kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রেম-খুন আর কেলেঙ্কারীর মুম্বাই

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৯:০৪



প্রেম-খুন আর কেলেঙ্কারীর মুম্বাই

২০১২ সালের ২৪ এপ্রিলে খুন হন শিনা বোরা। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য।

তাকে হত্যার পেছনে সরাসরি জড়িত মা ইন্দ্রাণী ও তারই প্রাক্তন স্বামী সঞ্জীব। পরে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার পেনের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া  হাড়গোড় শিনারই বলে জানায় পুলিশ। মা ও মায়ের সাবেক স্বামী মেয়েকে খুনের ঘটনা যেভাবে সাজিয়েছিলেন, তাতে স্তব্ধ সবাই।  

 

এ ধরনের ভয়ংকর অপরাধ সাধারণত দারিদ্রতা ও হিংস্রতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু শিনা বোরার হত্যাকাণ্ড কেবল অন্ধকার জগতের কোনো নৃশংস হত্যা নয়। এ ঘটনায় উঠে আসে মুম্বাইয়ের উচ্চস্তরের মানুষদের অন্ধকার দিকের কথা। এখানে নানাভাতি কেসের কথা বলা যায়। এ ঘটনা ঘটে ১৯৫৯ সালে।

১৯৫৯ সালের এপ্রিলের ২৭ তারিখ দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন কমান্ডার কায়াস ম্যানেকশ নানাভাতি। গাড়িতে পাশেই ছিলেন তার ইংলিশ স্ত্রী  সিলভিয়া (৩০) এবং দুই সন্তান। ডার্থমাউথের রয়াল নেভি কলেজের অ্যালামনাই তিনি। হ্যান্ডসাম, কেতাদুরস্ত এবং সবার প্রিয় অফিসার। ভারতীয় নেভির ফ্ল্যাগশিপ আইএনএস-এর সেকেন্ড ইন কমান্ড তিনি।

পেশাগত কারণে তাকে প্রায়ই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এ সুযোগে সিলভিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে নানাভাতির বন্ধু প্রেম আহুজার সঙ্গে। আহুজা বেশ আকর্ষণীয় এক পুরুষ। নাচে দারুণ এক্সপার্ট। লেডি কিলার হিসাবে বেশ নামও রয়েছে তার। মুম্বাইয়ের ব্রিটিশ যুগের ক্লাবগুলোতে তার অবাধ যাতায়াত। করাচি থেকে তিনি ভারতের নাগরিক হয়ে আসেন। বোন মামি আহুজার সঙ্গে থাকতেন। সিলভিয়ার তার প্রেম চলতে থাকে। এক পর্যায়ে সিলভিয়া নানাভাতিকে ডিভোর্স দিয়ে আহুজাকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু বিয়েতে অস্বীকৃতি জানান আহুজা। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সিলভিয়া এ সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেন যখন স্বামী ফিরে আসেন।

এর পর সিনেম্যাটিক ঘটনা ঘটে। নানাভাতি এ কথা শোনার পর স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে একটি সিনেমা হলে নামিয়ে দেন। নাভাল ডকে ফিরে যান এবং তার পিস্তলটি নেন। ওতে ৬টা গুলি ভরা ছিল। সেখানে শিফট শেষ করে আহুজার অফিসে যান। অবশ্য অফিসে ছিলেন না  বন্ধু। পরে আহুজার ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মিললো আহুজাকে। নানাভাতি সরাসরি আহুজার বেডরুমে ঢুকে যান। দরজা বন্ধ করেন এবং কিছু পর তিনটি গুলির আওয়াজ মেলে।    

