kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুরনো বাংলাদেশি গানের ডিজিটাল লাইব্রেরি 'আশিক মিউজিক'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৩:৪৯



পুরনো বাংলাদেশি গানের ডিজিটাল লাইব্রেরি 'আশিক মিউজিক'

আশিক মিউজিক। পুরনো বাংলাদেশি গানের ডিজিটাল লাইব্রেরি।

দেশের প্রতিটি প্রান্ত, এমনকী দেশের বাইরেও ছড়িয়ে থাকা বাংলা গান সংরক্ষণ করাই যে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য। বাংলা গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিবেদিত একটি প্রতিষ্ঠান আশিক মিউজিক। এই উদ্যোগের শুরু, এর কার্যক্রম ও অন্যান্য নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা ও সমন্বয়ক গহর আশিকের সঙ্গে। কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন তিনি, বলেন প্রচেষ্টা, সংকল্প আর স্বপ্নের কথা।

''আমাদের প্লাটফর্মের নাম আশিক মিউজিক। বাংলা গানের শত সুরের সম্ভারকে সংগ্রহ করে আমরা তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলা গান সব সংগ্রহ করতে চাই আমরা। এ দেশের সকল ব্যান্ড, একক শিল্পী, আধুনিক, চলচ্চিত্র, ও লোকজ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গানগুলি সবার কাছে তুলে ধরতে চাই। স্বর্ণযুগের সকল শিল্পী-কলাকুশলীদের এ প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাদের এই প্রচেষ্টা। '' বলছিলেন গহর আশিক।

আরও বললেন, ''দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলা গান সংরক্ষণ করতে চাই আমরা। হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান সংগ্রহ করতে চাই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেও। বাংলা গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিবেদিত আশিক মিউজিক। ''

'আশিক মিউজিক' বাংলা গানের ডিজিটাল লাইব্রেরি। অ্যানালগ যুগের যে সকল মাধ্যমে সংগীত প্রচার হতো তার প্রত্যেক ফরম্যাটে (এলপি, স্পুল, ক্যাসেট) সংগ্রহ ও ডিজিটাল সংস্করণে রূপান্তর শেষে আর্কাইভিং করে বিশ্বব্যাপী বাংলা গানের শ্রোতাকুলের কাছে পৌঁছে দেওয়া আশিক মিউজিকের প্রধান কাজ।

কিন্তু কেন এটা করছেন, জানতে চাইলে আশিক বলেন, ''হাজার বছরের বাংলা সংগীতের সংরক্ষণে তেমন কোনো কার্যকর সংগ্রহশালা এখনও গড়ে ওঠেনি। এই অভাব বোধ করেছেন অনেকে, প্রয়াস পেয়েছেন সে অভাব পূরণে উদ্যোগী হতে, কেউ কেউ অনেক দূর সে স্বপ্নকে টেনে নিয়েছেন। যার প্রতিটি উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। এখানেই 'আশিক মিউজিক' এর স্বপ্নের শুরু। ''

তিনি বললেন, ''আমাদের আর্কাইভে রয়েছে বাংলা গানের প্রতিটি জনপ্রিয় এবং একই সঙ্গে অবহেলিত গানের বিভাগ। সেই সঙ্গে যুক্ত করেছে আদিবাসী সংগীত, এমনকি আবৃত্তিও। ''

কিভাবে এসব সংগ্রহ করলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে আশিক জানালেন, দেশের প্রায় প্রতিটি দোকানে ঘুরেছে আশিক মিউজিক টিম, কয়েকজন গানপ্রিয় মানুষ তাদের সংগ্রহে থাকা ক্যাসেট, সিডি পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের সংগ্রহশালাতে। এ ছাড়াও আমাদের নিজেদের সংগ্রহে বেশ কিছু অ্যালবাম আগে থেকেই ছিল। যেহেতু আর্কাইভ করছি, সে জন্য প্রতিটা ক্যাসেট থেকে ভালো সাউন্ড পেতে অনেকগুলি কপি খুঁজে বের করা হয়েছে। কয়েকজন শিল্পী তাঁদের কাছে থাকা অ্যালবামের মাস্টার কপিও দিয়েছেন আমাদের এই কাজের জন্য। এখনও আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি দেশের আনাচে-কানাচে, পুরনো স্মৃতিময় এসব অ্যালবামের জন্য। দেশ-বিদেশের অনেক গানপ্রিয় মানুষ বিভিন্ন সময়ে প্লেয়ার, সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে সাহায্য করেছেন ও করছেন। তাদের প্রতি সব সময় কৃতজ্ঞ আশিক মিউজিক।

দেশের আনাচেকানাচে গানের অ্যালবাম সংগ্রহের কাজটি নিরলস ভাবে করে যাচ্ছে 'আশিক মিউজিক'। গান সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াটি অতি দুরূহ। ফাঙ্গাস পড়া, শ্যাওলা ধরা ক্যাসেট-স্পুলের ফিতা, ভাঙা ও স্ক্রাচ পড়া (এলপি), কম্প্যাক্ট ডিস্ক (সিডি)। অচল প্রায় অন্যান্য পুরনো মাধ্যম যা সচল করতে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রযুক্তি। যার দাম বর্তমানে অতি চড়া ও দুষ্প্রাপ্য।

