kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইমতিয়াজ আলম বেগ : ব্যান্ড ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৪:১৭



ইমতিয়াজ আলম বেগ : ব্যান্ড ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ

তিনি এমন বিষয় নিয়েই কাজ করেছেন, যা নিয়ে আগে কেউ পেশাদার মনোভাব নিয়ে কাজ করেননি। সেটা হলো ব্যান্ড ফটোগ্রাফি।

বাংলাদেশে এই নতুন ধারার ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ ইমতিয়াজ আলম বেগ। পুরো নব্বই দশকজুড়ে সব বিখ্যাত ব্যান্ডের জনপ্রিয় ছবিগুলো যাঁর তোলা। তুমুল জনপ্রিয় এইসব ছবিগুলো যা এখনও ব্যান্ড অনুরাগীরা মনে রেখেছেন। ঐতিহাসিক এই ছবিগুলোর সাথে যিনি অবধারিতভাবে বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে গেছেন। যাঁর দেখানো পথ এখন অনেক তরুণদের ব্যান্ড ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
 
মিউজিকের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। বন্ধুদের প্রায় সবাই ছিলেন মিউজিশিয়ান,  মিউজিক-কেন্দ্রিক আড্ডা আর নব্বই দশকের গোড়াতে জনপ্রিয় পশ্চিমা মিউজিশিয়ানদের অ্যালবামের (এলপি) কভার দেখেই রক মিউজিক-নির্ভর ফটোগ্রাফির আগ্রহ জন্মায় তাঁর। আলোকচিত্রাচার্য বাবার উৎসাহ তো ছিলই। সব মিলিয়ে হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর রক মিউজিক ফটোগ্রাফার। পুরো নব্বই দশকজুড়ে করা হাজারো অ্যাসাইনমেন্টে ধরে রাখলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের স্বর্ণ সময়কে। একক ফটোগ্রাফার হিসাবে যার তোলা ছবি দিয়ে বাংলাদেশে জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর সব চেয়ে বেশি অ্যালবামের কাভার এবং ব্যান্ড প্রোফাইল হয়েছে।

ইমতিয়াজ আলম বেগ। নামটি ইতিমধ্যেই একটি  ব্র্যান্ড এ পরিণত হয়েছে। কালের কণ্ঠের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এই নিভৃতচারী জানালেন অনেক অজানা কথা। পাঠকদের জন্য সংক্ষিপ্তাকারে পরিবেশন করা হলো।

জন্ম ২৫ সেপ্টেম্বর। এই আলোকচিত্রশিল্পী ১৯৯১ সালে ফটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা করেন বাবা বাংলাদেশের আলোকচিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ একুশে পদকপ্রাপ্ত আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ এর প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম ফটোগ্রাফি শিক্ষাকেন্দ্র বেগার্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফি থেকে। ১৯৯৬ সালে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফিক কাউন্সিল (আইআইপিসি) নয়া দিল্লিতে ফটোগ্রাফিক কনফারেন্সে অংশ গ্রহণ ও প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এ ছাড়াও মারটিন পার, স্টিভ কোনলান, ইংরিড পলারড এর মতো বিশ্ববরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পীদের পরিচালিত বিষয়ভিত্তিক কর্মশালাতে অংশ নিয়েছেন। জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতাতে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। তিনি জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতাগুলোতেও বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর তোলা ছবি দেশে-বিদেশে প্রদর্শিত হয়েছে। আলোকচিত্রের প্রশিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফিক ক্লাব ও সোসাইটিগুলোতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বর্তমানে ইমতিয়াজ আলম বেগ বেগার্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফির পরিচালক এবং বেগার্ট ফোরাম এর উপদেষ্টা পদে নিয়োজিত আছেন। তাঁর কাছ থেকে আলোকচিত্রের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক আলোকচিত্রশিল্পী দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।