এই হত্যাকাণ্ডের পর নানাভাতি ওয়েস্টার্ন নাভাল কমান্ডের প্রোভোস্ট মার্শালের কাছে অপরাধের স্বীকারোক্তি দেন। প্রোভোস্ট মার্শাল তাকে পুলিশের ডেপুটি কমিশনারের কাছে আত্মসমর্পন করতে বলেন। তিনি তা করেছিলেন। নানাভাতি ছিলেন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মূল্যবোধ নিয়ে চলতেন। অতীতে অপরাধ সংঘটনের কোনো ইতিহাস নেই। তার এ হত্যাকাণ্ডের শুনানিতে জুরি বোর্ড তাকে  নির্দোষ সাব্যস্ত করে।

আহুজার বোন মামি আহুজার অনুরোধে সেই সময় এক তরুণ আইনজীবী রাম জেথমালানি আদালতের বিচারককে রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। পরে মামলাটি হাইকোর্টে গড়ায়।

এরপর গোটা বিচারকার্য নিয়ে বড় বড় ঘটনা ঘটতে থাকে। বোম্বে ডেইলি ব্লিৎজ নানাভাতি কেস নিয়ে নিয়মিত খবর প্রকাশ করতে থাকে। সে সময় এক কপি বোম্বে ডেইলি ব্লিৎজ-এর দাম ছিল  ২৫ পয়সা। কিন্তু মামালার কল্যাণে ২ রুপি দামে বিক্রি হতো। এ মামলাকে ঘিরে ম্যাগাজিনটির কভারেজে শহরের পার্সি ওবং সিন্ধি কমিউনিটি একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।   এ অবস্থা হাইকোর্ট অবধি পৌঁছে। সেখানে নানাভাতির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডার রায় পড়া  হচ্ছিল। এরই প্রেক্ষিতে  নানাভাতি সুপ্রিম কোর্ট আপিলের সিন্ধান্ত নেন।

১৯৬১ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের রায়কেই সম্মতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট। এবার ব্লিৎজ আরো একধাপ এগিয়ে গেলো। তারা একটি মার্সি পিটিশন প্রকাশ করে। স্পষ্টভাবেই তারা পার্সি কমিউনিটির চাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। এই কমিউনিটি নানাভাতিকে ক্ষমা করে দেওয়ার পক্ষে ছিল। আইনের নীতি আর সমাজের চাহিদা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠলো।

১৯৬২ সালে এক নামকরা সিন্ধি নেতা ভাই প্রতাপের কাছ থেকে মার্সি পিটিশন পেলেন বিজয়ালক্ষ্মী পণ্ডিত। বিজয়া তখন বম্বের নতুন গভর্নর। তিনি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর বোনও বটে। ভাই প্রতাপের ব্যবসা ছিলো ক্রীড়াপণ্যের আমদানি-রপ্তানি। তিনি কিছু পণ্যের অবৈধ ব্যবহার করছেন বলে মামলা দায়ের হয়। পরে দেখা যায়, আসলে তিনি নির্দোষ। তাই এ ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতেই মার্সি পিটিশন করেন তিনি। তার অনুসারী এবং বিজয়ার চারপাশের আমলারা ভাই প্রতাপকে মাফ করে দেওয়ার পক্ষে মত দিলেন। এ ঘটনা থেকে উভয় সংকট থেকে উত্তরণের পথ পেলেন বিজয়া। ভাই প্রতাপকে মাফ করে দেওয়া যায়। এতে তুষ্ট হবে সিন্ধি। আর এ কারণে নানাভাতিকেও ক্ষমা করে দেওয়া যায়। এতে সিন্ধি এবং পার্স উভয় জাতি শান্ত থাকবে। এটি প্রস্তাব আকারে জেথামালানির কাছে গেলো। তিনি বোঝালেন মামি আহুজাকে। তিনি মেনে নিলেন সরকারের অনুরোধ।

এর পর পরই সরকার ক্ষমা করে দিলো নানাভাতিকে। তিনি কালবিলম্ব না করে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কানাডা পাড়ি দিলেন। আর কখনোই ফেরেননি। নানাভাতি মৃত্যুবরণ করেন ২০০৩ সালে। এখনো বেঁচে আছেন সিলভিয়া।

