kalerkantho

গল্প

বর্ষামঙ্গল

অদিতি ফাল্গুনী

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বর্ষামঙ্গল

অঙ্কন : নিখিল চন্দ্র দাস

বৎসরের প্রথম ঈশানে বয়,

সে বৎসর বর্ষা হবে খনা কয়।

 

এক

 

চৈত্রসংক্রান্তির দিনেই ঈশানে হু হু হাওয়া বইছিল। বিকেল না হতেই পুব দিকের শিমুলগাছের লাল লাল ফুল থেকে ফাটতে থাকা তুলা উড়িয়ে, দুপুরে চড়কের বড়শিতে গাঁথা ভক্তের পিঠের রক্ত ঘায়ে হিম ঠাণ্ডা কাঁপন তুলে আর সামনের যত খোলা মাঠের সব ধুলা কুণ্ডলী পাকিয়ে এসেছিল কালবৈশাখী। সেই সঙ্গে তিন মাইল দূরে উপজেলা সদরে মণি রত্নকারের দোকানে বাঁধাই করা রুপার বাজুবন্দের মতো ঝিলিক দেওয়া সাদা ফকফকে বাজ আকাশের দেহরেখা চিরে গেল এমাথা থেকে ওমাথা।

‘ঐ ঠাডা পড়িচে—ঠাডা পড়িচে—’

তল্লাটের সব বাড়ি থেকে বাচ্চাকাচ্চা, বুড়ো-বুড়ি, যুবক-যুবতী সবার গলার হর্ষ-আতঙ্ক-উত্তেজনা মেশানো কলরোল সেই রুপালি বজ্রের মতোই বাতাসের অনিঃশেষ হাহাকারের সঙ্গে লীন হয়ে যায়।

‘এ বচ্ছর খুব ঝড়-বিষ্টি হবিনি’—বাতের বিছানা থেকে দুই কনুইয়ে ভর দিয়ে খানিকটা ওঠার কসরতে নবীন জোয়ার্দার বলে।

‘ওষুদ খেয়িচো?’ বাবাকে জিজ্ঞেস করে হেলু। হেলুর বয়স বছর পঞ্চান্ন। বাপের আশি পার হয়ে আরো বছর দুই-পাঁচ গড়িয়েছে। মা মরেছে বছর দশেক, যদিও মা বাপের চেয়ে আরো বছর আটেক ছোট ছিল।

‘দিয়িচে। বউমা দিয়ি গেচে।’

