kalerkantho

উপন্যাস

স্পেয়ার মানুষ

আন্দালিব রাশদী

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



স্পেয়ার মানুষ

যেসব খবর গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, আমি তা কখনো পড়ি না। যেমন—সরকারি দলের এমপি গুলিবিদ্ধ কিংবা বিরোধী দলে ভাঙন, সচিবদের কয়েকজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা (এমনকি রাজাকারও হতে পারে), মাথাপিছু আয় শিগগিরই দুই হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে বাংলাদেশি টাইগার মেনি বিড়াল হয়ে গেল—এসব খবরের বড়জোর শিরোনাম পড়ি। আমার সবচেয়ে প্রিয় পাঠ হচ্ছে পাত্র চাই বিজ্ঞাপন। আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। তারপর মেলাতে চেষ্টা করি—আমি কি উপযুক্ত পাত্র?

শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় প্রায় চার কলাম ভর্তি পাত্র চাই, পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। আমি আয়েশ করে চা খেতে খেতে বিজ্ঞাপন পাঠ করি।

‘দুর্ঘটনায় নিহত স্বামীর সুন্দরী নিঃসন্তান স্ত্রী, বয়স ৩২, ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, পরহেজগার পাত্রীর জন্য মুসলমান সত্বংশের বয়স্ক ও নামাজি পাত্র চাই। পাত্রীর নামে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে ১৯৫০ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট রহিয়াছে। পাত্র সরাসরি যোগাযোগ করিবেন, কোনো মাধ্যম বা ঘটক গ্রহণযোগ্য নহে।’

আমি আমার ছোট্ট নোট বইয়ের শেষ পাতায় বিজ্ঞাপনদাতা মুন্সি আবু ওয়াদুদ এবং তার ফোন নম্বর টুকে নিই। আমার সঙ্গে এই পাত্রীর বয়সের ব্যবধান ৩৩ বছরের। আমার প্রিয় অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক উডি অ্যালান বলেছেন, একজন নারী তাঁর যৌন সক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেন ৩৬ বছর বয়সে। স্বামীহারা এই মেয়ের নাম যদি জেসমিন হয়ে থাকে, তাহলে আর চার বছর পর জেসি (বিয়ের পর স্ত্রীর নাম সংক্ষেপ করেই স্বামীরা ডেকে থাকে) সেই শীর্ষে আরোহণ করবে। তখন আমার বয়স হবে ৬৯—সিক্সটিনাইন। তা ছাড়া আমি ঠিক নামাজিও নই। অবশ্য এখনই নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়াটা আমার ঠিক হবে না। আমেরিকায় সেলিব্রিটি পুরুষের শেষ স্ত্রী এবং নিজের বয়সের ব্যবধান থাকে ৪০ থেকে ৫৫ বছরের। আমার পিছিয়ে না আসার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে।

আমি আরো একটি নম্বর লিখে রাখি। এই পাত্রীর নাম দিয়েছি সামান্থা।

‘ঢাকার একটি খ্যাতনামা হাসপাতালের অবিবাহিত সিনিয়র নার্স, লম্বা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি, একহারা গড়ন, রং ফরসা, বয়স ৩৬ বছর, পারিবারিক দায়িত্ব পালন শেষ করে নিজে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উপযুক্ত পাত্র পেলে পাত্রী চাকরি ছেড়ে দিতেও প্রস্তুত আছেন। পাত্র যুক্তিসংগত কারণে তালাকপ্রাপ্ত হলেও আপত্তি নেই।’

আমি চায়ে আরেকটা চুমুক দিতেই কলিংবেল বাজে।

দরজা খুলি। আমার মাথায় ঘুরছে ‘যুক্তিসংগত কারণে তালাকপ্রাপ্ত’ কথাটি। বেশ কটি যুক্তিসংগত কারণ থাকার পরও যদি স্ত্রী স্বামীকে তালাক না দেয়, তাহলে সে কি সামান্থাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে পারবে না?

দরজা খোলার পরও আমাকে আনমনা দেখে লোকটি আবার কলিংবেল বাজায়। আমার সংবিৎ ফেরার আগে হাঁটু সামান্য ভেঙে মাথাটা একটু সামনে এনে বলে, ওয়াহিও গোজাইমাস।

তার মানে কী?

গুড মর্নিং—সুপ্রভাত, স্যার।

আমার বাংলা কথা পুরোপুরি বুঝতে না-ও পারে—এটা ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, হু আর ইউ, গাই? ওই ব্যাটা, তুমি কে?

কাজুও ইশিগুরো।

নামটা বলে একবার আমার চোখাচুখি হয়ে হঠাৎ মাথা নুইয়ে আমার পা চেপে ধরে বসে পড়ল। পা ধরেই রাখল নাছোড়বান্দা বাঙালির মতো। বলল—স্যার, আমি বাসায় কাজ করি। আপনার বাসায় একটা কাজ দিন।

আমি ধমকে উঠলাম, পা ছাড়ো বলছি।

আমি এর আগে জীবনে কখনো বিদেশি কাউকে ধমক দিইনি। তবে বিদেশিদের ধমক খেয়েছি। বিদেশিরা আমাদের মতো ‘শালা, সম্বন্ধির পো’—এসব বলে না, দক্ষতা নিয়ে খোঁচা দেয়। বলে ডায়াপার পরা কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদের করতে দিলে কাজটা আরো ভালো হতো, বুঝতে পারলে, বুদ্ধিমান।

এতে আমি কিছু মনে করিনি। যতক্ষণ না বাপ-মা তুলে গালি দিচ্ছে, আমি চুপচাপই থাকব।

আমার ধমকে কাজ হয় না, পা ছাড়ে না। আমি সোজা হয়ে বললাম, ইমপসিবল, আমাদের কোনো কাজের মানুষের দরকার নেই। ভবিষ্যতে যদি কখনো দরকার হয়, তাহলে একটা বাঙালিকে রাখব। নাম যা-ই হোক, তাকে ডাকব আবদুল।

কাজের ছেলেদের এটাই স্ট্যান্ডার্ড নাম। কিন্তু কাজের মেয়েদের বহু বিচিত্র নাম—মায়মুনা থেকে শুরু করে হেমা মালিনী...

কাজুও পা জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল—স্যার, আপনি আমাকে আবদুলই ডাকবেন, তুই করে বলবেন, জিপার ছেঁড়া পুরনো প্যান্ট পরতে দেবেন, যতটা সম্ভব বাসি খাবার দেবেন, বেতন ইচ্ছা হলে কিছু দেবেন, ইচ্ছা না হলে দেবেন না; আপনার স্ত্রী যদি দু-একটা খুন্তির ছেঁকা দিতে চান, ম্যাডাম তা দেবেন, আমি কোনো অভিযোগ করব না; আপনার ছেলে-মেয়েরাও যদি মনে করে, আমাকে দু-চারটা চড়-থাপ্পড় দেওয়া দরকার, তা-ই দেবে, আমি টুঁ শব্দও করব না। তবু স্যার আমাকে রিজেক্ট করবেন না।

তার মানে?

বাংলাদেশের সার্ভেন্টস অ্যান্ড মেইড সার্ভেন্টস নিয়ে দুটি রিসার্চ পেপার পড়ে এসেছি, সমস্যাগুলো আগে নিজে বুঝতে চেয়েছি। দেখলাম, এগুলো আমার জন্য কোনো সমস্যাই নয়।

আমি শক্তি দিয়ে পা ছাড়াতে চেষ্টা করি এবং বলি, পা ছাড়, শালা হারামজাদা চায়নিজের বাচ্চা।

স্যার, আমি জাপানিজ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমরা হেরে গেলেও এটা নিশ্চয়ই আপনার জানা, আমরা চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করতে পেরেছিলাম।

শাট আপ। আমার কাছে চায়নিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান—সব একই কথা।

না, স্যার। এক হতে পারে না। আমি অরিজিনাল জাপানিজ।

বেশ বুঝলাম, তুই অরিজিনাল। কোরিয়ানরা নেড়ি কুকুর ধরে ধরে খায়, চায়নিজরা জ্যান্ত বানরের মগজ চামচ দিয়ে তুলে খায় আর জাপানিজরা খায় জ্যান্ত ব্যাঙ—তফাত কী? একই তো কথা।

স্যার, ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে একটা বড় রেস্তোরাঁয় লাল পিঁপড়া, কালো পিঁপড়া দুটিই ভেজে খাওয়ায়। লালটার দাম একটু বেশি। স্যার, আমি অনেক দিন ধরে শুধু হালাল ফুডই খাচ্ছি। আমাকে নিয়ে আপনার কোনো সমস্যা হবে না।

ওকে, হালাল ফুড ইটার, তোমার কথা বুঝলাম। এখন আমার পা ছেড়ে দাও। নাম-ঠিকানা রেখে যাও, কখনো যদি কাজের মানুষ দরকার হয়, যোগাযোগ করব।

বিদেশি বিনয়ের সঙ্গে বলল—আমি জানি স্যার, আমার মতো একটা কাজের মানুষ ঘরে ঘরে দরকার, আপনার ঘরেও। আমাকে রাখলে আপনি ঠকবেন না।

পা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটি সুন্দর বিজনেস কার্ডহোল্ডার বের করে। সেখান থেকে টেনে নেয় একটি কার্ড এবং আমার দিকে এগিয়ে দেয়। একদিকে জাপানি ভাষা, অন্যদিকে বাংলা :

কাজুও ইশিগুরো

পিতা : সিজুও ইশিগুরো

জন্ম ও আদিবাস : নাগাসাকি, জাপান

বর্তমান বাস : গিল্ডফোর্ড, সারে, ইংল্যান্ড

পেশা : ডমেস্টিক হেল্প (কাজের ছেলে)

 

দুই

 

তার মানে ব্যাটা ঠিকই বলেছে, আসলেই সে কাজের মানুষ। ডমেস্টিক হেল্প, মানে আবদুল।

পা ছেড়ে দেওয়ায় আমার রাগ কমে যায়। আমার ডান হাঁটুর অবস্থা ভালো নয়, মালাইচাকির চারপাশের লিকুইড কমে গেছে। নড়বড়ে অবস্থা, তার ওপর চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ। পেইনকিলার খেতে হয়। আমি জানি, বেশি পেইনকিলার কিডনি ড্যামেজ করে দেয়।

কাজুও যখন পা জড়িয়ে ধরে, হাঁটুতে টান পড়ে, আমি ব্যথা পাই এবং তখনই তাকে হারামজাদা বলে গাল দিই। সোহাগ করে তো আর কাউকে হারামজাদা বলা হয় না।

তার বিজনেস কার্ড হাতে নিয়ে বলি—তোর বাড়ি জাপান, থাকিস ইংল্যান্ডে আর আবদুলগিরি করতে এসেছিস বাংলাদেশে!

আমি জানি, জাপান আমাদের সবচেয়ে বড় ডোনার। সে দেশের একজন নাগরিক যদি একটা তুচ্ছ চাকরি চায়, ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে আগামী বছরের বরাদ্দের ওপর। তার ওপর এই যে আমি তুই করে বলছি, এটাও ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু চাকরবাকরদের তুই না বললে আমিও যে কথায় জোর পাই না।

কাজুও বলল—স্যার, সব কাজই সমান সম্মানের।

ব্যাটা, বড় কথা বলছিস? সব কাজই সমান ও সম্মানের!

বিদেশির কণ্ঠ কানে গিয়ে থাকতে পারে, আমার ছোট মেয়ে পুষ্প বেরিয়ে আসে।

কাজুও দুই হাত জোড় করে পুষ্পর দিকে মাথাটা নুইয়ে তাকে অভিবাদন জানায়। পুষ্পও ঠিক একই কায়দায় নিজের মাথা নোয়ায়। ব্যাপারটা আমার পছন্দ হয়নি। কাজের মানুষকে আবার কিসের অভিবাদন।

আমি একটু চড়া গলায় তাকে বলি, এখন তুই চলে যা, গেট আউট।

মাথা নিচু করে কাজুও বলল—স্যার, আমি সব কাজ করতে পারি, আমাকে এভাবে বিদায় করবেন না।

আমাদের কথার মধ্যে পুষ্প নাক গলায়। বিদেশিকে বলে—এই যে মিস্টার, আপনি কি আমাকে চায়নিজ ভাষা শেখাতে পারবেন? কাজুও বলল, আমি আসলে জাপানি। যদি জাপানিজ শিখতে চান, তাহলে চেষ্টা করতে পারি।

পুষ্প উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, আপনি জাপানি? তাহলে তো আরো ভালো। আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক জাপানি, আপনি কি হারুকি মুরাকামির কোনো বই পড়েছেন? তিনিই আমার প্রিয়। আমি মাত্র ‘কাফকা অন দ্য শোর’ উপন্যাসটা শেষ করলাম। এখন আমার হাতে আছে তাঁর স্মৃতিকথা ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’।

কাজুও একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার পুষ্পর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, আমার ভালো লেগেছে ‘নরওয়েজিয়ান উড’। অবশ্য জাপানের বাইরেই তাঁর পাঠক বেশি।

আপনি তো অনেক খবর রাখেন। আপনি কি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভাষা ইনস্টিটিউটের জাপানি ভাষার টিচার?