নানাভাতি কেসটিও মুম্বাইয়ের উঁচু স্তরের মানুষের অন্ধকার অংশ তুলে এনেছে। এ কেসের অনেকগুলো স্তর ছিল। ধনী, সুন্দরী ও নীল নয়না নারী আর তার প্লেবয় প্রেমিকে খুন ব্যাপক আলোচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। আবার এ খুনের পেছনে রয়েছে সুন্দরীর হ্যান্ডসাম স্বামী। ব্যাপক গসিপ, আলোচনাসহ বিভিন্ন পত্রিকার অসংখ্য সংবাদের কেন্দ্র হয় ওঠে এ ঘটনা।

প্রিন্সটনের ইতিহাসের প্রফেসর গায়ান প্রকাশ জানান,  আধুনিক সমাজকে পরিচালনা করতে অনেকেরই বিশ্বাস রয়েছে আধুনিক সমাজের ওপর। সেই সময় অনেকেই বিশ্বাস করতেন, নানাভাতি এক সম্মানজনক খুনী ছিলেন। স সেময় ব্লিৎজ ম্যাগাজিনটি নানাভাতি কেসটিকে গোষ্ঠীশাসন আর দেশপ্রেমের অংশে ভাগ করে দেয়। তারা মানুষের মনে নাটকীয়ভাবে কেসটির ছাপ ফেলে দেয়।  

মুম্বাইয়ের পুলিশ ইতিহাসবিদ দীপক রাও এই কেসটিকে শহরের সবচেয়ে এলিট কেস বলে মত দেন। ৫৬ বছর বয়সী রাও এখনো স্মৃতিচারণ করেন, ছোটকালে বাবা-মায়ের মুখ থেকে কিভাবে এই কেস নিয়ে গল্প শুনতে মুখিয়ে থাকতেন।

এই কেসটি বেশ কয়েকটি বলিউড সিনেমার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নাটক ও বই লেখা হয়। এর মধ্যে আর কে নায়ারের 'ইয়ে রাস্তে হে পেয়ার কে (১৯৬৩) উল্লেখযোগ্য। এতে অভিনয় করেন সুনীল দত্ত এবং লীলা নাইড়ু। গুলজারের 'আচানক (১৯৭৩)'-এ অভিনয় করেন ভিনোদ খান্না এবং লিলি চক্রবর্তি। সর্বশেষ সংযোজনটি অক্ষয় কুমারের অভিনীত 'রুস্তম'।

৫০ বছর পরও এখনো নানাভাতি কেস মানুষের স্মৃতি ও আলোচনায় তীব্র ঢেউ তোলে।

আসলে ঘটনার অন্তরালে ঘটনা থাকে। নানাভাতিকে ৮ সদস্যের জুরি বোর্ডের ৭ জনই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। শুদু একজন করেননি। তিনি রেজিনাল্ড পিয়ার্সে। তার কথা খুব কমই বলা হয়। একমাত্র তিনিই বলেছিলেন, নানাভাতি একটি খুন করেছে। তার বিচার হওয়া উচিত। এখনো বেঁচে আছেন এই বিচারক। বান্দ্রায় থাকেন। প্রতিদিন বিকালে হাঁটতে বেরোন। তার দীর্ঘায়ু লাভের সম্ভাব্য কারণটি জানালেন নাতী অ্যালেক্স। বললেন, দাদু কখনো মিথ্যা বলেন না। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ওই বিচারে সবাই আমার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। অথচ নানাভাতি যে স্পষ্ট খুনী তার প্রমাণপত্র আমি নিজে দেখেছি।

নানাভাতি কেসের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হয়েছে। সেই নীল নয়না সিলভিয়া এখন বুড়ো দাদি-নানী হয়ে গেছেন। সেই ভালোবাসা, প্রতারণা, খুন এবং উত্তাল সময়ের মধ্যে এই নারী ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রের একজন। সূত্র : ম্যানসওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া

 


মন্তব্য