিশোধ স্পৃহা তীব্র হয়। রাজাকার বরের কাছে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিলেও ফুলশয্যার রাতেই তাকে খুন করে প্রতিশোধ নেয়। এটিই তার মুক্তিযুদ্ধ।
দাগ এর চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, আবহ সঙ্গীত, শব্দ সংযোজন এমনকি পোশাকেও রয়েছে বিশেষত্য। বিশেষ করে ঘুমন্ত শিলার গুলির শব্দে ঘুম ভাঙার সাথে সাথে পায়ের আওয়াজে যে ভয়ংকর সাসপেন্স তৈরি হয় তা সচরাচর সিনেমায় দেখা যায়না। ভয়ংকর কিছু ঘটে যাওয়ার সিগন্যাল হিসেবে লাল রঙয়ের প্রদর্শন মনে করিয়ে দিতে পারে আলফ্রেড হিচককের নির্মাণ শৈলীকে। তবে ছবির শেষের দিকে দিরঘায়িত যৌন দৃশ্যে যদিও গল্পের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তা ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য উপযোগী নয়।
দাগ এ অভিনয় করেছেন, শারমনি জোহা শশী, শতাব্দি ওয়াদুদ, বাকার বকুলসহ অনেকে। চলচ্ছিত্রটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন পান্থ শাহরয়িার, চিত্রগ্রহণে ছিলেন জোগেন্দ্র পাণ্ডা, সম্পাদনা করেছেন  সুমিত ঘোষ, সাউন্ড ডিজাইন করেছন রিপন নাথ। এছাড়াও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন র্পাথ বড়ুয়া। চলচ্চত্রিটরি নির্বাহী  প্রযোজক অম্লান বশ্বিাস ও প্রযোজনা করছেনে ভিউজ এন্ড ভিশন্স।  
 


মন্তব্য