kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সিনেমায় সন্ত্রাসবাদির চরিত্রে অভিনয় করে বাস্তবেও সন্ত্রাসী গণ্য!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৮:১৫



সিনেমায় সন্ত্রাসবাদির চরিত্রে অভিনয় করে বাস্তবেও সন্ত্রাসী গণ্য!

আমি রিজ আহমেদ। আমি একজন অভিনেতা।

কিশোর বয়স থেকেই আমি বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে আসছি। ১৯৮০ সালে শিশু বয়সে আমাকে এবং আমার ভাইকে আমাদের বাড়ির কাছে এক দুর্বৃত্ত ছুরি হাতে আটক করে। আমার ভাইয়ের গলায় ছুরি ধরে ওই দুর্বৃত্ত। এর এক দশক পরে আমার গলায় ছুরি ধরেছিল আরেক “পাকি”। পরেরবার নিজেকে আমি লুটন বিমানবন্দরের জানালাহীন একটি ঘরে অসহায়ভাবে আটকে থাকতে দেখি। আমার হাত দুটো বেদনাদায়ক হ্যান্ডকাফে আটকানো ছিল। আর আমার শার্টের কলার ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পিন দিয়ে দেয়ালে আটকে রেখেছিল। ঘটনাটি ছিল ৯/১১ পরবর্তীকালের। আর এখন আমাকে একজন মুসলিম হিসেবে লেবেল পরানো হয়েছে।
৯/১১ পরবর্তী সময়েই আমি পেশাদার অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করি। ওই সময়ে আমি সিনেমায় কাজ শুরু করি। আমার প্রথম সিনেমাটি ছিল মিখায়েল উইন্টারবটমের দ্য রোড টু গুয়ান্তনামো। সিনেমাটিতে ব্রিটেনের বার্মিংহামের একদল বন্ধুর গল্প বলা হয়। যাদেরক বেআইনীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটি একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পায়। এতে আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। যারা সিনেমাটি দেখেছেন তারা গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দিদেরকে এখন আর শুধু কমলা রঙের জাম্পস্যুট না ভেবে বরং রক্তমাংসের মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
কিন্তু লুটন বিমান বন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরা লিখিত কোনো বার্তা পাননি। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব শেষে লুটন বিমান বন্দরের ইন্দ্রজালে ফিরে আসার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আমাকে ব্যাঙের মতো ধরে নিয়ে একটি অজানা ঘরে আটক করে রাখে। সেখান আমাকে অপমান, হুমকি এবং এরপর আক্রমণও করা হয়।
“তুমি কী ধরনের সিনেমা বানাও? তুমি কি মুসলিমদের সংগ্রামকে আরো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই একজন অভিনেতা হয়েছো?”, এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমাকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করছিল। এসময় তিনি আমার বাহু মুচড়িয়ে হাড় ভেঙ্গে ফেলার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।
আমাকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল সেগুলো শুধু শৈল্পিক মতপ্রকাশ বা অভিব্যক্তির জন্যই বিপজ্জনক ছিল না। বরং এজন্যও বিপজ্জনক ছিল যে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আমার সকলে আসলে কী ধরনের সন্ত্রাসবাদি হুমকির মধ্যে রয়েছি সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না।
ওই কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে যা করেছিল তা স্পষ্টতই বেআইনী ছিল। আমাকে কিছু সমাজকর্মী আইনজীবি এ ব্যাপারে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তা না করে বরং আমি ঘটনাটির একটি বিবরণ লিখে সাংবাদিকদের কাছে পাঠাই। বেআইনীভাবে আটকের বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত সিনেমার অভিনেতাকে বেআইনীভাবে আটকের গল্প এতোটাই ভালো হয়েছিল যে তা অগ্রাহ্য করাটাই শ্রেয় মনে করেন সাংবাদিকরা। এই বিষণ্ন ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করতে পেরে আমার খুশিই লাগছিল।
এই ঘটনায় উদ্বুদ্ব হয়ে আমি একটি গানও লিখি। এর শিরোনাম “পোস্ট নাইন ইলেভেন ব্লুস”। গানটির একটি লাইন ছিল এমন, “আমরা সকলেই সন্দেহভাজন/আমি হয়তো পেটের বায়ু ত্যাগ করলাম কিন্তু আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো রাসায়নিক হামলার জন্য”। ক্রিস মরিসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমার ওই গান। তিনি আমাকে ফোর লায়নস এ অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন।
যাইহোক, অবশেষে প্রমাণিত হলো, যুক্তরাজ্যে সাদা লোকরা ছাড়া আর কারো জন্যই অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নয়। প্রযোজকরা বললেন, তারা আমাকে দিয়ে তাদের সিনেমায় অভিনয় করাতে চান কিন্তু তাদের কাছে এমন কোনো কাজ নেই যাতে আমি কার্যকরভাবে অভিনয় করতে পারি। মনে হচ্ছিল ২০০০ সালের বহুজাতিক সংস্কৃতির ব্রিটেনে যেসব গল্প বলা দরকার তার সবই বুঝি ১৭০০ শতকের মাঝামাঝি সময়কালের শ্বেতাঙ্গদের গল্প। আমি শুনেছি ব্রিটেন আদৌ সেই প্রতিশ্রুত ভুমি নয়। বরং তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড।
আর কারণও সোজা। আমেরিকাও যুক্তরাজ্যের মতো এর গল্পগুলো ব্যবহার করে নিজের ব্যাপারে মিথ বা রুপকথা রপ্তানি করে। ব্রিটেনের বাস্তবতা হলো এটি একটি স্পন্দনশীল বহুজাতিক সংস্কৃতির দেশ। কিন্তু এর গল্পগুলোতে যে রুপকথা রপ্তানি করা হয় তা হলো এটি শুধু শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাদের দুনিয়া। বিপরীতক্রমে, আমেরিকান সমাজ সত্যিকার অর্থেই বিভক্ত। অথচ তাদের গল্পগুলোতে বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের মিলনমেলার রুপকথা রপ্তানি করা হয়। যেখানে সকলেই অপরাধ দমণ এবং ভিনগ্রহ থেকে আসা আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন।
সুতরাং আমি আমেরিকার উদ্দেশ্যেই রওয়ানা করি। কিন্তু যাত্রাটি সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরেও আমি একই সমস্যার মুখোমুখি হই। পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরানে ছয় মাস ধরে নির্মিত সিনেমা দ্য রোড গুয়ান্তানামোতে অভিনয় করার ফলে আমার বিশ্বভ্রমণই যেন হারাম হয়ে গেছে। বিমানেই আমি ঘামতে শুরু করেছিলাম। বিমান থেকে নামার পর আমার গয়ের রঙ দেখেই নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমার ব্যাপারে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেন।
আমার পাসপোর্টটি দেখেই আমার দিকে আতঙ্ক নিয়ে তাকান তিনি। এরপর আমার ইমিগ্রেশন কার্ডের ওপর একটি বড় “পি” এঁকে দেন। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ভাবলাম পাকি বুঝানোর জন্যই পি।
সেখানে আমার মতো চেহারারই আরো ২০ জন ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি হচ্ছি এমন এক ধরনের লোক মুখ খোলার আগেই যার চেহারা তার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আগেই আমি একটি বিশেষ অর্থবহনকারী চেহারার অধিকারী। ফলে আমার আর রেহাই নেই।
সেখানেও টানটান উত্তেজনাপূর্ণ তিন ঘন্টার রিমান্ডমূলক প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। হলিউডের একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য এক প্রযোজকের অফার লেটার দেখাই। একটি পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমায় অভিনয়ের কথাও বলি। সিনেমাটির একটি ডিভিডিও দেখাই।
আমি তাকে বলি দ্য রোড টু গুয়ান্তানামো একটি ডকুমেন্টারি-ড্রামা। কারণ গুয়ান্তানামো বে নিয়ে বানানো একটি তথ্যচিত্রে আমি অভিনয় করেছি বলাটা ঠিক হবে না। আর এটি যে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ড্রামা তাও বলি।
এরপর দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে। আমি তাকে একটি ডিভিডি দেই। ডিভিডির কভারে গুয়ান্তানামো বন্দীদের পোশাকে আমার ছবি ছিল। এরপর তিনি ভ্রু কুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করতে পারে এমন কাউকে চেনো?
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে না করি। এরপর তিনি আমার লাগেজ থেকে একটি বই টেনে বের করেন। এটি ছিল মহসিন হামিদের উপন্যাস “দ্য রিলাকট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট”।
“এটি কীসের বই?”
আমি ব্যাখ্যা করে বলছিলাম। কিন্তু তিনি কিছুই শুনছিলেন না। এরপর তিনি গুগলে আমার পরিচয় জানতে সার্চ শুরু করেন। গুগলে ব্রিটেনের লুটন বিমান বন্দরের ঘটনা নিয়ে একটি খবরে লিঙ্ক পান তিনি। আমি এবার পুরোপুরি নিরাশ হয়ে পড়ি। আমি ভাবতে থাকি আমার বুঝি আর হলিউডে অভিনয় করা হবে না। আমার আর কখনো ব্র্যাডপিট হওয়া হবে না।
তিন ঘন্টার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর অবশেষে আমি ছাড়া পাই। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমোদন পেতে গিয়েও আমাকে আরেকবার দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যার ফলে আমি হলিউডের যে প্রযোজকের সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলাম তাও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আর বিমান বন্দরের হ্যাপা থেকে কখনোই মুক্তি মেলেনি। একবার আরেকটি বিমানবন্দরে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমার কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ আছে কিনা?
এরপর আরো বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয়ের পরও আমি সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে কখনোই বাদ পড়িনি। আর একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ মুসলিম হওয়ায় এটাই যেন আমার নিয়তি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


মন্তব্য