kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভাগ্য, আয়নাবাজি এবং…

-বালার্ক চালাষ   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:১০



ভাগ্য, আয়নাবাজি এবং…

বুধবার (১২.১০.২০১৬) রাত ৭টা ৫০। চকবাজার-সোয়ারীঘাট-কেরানীগঞ্জ ঘুরে শ্যামলী সিনেমা হলে এলাম মাত্র।

টিকেট হাতে হাসি মুখে সারি বেঁধে প্রচুর দর্শক ঢুকছে হলে। এতো দর্শক! কত বছর পর দেখছি এই দৃশ্য? -আনন্দ-উত্তেজনায় লাফাচ্ছে আমার হদয়। ১০ মিনিট পরই শুরু হবে ছবি। দ্রুত কাউন্টারে গেলাম। কিন্তু গিয়েই থমকে দাঁড়াতে হলো। সামনে কাচে সাঁটা কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা- ‘হাউস ফুল’! মন খারাপ হয়ে গেল। আজ আর দেখা হলো না! ২৩ অক্টোবরের আগে আমার সাপ্তাহিক ছুটি নেই। ততদিন পর্যন্ত চলবে ছবিটি? চলতেও পারে। এতো দর্শক উপস্থিতি যখন। –এমন হতাশা-সান্ত্বনার কথা বলছে মন।

‌‌২৯ সেপ্টেম্বর ‘আয়নাবাজি’ মুক্তির পর অফিসে যাওয়ার পথে ওদিকে চোখ পড়লে দেখতাম, শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে ভিড়। একদিন দেখি, দর্শক-সারি হলের দরজা থেকে রিং রোডে এসে ঠেকেছে! তবে আজ (১২.১০.২০১৬)আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছে পরে।

হঠাৎ মনে হলো, আয়নাবাজি তো দেখা হলো না, একটু দাঁড়াই, দর্শকদের দেখি! অনেকে এসে টিকিট না পেয়ে ভার মনে ফিরে যাচ্ছেন। এর মধ্যে কাউন্টারের সামনে একটা জটলা তৈরি হলো। কয়েকজন জানতে চাইলেন অগ্রিম টিকেট পাওয়া যাবে কি না। কাউন্টারম্যান বললেন, বৃহস্পতিবারের টিকিট নেই। শুক্রবার আড়াইটা, সাড়ে পাঁচটা, রাত আটটার অগ্রিম টিকিট শেষ; তবে দুপুর ১২টার কিছু টিকেট পাবেন। শনিবারের বেশকিছু এবং রবিবারেরও কিছু টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

এ খোদা! এ কি শুনছি! -দুই দিনের অগ্রিম টিকেট বেচা হয়ে গেছে! আরো দুই দিনেরও বেশকিছু বিক্রি হয়েছে!

একজন রবিবারের আটটি টিকেট কেটে এক বিদেশির হাতে দিলেন। বিদেশি টিকিটে তাকিয়ে চওড়া হাসি দিলেন, ‘নাইস! নাইস!!’

এক ব্যক্তি পাশে দাঁড়ানো স্ত্রীকে জিজ্ঞাসিলেন, ‘কয়টা কাটবো?’ -‘আমরা দুজনেই তো, দুটিই নাও। ’

আরেক বয়স্ক ব্যক্তি সম্ভবত গিন্নিকে ফোনে বললেন, ‘এই, কয়টা নেবো?’ পরে তিনি পাঁচটি টিকিট কিনলেন।

এক তরুণ এসে কাউন্টারম্যানকে জিগালেন, ‘ভাই, হলে এসি আছে তো? আমাদের সঙ্গে কয়েক বিদেশিও দেখবেন। এসি না থাকলে তাদের কষ্ট হবে। ’ কাউন্টারম্যানের তরুণটির দিকে নজর দেবার সময় ছিল না। তাঁকে নানাজন নানা প্রশ্ন করছেন, টিকেট নিচ্ছেন। পরে একটু অবসর পেয়ে কাউন্টারম্যান আশ্বস্ত করলেন, পুরো হলই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।

ভালোই লাগছে, শিশু-কিশোর-তরুণ-যুবক-বৃদ্ধ- প্রায় সব বয়সের মানুষ সিনেমা দেখতে এসেছে। আফসোসও হচ্ছে, আজ আমার দেখা হলো না! হঠাৎ এক যুবক প্রায় দৌড়ে এসে কাউন্টারম্যানকে বললেন, ‘আটটি টিকেট নিয়েছিলাম। আমার দুজন লোক আসেনি। দুটি টিকেট ফেরৎ দিবো। ’

একেই বুঝি বলে ভাগ্য। অন্য কেউ চাইবার আগেই আমি চট করে বললাম, ‘তাহলে আমাকে একটা দিন। ’

তাঁকে ১৫০ টাকা দিয়ে টিকেট নিয়ে ছুটলাম হল গেটের দিকে। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। পেছন থেকে কানে এলো ‘ধন্যবাদ’।

ওয়াশরুম থেকে ফিরে লাইনে দাঁড়াতেই বুঝে গেলাম, আয়নাবাজি শুরু হয়ে গেছে! আমার আসন একেবারে সামনের সারিতে! কিছুটা স্মৃতিকাতর হলাম। ছোটবেলায় বেশিরভাগ সিনেমাই দেখেছি ধনবাড়ীর মধুছন্দা আর পিয়াসা হলের থার্ড ক্লাসে (পর্দার কাছে) বসে, ৩ টাকার টিকেট কেটে। কোনো কোনো দিন দেখেছি গেটম্যানকে এক টাকা দিয়ে। কিছু ছবি দেখার ‘সৌভাগ্য’ হয়েছিল নারীদের বিশেষ শ্রেণিতে বসে। মধুছন্দা-পিয়াসায় পাঁচটি শ্রেণি থাকলেও শ্যামলী সিনেমা হলে আছে দুটি- প্রিমিয়াম (১৫০ টাকা) ও ডিলাক্স (২৫০ টাকা)।

২.

বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম একটা বাংলা ছবি (আয়নাবাজি) দেখে ‘তৃপ্ত’ হলাম। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করলেন অমিতাভ রেজা। এক শক্তিমান পরিচালকের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। আমার বিশ্বাস, ছবিটা দেখার পর অনেক নায়ক-নায়িকা-অভিনয়শিল্পীই মুখিয়ে থাকবেন অমিতাভের ছবিতে কাজ করার জন্য। ’

আয়নাবাজির কাহিনি-নির্মাণ চমৎকার। সম্পাদনাও দারুণ। প্রিন্ট ঝকঝকে। আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে, আমি যে-জন্য অমিতাভ রেজাকে বড় কৃতিত্ব দেবো, সেটা হলো, আয়নাবাজির গল্প-চরিত্র-দৃশ্যগুলোর ৯৫ ভাগই বাস্তব করে তুলতে পেরেছেন তিনি। ঢাকা, ঢাকার লোকজন-গাড়ি-কারাগার ইত্যাদি তাদের মতো করে কাজ করছে, চলছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় গল্প, চরিত্র বা দৃশ্যটি অকৃত্রিমভাবে তুলে এনেছেন অমিতাভ। এটিই আমি খুঁজছিলাম বহুকাল ধরে। পাখির চোখে ঢাকা কত সুন্দর!-সেটা দেখালো আয়নাবাজি। ছবিটির কিছু দৃশ্য এমন, দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে আমিও যাচ্ছি, ওপর থেকে নামছি! এই প্রথম এ অদ্ভূত অভিজ্ঞতা আমার।

৩.

আয়নাবাজি দেখার কয়েক দিন আগে সহকর্মী কাজী মো. মোতাহার হোসেন বুলবুল আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‌‘আয়নাবাজির নায়িকা কে? কেমন অভিনয় করেছেন তিনি? কবরী-শাবানা-ববিতা-অঞ্জুদের মতো দেখে মজা পাবো তো?’

আমি বলেছিলাম, ‘নায়িকা হলেন উপস্থাপিকা, মডেল নাবিলা। শুনেছি তার প্রথম ছবি হলে্ও সহজ-স্বচ্ছন্দ-অনায়াস অভিনয় করেছেন তিনি। ’

ছবিটি দেখার পর বুলবুল ভাইকে বলছি, আপনিও দেখুন আয়নাবাজি। আপনার গাঁটের পয়সায় বন্ধুদেরও দেখাতে পারেন। একটুও লস খাবেন না। পয়সা উসুল হবে। আর হলে গিয়ে যদি চোখ বুজে না থাকেন, তাহলে নাবিলার (হৃদি) প্রথম দৃশ্যেই লুটতে পারবেন বড় মজা! তারপরে তো বোনাস্। হা হা হা।

চঞ্চল চৌধুরীর কথা একটু বলি। তিনি হলেন কাদামাটি। তাঁকে দিয়ে যে শিল্পকর্ম বানাতে চাইবেন দক্ষতা থাকলে তা-ই পারবেন। আয়নাবাজিতে তিনি বিভিন্ন চরিত্রের গভীরে ডুবে গেছেন। অকৃত্রিমভাবে ফুটে উঠেছেন। পার্থ বড়ুয়াকে তো ‌সাংবাদিকই মনে হলো। বৃন্দাবন দাসের অসাধারণ অভিনয়ের কথা সবার জানা। লুৎফর রহমান জর্জ, গাউসুল আজম শাওনসহ অন্যদের অভিনয়ও ভালো।

৪.

আয়নাবাজির কিছু বিরক্তিকর দৃশ্যের কথাও বলবো। ছোট ছেলেটির কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ তুলে দেওয়া কি ঠিক হয়েছে? তার প্রথম কয়েক কথায় দর্শক হাসলেও পরের কথাগুলো ন্যাকামো মনে হয়েছে। একদিকে স্মার্টফোনের ব্যবহার অন্যদিকে স্টুডিওতে গিয়ে নবদম্পতির ছবি তোলা- অসামঞ্জস্য নয়? এখন কী ওভাবে কেউ ছবি তুলতে যায় স্টুডিওতে? তবে আগের দিনের মতো মানুষ এখনও স্টুডিওতে গিয়ে দলবদ্ধ ছবি তুললে আমার ভালোই লাগবে।

 
৫.

আসিতেছে নেই!

এর আগে যতবার শ্যামলী হলে ছবি দেখেছি ততবারই লক্ষ্য করেছি, চলিতেছে ছবির সঙ্গে আসিতেছে ছবির পোস্টারও আছে। কিন্তু এবার দেখলাম, আসিতেছে (মুক্তির অপেক্ষায় থাকা) ছবির কোনো পোস্টার নেই! সব পোস্টার আয়নাবাজির!


আয়নাবাজি দেখে আমি ছবিটির সব বুঝে গেছি, তা নয়। কিছুদিন আগে আমার ফেসবুক-বন্ধু, কণ্ঠশীলনে সাবেক সহপাঠী আরেফিন শাকিল এই মন্তব্য করেছে : ‌‌আয়নাবাজি অনেক কিছু না বোঝার ছবি। আয়নাবাজি নিখাদ বিনোদনের ছবি। আয়নাবাজি অনেক নতুনত্বের ছবি। আয়নাবাজি একবার নয়, বারবার দেখার ছবি।

আমারও তা-ই মনে হয় অনেকটা।

আয়নাবাজির ব্যাপারে প্রায়ই আমার কাছে খোঁজ‌‌‌-খবর নিচ্ছেন সহকর্মী মিল্টন ভাই। সুযোগ পেলেই তিনি দেখবেন। তারিক ভাই বললেন, শিগগিরই তিনি সপরিবারে যাবেন হলে।

অমিতাভ রেজা, আপনার জন্য শুভকামনা। দেখুন না, আয়নাবাজি-২ বানানো যায় কিনা!


মন্তব্য