আমাকে নেবে না। আমার তেমন কোনো সার্টিফিকেট নেই।

পুষ্প তার কথাটাকে গুরুত্ব দিল না; বলল, সো হোয়াট? টেগোর স্কুল ফাইনাল পাস করেননি। টেগোরের নাম শুনেছেন?

‘গীতাঞ্জলি’র রবীন্দ্রনাথ?

হ্যাঁ, কিন্তু টেগোরের কয়েকটা গান ছাড়া আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। শুনুন, হারুকি মুরাকামির ‘স্পুটনিক সুইটহার্ট’ আমার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস। এটা আপনার জানার কথা—হারুকি মুরাকামির কিরিন নামে যে বিড়ালটা, সেটা কি কালো রঙের?

এটা আসলে আমার জানা নেই। এমনিতে আমার তেমন পড়াশোনা নেই।

বেশ, পড়াটা বাদ দিলাম। ভালো করে দেখতে পান তো? ঠিক করে বলুন, হারুকির বউ ইয়োকো মুরাকামি কি দেখতে সুন্দর?

আমি কখনো হারুকি মুরাকামি কিংবা তাঁর স্ত্রীকে সামনাসামনি দেখিনি। তবে ছবি দেখে যদ্দুর মনে হয়েছে, তিনি আপনার মতো এত সুন্দর নন।

পুষ্প বলল, এক্সাক্টলি। আমি ভালো করে ছবির দিকে তাকিয়ে দেখেছি। পেত্নি টাইপের মেয়েদের মতো। ভালো ভালো রাইটার যে কেন পেত্নি টাইপের মেয়েদের বিয়ে করে? আমাদের টেগোরও তো ভবতারিণী নামের বিচ্ছিরি চেহারার একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছেন।

এই আলোচনায় ঢোকার জন্য যেসব আজেবাজে বই পড়তে হয়, আমি তা কখনো পড়িনি। তা ছাড়া বাজে বই মানুষের চরিত্রের ওপরও ছাপ রেখে যায়। আমি বেশ বুঝতে পারছি, এই বদমাশ জাপানির বাচ্চা পুষ্পর সঙ্গে জমিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। এসব হচ্ছে কৌশল। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আমি যখন তাকে বলব, গেট আউট, পুষ্প ভেজা গলায় আমাকে বলবে—থাকুক না, বাবা। এমন করো কেন?

পুষ্পকে যে আমি চোখ ইশারায় চলে যেতে বলেছি, এটা সে আমলেই নিল না।

যেন সেখানে আমি নেই—এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আদুরে গলায় পুষ্প বলল—জানেন, মাত্র এক দিনের জন্য আমি হারুকিকে মিস করেছি। আমার বার্থডে ১১ জানুয়ারি আর হারুকির ১২ জানুয়ারি। মাত্র এক দিনের গ্যাপ। ব্যাড লাক। আচ্ছা, হারুকি মুরাকামিকে সুইডিশরা কেন নোবেল পুরস্কার দিচ্ছে না, আপনার কি কোনো ধারণা আছে? আমার মনে হয়, এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল কন্সপিরেসি।

হতেও পারে। আপনাদের দেশেও শুনেছি, হারুকি মুরাকামির মতো এ রকম জনপ্রিয় লেখকের ওপর ইনজাস্টিস করা হয়েছে।

ঠিক তা নয়, তিনি দেশের সব পুরস্কার পেয়েছেন। তবে নাক সিটকানো বুদ্ধিজীবী টাইপের কিছু লেখক তাঁর নিন্দা করে মজা পেতেন। অ্যাকচুয়ালি ম্যাসিভ পপুলারিটি তাঁদের জেলাসির কারণ। এটা ঠিক, তাঁর ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোজার হয়নি।

এবার আমি একটু কথা বললাম, তোরা কি মাসুদ রানার ওই যে কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলের কথা বলছিস, কী যেন নাম?

বাবা, তিনি কাজী আনোয়ার হোসেন। আমরা হুমায়ূন আহমেদের কথা বলছি।

কী নাম বললি?

হুমায়ূন আহমেদ।

কী লিখতেন? টিভি নাটক? টিভি নাটক লিখে কেউ নোবেল পুরস্কার পেয়েছে, এমন শুনেছিস?

পরক্ষণেই মনে হলো যে আমার বাড়িতে কাজের মানুষ কিংবা গৃহভৃত্য (চাকর শব্দটা এখন শুধু চাকরির সঙ্গেই আছে, যারা সরকারি চাকরি করে, তাদের একবার চাকর বলে দেখতে পারেন, তখনই যুগল অণ্ডকোষ মাথায় উঠে যাবে, প্রাণ নিয়ে ফিরতে কষ্ট হবে) হতে এসেছে, তাকে সঙ্গে নিয়ে সাংস্কৃতিক বিতর্কে অংশগ্রহণ করা অসমীচীন।

পুষ্প বলল—বাবা, তুমি কী যে! আমাদের লিটারারি ডিসকাশনটাকে ডাইলিউট করে দিলে।

আমি আলোচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিই।

পুষ্প চাকরিপ্রার্থী ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী নাম যেন বললেন?

কাজুও।

কাজুও কী? কাজুও ফুজিমতো, নাকি কাজুও কুরোসাওয়া?

কাজুও ইশিগুরো।

ও মাই গড! কাজুও ইশিগুরো। আরে বাপু, ইন্টারন্যাশনাল কন্সপিরেটররা হারুকি মুরাকামিকে চিরদিনের জন্য নোবেল প্রস্তাবনা থেকে ড্রপ করায় ঠিক একই নামের, মানে আপনার নামের এক জাপানিজ-ব্রিটিশকে পুরস্কারটা গছিয়ে দেওয়া হলো। আপনি কি তাঁর কোনো লেখা পড়েছেন?

না, তবে লেখকের নামটা শুনে থাকতে পারি।

কাজুও ইশিগুরোর লেখা এক্কেবারে ট্র্যাশ। নোবেল কমিটির কী যে রুচি!

আমাদের ইউকিও মিশিমাও তো নোবেল পুরস্কার পাননি, তাতে কিছু এসে যায় না। আমি দুঃখিত, আমার নামে নাম এমন একটা লোক আপনার প্রিয় লেখকের বিরুদ্ধে কন্সপিরেসিতে যুক্ত। আমি খুবই লজ্জিত!

আরে এতে লজ্জার কী আছে, নাম তো নামই। পুরান ঢাকার বাগডাশা লেনে যে পকেটমারটাকে পিটিয়ে আধমরা করে, মাথার চুল কামিয়ে, গেঞ্জি-লুঙ্গি খুলে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়, তার নাম শুনলে থ হয়ে যাবেন। রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে টেগোরও আছে।

জাপানেও তা-ই। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা নামের একজন সিরিয়াল কিলার আছে। কী লজ্জার কথা!

 

 

তিন

 

পুষ্প তার মায়ের প্রশ্রয়ে যে বদমাশ খালাতো ভাইটির প্রেমে পড়েছিল বলে আমি সন্দেহ করতাম, সেই ছোকরাটিকে এনকাউন্টারের নামে পুলিশ খালাস করে দিয়েছে। এনকাউন্টার মানে গুলি করে মেরে ফেলা, পাঁচ-সাত বছর আগে এটাকে বলা হতো ক্রসফায়ার। এই ঘটনাটি পুষ্প আর তার মাকে যত বিচলিত করেই থাকুক, এতে পুলিশের বিবেচনাশক্তি ও টার্গেট শ্যুটিংয়ের ওপর আমার শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর আগে যদি দু-একটা উল্টাপাল্টা মেরেও থাকে, একটি সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে আমি তাদের সব অপরাধ থেকে ইমিউনিটি দিয়ে দিলাম। এই ছোকরার নাম কাইয়ুম, চ্যাগা কাইয়ুম।

চ্যাগা কাইয়ুম খালাস হওয়ার পর পুষ্প নিশ্চুপ হয়ে যায়। কাইয়ুমের ফোনের কললিস্ট ধরে তার সঙ্গে কথা বলতে পুলিশ আসে। পুলিশই তাকে জানায়, পুষ্পই কাইয়ুমের একমাত্র প্রেমিকা নয়, চৈতি নামের এক দেহপসারিণীকে সে ভালোবাসত, সে তার সারা জীবনের সঞ্চয় আত্মসাৎ করে। চৈতি যখন তার পিছু নেয়, সে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আরো একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি কাইয়ুমকে শেষ পর্যন্ত চৈতিই ধরিয়ে দেয়। আমার আশঙ্কা, কাইয়ুম চৈতির সারা জীবনের সঞ্চয় যেমন হরণ করেছে, পুষ্পর কাছ থেকেও কম কিছু নেয়নি।

পুরো ব্যাপারটি তাকে ভয়ংকর ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। দুই বেলা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খায়, সারা দিন দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকে, আমি আতঙ্কে থাকি—পুষ্প ভয়ংকর কিছু করে না ফেলে! বিদেশির সঙ্গে তার এই কথোপকথন আমাকে যত বিরক্তই করুক, আমি চাই পুষ্প কথা বলুক, তাহলে বিষণ্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

পুষ্প জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা কাজুও ইশিগুরো, আপনি তো জাপানি, আপনি কি হারাকিরি করতে জানেন?

ব্যাপারটা সব জাপানিই কমবেশি জানে। তবে এটা তো বারবার ট্রায়াল দিয়ে শেখার মতো ব্যাপার নয়। হারাকিরি করে ফেললে কি এ পর্যন্ত আসতে পারতাম?

পুষ্প বলে, তাইতো। এ রকম একটা স্টুপিড প্রশ্ন আমার করা উচিত হয়নি।

আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। জিজ্ঞেস করি, ওটা কী?

পুষ্প এবার আমাকে বলল, নিজের পেটে লম্বা একটা ছুরি ঢুকিয়ে একটানে নাড়িভুঁড়ি বের করে আত্মহত্যা করাকে হারাকিরি বলে। এটা খুব সম্মানের কাজ, এটা করতে দারুণ সাহসী হতে হয়।

কাজুও বলে, অবশ্য আজকাল কেউ হারাকিরি করেছে, এমন বেশি শোনা যায় না।

কেন? প্রশ্নটা পুষ্পর।

কারণ জাপানিদের আত্মসম্মানবোধ অনেক কমে গেছে আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর যেটুকু সাহস ছিল, তা-ও নিঃশেষ হয়ে গেছে।

কাজুও এবার আমার দিকে তাকিয়ে সবিনয়ে পুরনো কথাটাই বলল—স্যার, আমাকে প্রত্যাখ্যান করবেন না।

পুষ্প বলল, এই যে মিস্টার কাজুও ইশিগুরো, আপনি অনুগ্রহ করে এখনই চলে যাবেন না। একটু পরই আমার দোয়েল আপু আসবে, দোয়েল কখনো জাপানি মানুষ দেখেনি। দোয়েল খুব ভালো চা বানায়। দারুচিনি, তেজপাতা, কিশমিশ, একটু মধু, দুধ, গরম পানি আর বাগানের তাজা চা পাতা।

আমি কিছুটা রেগেই বলি, জাপানি মানুষ দেখার কী আছে? জাপানিদের চোখ কি মাথার পেছন দিকে নাকি? কান কি দুই জোড়া? হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করে?

আমি আরো খারাপ কিছু বলতে চাইছিলাম। কিন্তু নিজের মেয়ের সামনে এসব বলা ঠিক হবে না ভেবে নিজেকে সামলে নিই। পুষ্প এবার আমাকে ধমকাতে শুরু করে। বলে—বাবা, তুমি একজন বিদেশির সঙ্গে এমন বাজে ব্যবহার করছ কেন? মিস্টার ইশিগুরো তো দেশে ফিরেই বাঙালিদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে শুরু করবেন। আর সেটা করলেও ভুল তো কিছু হবে না—বাঙালিরা তো মোর অর লেস তোমার মতোই।

এবার আমি দেঁতো হাসি দিয়ে বলি, এই হারামজাদা নিজের দেশে ফিরে যাবে না। সে এখানে থাকতে এসেছে। খুনখারাবি করে পালিয়ে এসেছে কি না কে জানে।

পুষ্প বলল—বাবা, প্লিজ! মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ।

তার মানে আমাকে আমার ভাষা সংযত করতে হবে। বেশ, তা-ই হবে। আপাতত আপদটা বিদায় হোক।

 

 

চার

 

এক দুস্থ বিদেশির পাল্লায় পড়ে আমি শুক্রবার সকালটাকে মাটি করতে পারি না। আমি আবার খবরের কাগজ নিয়ে বসি। শুধু একটিমাত্র কলাম পড়েছি, আরো তিনটি বাকি।

‘২১ বছর বয়সী সুন্দরী একটি বাক্প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য মানবিক গুণসম্পন্ন যোগ্য পাত্র চাই। পাত্র পূর্বে বিবাহিত হইলে এবং পূর্ব স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান থাকিলে সমস্যা নাই। পাত্র ইচ্ছা পোষণ করিলে ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় রোডে পাত্রীর পিত্রালয়ের দ্বিতল ভবনে অবস্থান করিতে পারিবেন। পাত্রীর একমাত্র ভাই নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। সুদর্শন পাত্র অগ্রাধিকার পাইবেন। এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সাইড ফটো গ্রহণযোগ্য নহে) ও জীবনবৃত্তান্তসহ লিখুন।’

এ ক্ষেত্রে পোস্টবক্স দেওয়া হয়েছে। ফোনে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। মেয়েটির একটি বাড়তি গুণ বাক্প্রতিবন্ধী। আহ্! আমার স্ত্রী যদি অর্ধেক বাক্প্রতিবন্ধী হতো! রবীন্দ্রনাথ এই মেয়ের নাম নিশ্চয়ই সুভাষিণী কিংবা প্রিয়ংবদা রাখতেন। প্রিয়ংবদা—যে নারী মিষ্টি ও প্রিয় কথা বলে। তাহলে তা-ই হোক এই মেয়ের নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি কথাগুলো তো অব্যক্তই থাকে। বাক্প্রতিবন্ধী এই প্রিয়ংবদার সব কথাই মিষ্টি কথা, কারণ সবই অব্যক্ত। সমস্যা বয়সের ব্যবধান। আমার সঙ্গে ব্যবধানটা ৪৪ বছরের।

প্রিয়ংবদা তার সক্রিয় যৌনজীবনের শিখরে পৌঁছবে ৩৬ বছর বয়সে (হিসাবটা আমার নয়, উডি অ্যালানের), মানে আরো ১৫ বছর পরে। তখন আমার বয়স দাঁড়াবে পুরোপুরি ৮০। ও মাই গড! আমাকে এখনই প্রিয়ংবদার কাছ থেকে সরে যেতে হবে। কিন্তু সরে আসব কেন? প্লেবয় সাম্রাজ্যের মালিক হিউ হেফনারের জন্ম ১৯২৬ সালে আর তাঁর স্ত্রী ক্রিস্টাল হ্যারিসের ১৯৮৬ সালে। তাহলে ব্যবধানটা কি চুয়াল্লিশের বেশি, না কম? পুরো ৬০ বছর। হিউ হেফনার সামলাতে পারলে আমি পারব না কেন?

লাস্যময়ী আনা নিকোল স্মিথ ১৯৯৪ সালে ধনকুবের হাওয়ার্ড মার্শালকে যখন বিয়ে করেন, দুজনের বয়সের ব্যবধান তো আরো বেশি—৬২ বছরের। তাহলে আমার শরীর ঘেমে উঠছে কেন? সুভাষিণী কিংবা প্রিয়ংবদা আমার চেয়ে মাত্র ৪৪ বছরের ছোট।

বহু বছর আগে রিডার্স ডাইজেস্টের ‘লাফটার দ্য বেস্ট মেডিসিন’ পাতায় পড়া একটা অ্যানেকডোট মনে পড়ল।

৮৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ তাঁর তরুণী গর্ভবতী স্ত্রী সম্পর্কে তাঁর সমবয়সী এক শিকারি বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। গত বছর আফ্রিকায় শিকার করতে গিয়ে দেখি, সামনে একটা হিংস্র চিতা। বন্দুক তুলতে গিয়ে দেখি, তুলতেই পারছি না। চিতাও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে—এমন অবস্থা। তাড়াতাড়ি বন্দুকের লাইসেন্সটা বের করে চিতাকে দেখালাম। অমনি জন্তুটা মাটিতে পড়ে গেল।

ধ্যাৎ, তা হয় নাকি? গর্ভবতী তরুণীর স্বামী বলল, নিশ্চয়ই পাশ থেকে কেউ চিতাটাকে গুলি করেছে।

শিকারি বন্ধু বলল, তাহলে বুঝতে পেরেছ, তুমি মেয়েটিকে শুধু বিয়ের কাবিনটা দেখিয়েছ।

আমার বেলায়ও কি এমন কিছু ঘটতে পারে?

আমার কাছ থেকে খানিকটা দূরে পুষ্প কাজুওর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে।

শুনুন, বাবার কথা কানে তুলবেন না। আমরাও বাবার কথা এক কানে শুনি, অন্য কান দিয়ে বের করে দিই।

কাজুও বলল, দারুণ তো! আমি বাংলাদেশে এসে একজন বৃদ্ধ নেংটাবাবাকে দেখেছি, তিনি জনসমক্ষে ঢকঢক করে পানি খাচ্ছেন এবং তাঁর কোঁচকানো শিশ্ন দিয়ে অবিরাম তা বের করে দিচ্ছেন। একেবারে স্বচ্ছ পানি, প্রস্রাবের গন্ধ তাতে নেই। তাহলে আপনিও ওই রকম পারেন?

মানে?

আমি পানি খাওয়া আর পানি নিঃসরণ করার কথা বলছি না। বলছি এক কানে শব্দ ঢোকান, অন্য কান দিয়ে বের করে দেন। চমৎকার! ইন্ডিয়ান যোগীরা নাকি তাঁদের গোটা শরীরই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন—এটা খুব বড় ব্যাপার।

পুষ্প বলল, আমরা তো শুধু শুনি আর বের করে দিই, আমার বাবা আরো এক্সপার্ট! বাবা বিশেষ করে আমার মায়ের কোনো কথা তার কানে ঢুকতেই দেয় না। শব্দ ও স্বর-ছাঁকনি বাবার কানে লাগানো আছে। কোন শব্দ গ্রহণ করবে আর কার স্বর শুনবে, ছাঁকনিই তা ফিল্টার করে দেয়। মা অবশ্য বলে, মানুষটা কালা।

কাজুও বলে, কালা, মানে ব্ল্যাক?

আমি যে পাশেই আছি এটা বেমালুম ভুলে গিয়ে পুষ্প বলল—ওটা যে শিশ্ন, এই সুন্দর বাংলা শব্দটা ঠিকই শিখেছেন; কিন্তু কালা মানে জানেন না। তার মানে ভাষাবিজ্ঞানের আরেকটা তত্ত্ব প্রমাণ করলেন আপনি—মানুষ যখন নতুন ভাষা শেখে, অল্প সময়ের মধ্যে সেক্সুয়াল ওয়ার্ডস শিখে নেয়। শুনুন, কালা মানে যে কানে শোনে না, শ্রবণপ্রতিবন্ধী।

থ্যাংক ইউ। একই ধ্বনির আরো কয়েকটি শব্দ আমি জানি—খালা মানে আন্টি, শালা মানে ব্রাদার ইন ল, তালা মানে লক, চালা মানে হাট, গালা মানে...।

পুষ্প তাকে বাধা দিল, থাক আর পণ্ডিতি ফলাতে হবে না। এবার বলুন, আপনি কোথায় উঠেছেন? র্যাডিসনে? জ্যামের কারণে বিদেশিরা তো সোনারগাঁও কিংবা ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যেতেই চায় না।

পুষ্পর কথাটা আমার কানে ঢোকে এবং আমি চেঁচিয়ে উঠি, র্যাডিসনে!

এই জাপানির বাচ্চার কোথাও থাকার জায়গা নেই। আমাদের বাড়িতে থাকতে চায়। আবদুলগিরি করবে।

মানে আমাদের বাড়িতে?

আমি তো সরল বাংলায় বলেছি। বিশ্বাস না হয় উল্লুকটাকে জিজ্ঞেস করে দেখ, কী বলে।

বাবা, এভাবে বোলো না, তিনি কিন্তু খুব ভালো বাংলা জানেন।

উল্লুককে কি খেঁকশিয়াল বলব? না হলে জাপান থেকে কেউ বাংলাদেশে থাকতে আসে?

এটা হয়তো তার হায়ার স্টাডির একটা অংশ। একটা দেশকে চিনবে, একটা সোসাইটি সম্পর্কে জানবে, একটা ফ্যামিলিকে কাছ থেকে দেখবে, দেশে ফিরে গিয়ে  ‘ফ্যামিলি রিলেশন্স ইন বাংলাদেশ’ কিংবা ‘প্যাট্রিয়ার্কি ইন ফ্যামিলি অ্যান্ড সোসাইটি : আ বাংলাদেশ পারস্পেকটিভ’—এই নামে থিসিস লিখে পিএইচডি ডিগ্রি পাবে। বেশ কয়েক বছর পর দেখতে পাবে, কাজুও বাংলাদেশে এসেছে জাপানের রাষ্ট্রদূত কিংবা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে।

আমি বললাম, সে কচু হবে!

পুষ্প বলল—বাবা, মানুষকে ট্রাস্ট করতে হয়।

এবং তারপর ঠকতে হয়, তাই না?

আমি জানি, খোঁচাটা ঠিকই লাগবে। আসলে আমি চ্যাগা কাইয়ুমের কথা বলতে চাইনি। পুষ্প যখন বিদেশিটাকে ধরে বদমাশটার স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তা-ই করুক। তবে ব্যাপারটা যে আমি পছন্দ করছি না, এটা তো বোঝাতে হবে।

পুষ্প বলল—বাবা, আমাদের একটা রুম তো খালিই পড়ে আছে। ভেতরে কিছু ভাঙা ফার্নিচার। ওগুলো বের করে নিলে কাজুও ইজিলি সেখানে থাকতে পারবে।

কাজুও বলল, আমার জন্য ঘরের ভেতরে রুম দরকার নেই। একটা চাদর পেতে গ্যারেজেই ঘুমাতে পারব।

পুষ্প বলে, আমাদের গাড়ি নেই, সে জন্য গ্যারেজও বানানো হয়নি, অবশ্য গ্যারেজের জায়গা ঠিক করা আছে। কখনো গাড়ি কেনার টাকা হলে বাবা গ্যারেজটা করে নেবে।

গ্যারেজ না থাকলে সমস্যা নেই। আমি কিচেনের ফ্লোরেও থাকতে পারব। আমার খুব ভালো ঘুম হয়, আমি মেপে মেপে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাই। কোনো দিন একটু বেশি ঘুমালেই গা ম্যাজম্যাজ করতে থাকে।

পুষ্প বলে—বাবা, প্লিজ! কাজুও থাকুক না!

কিন্তু আমার মনোভাব আড়াল করে পারি তো কাজুওকে তখনই ঘাড় ধরে বিদায় করে দিই। নিজের বাড়িতে উটকো জাপানি ঝামেলা কে সহ্য করবে। বাঙালি হলেও একটা কথা ছিল।

এবার কাজুও ইশিগুরো নিজেই কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল—স্যার, আমাকে রাখলে আপনি ঠকবেন না। আপনার ফ্যামিলির সবার সব কাজ তো করবই, বাড়তি হিসেবে আপনি আমাকে যেকোনো জায়গায় লাগাতে পারবেন, খাটাতে পারবেন। আর এটা তো পৃথিবীতে সবাই স্বীকার করে, জাপানিরা কাজে ভালো। ইয়াসিকা ক্যামেরা বলুন, টয়োটা গাড়ি বলুন—আমাদের লোকেরাই তো বানায়। স্পেয়ার সব কিছুই কাজে লাগে। যেমন ধরুন, কোনো চিকিৎসাগত কারণে আপনার ফ্যামিলির কারো একটা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা দরকার। আমার একটা কিডনি দিয়ে দেব, কিংবা ধরুন কর্নিয়া রিপ্লেসমেন্ট, আমার চোখ তো আছেই। আমাকে স্যার যেকোনো কাজে লাগাতে পারেন।

তখনই আমার স্ত্রী সাহারা খাতুন, মানে পুষ্পদের মায়ের কথা মনে হলো। সাহারার এমনিতেই ডায়াবেটিস, খিটখিটে মেজাজ, একটা কিডনির এইটি পার্সেন্ট ড্যামেজড, অন্যটার অবস্থাও ভালো নয়। নষ্ট কিডনি অপসারণ করে ভালো কিডনি প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু কাজটা এগোয়নি।

কাজুওর কথা শুনে আমার আচরণে পরিবর্তন আসে। আমারও তো কিছু একটা লাগতে পারে। বড় কিছু সমস্যা ধরা পড়ে যেতে পারে এই ভয়ে মেডিক্যাল চেক আপ করাই না।

পুষ্পকে আড়ালে রেখে আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করি, বিচি রিপ্লেসমেন্ট করা যায়? আমার একটু সমস্যা আছে।

কাজুও জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইজ বিচি?

তাত্ক্ষণিকভাবে এর কোনো ভালো বাংলা বা ইংরেজি প্রতিশব্দ মনে করতে না পেরে ইশারায় বুঝিয়ে দিই।

কাজুও জিজ্ঞেস করে, ইউ মিন রিপ্লেসমেন্ট অব টেস্টিস?

আমি বলি—হ্যাঁ, আমি আসলে ওটাই বোঝাতে চাইছিলাম।

কাজুও বলল, ওটার রিপ্লেসমেন্ট খুব সহজ। একেবারে চিন্তা করবেন না, স্যার। আমি তো আছি।

ঘরের ভেতর থেকে একচক্কর ঘুরে এসে পুষ্প জিজ্ঞেস করে—যদি কারো হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করতে হয়?

বেয়াদবটা আমার সামনে পুষ্পকে বলে, যদি আপনার লাগে আমি দিতে রাজি আছি। কিন্তু স্যারকে দেব না।

পুষ্প জিজ্ঞেস করে—আর কোন কোন অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট করা যায়?

প্রায় সবই। লিভার, স্টমাক, প্যানক্রিয়াস, লাং, বোনম্যারো, ইনটেস্টাইন, হার্টের ভাল্ভ, এমনকি রক্তনালিও। তবে সাধারণ মানুষের বেলায় আইন-কানুনের ঝামেলা আছে, একসঙ্গে দুটি কিডনি দেওয়া যায় না, লিভারের একাংশ মাত্র দেওয়া যায়, শুধু মরা মানুষের হার্ট নেওয়া যায়। কিন্তু আমার বেলায় এসব কোনো সমস্যা নয়।

পুষ্প জিজ্ঞেস করে, আপনি অসাধারণ নাকি?

না, মানে একটু তো ডিফারেন্ট অবশ্যই। অবশ্য এই ট্রান্সপ্লান্টেশনের ব্যাপারটা খুব বেশিদিন আগের নয়। ১৯০৫ সালে প্রথম সফল কর্নিয়া প্রতিস্থাপন হয়। আর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করতে লেগে যায় আরো ৪৫ বছর। ১৯৫০ সালে শিকাগোর ডাক্তার রিচার্ড লাডলার কাজটা করেন। প্রথম লাং ট্রান্সপ্লান্ট হয় ১৯৬৩ সালে, খুব সফল বলা যায় না, কাজটা করার পর মানুষটা বেঁচে ছিল মাত্র ১৮ দিন। ২০০৫ সালে মুম্বাইয়ের ওয়াদিয়া হাসপাতালে প্রথম গর্ভাশয় প্রতিস্থাপন হয়। আমি খুব দুঃখিত, পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করায় আমার ওভারি, ফেলোপিয়ান টিউব—এসব নেই।

পুষ্প চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।

চিকুনগুনিয়া নামের একটি অসুখে আমার পায়ের অবস্থা খারাপ, পায়ের ট্রান্সপ্লান্টেশন কি চলে? মানে হাঁটুর?

কাজুও বলল, আর্টিফিশিয়াল অর্গানের কথা ভাববেনই না। দরকার শুধু ভালো ডাক্তার। ২০১১ সালে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া হাসপাতালের ডাক্তার ক্যাভাডাস ও তাঁর টিম প্রথম দুই পা প্রতিস্থাপন করেছেন।

পুষ্প অবাক হয়। লোকটা এত কিছু জানে, আবার বলছে এ বাড়িতে আবদুলগিরি করবে!

পুষ্প জিজ্ঞেস করে—আপনি কি সিআইএর এজেন্ট? সত্য কথা বলবেন।

কাজুও জবাব দেয়, আমাকে দেখে কি মনে হয়, সিআইএর মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা আমাকে তাদের এজেন্ট নিয়োগ করবে? শুনুন—সিআইএ, কেজিবি, মোসাদ—এসবের এজেন্ট হওয়ার জন্য মন্ত্রীদেরও কেউ কেউ মুখিয়ে থাকে। সিআইএ আমার পেছনে পয়সা ঢালবে কোন দুঃখে?

পুষ্প বলল, আমি শিগগিরই আমার হার্ট চেক করাব।

কাজুও বলল, আমার হার্ট আপনার জন্য বুক করা রইল।

আমি জানি, এসব প্রেমের ডায়ালগ। ধমক লাগালাম। যা যা, বাজে কথা বন্ধ কর। কাজ করতে চাইলে এখনই শুরু করে দে।

 

 

পাঁচ

 

পুষ্প বলল, ভেতরে পুরনো ফার্নিচারের রুমটা তাহলে খালি করুক।

প্রয়োজন নেই।

তাহলে কাজুও থাকবে কোথায়?

ঘরের বাইরে, দরজার সামনে মাদুর পেতে ঘুমাবে সাত দিন। কাজের মান ও পরিমাণ যদি সন্তোষজনক হয়, তাহলে অ্যাকোমডেশনের ব্যাপারটা চিন্তা করব।

পুষ্প বলল—বাবা, ইটস ইনহিউম্যান।

নো ফারদার টক, পুষ্প। সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি আমার এখনো ফুরায়নি। আর এই জাপানি ছোকরা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোন। আমি পান-সিগারেট, হুঁকা-জর্দা—এসব পছন্দ করি না। পানি ছাড়া অন্য কোনো রকম ড্রিংকও না। কোক, সেভেন আপ, স্প্রাইট, পেপসি—কোনোটাই না।

কাজুও বলল, মানুষ কেন সিগারেট খায় আমার ধারণা নেই। আমি টান দিয়ে দেখেছি, কাশি আসে। বাকি যা বললেন, আমি কখনো খাইনি, খাব না। আর কোক-পেপসি তো আমাকে কেউ বিনা পয়সায় দেবে না। আমাকে পয়সা দেবেন না।

আমি সতর্ক করে দিই, আমার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কখনো কোনো ফালতু আলাপ চলবে না, আমার তিন মেয়েকে যথাক্রমে বড় আপু, মেজো আপু আর ছোট আপু ডাকবি, আমার দুই ছেলেকে বড় ভাইজান ও ছোট ভাইজান ডাকবি। তোকে সবাই কাজুও ডাকবে, ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারলে জাপানি ডাকবে।

আপনি যে বলেছিলেন আবদুল ডাকবেন।

তা বলেছিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের নাম আবদুল খালেক। তিনি বিপদে-আপদে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে থাকেন। তোকে আবদুল ডাকলে আবদুল খালেক যদি কিছু মনে করেন, সে জন্য আবদুলটা বাদ দিলাম। আর আমার স্ত্রীকে কী ডাকবি সেটা সে-ই ঠিক করে দেবে।

স্যার, আপনাকে?

এখন যা ডাকছিস ঠিক তা-ই। স্যার।

ঠিক আছে, স্যার।

যেহেতু তোর বাবার দেশ জাপান বাংলাদেশের এক নম্বর ডোনার, সে জন্য ছেলে-মেয়েদের বলে দিচ্ছি, কেউ তোর সঙ্গে তুই-তোকারি করবে না। তুমি বলবে।

জি, আচ্ছা।

আরেকটা কথা শুনে রাখ, তুই যদি মনে করিস, তোকে বেতন দিয়ে আমাকে বাংলাদেশ সরকারের ঋণ শোধ করতে হবে, তাহলে ভুল করছিস। সাত দিন দেখি। খাওয়াদাওয়া পাবি। তারপর তোর কাজের ইভ্যালুয়েশন হবে। ভালো হলে একটা থাকার জায়গা পাবি, কিঞ্চিৎ হাতখরচও। ভালো না হলে সেদিনই বিদায়। পোষালে থাকবি, না পোষালে চলে যাবি। পুষ্পর মায়ের একটা কিডনি লাগবে। চা-মিষ্টি খাওয়ার জন্য কিছু দেব। এটা নিয়ে পরে কথা হবে।

কাজুও ইশিগুরো মাথা নুইয়ে হাঁটু জোড়া একটু নামিয়ে বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, স্যার। গাড়িতে যেমন স্পেয়ার চাকা থাকে, ভালো ব্র্যান্ডের শার্টে যেমন স্পেয়ার বোতাম থাকে, ও রকমই আপনার বাড়িতেও একজন স্পেয়ার মানুষ থাকা ভালো। কখন কার কী কাজে লাগে।

তুই আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস। তুই জাপানি বিদ্যাসাগর। তোর স্পেয়ার বিদ্যার গুষ্টি কিলাই। এই যে আমার ছেলে তৌফিক আর তৌহিদ—বল, কোনটা স্পেয়ার?

কাজুও বিনয়ের সঙ্গে বলল, দেখুন স্যার, আপনার সন্তান পাঁচটি না হয়ে যদি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো পনেরোটি হতো, আপনি একজনকেও স্পেয়ার ঘোষণা করতেন না। উনিশটি হলেও না। স্পেয়ার মানুষটিকে আসতে হয় বাইরে থেকে—সেই বাইরের মানুষটিকে আপনি যত পছন্দই করুন, তার জন্য আপনার যন্ত্রণা কম, ভালোবাসা কম, তার জন্য আপনার টেনশন কম। এত কিছু কম বলেই তার অধিকারও কম। টাকার জন্য সে কখনো আপনার গলা টিপে ধরবে না, পিস্তলের নলের মুখে অ্যাপার্টমেন্ট লিখে দেওয়ার কথা বলবে না, এমনকি এটাও বলবে না—জন্ম দেওয়ার সময় খেয়াল ছিল না?

তার এই জ্ঞান বিতরণের পরও আমি চুপ করে থাকি। সে তো ভুল কিছু বলছে না। কাজুও ধরে নিয়েছে, আমার পাঁচ সন্তান—পুষ্প, দোয়েল আর লীলাবতী, লীলার আসল নাম আলিফ লায়লা, ওদিকে তৌফিক আর তৌহিদ। কিন্তু আমি আমার আরেকটি কন্যার কথা জানি। ঢাকার সিনেমাজগতে এককালে সেলিব্রিটি শ্রাবন্তীর বড় মেয়ে নয়না আসলে আমারই, নায়ক শাহান শাহর নয়। নয়নাই আমার প্রথম সন্তান। কিন্তু শ্রাবন্তী তখন রোমান্টিক নায়ক শাহান শাহর স্ত্রী।

দোয়েল যখন বাসায় ঢোকে, তার সঙ্গে আরেকটি সুন্দর মেয়ে, মুনতাহা। দোয়েলের ক্লাসমেট, মেডিক্যালে থার্ড ইয়ার। পুষ্প সবে শুধু ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার।

দোয়েল দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পুষ্পর সঙ্গে কথা বলল, পিটপিট করে কাজুওর দিকে তাকাল। তারপর তার বান্ধবীর সামনে সরাসরি আমাকে চার্জ করল—বাবা, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই বয়সী একটা চালচুলোহীন বিদেশিকে বাসায় রাখতে চাইছ? আমি হোস্টেলে থাকলে, তুমি বাইরে থাকলে পুষ্প বাড়িতে একা। বিদেশি হলেই বদমাশ হবে না—এটা কেন মনে করছ?

কাজুও তার চরিত্রের ওপর এমন আচমকা আক্রমণের জন্য সম্ভবত তৈরি ছিল না। সে সরাসরি নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।

মুনতাহাও নিচু স্বরে বলল, দেখতেও তো বদমাশের মতো। লন্ডনে আমার ফুফার সাব-অর্ডিনেট জাপানি ব্যাংকার তার মেইল হ্যাক করে ওয়ান পয়েন্ট সেভেন ফাইভ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং আত্মসাৎ করেছে। অথচ জেল খাটছে আমার ফুফা।

দোয়েল একটুক্ষণ চুপ থেকে আবার গর্জে উঠল। বলল, ইমপসিবল। বাবা, এই জাপানিকে আমাদের বাড়িতে রাখা যাবে না। আমাকে ভুল বুঝো না। পুষ্প বলেছে, এর জন্ম নাকি নাগাসাকিতে। একবার চিন্তা করে দেখো, যে দুটি জায়গায় অ্যাটম বোমা পড়ে, নাগাসাকি তার একটি। ফর্টিফাইভের নাইন্থ আগস্ট ওই বোমাটা পড়ে। বোমার চেয়েও ভয়াবহ ছিল রেডিয়েশন। আমি নিশ্চিত, এই জাপানির শরীরে রেডিও-অ্যাক্টিভ এলিমেন্ট আছে। এসবের রেডিয়েশন থেকে নির্ঘাত ক্যান্সার। বাবা, তুমি এই জাপানিটাকে তাড়াতাড়ি সরাও। তুমি তো বাবা জীবনে কোনো দিন সায়েন্স পড়োনি। রেডিও-অ্যাক্টিভ পার্টিকলের রেডিয়েশন থেকে কী কী হতে পারে এবং ব্যাপারটা কত ভয়াবহ হতে পারে, এ সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই।

এটা ঠিক, আমার পড়াশোনা আর্টস নিয়ে। তা-ও খুব বেশি দূর নয়, কম বয়সেই বিস্কুটের ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিতে হয়েছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া তেজগাঁওয়ে অফিস। ফ্যাক্টরিতে যখন বিস্কুট তৈরি হতো, এর মিষ্টি একটা সৌরভ চারদিক মাতিয়ে রাখত, অনেক দূর থেকে এই সুবাসটা পাওয়া যেত। এই সুবাসই আমাকে বহুদিন, বহু বছর এই বিস্কুট কম্পানির চাকরিতে আটকে রেখেছে। এই যে সুঘ্রাণ, আমি ভাবতাম, এটাই বিস্কুটের রেডিয়েশন। আমি ঘ্রাণ শুঁকে বলতাম, এটা মিল্ক বিস্কুট, এটা ক্র্যাকার্স, এটা ওয়েফার আর বিশেষ ধরনের একটা ঘ্রাণ বেরোত ক্রিম বিস্কুট থেকে।

দোয়েল আবার বলে—প্লিজ বাবা! আমাদের কথা একটু ভাবো। তুমি কি দেখতে চাও আমরা ক্যান্সারে ধুঁকে ধুঁকে মরছি, রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়ার পর পুষ্পর মাথা ন্যাড়া হয়ে গেছে, লীলাবতী ভয়ে এ বাড়িতে আসছে না—যদি ওর পেটের বাচ্চা আক্রান্ত হয়।

কাজুও বলল—দেখুন, আমার জন্মের পঁয়তাল্লিশ কি ছেচল্লিশ বছর আগে নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা পড়ে। তখন এমনকি আমার মায়েরও জন্ম হয়নি। তার পরও আমাদের যাদের জন্ম হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকিতে, আমরা যখন অন্য দেশে যাই, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, আমাদের শরীরে যদি কোনো রেডিও-অ্যাক্টিভিটিজ থেকে থাকে, তা ডি-অ্যাক্টিভেটেড করা হয়। পাঁচ বছর বয়সে আমি যখন মা-বাবার সঙ্গে জাপান ছেড়ে ব্রিটেনে আসি, এই প্রক্রিয়া আমাদের ওপর চালানো হয়েছে। আমাকে নিয়ে আপনাদের ভয়ের কিছু নেই। তার পরও যদি সন্দেহ থাকে, আপনাদের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনকে বলুন, আমাকে পরীক্ষা করে দেখুক কিছু পায় কি না।

আমি দোয়েলকে শান্ত করার জন্য বললাম, তোর কথার অবশ্যই যুক্তি আছে। হয়তো সে রকম খারাপ কিছু—রেডিও-অ্যাক্টিভ না কী বললি, তার ভেতরে থাকতেও পারে, আমি শুধু সাহারা খাতুনের জন্য একটা কিডনির কথা ভাবছিলাম। আমি আমার স্ত্রীকে ছেলে-মেয়েদের সামনেও সাহারা খাতুনই ডেকে থাকি। দোয়েল আমাকে সম্ভবত একটু কম পছন্দ করে। বলল, তুমি কিডনির কথা ভাবতে থাকো। কিছুদিনের মধ্যে দুটিই অকেজো হয়ে যাবে, তুমি তখনো ভাববে। যখন মা মারা যাবে, তুমি ডেডবডি সামনে নিয়ে বলবে—আমি একটা কিডনির কথা ভাবছিলাম।

আমি বললাম, আসলে কাজুও বলেছিল, সে তোর মাকে একটা কিডনি দেবে। আমি তো সে জন্য ওকে রাখতে চেয়েছি, তা-ও ঘুমাবে আমাদের ঘরের বাইরে।

পুষ্প চোখমুখ কুঁচকে বলল—বাবা, ব্যাপারটা এত সোজা নয়। সবার আগে লাগবে ব্লাড গ্রুপ ম্যাচিং। যদি ম্যাচ করে, টিস্যু ম্যাচিং। রক্তের যেমন অনেক ধরনের গ্রুপিং, ঐখঅ-অ, ঐখঅ-ই, ঐখঅ-ঈ, ঐখঅ-উচ, ঐখঅ-উছ, ঐখঅ-ইজ—এসব হচ্ছে টিস্যুর গ্রুপিং। ঐখঅ হচ্ছে হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন। যে কিডনি দেবে আর যে তা নেবে, দুজনের রক্ত ও টিস্যুর গ্রুপিং একই হতে হবে। তা না হলে ডাক্তার অপারেশনই করবেন না। নন-ম্যাচিং কিডনিকে বডিই রিজেক্ট করবে। তা ছাড়া এই জাপানি ঝুঁকি নিয়ে কিডনি দিতেই বা যাবে কেন?

কাজুও মুখ খুলল—দেখুন, ম্যাচিং নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। এভাবেই আমরা তৈরি। ব্লাড এ পজিটিভ বি নেগেটিভ যা-ই হোক, আমরা হচ্ছি ও-এর মতো, ইউনিভার্সাল ডোনার। যেকোনো গ্রুপের রক্তের সঙ্গে আমার রক্ত ম্যাচ করবে। কিডনি, লিভার, হার্ট যা-ই বলুন, টিস্যুর ব্যাপারটা একই রকম। আমরা ইউনিভার্সাল ডোনার।

দোয়েল একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করে—ইমপসিবল।

কাজুও বলল, ওই সিনেমাটা দেখেছেন—‘নেভার লেট মি গো’, দারুণ, তাই না।

আমি বাংলা ছাড়া ভিন্ন কোনো ভাষার সিনেমা পুরোপুরি বুঝি না, তাই দেখিও না।

দোয়েল বলল, রাখো তোমার সিনেমার গল্প। বাবাকে পটিয়ে রাজি করানোর জন্য কত টালবাহানা!

পুষ্প বলল, ওয়ান্ডারফুল মুভি। ইউটিউবে আছে। ভেরি পেইনফুল অ্যান্ড শকিং লাভ স্টোরি।

প্রেম, ভালোবাসা—এসব শব্দ আমরা কখনো মুরব্বিদের সামনে উচ্চারণ করিনি। কিন্তু পুষ্প অবলীলায় লাভ, কিস, সেক্স—এসব শব্দ আমাদের সামনে বলে ফেলে।

 

 

ছয়

 

দোয়েল বিষয়টিকে এতটাই জটিল করে ফেলেছে যে কাজুওর এ বাড়িতে থাকার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারো চোখ ওঠার মতো তুচ্ছ রোগ হলেও দোয়েল বলবে কিংবা দোয়েলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অন্যরাও বলবে—এটা নাগাসাকির রেডিয়েশন ইফেক্ট। খুসখুসে কাশি, বদহজম, দাঁত ব্যথা, স্পন্ডেলাইটিস—সবগুলোরই পেছনের কারণ কাজুওর শরীরের রেডিও-অ্যাক্টিভ পার্টিকলস।

দোয়েলকেই বললাম, লীলাকে আসতে বল। মেয়েটার বিচার-বিবেচনাশক্তি ভালো। দেখি কাজুওর ব্যাপারে সে কী বলে।

আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে জোর দশ মিনিট। রিকশায় আসতে বা যেতে চাইলে ওঠানামাসহ পাঁচ মিনিট। দোয়েল বলল, বড় আপুর আসা ঠিক হবে না। তার পেটে বাচ্চা। রেডিয়েশন সবার আগে পেটের বাচ্চাকেই মারবে। তবু তুমি যখন বলছ, আমি লীলা আপুকে বলছি; কিন্তু সঙ্গে সতর্কও করে দেব, আসিস না, রেডিয়েশন। তোর পেটে বাচ্চা, ক্ষতি হবে। লীলার সাত মাস চলছে। গত মাসে আমাদের কাছাকাছি একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছে। উদ্দেশ্য দুটি—মায়ের খোঁজখবর নেওয়া এবং মায়ের বেলায়ও সন্তানসম্ভাবনা মেয়ের জন্য যতটা সম্ভব করা। আরো কাছাকাছি, আমাদের বাড়ি লাগোয়া ভাড়ায় নেওয়ার মতো অ্যাপার্টমেন্টও ছিল। কিন্তু এখনো যেটায় থাকছে সেটা পছন্দের, কারণ মালিক কায়সারুল জয় লীলার স্বামীর ক্লাসমেট, প্রায় দেড় বছরের জন্য দেশ ছেড়েছে ডেনমার্ক না নরওয়ে কোথায় যেন পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ করবে। লীলাদের বাড়িভাড়া লাগবে না, শুধু ইউটিলিটিজ বিলগুলো দেবে এবং সেই ভবনেই কায়সারের আরো পাঁচটা অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া ও ভাড়াটে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে, দরকার হলে হুন্ডিটুন্ডি করে অবৈধ পথে বন্ধুর কাছে এসব টাকা পাঠাবে।

দোয়েল যখন লীলাকে ফোন করছে, সেই স্বল্পকালীন বিরতিতে আমি আবার সেই চার কলামের একটিতে হালকা শেড করা একটি ছোট্ট বক্স বিজ্ঞাপন পড়ে ফেলি—

‘বন্ধ্যাত্বের কারণে তালাকপ্রাপ্ত ৫১ বছর বয়সী ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, সুদর্শন নারী, একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপকের জন্য অনূর্ধ্ব ৬০ বছরের উপযুক্ত পাত্র চাই। ঢাকায় পাত্রের বাড়ি থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। পাত্র সরাসরি যোগাযোগ করবেন।’

আমি দ্রুত নোট বইয়ে ফোন নম্বরটি লিখে ফেলি। একটি ফোন আমাকে করতেই হবে। আমি ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করব, পাত্রের বয়সটি যেন পুনর্বিবেচনা করেন। অনূর্ধ্ব ৬০-এর বদলে বয়সটা বরং অনূর্ধ্ব ৬৫ হোক। ৬০ আর ৬৫-তে তেমন ফারাক নেই, যৌন সক্ষমতা প্রায় একই রকম থাকে। এবার দেরি করা যাবে না। আমারই করা উচিত এমন অনেক নম্বর হাতের কাছে থাকার পরও আমি ফোন করিনি, অনেক মিস করেছি। কাজুও ব্যাপারটা ফাইনাল করেই আমি শুকতারাকে ফোন করব।

শুকতারা! শুকতারা আবার কে? প্রশ্নটা আমার, জবাবও আমার দেওয়া, ওই যে সুন্দর লম্বা ভদ্রমহিলা গর্ভধারণ করতে পারেননি বলে হাজব্যান্ড তালাক দিয়েছেন, তিনিই।

কলিংবেল বাজল। দরজা খুলল কাজুও। চিৎকার করে উঠল লীলাবতী। আরে আপনি কে? এখানে কী চান?

কাজুওকে উত্তর দিতে হয়নি।

পুষ্পই বলে—আপু, তোকে নিষেধ করেছি, তবু এসেছিস? আমি এই জাপানিটার কথাই বলেছি। ডেঞ্জারাস, ভেরি ডেঞ্জারাস! তোকে বলিনি রেডিয়েশন—র্যাডন রেডিয়েশন খুব ডেঞ্জারাস।

সে জন্যই তাড়াতাড়ি এসেছি। চুলায় ভাত ছিল, মাঝপথে গ্যাস বার্নার নিভিয়ে রিকশায় চলে এলাম। তোদের জাপানিটা কেমন করে রেডিয়েশন ছড়ায় তা দেখতে এসেছি। বেশিক্ষণ থাকব না, প্রসেসটা দেখেই চলে যাব। আতিকের ওপর মেজাজ একটু খারাপ আছে, ব্যাপারটা পরে বলব।

লীলা আমার ঘাড়ে দুটি চাপ দিয়ে জিজ্ঞেস করল—বাবা, তোমার স্পন্ডেলাইটিসের ঝামেলাটা এখন কেমন?

বললাম, আরেকটু টিপে দে। তুই ছাড়া ওরা কেউ আমাকে একটু ছোঁয়ও না।

আমার চোখ পড়ে খোলা নোট বইটার ওপর। তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিই। আমার ঘাড়ে হাত রেখে লীলা জাপানির সঙ্গে ইংরেজিতে কথোপকথনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, হোয়াই ডু ইউ স্প্রেড রেডিয়েশন এবং হাউ ডু ইউ ডু ইট?

দোয়েল বলল—আপু, ব্যাটা বাংলা বোঝে এবং বলতে পারে। তবে এসব সিলি কোয়েশ্চেন করবি না।

লীলা বলল, তাহলে কি জিজ্ঞেস করব জাপানকে সূর্যোদয়ের দেশ বলা হয় কেন? কিংবা সাধারণত কোন মাসে জাপানে চেরি ফুল ফোটে? নাকি পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন জিজ্ঞেস করব—হ্যালো মিস্টার জাপানি, রাষ্ট্রের টাকায় আপনাদের দেশে রাজা ও রাজপরিবার কেন পোষেন, জবাব দিন। রাজার তো কোনো ক্ষমতাই নেই।

আমাদের সবাইকে অবাক করে লীলাবতী কাজুর কাছে গিয়ে অনেকটা আলিঙ্গনের মতো করে তাকে আঁকড়ে ধরে বলে—এই জাপানি, আমার শরীরে একটু রেডিয়েশন দাও তো।

কাজুও ভ্যাবাচেকা খেয়ে তার হাতের বেষ্টনী থেকে বেরোতে চেষ্টা করে। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মেয়ে সম্পর্কে কাজুওর যে পড়াশোনা, তাতে কোনো ভদ্রঘরের মেয়ের তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরার কথা নয়। তবে যৌনকর্মী ধাঁচের কোনো নারী এমনটা করতেই পারে—এটা তার পেশাগত প্রস্তুতির অংশ। জাপানেও তা-ই।

লীলা কাজুওকে ছেড়ে দিয়ে তার হাতটা তুলে নিয়ে নিজের হাতের সঙ্গে ঘষে বলে—কই, কিছুই তো হচ্ছে না।

দোয়েল লীলার ওপর খেপে ওঠে—আপু, তুমি এসব কী শুরু করেছ? আতিক দুলাভাই বলে গেছে তোমার নাকি স্ক্রু ঢিলা হয়ে যাচ্ছে, এটা কি তারই লক্ষণ?

আতিক তাই বলেছে! বেশ। আজ রাতেই টের পাবে। লীলা বিড়বিড় করে বলল।

বিবাহিত মেয়েদের একটু বেশরম হতে সমস্যা নেই। বিবাহিতরা নিজেদের এবং পরস্পরের শরীর সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে বলে তাদের কৌতূহল ও শিহরণ কমে যায়। যেভাবে লীলা কাজুওকে ধরল, হাত ঘষাঘষি করল, আমার, পুষ্প কিংবা দোয়েলের তা পারার কথা নয়।

লীলা বলল—বাবা, তুমি একটু ভেতরে এসো তো, তোমার সঙ্গে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে। ওঠো তো, বাবা।

আমি নোট বইটা তুলে প্যান্টের পকেটে ঢোকাই।

লীলা সবাইকে বলে, ওনলি ফাইভ মিনিটস। জাপানিকে একটা গান শোনাতে বল, জাপানি লালাবি।

লীলাবতী দু-এক সপ্তাহ পর পর একটা না একটা পার্সোনাল কথা আমাকে শুনিয়ে যায়। সাহারা খাতুন যথেষ্ট ভালো না হলেও মেয়েদের তার ভাষায় ‘বাজে কথা’ শুনতে রাজি নয়। এসব শুনলে আশকারা পাবে, মাথায় উঠবে। লীলা দু-একবার মাকে পার্সোনাল কথা শুনিয়েছে, সাহারা খাতুন বলেছে, স্বামীরা এমনই হয়।

এটা ঠিক, লীলার সব পার্সোনাল কথাই আতিককে নিয়ে। একবার বলল—বাবা, এসিড কোথায় পাওয়া যায়?

আমি জিজ্ঞেস করি, কোন ধরনের এসিড?

লীলা বলল—বাবা, আমি তিন ধরনের এসিডের নাম জানি। নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড। কিন্তু কোনটা যে বেশি কাজের, তা তো জানি না।

কোন ধরনের কাজের জন্য?

ওই যে বাবা, এক ধরনের এসিড আছে না, গায়ে লাগলে চামড়া পুড়ে যায়, বিকৃত হয়ে যায়—ওই রকম এসিড।

বলিস কী! ওগুলো তো ডেঞ্জারাস। ওই রকম এসিড দিয়ে তুই কী করবি?

এমন কিছু না, বাবা। তুমি অকারণে দুশ্চিন্তা করছ। আমি তো আগে হাতে ভালো গ্লাভস পরে নেব।

তারপর?

বাবা, তারপর একটা সুন্দর মুখের ওপর ছুড়ে মারব।

আমি বলে উঠি, ও মাই গড! তুই এসব কী বলছিস! তোর কি কয়েক দিন ধরে ঘুম হচ্ছে না? ভালো ঘুম না হলে মাথায় এ রকম উল্টাপাল্টা চিন্তা আসে।

বাবা, তুমি ঠিক ধরেছ। রাতে এমনিতেই কম ঘুম হয়, যতটুকু হয় এর মধ্যে চারবার ঘুম ভাঙে। একবার হিসু পায়, সে কারণে আর তিনবার মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণে।

ঘুমটা দরকার। ভালো ঘুম হলে শরীরটাও ঝরঝরে থাকবে।

বাবা, ছোটবেলায় মা হাঁ করে ঘুমাত আর তুমি আমাকে অদ্ভুত একটা কাজ করে ঘুম পাড়াতে। এভাবে যে ঘুম পাড়ানো যায় তুমি কেমন করে আবিষ্কার করলে?

কিভাবে?

কাতুকুতু দিলে ঘুমন্ত মানুষও জেগে ওঠে। আর তুমি কাতুকুতু দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতে। তোমার একটা আঙুল আমার বগলের ভেতর থার্মোমিটারের মতো চেপে রাখতাম এবং ঘুমিয়ে পড়তাম। তুমি আঙুলটা টেনে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করলে আমার ঘুম ভেঙে যেত।

আমার তো তোর বগলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে না রাখলে ঘুম আসা দূরে থাক, একটা হাইও উঠত না।

ঠিক আছে বাবা, এবার কাজের কথায় আসি। তুমি আমাকে এক বোতল ওই রকম এসিড এনে দাও। আতিক যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু বাঁ দিকে কাত হয়ে উল্টো দিকের অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দার দিকে তাকাবে, তখন আমি পাশ থেকে গিয়ে আতিকের মুখের ডান দিকটাতে এসিড ছুড়ে মারব। তবে খুব সাবধানে, যাতে আমার গায়ে এসিডের ছিটেফোঁটা না পড়ে।

আতিককে কেন?

আতিককে না তো কাকে? আমার শ্বশুরের মুখে মারব? তিনি নিরীহ মানুষ, তাকে এসিড মারতে যাব কেন?

আতিককেই বা কেন?

ও যে দেখতে খুব সুন্দর। বাবা, আতিকের মতো একটা সুন্দর ছেলে আমাদের চেনাজানাদের মধ্যে কেউ কি আছে? তুমি এমন কারো কথা মনে করতে পারো?

না, মনে পড়ছে না। তোর জন্য যে কটা প্রস্তাব এসেছে বা আমরা খোঁজ নিয়েছি, দেখতে একজনও আতিকের ধারেকাছে আসার মতো নয়। এককথায় তাকিয়ে থাকার মতো ছেলে।

তুমি সত্যিই তাই বলছ?

হ্যাঁ, অবশ্যই।

তাহলে ফাহিমা সুলতানার তো কোনো দোষই নেই।

ফাহিমা সুলতানা কে?

বললাম না, উল্টো দিকের অ্যাপার্টমেন্টের জহির আহমেদের সেকেন্ড ওয়াইফ। ফার্স্ট ওয়াইফের সঙ্গে একটা বড় কিছু ঘটেছে।

বড় কিছু মানে?

কেউ বলে, জহির আহমেদের এক বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে গেছে; কেউ বলে, জহির আহমেদ নিজেই বউকে গুম করে ফেলেছে। তা সে যা-ই করুক, আমিও মনে করি, যেহেতু আতিক তাকিয়ে থাকার মতো একটি ছেলে, এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে ফাহিমা সুলতানা তার দিকে না তাকায়। একটাই উপায়—আতিকের চেহারাটা কুিসত করে দেওয়া। আমি প্রায় এক মাস ধরে মুখে জখম আছে এমন অন্তত ৪০ জন পুরুষ ও নারীর ওপর দূর থেকে সমীক্ষা চালিয়েছি। বাবা, তোমার তো মনে আছে, আমি রিসার্চ মেথডোলজির ওপরও একটা কোর্স করেছি। আমি পুরোপুরি সায়েন্টিফিক মাইন্ড নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখেছি, সবচেয়ে কুিসত চেহারা যার, সে এসিড ভিকটিম। ছেলেদের মধ্যে এমন কেউ নেই, দুটি মেয়ে আছে, দেখলে ভয় লাগে।

তুই কী বলছিস!

বাবা, আমার ডিসিশন ফাইনাল। এসিড মেরে আতিকের মুখের এমন অবস্থা করব, যাতে ফাহিমা সুলতানা দেখেই আঁতকে ওঠে। বাবা, তুমি আমার কাছে খুব ইজি সলিউশন পাবে।

সবার অজান্তে আতিককে রক্ষা করতে, আমার মেয়েকে কারাবাস থেকে বাঁচাতে একটা অরুচিকর কাজ করে ফেললাম। আমি এক সন্ধ্যায় জহির আহমেদের সঙ্গে দেখা করে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথাটা বললাম। জহির আহমেদ বললেন, বাহ্! বেশ তো। আমি তো ফাহিমাকে বিদায় করার একটা মওকা খুঁজছিলাম। ফাহিমা যদি আপনার মেয়ের হাজব্যান্ডের সঙ্গে চলে যায়, আমি আপনাকে ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করাব। তাহলে আংকল, বড় বাঁচা বেঁচে যাব। তখন আমিও একা, আপনার মেয়েও একা। আপনি যদি রাজি থাকেন, আমরা দুজন আমাদের সম্পর্কটা একটু এগিয়ে রাখতে পারি। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ—এই বলে জহির আহমেদ আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন।

আমি তাঁকে বদমাশ, হারামজাদা—এসব গাল দিতে দিতে বাড়ি ফিরে আসি।

পরদিন সন্ধ্যায় লীলা হাঁপাতে হাঁপাতে আমার কাছে এসে বলল—বাবা, কথা আছে। নিজেই দরজার ছিটকিনি বন্ধ করে দেয়। বলে—বাবা, তোমাকে যে একটা স্পেশাল এসিড দিতে বলেছিলাম, ওটা এখন আর লাগছে না। তবে কোথায় পাওয়া যায়, দাম কত পড়বে, এর সঙ্গে কোন ধরনের ঝুঁকি জড়িত—এসব ভালো করে জেনে রেখো। পরে কাজে লাগতে পারে।

আমি বললাম—লীলাবতী, তুই যখন আমাকে বলবি, আমি খোঁজ নেব না, তা কি হয়? এতে সালফিউরিক আর নাইট্রিক—দুটি এসিডই ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে সরাসরি এসিড নিয়ে দুটি আইন আছে : এসিড কন্ট্রোল অ্যাক্ট ও এসিড ক্রাইম কন্ট্রোল অ্যাক্ট। এসিড অপরাধের জন্য ২০০২ সাল থেকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ধার্য করা হয়েছে। অননুমোদিত এসিড পরিবহনের শাস্তি অনেক বড়। আমিও তাই ভাবছিলাম, তোর জন্য এসিডটা নিয়ে আসার পথে যদি ধরা পড়ি, রিমান্ডে নিয়ে আমাকে যে মার দেবে, তারপর আমার কেস হয়তো আদালত পর্যন্ত গড়াবে না। তার আগেই চোখ উল্টে জিহ্বা বের করে ফেলব। একটা সুবিধা কি জানিস? যেকোনোভাবেই হোক, রায়ের আগে মরে গেলে আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে লীলাবতী, আমি কী ঠিক করেছিলাম জানিস? আমাকে যদি পিটিয়ে আধমরাও করে ফেলে, আমি কোনো দিনই তোর নাম বলতাম না। রিমান্ডে যে কী কষ্ট, তা তুই সহ্য করতে পারতি না।

আমার কথা শুনে লীলাবতীর চোখ ছলছল হয়ে ওঠে। বলে—বাবা, তুমি আমার জন্য এত মার সহ্য করলে!

 

 

সাত

 

কী বলিস, মার সহ্য করিনি, করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

লীলাবতী আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে—বাবা, এসিড আনতে হবে না। কী হয়েছে বলতে পারব না। জহির আহমেদ সাহেবের বাড়ির বারান্দায় একেবারে ছাদ পর্যন্ত পাতলা টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। একটু আগে বারান্দায় গিয়ে দেখে তো আমি অবাক—এ বারান্দা থেকে যেমন কিছু দেখা যায় না, ও বারান্দা থেকেও এদিকে কিছু দেখা যাবে না।

তাই নাকি? আমি জিজ্ঞেস করি।

এ জন্যই তো দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছি। বাবা, আল্লাহ তোমাকে একটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। আমি ভাবতেই পারি না, তুমি বোতল ভর্তি এসিডসহ ধরা পড়েছ আর পুলিশ তোমাকে উপুড় করে শুইয়ে চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে। কী টেরিবল!

আমি কাজুওর বিষয়টি ফাইনাল করতে লীলাকে ডেকেছি। আমার বিশ্বাস, কিডনির ব্যাপারটা শুনলে এমনিতেই ওর মন নরম হয়ে যাবে। নিজে থেকেই দোয়েলকে ধমক দিয়ে বলবে, তোর এত রেডিয়েশনের ভয় থাকলে তুই হোস্টেলেই থাকিস, মাঝে মাঝে আমার বাড়িতে আসিস। দরকার হয় তোর জন্য বাবাকেও এখানে ডেকে আনব।

কিন্তু ওদিকে না গিয়ে লীলাবতী বলল—বাবা, গত রাতে আতিক বাসায় ফেরেনি, কিছুক্ষণ আগে ফোন করে বলল, আজ রাতেও ফিরবে না। কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমির রেস্টহাউসে আছে। একটা ট্রেনিং চলছে। ওকে ট্রেনার হিসেবে কাজ দিয়েছে, কুড়ি হাজার টাকা দেবে। টাকাটা ইউএনডিপির।

আমি বলি—বেশ তো, তাতে সমস্যাটা কোথায়। আজকাল তো শুনেছি, পোস্ট ডিনার ট্রেনিং সেশনও থাকে। দুদিন-তিন দিন না আসে না আসুক। তোর খারাপ লাগলে বাসায় চলে আসবি কিংবা আমাকে ফোন করে দিলে আমি প্রেসারের ওষুধ আর থাইরক্সিন ট্যাবলেট নিয়ে তোর বাসায়ই চলে যাব। দু-এক রাত থেকে আসতে আমার কোনো সমস্যা নেই। শুধু রাতের বেলা টিভির টক শোগুলো আমাকে দেখতে দিস। গাঁজাখুরি জিনিসও দেখতে দেখতে দেখার নেশা হয়ে যায়। আহাম্মকগুলো যে তাদের চেয়ে বড় একটা আহাম্মককে সঞ্চালক হিসেবে বসিয়ে দুনিয়ার যত্ত সব আজগুবি কথা বলে যায়, চাপাবাজির প্রতিযোগিতা করে, আমার কিন্তু দেখতে ভালোই লাগে।

লীলাবতী আমাকে ধমক দেয়। বাবা, তুমি এত কথা বলো কেন? কোথায় আমি নিজের কথাটা বলব, আর তুমি শুরু করে দিলে আরেকটা টক শো।

স্যরি মা, ওরা দুজন তো আমার কথা শুনতেই চায় না, তোকে তাই কাছে পেলে বলতে ইচ্ছা করে, বলি। এখন বল সমস্যাটা কী? আতিক কুমিল্লা বার্ডের রেস্টহাউসে আছে, এই তো।

লীলা বলল, এটা আমার জন্য কখনো সমস্যা হতো না, যদি না তিন দিন আগে থেকে চারতলার অ্যাপার্টমেন্ট ‘সি’র ডিভোর্সি নায়লা খাস্তগিরের দরজায় তালা মারা থাকত। আমি এক ঘণ্টা আগেও নিজে চেক করে এসেছি।

কী নাম বললি, লায়লা দস্তগির ডিভোর্সি বলে কি বাড়ির বাইরে কোথাও যেতে পারবে না?

বাবা, আগে নামটা ঠিক করো—লায়লা নয়, নায়লা; দস্তগির নয়, খাস্তগির। শুধু বাড়ির বাইরে কেন, দেশের বাইরে গেলেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না। আমার সন্দেহ হচ্ছে, নায়লা খাস্তগির আতিকের সঙ্গে কুমিল্লা বার্ডের রেস্টহাউসে আছে।

তুই না বললি এই মহিলা তিন দিন ধরে নেই আর আতিক গেছে দুদিন আগে। সময়ের হিসাবে তো মেলে না। তা ছাড়া চাকরির কারণে আমাকেও তো কত রাত ঢাকার বাইরে থাকতে হয়েছে। তোর মা চাইলে কত রকম সন্দেহ করতে পারত।

লীলাবতী বলল—বাবা, তুমি এমপাওয়ারমেন্ট পড়োনি? সন্দেহ করতে গেলেও এমপাওয়ার্ড হতে হয়। মার তা ছিল না, তাই সন্দেহ করেনি। মানলাম, কাজের জন্য তোমাকেও ঢাকার বাইরে রাত কাটাতে হয়েছে। কিন্তু তুমি আর আতিক এক কথা হলো? তোমাদের সময় ফ্যামিলি ভ্যালুজ ছিল, তোমাদের সময় মেয়েরা পুরুষ মানুষের গায়ের ওপর আছড়ে পড়েনি। কাজেই তোমার সঙ্গে এটা মেলাতে চেষ্টা কোরো না। আর তিন দিন ও দুদিনের যে অঙ্ক করলে, এর কোনো মানে নেই। আতিক হয়তো নায়লা খাস্তগিরকে বলেছে, তুমি এক দিন আগে চলে যাও, নইলে আমার স্ত্রী লীলাবতী সন্দেহ করবে।

মানলাম, তোর কথা ঠিক। কিন্তু তোর সন্দেহ করার কারণটা কী? এমন কিছু কি করেছে, যা এ রকম ইঙ্গিত দেয়, যেমন—ঘন ঘন ওই মেয়েটির অ্যাপার্টমেন্টে যায়, গিয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটায়।

বাবা, আতিক এত বোকা নয়। ওর তো এটা জানা আছে, আমি হুট করে নায়লা খাস্তগিরের কলিংবেল টিপে জোর করে ভেতরে ঢুকে এখানে-ওখানে সার্চ করে ওকে খুঁজে বের করে ফেলতে পারি। আসলে শরীরটা যত বড়ই হোক, আতিক মানুষটা কিন্তু ভীতু টাইপের। আমার ভয়ে আমার ত্রিসীমানার ভেতর কিছু করবে না, সেটা আমি নিশ্চিত।

আমি বললাম—লীলা, তুই অনেক কথা বললি। তোর সন্দেহের কারণটাই বললি না।

বাবা, তাহলে শোনো, দুই সপ্তাহ আগে লিফটের দরজায় আমাদের সঙ্গে নায়লা খাস্তগিরের দেখা। আতিকের ওপর চোখ পড়ার পর নায়লার চোখের তারা নাচছিল। এটাই তো সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। আতিকের চোখে তুই গ্রহ-নক্ষত্র কিছু দেখিসনি?

বাবা, তুমি আতিককে চেনো না। ও ইমোশন লুকিয়ে রাখতে জানে, কাজেই ওর চোখের দিকে তাকালে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ঠিক আছে, আমরা একটু ওয়াচ করি। তুইও লায়লা দস্তগিরের চোখের তারার নাচনটা ভালো করে দেখ।

বাবা, নামটা ঠিক করে বলো—নায়লা খাস্তগির।

বেশ, ঠিক করে বললাম। আরো বললাম, দেখিস, কাল সন্ধ্যার মধ্যে আতিক চলে আসবে। মেয়েটা হয়তো আসবেই না।

ঠিকই বলেছ, নায়লা খাস্তগিরকে বলবে—মাই লাভ, তুমি এক দিন পরে এসো, নইলে জানোই তো, লীলাবতী বুঝে ফেলবে।

ঠিক আছে, এটাও না হয় দেখি। আমরা তো পরেও সিদ্ধান্ত নিতে পারব।

তোমার কথা আপাতত মেনে নিলাম। কাল সন্ধ্যার দিকে তুমি আমার বাসায় থাকবে। ও যদি কাল আসেই, আমরা ওকে ইন্টারোগেট করে সত্যটা বের করব। এসো, এবার তোমাদের জাপানি প্রসঙ্গটা শেষ করি।

লীলাবতী আর আমি ফিরে আসি।

লীলা এসেই কাজুওকে জিজ্ঞেস করে—তোমার পুরো নাম?

কাজুও ইশিগুরো।

আচ্ছা, তুমি তাহলে কাজুবাদাম। তোমার মাথায় কোনো সমস্যা নেই তো? তুমি আমেরিকা না গিয়ে বাংলাদেশে আসতে গেলে কেন? তুমি ইশিগুরো, না ইশিগরু?

আপনি আমাকে কাজুবাদাম বলতে পারেন, ইশিবলদও বলতে পারেন। আমার মাথায় কোনো সমস্যা নেই। আমি চাইলেই আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ আমার ছিল না, কারণ আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে বাংলাদেশ।

তুমি কি আরাইয়ামাকে চেনো?

কোন আরাইয়ামা?

মাথা খারাপ আরাইয়ামা। বাংলাদেশে এসে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। ওর খোঁজে বড় বোন জাপান থেকে এসেছিল, পায়নি।

আমার খোঁজে কারো আসার সম্ভাবনা নেই।

লীলাবতী বলল, জাপানিরা অবশ্য বউ খুনটুন করে পালিয়ে বেড়ায় না। না হলে ও রকম একটা কিছু ভাবতাম। একটা কাজ করলেই হয়, স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা এনএসআইকে দিয়ে ওর সম্পর্কে একটা রিপোর্ট আনিয়ে নিলেই হয়। পুষ্প সবার ছোট হলেও চোখ-কান বেশ খোলা রাখে। বলল, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঝামেলা বাড়িয়ো না। পরে দেখা যাবে, জাপানি অপহরণ ও আটক নামে এক মামলা হয়েছে। তাতে বাবা এক নম্বর আসামি, আমি দুই নম্বর।

আমি বললাম, কথা ঠিক। আমরা আপাতত একটা কিডনি নেওয়া পর্যন্ত ওকে রাখার সিদ্ধান্ত নিই।

আবার দোয়েল মুখ খোলে। তোমার যা ইচ্ছা তা-ই করো। রেডিয়েশনের কথা যদি বাদও দিই, এমনও হতে পারে, এই জাপানি ওদের দেশের বেসিক ব্যাংক লুট করে সব টাকা সুইজারল্যান্ড কিংবা পানামায় পাচার করে দিয়েছে। কিছুদিন গাঢাকা দিয়ে থাকার জন্য এখানে চলে এসেছে। দেখবে, পাঁচ-দশ দিনের মধ্যে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি হবে। বাবাকে ধরে নিয়ে যাবে গুয়ানতানামো প্রিজনে।

পুষ্প বলল, দোয়েল আপু নিউজপেপার পড়ে না, খবরও রাখে না। শুধু বাবা আর আমি নিউজপেপার পড়ি। গুয়ানতানামোর প্রিজন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই না, বাবা?

আমি এমনভাবে মাথা নাড়ি, এর মানে হ্যাঁ হতে পারে, না-ও হতে পারে। আমি আসলে এ রকম কোনো খবর পড়িনি। পুষ্পকে কী করে বলি যে আমার পড়া শুধু পাত্র চাই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। একজন কম বয়সী মহিলা মন্ত্রী নাকি তার এপিএসের প্রেমে পড়েছে—এ রকম একটা রসালো সংবাদও আমি উপেক্ষা করেছি।

আবার বেল বাজে। দরজার কাছাকাছি ছিল লীলাবতী। সে-ই খোলে। একসঙ্গে দুই ভাই—তৌহিদ ও তৌফিক ঢোকে। তৌহিদ খালি গা, হাফপ্যান্ট পরা, কাঁধে ব্যাগ, টেনিস র্যাকেট; তৌফিক ট্র্যাকস্যুটে। শুক্র-শনি দুদিন দুজনের একজন টেনিস, অন্যজন লং ডিস্ট্যান্স দৌড় নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

ঘরে বিদেশি দেখে দুজনই অবাক হয়। বিদেশি আবার তাদের তিন বোন পরিবেষ্টিত।

তৌফিক শুরুতেই তার পাণ্ডিত্য দেখাল। বিদেশিকে জিজ্ঞেস করল—

দি শি শেই? হু আর ইউ?

ওয়া শি কাজুও ইশিগুরো।

তা কোথায় বাড়ি? গুয়াংজু?

আমি চায়নিজ নই। আমি জাপানি। তবে চায়নিজ ভাষা জানি।

কিন্তু তুমি যে চীনা ভাষায় জবাব দিলে?

আপনি বাংলায় জিজ্ঞেস করলে বাংলায় জবাব দিতাম।

তৌফিক বলল, দোনাতা দেসুকা—এটা কে?

বিদেশি হেসে জবাব দিল, কাজুও ইশিগুরো।

পুষ্প বিশেষ করে তৌফিকের সম্পর্কে কাজুওকে বলল, আমার ছোট ভাই হারুকি মুরাকামির মতো দৌড়ায়। সপ্তাহে ছয় দিন। শুক্র-শনি সকালে, রবিবার বাদে বাকি চার দিন বিকেলে।

কাজুও জিজ্ঞেস করে, মুরাকামির ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’ বইটা কি তিনি পড়েছেন?

তৌফিক নিজেই জবাব দেয়, ট্র্যাশ। সব ফিকশনই ট্র্যাশ। এগুলো হচ্ছে বানিয়ে বানিয়ে লেখা মিথ্যা গল্প। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’, এমনকি ‘লেডি চ্যাটার্লিস লাভার’ চেষ্টা করে দেখেছি—সব ট্র্যাশ। আমার এত সময় নেই। যেটুকু সময় পাই, দৌড়াই।

নিজেকে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে রেখে পুষ্প দুই ভাইকে কাজুও সম্পর্কে একটা ব্রিফিং দেয় এবং দোয়েলের আপত্তির কথাও জানায়। তৌহিদ বলে, দোয়েল ঠিকই বলেছে, জাপানির বাচ্চা তো সিরিয়াল কিলারও হতে পারে। ভালো করে চেহারাটা দেখো, কী ইনোসেন্ট ফেস—সিরিয়াল কিলারদের এমন নিষ্পাপ চেহারা হয়? হয়তো বাবাই ওর নেক্সট টার্গেট।

আমি জিজ্ঞেস করি, আমাকে মারার মোটিভেশন সে কোথায় পাবে? অবশ্য তোরা যদি আমাকে বিদায় করে দিতে চাস, তাহলে আমাকে মারার জন্য জাপানিটাকে ব্যবহার করতে পারিস।

তৌহিদ বলল—বাবা, এটার মোটিভেশন ভিন্ন এবং তা নিজের ভেতরেই। এটা ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের রান নেওয়ার মতো। ৪৯ রান হয়েছে, আর ১ রান নিতে পারলে হাফসেঞ্চুরি হবে। কিংবা ৯৯ হয়েছে, আর মাত্র ১, তার পরই সেঞ্চুরি। এই ব্যাটাও হয়তো মনে করছে, বাবাকে শুইয়ে দিয়েই সেঞ্চুরিটা পুরো করবে।

 

 

আট

 

লীলাবতী ধমকে ওঠে, বাবাকে নিয়ে আর একটা বাজে কথাও শুনতে চাই না। বাবাকে দিয়ে কেন সেঞ্চুরি করবে? মারতে হলে ভাইজানকে মারবে, ছোট ভাইয়াকে মারবে।

দুজনই লীলার বড়। তৌহিদ তাদের ভাইজান এবং তৌফিক ছোট ভাইয়া। তৌহিদ বলল, কোবে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে স্টেশনে বোমা মেরে যে লোকটা পালিয়েছে, এখনো তার সন্ধান মেলেনি। সে নয় তো?

তৌফিক বলল, এই জাপানিটার বদলে একটা জাপানি মেয়ে আনানো যায় না? ভাইজানের জন্য খুব ইন্সপায়ারিং হতো। মেয়েটাকে মডেল হিসেবে কাজে লাগাতে পারত, আবার ভালো লেগে গেলে বিয়েও করে ফেলতে পারত। জাপানি মেয়েরা বেস্ট ওয়াইভস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। আর বাঙালি ছেলেরা বেস্ট হাজব্যান্ডস। জাপানি মেয়ে আর বাংলাদেশি ছেলে মিলে পারফেক্ট কাপল হতে পারে।

তৌহিদ বলল, তাহলে তোরা ওই শালাকে বল, ও ফিরে গিয়ে ওর বড় বোনকে পাঠিয়ে দিক। থাকতে চাইলে সে আমার শালা হিসেবেই থাকুক।

পুষ্প হেসে ওঠে। বলে, কোথায় রেডিয়েশনের ভয়ে আমরা তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি আর এখন আত্মীয় বানাচ্ছ। ভালোই, তাহলে কাজুও আমারও বেয়াই হচ্ছে। বেয়াইদের সঙ্গে একটু রসিকতা করাই যায়।

তৌহিদ বলল, বেশ। ও যদি আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কাজগুলো করতে পারে থাকুক। ফিউজ হওয়া বাল্ব লাগানো, ফ্যানের ঝুল পরিষ্কার করা, ফ্লাশ নষ্ট হয়ে গেলে কমোড মিস্ত্রি ডেকে আনা, টুকটাক ফুটফরমাশ খাটা। থাক বাবা, রেডিয়েশনের ভয় থাকলেও থেকে যাক।

তখনই লীলাবতীর ফোন বেজে ওঠে। রিংটোনে রবীন্দ্রনাথের গান—‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা’।

লীলা ফোন ধরে কঠিন স্বরে বলে, আমি কোথায় মানে? তুমি কোথায়? আচ্ছা আসছি। না থাক, তুমি চলে এসো, বাবার বাসায়। একটা জাপানি গৃহভৃত্য মানে কাজের ছেলে এসেছে, দেখে যাও।

লীলা ফোন রেখে বলল—বাবা, ও আসছে। আতিক কুমিল্লা থেকে চলে এসেছে, তুমি ঠিকই বলেছিলে।

ক্ষুব্ধ দোয়েল দেখল, একে একে সবাই গৃহভৃত্য হিসেবে কাজুওকে রাখার পক্ষে চলে যাচ্ছে। তার প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তবু বলল, আমার যা বলার স্পষ্টই বলে দিলাম। রেডিও-অ্যাক্টিভ রেডন কী করতে পারে, তোমাদের কোনো ধারণা নেই। ধারণা হবে, কিন্তু তত দিনে ভয়ংকর সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি চললাম, আমি আর এ বাড়িতে আসছি না।

দোয়েল হুট করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। খোলা দরজায় ঢুকল আতিক। আমাকে অবাক করে লীলাবতী আতিককে প্রায় আলিঙ্গনের মতো করে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করে—জান, কেমন আছ? ওখানকার খাওয়াদাওয়া কেমন?

আতিক তার ব্যাগ থেকে এক কেজি রসমালাইয়ের একটি বাটি আমার সামনে রেখে বলল—বাবা, আপনি খাবেন, কুমিল্লার রসমালাই, খুব ফেমাস। যাদের সুগার প্রবলেম আছে তারাও খায়, কোনো সমস্যা হয় না।

পুষ্প আতিকের সঙ্গে কাজুওর পরিচয় করিয়ে দেয়। দুলাভাই, এদিকে তাকান, এই হচ্ছে মিস্টার কাজুও ইশিগুরো। তিনি কিন্তু চায়নিজ কিংবা কোরিয়ান কিংবা ভিয়েতনামি নন; কাজুও জাপানি। বাবা তাঁকে ডমেস্টিক হেল্প হিসেবে নিয়োগ করেছেন, তবে তিনি আমাকে জাপানি ভাষাও শেখাবেন। প্রথম সাত দিন ঘুমাবেন ঘরের বাইরে, কাজকর্ম বাবার পছন্দ হলে ঘরে কোথাও শোবার ব্যবস্থা করা হবে।

কাজুও বারবার উচ্চারণ করল, কানসা সিতে ইমাসু।

আতিক বলল, কাকই তানাকা কী বলছে?

লীলা বলল, কাকই তানাকা?

আমি একজন জাপানির নামই জানি, কাকই তানাকা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

কাজুও বলল, আমি বলেছি যে আমি খুব কৃতজ্ঞ, আই অ্যাম ভেরি গ্রেটফুল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তৌফিক, তৌহিদ, আতিক ও লীলাবতী মিলে কাজুওর জন্য প্রযোজ্য একটা কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করে ফেলল। লীলা তার আগে আতিকের পকেট থেকে একটা পাঁচ শ টাকার নোট বের করে পুষ্পর হাতে দিয়ে বলল—যা, কুড়িটা পরোটা এক শ টাকা আর বাকি টাকার মাংস, ডাল-ভাজি যা পাস নিয়ে আয়। সবাই নাশতা করব। পুষ্প যখন খাবার নিয়ে ফিরে এলো, তখন কাজুওর জন্য তৈরি করা কোড অব কন্ডাক্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে—

ক. জাপানি গৃহভৃত্য কাজুও ইশিগুরো গৃহকর্তা এবং তাঁর স্ত্রী সাহারা খাতুনকে যথাক্রমে স্যার ও মা সম্বোধন করবে।

খ. তৌহিদকে ভাইজান, তৌফিককে ছোট ভাইয়া, লীলাকে বড় আপু, দোয়েলকে মেজো আপু ও পুষ্পকে ছোট আপু সম্বোধন করবে এবং আপনি বলবে।

গ. গৃহকর্তা এবং তাঁর স্ত্রী তাকে তুই, তুমি যা ইচ্ছা বলতে পারেন; কিন্তু অন্যরা তাকে তুমি বলবে।

ঘ. জাপানি গৃহভৃত্য কোনো ধরনের ধূমপান, নেশাদ্রব্য গ্রহণ, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি সেবন করতে পারবে না। শুধু হালাল দ্রব্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করবে।

ঙ. হাফপ্যান্ট, শর্টস ইত্যাদি পরতে পারবে না, তাকে তৌফিক ও তৌহিদের পুরনো প্যান্ট, ট্রাউজার, লুঙ্গি ইত্যাদি সরবরাহ করা হবে।

চ. জাপানি গৃহভৃত্য কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে নিজেকে জড়ালে এবং তা প্রমাণিত হলে তাত্ক্ষণিকভাবে তাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে।

ছ. এই বাড়িতে তার কোনো পুরুষ বা নারী বন্ধু প্রবেশ করতে পারবে না।

জ. অসুস্থ মিসেস সাহারা খাতুনের আরাম-আয়েশের দিকে তাকে মনোযোগী হতে হবে।

সবার নাশতা করা শেষ হলে লীলাবতী মাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বসার ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং একটি জাপানি যুবককে তাদের বাড়িতে গৃহভৃত্য হিসেবে নিয়োগদানের সংবাদ শোনায়।

ফরসা গায়ের রং কাজুওকে দেখে আমার স্ত্রী সাহারা খাতুন তাকে সালাম দেয়—আসসালামু আলাইকুম। আপনি ভালো আছেন? আপনার আম্মা কেমন আছেন?

 

নয়

 

সাহারা খাতুনের জন্য উপযুক্ত মূল্য দিয়ে কিডনি কেনার জন্য দেশের সর্বাধিক পঠিত পত্রিকায় যথেষ্ট পয়সা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। সাহারা সবচেয়ে দুর্লভ ব্লাড গ্রুপের মানুষ—এবি নেগেটিভ। একটিমাত্র সাড়া পেয়েছিলাম, সাড়াদাতা আবদুল কুদ্দুস স্বীকার করেছে—সে মূলত একজন দালাল, কিডনির দাম যা-ই হোক এ নিয়ে তার কোনো কথা নেই; কিন্তু আমরা যদি পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে এক লাখ টাকা দিই, তাহলে সে কিডনির সন্ধানে বের হবে। আমি পঞ্চাশ হাজার দিতে চাইলে সে জানায়, বি পজিটিভ ব্লাড গ্রুপের মানুষের জন্য সে পঞ্চাশ হাজারের বেশি পেয়ে থাকে। এবি নেগেটিভ হচ্ছে রেয়ার গ্রুপ। মানুষ খুঁজে বের করতেই তার কুড়ি হাজার টাকা লেগে যাবে।

শেষ পর্যন্ত পঁচাত্তর হাজার টাকায় তাকে রাজি করাই। টাকা দেব কিডনি ডোনারের সঙ্গে চুক্তির পর। প্রায় এক মাস ধরে দু-এক দিন পর পরই আবদুল কুদ্দুসকে ফোন করি। কুদ্দুস জানায়, খোঁজ চলছে। সাতাশতম দিনে বলে, খোঁজ মিলেছে। এবার সে পঁচিশ হাজার টাকা আগাম চায়। ছেলে-মেয়ে, এমনকি সাহারা খাতুনও আগাম দিতে রাজি নয়। আমি বলে দিই, নো অ্যাডভান্স, দরকার হয় আরো পাঁচ হাজার দিয়ে আশি হাজার করে দেব।

ত্রিশতম দিনে কুদ্দুস নিজেই ফোন করে বলল, আপনার স্ত্রীর কপালে কিডনি নেই। বাড্ডার ইয়াসিন মিয়া তাঁর বোনের জন্য এই কিডনি নিয়ে নিয়েছেন। তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আগাম দিয়েছেন। কিডনি প্রতিস্থাপন হয়ে গেলে বাকি পঞ্চাশ হাজার দেবেন।

আমিও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি—কপালে না থাকলে আর কী করা, শুধু আমাকে এটা বলো, কিডনির দাম পড়ছে কত?

কুড়ি লাখ থেকে পঁচিশ লাখের মধ্যে।

আমরা ঠিক করেছি আবার বিজ্ঞাপন দেব সব গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায়। আশুলিয়ায় সাড়ে চার লাখ টাকায় কেনা একটা জমির এখন দাম উঠেছে পঁয়ষট্টি লাখ। বিক্রি চূড়ান্ত হয়ে এসেছে। যত টাকাই লাগুক, সাহারা খাতুনের কিডনি প্রতিস্থাপন করাবই।

ঠিক এমন সময়ই কাজুওর আবির্ভাব।

কাজুওর কিডনি সাহারার কিডনির সঙ্গে ম্যাচ করবে—এটা ঠিক বিশ্বাস করে নয়, সে যখন বলেছে, চেষ্টা করে দেখতে সমস্যা কী—এ রকম একটা মনোভাব নিয়েই আমার এগোনো। না হলে এই বয়সী একটা যুবককে গৃহভৃত্য হিসেবে রাখার কথা নয়। আমার মেয়েদের সম্ভ্রম, গোপনীয়তা নিয়ে আমি নিস্পৃহ এমন নয়, এমনকি দোয়েল যে রেডিয়েশনের ভয় দেখিয়েছে, আমি সেটাও একেবারে উড়িয়ে দিইনি। আমি ব্যাপারটা এভাবেই নিয়েছি, কাজুও যেমন বলেছে গাড়ির জন্য স্পেয়ার চাকা, বাড়ির জন্য স্পেয়ার মানুষ। কখন কে কী কাজে লাগে কে জানে।

কাজুও এককাপড়ে আসা মানুষ, ