kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উত্তর কোরিয়ার চলচ্চিত্র উৎসব, যেখানে যৌনদৃশ্যে আতঙ্কে চিৎকার করে দর্শক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৫:০৬



উত্তর কোরিয়ার চলচ্চিত্র উৎসব, যেখানে যৌনদৃশ্যে আতঙ্কে চিৎকার করে দর্শক

উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নেই কোনো লাল গালিচা। ১৯৭২ সালে উত্তর কোরিয়ার ক্লাসিক মুভি 'দ্য ফ্লাওয়ার গার্ল' তারকা হং ওং-হি যখন ২০১৪ সালে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল সিনেমা হল এ হাঁটেন, তখন তিনি নগ্ন কংক্রিটেই হেঁটেছেন।

সবাই এভাবেই হাঁটেন। ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া তাদের বিনোদন তারকাদের ঘিরে অতিরঞ্জিত কিছু করে না।

কোরইয়ো ট্যুরস এর ক্রিয়েটিভ প্রজেক্ট ম্যানেজার ভিকি মোহিদ্দেন জানান, তারকাদের ঘিরে সেখানে এমন সংস্কৃতির প্রচলন নেই। স্কটল্যান্ড থেকে এসে বেইজিংয়ে বাস করছেন ভিকি।

আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে পিয়ংইয়ং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ১৫তম আসর। একে নিয়ে কোনো গসিপে মেতে ওঠেনি মিডিয়া বা ভক্তরা। এখানে বিদেশিদের ২৪ ঘণ্টা ব্যক্তিগত গাইডের নজরদারিতে থাকতে হয়।

পিয়ংইয়ং জুড়ে ৭টি বিশাল পর্দায় দেখানো হবে এ অনুষ্ঠান। স্থায়ীদের জন্য অধিকাংশ ছবিই বিদেশি। থিয়েটারের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হলে আগ্রহী মানুষগুলো ছুটে যান একটি আসন পেতে। বাকিরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ মেঝেতেই বসে পড়েন। অধিকাংশ আসনে চাপাচাপি করে দুজন বসে পড়েন। এটাই আন্তর্জাতিক ছবি দেখার একমাত্র সুযোগ।

রাস্তার দোকানগুলো থেকে খাবার ও পপকর্ন নিয়ে বসে পড়েন তারা। এখানে মানুষ চীন থেকে আসেন কোরইয়ো ট্যুরসের মাধ্যমে। বেইজিং-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা নিক বোনার। ২০১৩ সালের 'কমরেড কিং গোস ফ্লাইং' ছবিটির সহকারী পরিচালক ছিলেন।  

গোটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার চলচ্চিত্র উৎসবে আছে নানা নিয়ম। উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না অসংখ্য মানুষ। তেমনি ধারণা রাখেন না পিয়ংইয়ং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সম্পর্কে। এই আয়োজন সম্পর্কে সেখানে না যাওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না, জানান মোহিদ্দেন।

আর আগের আসরে যেসব ছবি দেখানো হয়েছিল তার মধ্যে রয়েছে বলিউড ছবি রাম-লীলা, মার্শাল আর্ট ছবি ব্লাড লেটার এবং থাই থ্রিলার 'মাইল্ডফুলনেস অ্যান্ড মার্ডার'।

একটি ছবিতে দুজন পুরুষের যৌনদৃশ্য দেখানে হয়। সে সময় রীতিমতো ভয়ে চিৎকার করছিলেন দর্শকরা, বলেন মোহিদ্দেন।

রোমান্টিক ঘরানাসহ ড্রামা ও ক্রীড়া বিষয়ক সিনেমাগুলো জনপ্রিয়। ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো একটি জাপানি ছবি দেখানো হয়। জাপানি সংস্কৃতি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ৫০ বছর পর এই প্রথম কোনো জাপানি ছবি দেখানো হয়।  

উত্তর কোরিয়ার মানুষের সঙ্গে মেশামেশির এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। সিনেমা তারা কিভাবে দেখেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন তা দেখা যায়। ছবি দৃশ্যায়নে 'আহা' বা 'উহ' জাতীয় শব্দ দর্শকদের মাঝ থেকে বেশ উচ্চারিত হয়।

১৯৮৭ সালে চলচ্চিত্র উৎসব প্রতিষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক উপাদান বিনিময়ের উদ্দেশ্যে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রতি দুই বছর অন্তর এটি আয়োজিত হতো। প্রায় ৪০টি দেশের মোটামুটি এক শো নানা ধরনের সিনেমা দেখানো হয়েছে।

এই আয়োজনে ছবি নির্বাচনের বিষয়টি এখন পর্যন্ত রহস্য হয়ে রয়েছে। কখনোই আমেরিকান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা দেখানো হয়নি। রাজনৈতিক ও যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ক ছবিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পংগোয়া থিয়েটারে উদ্বোধনী আয়োজনকে অস্কারের উত্তর কোরিয়ার সংস্করণ বলা যায়। ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় থাকেন ছোট পোশাকের গ্ল্যামারাস নারী এবং স্যুট পরিহিত কোনো পুরুষ।

২০০৮ সাল থেকে এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন মোহিদ্দেন। বলেন, আয়োজনগুলোতে দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকেই উপস্থিত হয় মানুষ। এটা বরং অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।

সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, অভিনেতা এবং অভিনেত্রীকে দেওয়া হয় 'টর্চ প্রাইজ' যা অনেকটা অলিম্পিক মশালের মতো। শেষ আয়োজন পুরষ্কৃত হয় একটি জার্মান সিনেমা 'মাই বিউটিফুল কান্ট্রি' যা কসোভা যুদ্ধের ওপর নির্মিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডে আছেন ফ্রান্সের চলচ্চিত্র প্রযোজক ফ্রাঙ্কোইস মার্গোলিন, রাশিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা মিখাইল কোসিরেভ এবং রাসেল এডওয়ার্ডস এবং সিডনির চলচ্চিত্র সমালোচক। তারা একটি বিশেষ প্রদর্শনী কক্ষে বসে ছবিগুলো দেখেন।

ওই কক্ষে বসেই ছবিগুলোর গুণগত মান নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে বলে জানান এডওয়ার্ডস। জুরি বোর্ডে উত্তর কোরিয়ার একজন ছিলেন। কিন্তু তিনি বেশি কথা বলতেন না।

উত্তর কোরিয়ায় খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। খরা লেগে থাকে। তারপরও এই আয়োজনে বিলাসী ডিনার পার্টির আয়োজন হয়।

স্থানীয়দের একটি ছবি দেখতে ৭৫ পেনি খরচ করতে হয়, যেখানে তাদের গড় মাসিক আয় ৫০ পাউন্ড। বিদেশিদের মধ্যে প্রত্যেককে ১৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে পিয়ংইয়ংয়ে ৫ দিনের জন্য থাকতে দেওয়া হয়। তাদের আসা-যাওয়া করতে হয় উত্তর কোরিয়ার ওয়ান-স্টার ন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে।

সবমিলিয়ে এই উৎসব স্থানীয়দের জন্য। খুব বেশি সংখ্যক বিদেশিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তবুও কান, বার্লিন ও সানড্যান্স বিভিন্নভাবে স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিকে উৎসাহ প্রদান করে। ভিন্ন হলেও উত্তর কোরিয়া কেন করবে না? হাজার হলেও ইতালির স্বৈরশাসক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্ভাবক।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

 


মন্তব্য