বাপের তোশকের পেছনে একটা কাঠের মিটসেফের মাথায় বেশ কিছু হোমিওপ্যাথিক আর কবিরাজি ওষুধের বোতল আর শিশি। বাতের ব্যথার পাশাপাশি হাঁপানি আর কাশিও আছে নবীন জোয়ার্দারের। তবে আশপাশের কয়েক গ্রামে তার মতো চাষের জমির হালচাল, মাটির ধরন, বৃষ্টি বা বাতাসের টান দেখেই সামনে আবহাওয়া কেমন হবে বলতে পারে খুব কম মানুষ। এখন প্রতি উপজেলায় কৃষি অফিস আর কৃষি অফিসাররা আছেন—গ্রামে গ্রামে মোবাইলেই গাছের পোকার বালাই দমনের নোটিশ আসে, উপজেলা কি আরো দূরের জেলা শহরে গেলে বিস্তর কীটনাশকের কৌটা আর স্প্রে কিনতে পাওয়া যায়—এমন সময়ও বয়সী অনেক চাষি হেলু জোয়ার্দারদের বাসায় আসে, ‘নবীন কাকা আচো নাকি বাসায়?’ নবীন জোয়ার্দার কারো কাকা, জ্যাঠা, চাচা, মামা বা খুড়ো। কেউ মরিচ চাষ, কেউ বেলগাছ বা শসার ফলন, কেউ কাউন-ধানের সুরক্ষা বিষয়ে নানা তত্ত্বতালাশে তার কাছেই আসে। খনার কয়েক শ বচন হেলুর বাপের ঠোঁটস্থ। ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে নবীনের নিজেরই ভালো মুখস্থ হয়েছে সেসব। বাপের সে একটাই ছেলে। দুই দিদির ওপারে নদিয়ায় বিয়ে হয়েছে। বাপের মতো মাটির সঙ্গে, বাতাস আর আকাশের মেঘের সঙ্গে খুব সহজেই বন্ধু পাতানোর স্বভাব তারও কিছু আছে। তাই তার কাছেও মানুষ আসে বৈকি। কিন্তু হেলুর বউ কাকবাঁজা। একটাই ছেলে, যে শহরে ভার্সিটিতে পড়ছে। শুরুর বছর যখন ছেলে ভার্সিটিতে যায়, তখন মাস     দুই-তিন পর পর চলে আসত। এখন বছরে একটিবারও বলতে গেলে আসে না। কোনো নামগন্ধই নেই। এই যে প্রতিবছর আউশ বোনে হেলু, বোনে রোপা আমন কি বোরো ধান (ছোটবেলায় হেলু মা-বাবার মুখে শুনত যে মেয়েরা নাকি দুই জাতের হয়। যেমন—হেলুর বড় দিদির ছিল আউশ ধানের গড়ন, যে দেখতে দেখতে শরীরে বড় হয়ে যায়, তাড়াতাড়ি তার বিয়ের সম্বন্ধ চলে আসে। আর ছোট দিদি ছিল হালকা-পলকা—তার বয়স বোঝা যেত না। বড় দিদির তুলনায় বেশ অনেকটা দেরিতে তাকে বিয়ের যোগ্য মনে হয় বা পাত্রপক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে—এমন মেয়েরা নাকি আমন ধানের মতো, যারা বাড়তে সময় নেয়)...মাঠভর্তি ম-ম করা ধান সব অটোতে তুলে উপজেলা কি কখনো কখনো জেলা সদরের বাজার অবধি সে বেচতে নিয়ে যায়। তারপর টাকা বিকাশ করে ছেলেকে, সেই ছেলে ক্বচিৎ-কদাচিৎ এক-আধবার যদিও বা গ্রামে আসে, তাকে দেখে চিনতে পারে না হেলু। কিছুতেই ভাবতে পারে না যে বিয়ের প্রায় বছর বারো পর—অনেক সাধু-সন্ন্যাসী-পীর-ফকির-তন্ত্রমন্ত্র-মানত-মাদুলি-তাগা-তাবিজ-শিকড়-বাকল করে স্ত্রী মালতী রানীর গর্ভে যে সন্তান এসেছিল, এ সেই ছেলে কি না! তার কথার সুরটিও আলাদা। ছেলে তার মাঠ চেনে না—কোন ধানের কী নাম, কোন ধানে কখন কী পোকা আসে, সেই সব বারো জাতের পোকা তাড়ানোর কী নিদান শাস্ত্রে বলে—এসব কিছুই হেলুর ছেলে বলতে পারবে না। কিন্তু হেলুকে তো পারতে হয়। এই যে সংক্রান্তির বিকেলে  ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে সারা রাত বৃষ্টি চলল, সকালবেলাটা মনে হচ্ছে যেন ঘন কালো রাত্রি—তবু পঞ্চান্ন বছরের হেলুকে এখন ঘুম থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে বৈকি।   বাহ্য-পেচ্ছাপ সেরে, মুখ-হাত ভালো করে ধুয়ে ক্ষেতে তো যেতেই হবে।

‘ম্যালা ঝড়-জল করিচে। ঠাকুর—আকাশের অবস্থা দেকো। এর ভেতর বার হবে? বাবার শরীরের অবস্থা গতকাল ভালো ছিল নাগো!’

মালতী রানী পঞ্চাশ পার হয়েও আঁটসাঁট শরীরের। আলস্যের ভাত খায় না সে। যে ঘরের বউঝি আলসে, সে ঘরে নাকি মা লক্ষ্মী সদা চঞ্চলা। কমলা সে ঘরে বিরাজ করেন না। মালতীকে বধূবরণের সময় ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে ঘরে তোলার পর থেকে আর দেহ রাখা অবধি এইসব বিদ্যাই কানের কাছে পইপই করে ঝেড়ে গেছে হেলুর মা স্বর্গীয় উমা রানী জোয়ার্দার। কাজেই বিছানায় এমন থমথমে বাদলা আকাশের ভোরেও স্বামীর নড়াচড়া টের পেতে না পেতেই উমা রানী জোয়ার্দার উঠে পড়ে। বাসি কাপড় ছেড়ে রান্নাঘরে গিয়ে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করে। চুলা জ্বলবে কি ছাই? আকাশ থেকে সপ্তধারে খোদ মা গঙ্গাই যেন মাটিতে আছড়ে পড়ছে।

‘গরম ভাত করতি হবি নানে—দুটো পান্তা থাকলি তা-ই দে!’

‘একটা ডিম ভাজি দিই?’

‘চুলো ধরাবি কী করি? বললিই হলো? একটু   পেঁয়াজ-মরিচ কাটি দিলিই হবে।’

 

পুরুষ হিসেবে এমনিতে হেলু বেশ বুঝদার। বাড়ির বউঝিকে (ঝি আর কই আছে তার? থাকলে বেশ হতো—ছেলের মতো এত অচেনা হতো না হয়তো) কথায় কথায় সুবিধা নেই, অসুবিধা নেই—নিজের নোলার হাউস মেটাতে দশ রকমের অন্ন-ব্যঞ্জন রেঁধে খাওয়াতে বলে কষ্ট দেওয়ার মানুষ হেলু নয়।

‘রাতির বাসি তরকারি আচে। গরম করি?’

‘কতায় কতায় বাজনা না বাজালি তোর চলে না? দুটো লাল দেখে কাঁচা মরিচ হয়িচে ভিটির পেছনটায়—কাল সন্ধেয় দেখলাম! সেই মরিচ দে আর পেঁয়াজ কুচি করি দে। সঙ্গে একটু মুড়ি দে। পান্তার সঙ্গে মুড়ি আর  পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ি মাখি খায়ি মাঠে যাতি হবে। তাড়াতাড়ি কর। বাবাকে পারলে—উনি তো বেলা করে ওঠেন—ততক্ষণে বিষ্টির ধার একটু কমলি পরে গরম ভাতে আর ঘি আলু সিদ্ধ পাতে দিস।’

‘আ-চ্ছা!’ স্বামীর কথায় ঘাড় নেড়েই আবার মাথা ঝাঁকায় মালতী রানী, ‘আজ না গেলি হয় না? কেমন বাজ ডাকতিছে শুনতি পাতিছো?’

‘তুই থাম দিকি—সংক্রান্তির পর পাঁজি মতে আজ বছর পয়লার দিন। আজই যদি ক্ষেতিতে না যাই, তবে মা ক্ষেতলক্ষ্মী আমাকে কোনো দিন ক্ষমা করবে না!’

 

দুই

 

একে তো ঢাকা শহরজুড়েই কাটাছেঁড়া, তাতে বর্ষাকাল আসার আগেই ফিবছর ওয়াসার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আরো বেড়ে যায়। আর এ বছর কী যে হলো, কিছু বুঝে পায় না শাহানা। চৈত্র পার হয়ে বৈশাখ আসতে না আসতেই আকাশ প্রায় সকালেই এক ঘোর অপার্থিব পিঙ্গল রং ধারণ করে! সকাল থেকে দুপুর অবধি চলে ঝুম ধরে বৃষ্টি। তারপর বিকেল না হতে মেরুদেশীয় শীত নেমে আসে এই গরম দেশের রাজধানী শহরে। গতকাল বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে রিকশা নিতে নিতে  শাহানা দেখে, যেন বা রুশ বইয়ে পড়া সাইবেরীয় হাওয়ায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। সপ্তাহ তিনেক হয় সব সোয়েটার-কার্ডিগান-মাফলার-মোজা-কম্বল কত কষ্ট করে ওয়ার্ডরোবে আর লকারে তুলে রাখল সে। এখন দেখতে না দেখতে শীত!

‘নিম্মি, ওঠো মা!’

‘আমি আজ স্কুলে যাব না, আম্মু!’

‘ছি মা, এমন করতে নেই। ওঠো!’

নিম্মি প্রাণপণ অবাধ্যতায় বিছানায় শোয়া অবস্থায়ই হাত-পা ছুড়তে থাকে। এমন সব সময়, কান্না পায়    শাহানার। আরিফ আজ দুই বছর হয় চাকরিতে দেশের বাইরে। কাজেই শাহানা নিম্মিকে নিয়ে থাকছে তার     মা-বাবার সঙ্গে। মা-বাবা দুজনই যথেষ্ট বয়সী আর অসুস্থ। শাহানার বাকি তিন ভাই-বোনই দেশের বাইরে সেটেলড। কাজেই ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক—শাহানাকেই মেয়ের স্কুল, মা-বাবার ডাক্তার কি বাজারঘাট—সব কিছুই করতে হয়। এমন ভয়ানক বৃষ্টিতে এতটুকু মেয়েকে ঠেলে স্কুলে পাঠাতে তারও খুব ইচ্ছা করে না আসলে। কিন্তু কিছু করার নেই। নিম্মিদের স্কুলে অ্যাটেনডেন্সের বিষয়ে খুব কড়াকড়ি হয়। পরীক্ষার মার্কিং নির্ভর করে অ্যাটেনডেন্সের ওপর। অথচ মাত্র আট বছরের মেয়ে! ওদের বয়সটায় শাহানারা বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা বানিয়ে স্কুলের জল ভরা ঘাসের ওপর নৌকা ভাসাত। আচ্ছা, আজকালকার বাচ্চারা কি কাগজের নৌকা বা নারিকেলপাতার হাতঘড়ি বা চশমা বানাতে জানে? নাকি সবই ওই রিমোট কন্ট্রোলড বারবি ডল বা ফাইটার রোবট আর গাড়ির খেলনা আছে ওদের? সদা প্রস্তুত আর সদা স্বয়ংক্রিয়? নিম্মি স্কুল থেকে দুই কেজি বইয়ের ব্যাগ টানতে টানতে ঘরে ফেরার পথেই ফ্যাকাসে হয়ে বলতে থাকবে আগামী দিনের হোমওয়ার্কের বিবরণ। ভাগ্য বলতে এটুকুই যে শাহানার ব্যাংক, বাসা আর নিম্মির স্কুল—সবটা পনেরো মিনিট করে পৌনে এক ঘণ্টা দূরত্বের ভেতরে। লাঞ্চ আওয়ারে দেরি করে বের হয়ে, স্কুল থেকে নিম্মিকে তুলে বাসায় দিয়ে, নিজে মুখে দুটো গুঁজে আবার সে ছোটে। তাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বলে এটুকু পারা যায়। প্রাইভেট ব্যাংক হলে আর দেখতে হতো না।

‘কাল জিওগ্রাফি টিচার বলেছে...’

‘আগে একটু খাও তো মা!’

নিম্মির মুখে ভাত তুলে দেওয়ার আগে বারবি ডলের সুইচ টিপলে সোনালি চুল আর নীল চোখের বারবি গাইতে থাকে : ‘When I was young/I played for fun/Made up the words/Nobody heard/But now I see all eyes on me/And suddenly I'm in a dream.’

...নিম্মি তখন শুধু যদি একটু খায়! মেয়েকে খাওয়াতে বারবির গান ছেড়ে শুনতে শুনতে শাহানারও মুখস্থ হয়ে গেছে।

‘নিম্মি, ওঠো বলছি!’

এসএমএসের শব্দ আসে। আরিফ কি এসএমএস পাঠাল কাঠমাণ্ডু থেকে? নাকি জিপির অর্থহীন নানা বিজ্ঞাপন, ‘স্বপ্ন’য় কেনাকাটা বা রিয়েল এস্টেট কম্পানিগুলোর নানা অফারের এসএমএস? নিজেও ঘুম ঘুম চোখ দুই হাতে ডলতে ডলতে মোবাইল খুলে শাহানা দেখে, নিম্মির স্কুলের এসএমএস। ওমা, দারুণ খুশির খবর! দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আজ স্কুল বাতিল। ইংরেজি মিডিয়াম কিন্ডারগার্টেন কর্তৃপক্ষের ভেতরেও এতটা আত্মা আছে তাহলে এখনো! আনন্দে শাহানার মনে হলো, আজ ব্যাংকে রোজকার ডিউটিতে যাওয়ার আগে কিচেনে ঢুকে মা-বাবার জন্য একটু খিচুড়ি রাঁধে। কয়টা বাজে? সাড়ে সাতটা! হুম্। সাড়ে আটটার ভেতর রান্না হয়ে গেলে—নিম্মিকে যেহেতু স্কুলে নিতে হবে না—তারপর শাওয়ার নিয়ে, খেয়ে বাসা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট দূরত্বের ব্যাংকে ঠিক দশটার ভেতর পৌঁছা যাবে? তেমনটা ভেবেই রান্নাঘরে ঢুকে আজ ময়নার মাকে হাত না লাগাতে দিয়ে নিজেই খিচুড়ি চড়াল শাহানা। ঘি-আলু-টমেটোর গাওয়া গাওয়া খিচুড়ি আর ডিম ভুনা করল সে। আজ সে বাচ্চার স্কুল আর নিজের অফিসে পৌঁছার আগের বিরক্তিতে মা-বাবার সঙ্গে অনর্থক খিটখিট করল না। স্নানঘরে ঢুকে গায়ে পানি ঢালার সময় দু-এক লাইন গুনগুনও করল। তবে কি না পথে নামতেই যত ভয়! আব্বা যে কী—নিজের শৈশবের এই পুরনো ঢাকার বাড়ি কিছুতেই বদলাবে না। এখন এত সেকেলে বাড়ি কেউ রাখে? মানুষ এখন প্রমোটার বা ডেভেলপারকে দেয় বা নিদেনপক্ষে ভাড়া দিয়ে দেয়। কিংবা সব ভেঙেচুরে প্রমোটারের কাছ থেকে চড়া দাম নিয়ে নতুন ঢাকায় আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে ওঠে। এই ওয়ারী রোড-র্যাংকিন স্ট্রিট-বনগ্রামের মায়া কি আব্বা ইহজনমে কাটাতে পারবে না? ছোট ছোট ঘিঞ্জি গলি, গলির পর তস্য গলি, ঘর থেকে পা ফেলতেই শতমুখে ধেয়ে আসা ইতিউতি ডাস্টবিন, রাস্তাজুড়ে আবর্জনা, মাথার খুব কাছে ঝুঁকে থাকা শত শত বিদ্যুতের তার—ভয়ানক অবস্থা!

‘আজ এই আবহাওয়ায় বের হবি?’ আম্মা বললেন।

‘হুম্। কাজ জমে আছে একগাদা।’

‘সাবধানে যা। সামনে তো রাস্তা কাটছে। কারেন্টের তার সব মাথার ওপর দুলছে আর তাতে এমন বৃষ্টি, থেকে থেকে বাজ চমকানি!’

‘চিন্তা কোরো না। আমি সাবধানেই যাব।’

বাসা থেকে বের হয় শাহানা। বৃষ্টি এতক্ষণ তোড়ে হয়ে মাত্রই ধরে গিয়ে একটু আস্তে টিপটিপ করে পড়ছে এখন।

 

তিন

 

চৈত্রে দিয়া মাটি

বৈশাখে কর পরিপাটি।

জ্যৈষ্ঠে খরা, আষাঢ়ে ভরা

শস্যের ভার সহে না ধরা।

ভাদ্রের চারি, আশ্বিনের চারি

কলাই করি যত পারি।

আউশ ধানের চাষ

লাগে তিন মাস।

 

কী মেঘ রে বাবা! আষাঢ় তো দূরের কথা, জ্যৈষ্ঠ আসার আগে বা বলা ভালো যে বৈশাখের শুরুতেই আকাশ ভেঙে পড়েছে বৃষ্টিতে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে দেখি। শনশন হাওয়া উঠছে ধানক্ষেতে। কী আর করা, হেলু জোয়ার্দার? জমি তো লক্ষ্মী। তাকে একটা দিন একটু অমনোযোগ দিলে সে-ও তার শোধ নেয়। প্রতিদিনের আগাছা নিড়ানি, প্রতিদিনের সযত্ন-পরিচর্যা তাকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে রাখে। ওই দেখো, আবার মেঘ ডাকছে।

‘হেলু কাকা, মাঠে যাতিছ?’ শেখের পাড়ার মাহতাব সর্দারের মেজো ছেলে আয়নাল সর্দার তাকে দেখে ডাকে।

‘হ, যাতিছি। তুই যাবি না?’

আয়নালের মাথায় একটি বড় কচুপাতার টোকা, যার ওপর সপসপ বৃষ্টি পড়ছে।

‘নাগো কাকা, আকাশে মেঘের অবস্থা দেখো! একপশলা বৃষ্টি হইয়ে ফের মেঘ ডাকিচে। বাজ পড়তিচে। আমি আজ যাব নাগো, কাকা! তুমিও যাও, বাসায় গিয়ি একটা দিন বিশ্রাম নাও!’

‘মেঘ তো ভালো। খনার বচন আছে না—দিনের মেঘে ধান/রাতের মেঘে পান। এই মেঘে ধান হয়, বুঝিছিস?’

‘তুমি বোঝো দিনি, কাকা! আমার সাবধান করার কথা, তা করলুম!’

‘আমাকে যে সাবধান করিচিস, তা তোর নিজির কী খবর? তুই তবে বের হয়িচিস কেন?’

‘ঘরে কেরোসিন-পেঁয়াজ-মসুরের ডাল নেই। তাই সওদাপাতি করব বলে বের হয়িচি। একুন আকাশের যা অবস্থা দেকতিচি, তাতে ফিরি যাওয়াই ভালো।’

‘যা—’

ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। হেলু জোয়ার্দার এই বৃষ্টিকে গা করে না। বৃষ্টিকে গা করলেই গা। পান্তা খাওয়ার পর দাঁতে সে খানিকটা গুল ঘষেছে। এমনিতে এখন বিড়ি ধরাতে গেলে এই বৃষ্টিতে বিড়ি জ্বলবে না। দিয়াশলাইয়ের পিঠে কাঠি ঘষলে সে জ্বালাবে না তার অবিশ্বাস্য মৌলিক আগুন। এমন ঝমঝমানো মেঘের দিনে গুল দাঁতে ঘষলেও সেই সুখের মৌতাতেই ক্ষেতে অনেকটা সময় কাজ করা যায়। এ ছাড়া হেলুর বর্গাদার চাষি নেই। ছেলে একটা ভার্সিটির ছাত্র হয়ে শহরের ভদ্রলোকদের মতো হয়ে গেছে। তাকে হেলু বোঝে না বা বুঝতে চায়ও না। এটুকু জানে যে আরো একটা বছরের পর শহরে বড়লোকদের মতোই চাকরি পেতে ছেলেকে আরো এক বছর তাকে ধান বেচে টাকা পাঠাতে হবে।

 

আকাশে কোদালীর বাউ।

ও গো শ্বশুর মাঠে যাও

মাঠে গিয়া বাঁধো আলি।

বৃষ্টি হবে আজি কালি

গুনগুন করে মায়ের ব্রতকথার সুর ধরে হেলু জোয়ার্দার। নিজের ভাগের জমিটুকুতে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে মন ভালো হয়ে গেল তার। ক্ষেতজুড়ে আউশ ধানের সবুজ লকলকে চারা মাথা নেড়ে হিলহিল করে হাসছে। পা গেঁথে যাচ্ছে কাদায়। একি! আগাছাও উঠেছে বেশ। আগাছা তুলতে হয় তো তবে টেনে। হেলু জোয়ার্দার উবু হয়ে সবুজ আউশের চারাগুলোর পাশে বসে পড়ে।

চৈত্রেতে থর থর

বৈশাখেতে ঝড় পাথর

জ্যৈষ্ঠতে তারা ফুটে

তবে জানবে বর্ষা বটে।

গুনগুন করে খনার শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে হেলু জোয়ার্দার আগাছা তুলতে আরো উবু হয়। আর তখনই তিন মাইল দূরের মণি রত্নকারের দোকানের মিনে করা রুপোর বাজুবন্দের মতো ঝিলিক দেওয়া সাদা ফকফকে বাজ আকাশের দেহরেখা চিরে গেল এমাথা থেকে ওমাথা। আগাছা টান দিতে যাওয়া হেলুর করতলে উল্টো উঠে আসে একগুচ্ছ সবুজ আউশ। সেই অবস্থায়ই চিত হয়ে পড়ে যায় সে কাদা শয়ানে। দুই চোখের কোনায় জল গড়িয়ে আসে, যা বিদ্যুতের নীলাভ আলোয় দেখা যায় বা যায় না।

‘হরি হরি—’

এক অস্ফুট ঈশ্বরনাম অচেতনে উচ্চারিত হয়।

 

চার

 

রিকশা বনগ্রাম রোড থেকে র্যাংকিন স্ট্রিটের দিকে যেতেই পথে কোমরসমান জল। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, নিচে কোথায় কোন ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা কে জানে? একেকটি খোলা ম্যানহোল যেন একেকটি মৃত্যুকূপ!

‘রিকশা—আস্তে যান, ভাই—সাবধানে!’

‘আস্তেই তো যাইতাছি!’

ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না     শাহানার। দশটা বেজে আটাশ। র্যাংকিন স্ট্রিটে জনতা ব্যাংক পর্যন্ত যেতে যেতে রিকশা কখন এই কোমরসমান জলের নিচে পাতা উন্মুক্ত ম্যানহোলের ঢাকনার ভেতর যে পড়ে যায় কে জানে!

‘এবার একটু তাড়াতাড়ি করেন, ভাই—দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

‘আপনি তো আগে ভয় পাইতাছিলেন। আস্তে চালাইতে কইতেছিলেন। কোনো ভয় কইরেন না—ইনশা আল্লাহ!’

এটুকু বলে রিকশাওয়ালা জোরে পেডালে চাপ দিতেই ডান দিক থেকে অতর্কিত যমদূতের মতো একটি প্রকাণ্ড বাস শাহানার রিকশায় ঈষৎ ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।  শাহানার রিকশার পেছনেই শ পাঁচেক রিকশা-টেম্পো-স্কুটার-বাচ্চাদের স্কুলের ভ্যান-বাস-ট্রাকের এক মহা পিঁপড়ে মিছিল—এই কনকনে হিম দুর্যোগের দিনেও।

‘আ-স্তে ভাই, আ-স্তে!’

দুর্বল গলায় বলে প্রাণপণে রিকশার হুড আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলেও সবল বাসটি ততক্ষণে এক শক্ত ধাক্কা কেন জানি শাহানার রিকশায় দিয়েই চলে গেল পাশ কাটিয়ে।

‘আল্লাহ, যেন ম্যানহোলে না পড়ি!’

এটুকু ভাবা না ভাবার ভেতরেই শাহানা টের পায়, সে ছিটকে পড়ে গেছে বুক সমান কাদা-জলে আর মাথার ওপর নেমে আসছে পথের পাশের একটি উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক তার।



মন্তব্য