''১৯৯১ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে নগর বাউল জেমস ভাই এর অ্যাসাইনমেন্টটাই ছিল আমার প্রথম। '' বললেন বেগ। ''যদিও তার আগে থেকেই আমি ফটোগ্রাফি করছি। কিন্তু ওটাই ছিল আমার পেশাদার রক ফটোগ্রাফির শুরু। এরপর থেকে একে একে মাইলস, এলআরবি, রেনেসাঁ, ফিলিংস, অর্থহীন, আর্ক সহ অনেক অনেক ব্যান্ড। এই সব ব্যান্ডের স্টেজ পারফর্মেন্স থেকে শুরু করে একাধিক অ্যালবাম কাভার, পোস্টার এবং ব্যান্ড প্রোফাইলে আমার তোলা ছবি ব্যবহার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে হামিন ভাই, শাফিন ভাই, বাচ্চু ভাই আর জেমস ভাই এর কথা বলতেই হবে কারণ এঁরা আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। আমার ভাবনাগুলোকে কাজে রূপান্তর করার সুযোগ করে দিয়েছেন। '' থামলেন তিনি, চুমুক দিলেন চায়ে। ''একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের এমন কোনো কনসার্ট নেই যেখানে আমি ছবি তুলিনি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইভেন্টের ছবি আছে আমার কাছে। যেগুলো এখন ইতিহাস। দেখতে দেখতে অনেক বছর কেটে গেল কিন্তু মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। এ প্রজন্ম ভাবতেও পারবে না যে কত সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। ফিল্মে কাজ করা যে কত কঠিন ছিল বিশেষ করে কনসার্ট ফটোগ্রাফি। আইএসও ১০০ দিয়ে স্টেজে লো লাইটে কাজ করার সাহস এখনকার ফটোগ্রাফারদের হবে না। কত রকমের যে ঘটনা, অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি লিখতে গেলে একটা বড় বই হয়ে যাবে। ''  


''আমি দীর্ঘদিন মাইলস সহ অন্যান্য ব্যান্ডের এর অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিসাবে যুক্ত ছিলাম। সে সময় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মিউজিক ম্যাগাজিন 'রক অ্যান্ড রিদম' ও 'বিশ্ব সঙ্গীত' এ স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসাবে দীর্ঘকাল কাজ করেছি। আমার বাবা একটা কথা প্রায়ই বলতেন তাঁর সব ছাত্রদের 'টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে পৃথিবী সংরক্ষণ করা যায়'। আমি চেষ্টা করেছি টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে বাংলাদেশের রক মিউজিককে সংরক্ষণ করতে। আগামী প্রজন্ম এই ছবিগুলো দেখে কিছুটা হলেও বুঝতে পারবে যে বাংলাদেশের রক মিউজিক কতটা সমৃদ্ধ ছিল। আগামীতে কেউ বাংলাদেশের রক মিউজিক এর ইতিহাস বা এর ওপর গবেষণা করতে গেলে এই ছবিগুলো রেফারেন্স হিসাবে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। একটা রক ফটোগ্রাফির বই প্রকাশ করতে পারলে আরও ভালো হয়। ''


 
''আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় নব্বই দশক। অদ্ভুত একটা সময় পার করে এসেছি। আমার বিচরণ ছিল একটি গানপাগল সংস্কৃতির ভেতর। এলিফ্যান্ট রোডের রেইনবো মিউজিক রেকর্ডিং সেন্টার কে ঘিরে আমাদের বিশাল এক আড্ডা জমে ওঠে। ওই আড্ডার কেন্দ্রে ছিলেন রেইনবোর কবির ভাই। রক মিউজিকের প্রতি ছিল আমাদের প্রবল আগ্রহ। সে সময় লেড জেপলিন, পিঙ্ক ফ্লয়েড, ব্ল্যাক সাবাথ, ডিপ পারপল, রেইনবো, আয়রন মেইডেন, ইউরিয়াহ হিপ, ডোরস এর গান নিয়ে অন্য রকম এক সময় কেটেছে। বন্ধুদের মধ্যে ফুয়াদ, কমল, আরশাদ, টিপু, রেজা, বাবনা, ইমরান, সুমন, বুনো, পিকলু, জুয়েল, মোর্শেদ-সহ আরও অনেকে সে সময় একসাথে আড্ডা দিতাম। আড্ডার মূল অংশজুড়েই থাকত মিউজিক। পরবর্তীতে এদের হাত দিয়েই মেইনস্ট্রিমের ব্যান্ড রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেজ, ইন ঢাকা, এইসেস, জলি রজারস, অর্থহীন ইত্যাদি সব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে সবার। এবং এঁরাই আমাকে ব্যান্ড ফটোগ্রাফিতে অনেক সহযোগিতা করেছে। ''

 
কথা প্রসঙ্গে চলে আসেন বাংলাদেশের মিউজিকের প্রথম মহাতারকা আজম খান। আফসোস নিয়ে বেগ বললেন, ''আমার দেখা রিয়েল রকস্টার তিনি। কখনোই পপ শিল্পী নন। মানুষ ভুল করে তাঁকে পপ শিল্পী বলেন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি মাস্টার অফ রক। আজম খানকে নিয়ে প্রচুর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মৃত্যুর পর যে অ্যালবাম বের হয়েছিল সেটার সিডি কাভারেও আমার তোলা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। '' বেগ দুঃখ করলেন প্রয়াত শিল্পী নিলয় দাস কে নিয়ে, ''তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। কত যে আড্ডা মেরেছি নিলয়দার সাথে, তিনি ছিলেন জাত শিল্পী। ক্লাসিক্যাল গিটারে অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। তাঁর কাছে এল স্টুয়ার্ট, ডন ম্যাক্লিন, ফ্রেডই এগুইলার, জিম ক্রস, ব্রেড, জেজে কেল এর ফেমাস নাম্বারগুলো শুনতাম। দুর্দান্ত করে বাজাতেন,'' বললেন বেগ। ''তিনি বেঁচে থাকলে অনেক অবদান রাখতে পারতেন বাংলাদেশের মিউজিকে। '' বেগ স্মরণ করলেন দেশসেরা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার প্রয়াত মবিনকে। ''আসলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কত প্রতিভাবান যে কত রকমের কন্ট্রিবিউশন রেখেছেন, তাদের কথা এই প্রজন্ম জানেই না। মবিনের সাথে যে কত ট্যুর করেছি। মাঝে মাঝেই মবিনের কথা মনে হয়। ''


 
ফটোগ্রাফির অনেক গ্রাউন্ড ও লেভেলে কাজ করেছেন তিনি। কাজের সুবিন্যস্ত পরিসর এবং বিশাল ব্যাপ্তী তাঁর। দেশের শীর্ষ বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপি, এশিয়াটিক, ইন্টারস্পিড, মিডিয়া কম, অ্যাডকম, গ্রে, কজিটো, এ পজিটিভ সহ ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি- আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর কম্পানিগুলোর জনপ্রিয় অনেক বিজ্ঞাপনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

প্রিয় ফটোগ্রাফারের তালিকায় প্রথমেই আছেন বাবা আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ, ভারতের রঘু রায়, কিংবদন্তি মার্কিন পোট্রেট ও ফ্যাশন ফটোগ্রাফার রিচার্ড অ্যাভেডন, জনপ্রিয় রক এন রোল ফটোগ্রাফার জিম মার্শাল, বিখ্যাত মার্কিন ফটোগ্রাফার মেরি এলান মার্ক। প্রিয় মিউজিশিয়ানদের তালিকাটি আরও দীর্ঘ। তারপরও লিওনার্ড কোহেন, বব ডিলান, ভ্যান মরিসন, লু রিড, পিটার গ্রিন, বাডি গাই, জনি লি হুকারদের রেখেছেন পছন্দের শীর্ষে।

বর্তমান কাজ ও ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বেগ হেসে বললেন, ''ফটোগ্রাফির মতো মিউজিক আমাকে মারাত্মক প্রভাবিত করে। মিউজিক এর সাথে জড়িয়ে আছে আমার জীবন, যাদের গান শুনে বিরক্তি, ঘেন্না আর ভালোবাসতে শিখলাম তাদের জন্য আমি কি করলাম? তাঁদের সাথে দেখা হওয়ার সুযোগও নেই। তাই আমি আমার পছন্দের মহান মিউজিশিয়ানদের উৎসর্গ করে কিছু থিমেটিক ছবি তৈরি করছি। দূর থেকে যতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়। ''  

ভবিষ্যৎ নিয়ে কি ভাবছেন, বললেন, ''বাবার শুরু করা ফটোগ্রাফিক আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমার মূল উদ্দেশ্য। বেগার্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফিকে আরও সমৃদ্ধ আর গতিশীল করতে চাই। '' আগামী দিনের ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশে বললেন, ''অন্য সব শিল্পমাধ্যমগুলোর সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানো উচিত। ''

যদিও প্রাপ্তি নিয়ে মাথা ঘামান না এই শিল্পী, তবুও তাঁর প্রাপ্তি অনেক। অনেক সম্মাননা আর পুরস্কার পেয়েছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে একটি কমপ্লিমেন্ট। যা সুমন চট্টোপাধ্যায় (কবীর সুমন) লিখেছিলেন ১৯৯৯ সালে, ইমতিয়াজ আলাম বেগ কে নিয়ে। প্রথম সাক্ষাতের পরদিনই তাঁকে নিয়ে একটি গান লিখে উপহার দিয়েছিলেন 'গানওলা' সুমন, কলকাতায়। সেটাকেই তিনি তাঁর জীবনের সেরা কমপ্লিমেন্ট মনে করেন। কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য সেই গানটির শেষ তিনটি লাইন নিচে উল্লেখ করা হলো :

বাংলার ছেলে ছবির খেয়ালে
হেলান দিয়েছে গানের দেয়ালে
চলছে দেয়াল, তুমিও কিন্তু ছবিতে ছবিতে চলো। ।


মন্তব্য