এরপর থেকে যায় সেই কপিগুলোর সযত্ন পরিচর্যার মাধ্যমে সর্বোৎকৃষ্ট মানের ডিজিটাল সাউন্ড আউটপুট পাওয়ার মতো এক বিরামহীন যুদ্ধ। যেখানে সময়-শক্তি-সাহস-ধৈর্য ব্যয় হয় সম্পূর্ণ হিসেব ছাড়া। যে প্রকল্পে শুধুমাত্র একটি গানের কপির উৎকৃষ্ট শব্দমান প্রাপ্তির আশায় লম্বা সময়, শ্রম ও ধৈর্য ব্যয় করতে হয় অকৃপণভাবে।

এলপি, স্পুল আর ক্যাসেটের ফিতে ছিড়ে ডিজিটাল রূপান্তরের এই ক্রমোন্নতির ধারায় আজ প্রযুক্তির উৎকর্ষে যন্ত্র আর অ্যাপসের বদৌলতে গান পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে কিন্ত তা সাময়িক আবেদন রাখলেও স্থায়িত্ব কম। আমাদের 'আশিক মিউজিক' স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ দেশের গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রী আর কণ্ঠশিল্পীর মিলনে সৃষ্ট যে 'আশিক মিউজিক' বাংলা গানের সংগীতসম্ভার তা সংরক্ষণ ও প্রসারে চেষ্টা করছে। আমাদের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৪ হাজারের বেশি ব্যান্ড, আধুনিক, চলচ্চিত্র ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গানের অ্যালবাম এবং প্রতিনিয়ত বাড়ছে তা।

আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণে সকল গানের ফিজিক্যাল কপি সংগ্রহ, পরিচর্যা, ডিজিটাল কপিতে রূপান্তর ও সংরক্ষণ শেষে শ্রেণিবদ্ধ করে সংগৃহীত উপাত্ত নথিবদ্ধ করা হয়। এরপর সে সকল সফট কপি আপলোড করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বজোড়া বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে 'আশিক মিউজিক'। গড়ে তুলেছে তাদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। কাজ করে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে নতুন নতুন আইডিয়া মানুষের কাছে উপস্থাপনের লক্ষ্যে।

আশিক বললেন, "আশিক মিউজিক এর সংগ্রহে থাকা অতি দুষ্প্রাপ্য সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে অপ্রকাশিত বা কখনও বাজারজাত করা হয়নি এমন অনেক অ্যালবাম। রয়েছে বিদেশে রেকর্ডকৃত ও প্রকাশিত বাংলাদেশি শিল্পীদের একাধিক অ্যালবাম। সংগ্রহে আছে বাংলাদেশের প্রথম প্রকাশিত ক্যাসেটটিও। ''

আসন্ন প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে আশিক বলেন, ''গত শতকের ৯০ দশক ছিল বাংলা গানের এক জ্বলজ্বলে মাইলফলক। অজস্র ব্যান্ড এর অসামান্য প্রতিভাধর শিল্পীরা উপহার দিয়েছেন অপূর্ব-অশ্রুতপূর্ব সুরঝংকার। সেইসব গানে আজও আন্দোলিত হয় শ্রোতাদের হৃদয়। ''

''৯০ দশকের শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড শিল্পীদের একসঙ্গে জড়ো করে 'আশিক মিউজিক' তৈরি করেছে এক অনবদ্য মিক্সড অ্যালবাম। যেখানে ৯০ দশকের ২৪টি তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পীদের এই অ্যালবামটি বাংলা গানের জগতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে। '' যোগ করলেন তিনি।

সবার বা সব প্রকল্পেরই কিছু লক্ষ্য থাকে, আপনাদের এমন কিছু কি আছে- এমন প্রশ্নের জবাবে আশিক বলেন, ''সংগীতশিল্পীদের নামের প্রারম্ভে দুঃস্থ্ শব্দটি আর কখনও বসতে না দেওয়া। প্রকৃত সংগীতস্রষ্টার প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা। সকল যন্ত্রসংগীতশিল্পীদের যথাযথ সম্মান জানানো। কালজয়ী সংগীত সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা। যে সকল গুণী সংগীতজ্ঞদের জাতি হারিয়েছে তাদের যথাযথ সম্মানে স্মরণ করা। বাংলা গানের সকল শাখার ইতিহাস উপাত্তসহকারে আর্কাইভিং। বিশ্বব্যাপী বাঙালি সংগীতশিল্পীদের একত্রিত করবার প্রয়াস বজায় রাখা। নতুন প্রজন্ম ও নতুন শিল্পীদের গবেষণার সুবিধার্থে একটি আধুনিক ও বহুমাত্রিক পূর্ণাঙ্গ ও সহজলভ্য বাংলা গানের সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করা- এসবই আমাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বলতে পরেন। ''

''শিগগিরই তৈরি করা হবে আশিক মিউজিকের একটি অত্যাধুনিক ওয়েবসাইট। যা থেকে শ্রোতাগণ তাঁদের পছন্দের গান শুনতে পারবেন,'' সব শেষে বললেন গহর আশিক।

ফেসবুকে আশিক মিউজিকের ঠিকানা।

 


মন্তব্য