kalerkantho


যেসব কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত ১৯টি সিনেমা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ১৬:৪৬



যেসব কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত ১৯টি সিনেমা

আপনি যদি কখনো সিনেমার ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চান তাহলে আপনাকে যা করতে হবে তা হলো, গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যে সিনেমাগুলো নিষিদ্ধ হয়েছে সেগুলো একটু খতিয়ে দেখা। এর মাধ্যমে লোকের ওপর সিনেমার প্রভাব সম্পর্কে আপনার ধারণা আরো স্পষ্ট হবে।
রাজনৈতিক (দ্য গ্রেট ডিক্টেটর), ধর্মীয় (দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রাইস্ট) বা বিশেষ রঙ্গের ব্যবহার (দ্য সিম্পসনস মুভি) যে কারণেই কোনো সিনেমা নিষিদ্ধ করা হোক না কেন সবগুলো সিনেমাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনুভূত অপরাধের ওপর ভিত্তি করে।
বিখ্যাত ১৯টি সিনেমা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল যেসব কারণে:
১. “দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স”
১৯৫০ এর দশকের শেষদিক এবং ১৯৬০ এর দশকের শুরুর দিকে উত্তর আফ্রিকায় ফরাসি সরকারের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ান যুদ্ধের ওপর নির্মিত এই তথ্যচিত্রটি ফ্রান্সে ৬ বছর নিষিদ্ধ ছিল। কারণ সিনেমাটি আলজেরিয়দের পক্ষে এবং ফরাসিদের বিপক্ষে নানা ধরনের রাজনৈতিক বার্তায় পরিপূর্ণ ছিল।
২. ব্যাটলশিপ পোটেমকিন
১৯২৫ সালের ক্ল্যাসিক ঘরানার এই নির্বাক সিনেমায় রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজে ১৯০৫ সালে সংঘটিত একটি বিদ্রোহের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সিনেমাটি নাৎসীবাদি জার্মানি এবং আরো অনেক দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটি নিষিদ্ধ করার পেছনে যে আশঙ্কাটি কাজ করেছে তা হলো, সিনেমাটি মার্ক্সবাদি বিপ্লব উস্কে দিতে পারে। বিশ্বব্যাপী সিনেমার অধ্যায়ন সংক্রান্ত কোর্সগুলোতে এটি এখন একটি পাঠ্য বিষয়।
৩. অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ
স্ট্যানলি কুব্রিকের এই ক্লাসিক সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে এক অতিসহিংস কিশোরকে নিয়ে। সিনেমাটিতে বাড়িঘরে হামলা, ধর্ষণসহ ভয়ানক কিছু সহিংস আচরণের চিত্রায়ন করা হয়। এ কারণে বেশ কয়েকটি দেশে দশকের পর দশক ধরে সিনেমাটি নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি যুক্তরাজ্যের থিয়েটারগুলো থেকেও এটি প্র্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। কারণ কুব্রিক এবং তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ১৯৯৯ সালে কুব্রিকের মুত্যুর পরই শুধু সিনেমাটি ফের থিয়েটারে প্রদর্শিত হয়।
৪. “ড. স্ট্রেঞ্জলাভ বা হাউ আই লার্নড টু স্টপ ওরিয়িং অ্যান্ড লাভ দ্য বম্ব”
কুব্রিকের আরেকটি ক্ল্যাসিক এই সিনেমা। এতে স্নায়ুযুদ্ধকে উপজীব্য করে একটি গল্পের চিত্রায়ন করা হয়। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পরপরই ফিনল্যান্ড সিনেমাটির প্রদর্শণ নিষিদ্ধ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সিনেমাটি প্রদর্শণ করলে ক্ষুব্ধ হতে পারে এই ভয় থেকেই সেটির প্রদর্শণ নিষিদ্ধ করে ফিনল্যান্ড।
৫. ককসাকার ব্লুস
পরিচালক রবার্ট ফ্র্যাঙ্ক এবং ড্যানি সেইমুর বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ড দ্য রোলিং স্টোন এর ১৯৭২ সালের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে উপজীব্য করে নির্মাণ করেন এই সিনেমা। সিনেমাটি দেখে দ্য রোলিং স্টোন স্বয়ং হতচকিত হয়ে যায়। ব্যান্ডটি নিজেই সিনেমাটির মুক্তি থামিয়ে দেয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে কঠোর দিকনির্দেশনার অধীনে সিনেমাটি মুক্তি পায়। কিন্তু শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়, বছরে মাত্র চারবার সিনেমাটি প্রদর্শন করা যাবে। আর প্রথম বছরে শুধু স্টোনের সম্পাদিত সংস্করণটিই প্রদর্শণ করা যাবে।
৬. ডাক সুপ
জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে মার্ক্স ভাতৃদ্বয় ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির গলার কাঁটা হয়ে ওঠেন। যুদ্ধ ও রাজনীতি নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক এই সিনেমা নির্মিত হয় ১৯৩৩ সালে। সিনেমাটি মুক্তির পরপরই মুসোলিনি এটি নিষিদ্ধ করেন। আর মার্ক্স ভাতৃদ্বয়ও নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে নতুন ছিলেন না। একই সময়ে তাদেরকে জার্মানিতেও নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ এই দু্ই কমেডিয়ান ছিলেন ইহুদি।
৭. ফ্রিকস
বিরক্তিকর এই ক্ল্যাসিক থ্রিলারটির উপজীব্য সার্কাস শো। এতে বেশ কয়েকজন সার্কাস তারকার তাদের দলনেতার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের একটি কাহিনীর চিত্রায়ন করা হয়েছে। সিনেমাটি যুক্তরাজ্যে ৩০ বছর ধরে নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯০-র দশকে একটি ভিডিও সংস্করণ প্রকাশের অনুমোদন পাওয়ার পর এটি ফের সহজলভ্য হয়।
৮. দ্য গ্রেট ডিকটেটর
চার্লি চ্যাপলিনের প্রথম সবাক সিনেমাটি তার সবচেয়ে কুখ্যাত সিনেমাও বটে। সিনেমাটিতে নাৎসীবাদি জার্মানির ফ্যাসিবাদি শাসনের প্রতি ব্যাঙ্গ করা হয়। চ্যাপলিন নিজে সিনেমাটির গল্প লিখেছেন, সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন এবং এতে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৪০ সালে মুক্তির পরপরই নাৎসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ল্যাটিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হয়।
৯. দ্য ইন্টারভিউ
শেঠ রোগান/জেমস ফ্র্যাঙ্কো নির্মিত ২০১৪ সালের এই কমেডিতে দুজন সাংবাদিকের উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উনকে হত্যাচেষ্টার গল্পের চিত্রায়ন করা হয়েছে। দুই সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওই দুই পরিচালক। সিনেমাটি রাশিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়। ওদিকে উত্তর কোরিয়ায় এমনিতেই সকল আমেরিকান সিনেমা নিষিদ্ধ রয়েছে।
১০. লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস
১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির সময় সিনেমাটি মূলত একটি এক্স রেটিং সহকারে প্রকাশিত হয়। বার্নার্ডো বার্টোলুসির প্রেম-যৌনতা বিষয়ক এই মাস্টারপিস বিশ্বব্যাপী আরো বাজে ভাগ্য বরণ করে। মুক্তির পরপরই সিনেমাটি বেশ কয়েকটি দেশে নিষিদ্ধ হয়। বার্টোলুসির নিজ দেশ ইটালিতেও ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সিনেমাটির প্রদর্শণ নিষিদ্ধ ছিল। সিনেমাটির মুদ্রণও নিষিদ্ধ ছিল এবং পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। এছাড়া অশ্লীলতার দায়ে বার্টোলুসির চার মাসের কারাদণ্ডও হয়েছিল।
১১. দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রাইস্ট
১৯৫৫ সালে নিকোস কাজান্টজাকিস এর বিতর্কিত উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন মার্টিন স্কোরসেস। এতে যিশু খ্রিস্টের বিকল্প ভাগ্য বরণের গল্প চিত্রায়ন করা হয়েছে। সিনেমাটি যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কাউন্টিতে নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাভান্নাহ, জর্জিয়া, নিউ অর্লিন্স, ওকলাহোমা সিটি, সান্তা অ্যানা এবং ক্যালিফোর্নিয়াতেও এটি নিষিদ্ধ ছিল।
১২. নোয়াহ
ইতিহাসখ্যাত সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যার আগে নূহ নবীর মিশনকে উপজীব্য করে সিনেমাটি নির্মাণ করেন ড্যারেন অ্যারোনোফস্কি। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ এবং ইসলাম অধ্যুষিত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০১৪ সালে মুক্তির আগেই এটি নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ ইসলামের বিভিন্ন ঘরানায় নবীদের ছবি আঁকা বা কোনো ধরনের চিত্রায়ন করা হারাম।
১৩. স্যালো বা দ্য ওয়ান টুয়েন্টি ডেজ অফ সডম
যৌনতা এবং গ্রাফিক সহিংসতার কারণে সর্বকালের সবচেয়ে বিতর্কিত সিনেমাগুলোর একটি এটি। ১৯৭৫ সালে মুক্তির পরপরই বেশ কয়েকটি দেশে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে সিনেমাটির একটি অকর্তিত ও চুড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।
১৪. দ্য সিম্পসন মুভি
প্রশ্নবিদ্ধ অনেক কারণেও সিনেমা নিষিদ্ধ করা হয়। সে ক্ষেত্রে এই সিনেমা পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। ২০০৭ সালে বার্মায় সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হয় কারণ এতে লাল ও হলুদ রঙের ব্যবহার করা হয়েছে। বার্মার যুক্তি এই রঙগুলো বার্মার ব্রিদাহী গোষ্ঠী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। সুতরাং এটির প্রদর্শনে বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন হতে পারে।
১৫. দ্য টেক্সাস চেইন স ম্যাসাকার
১৯৭৪ সালে মুক্তির পরপরই এই হরর ক্ল্যাসিকটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে সিনেমাটির একটি অকর্তিত সংস্করণ চুড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়।
১৬. ক্যানিবাল হলোকস্ট
সিনেমাটি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখলে হজম করা কঠিন হবে। প্রথমবারের মতো পরিত্যক্ত ফুটেজ থেকে নির্মিত হয় এই ভৌতিক সিনেমা। অ্যামাজান জঙ্গলে এক কাল্পনিক তথ্যচিত্র নির্মাতার একটি সিনেমার চিত্রায়ন সংক্রান্ত গল্প নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা বেশ প্রভাবশালী হয়েছিল। সিনেমাটিকে এতোটাই বাস্তবানুগ ভাবা হয়েছিল যে, ১৯৮০ সালে মুক্তির পর এটি বিভন্ন সময়ে ৪০টি দেশে নিষিদ্ধ হয়। নিউজিল্যান্ডে সিনেমাটির প্রদর্শণ এখনো নিষিদ্ধ আছে।
১৭. দ্য ওলফ অফ ওয়াল স্ট্রিট
বয়স বাড়লেও সিনেমা নির্মাতা মার্টিন স্কোরসেস দূর্বল হননি। এক স্টক ব্রোকারের গল্প নিয়ে নির্মিত এবং ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার এই সিনেমাটি মালয়েশিয়া, নেপাল, জিম্বাবুয়ে এবং কেনিয়াতে নিষিদ্ধ আছে।
১৮. জুল্যান্ডার
২০০১ সালে মুক্তির পর বেন স্টিলার এর এই হিট সিনেমা বেশ কয়েকটি দেশে নিষিদ্ধ করা হয়। সিনেমাটিতে সমকাম সম্পর্কিত গল্প থাকায় তা নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সমকাম ছাড়াও এতে আরো অনেক সুস্পষ্ট অপরাধের চিত্রায়ন করা হয়। আর মালয়েশিয়ার সিনেমা সেন্সর বোর্ড এটিকে পুরোপুরি প্রদর্শনের অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে। কারণ এতে মডেল ডেরেক জুল্যান্ডারকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার বিষয়ে ব্রেনওয়াশের গল্পের চিত্রায়ন করা হয়েছে।
১৯. অ্যামাজিং গ্রেস
এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন প্রয়াত সিডনি পোল্যাক। শিল্পী অ্যারেথা ফ্র্যাঙ্কলিনের লস অ্যাঞ্জেলসের নিউ টেম্পল মিশিনারি ব্যাপটিস্ট চার্চে ১৯৭২ সালে দুই রাতের অবস্থানের সরাসরি ভিডিও থেকে এটি বানানো হয়। তার বেস্ট সেলিং অ্যালবাম “অ্যামাজিং গ্রেস” এর জন্য অ্যারেথা ওই দুই রাত গির্জায় অবস্থান করেছিলেন। সে বছরই অ্যালবামটি মুক্তি পায়। পোল্যাক সেখানে গিয়েছিলেন চারজন পুরষ শুটিং ক্রুসহ। আর সেখানে তার প্রায় ২০ ঘন্টা ধরে অবস্থানের চিত্র ভিডিওতে ধারন করা হয়।
২০১৫ সালে সিনেমাটি চুড়ান্তভাবে উৎসবে দেখানো শুরু হয়। প্রথমে টেলুরাইড এবং পরে টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয়। তবে অ্যারেথা ফ্র্যাঙ্কলিনের আইনজীবি এটির প্রদর্শণ বন্ধ করে দেন। এর পেছনে কারণ হিসেবে তিনি, ফ্র্যাঙ্কলিনের অনুমতি না নেওয়ার বিষয়টির উল্লেখ করেন। সিনেমাটির প্রযোজক চলতি বছরে টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে এটি পুনরায় প্রদর্শনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিনের আইনজীবি ফের এটির প্রদর্শনে বাধা দেন।
সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার


মন্তব্য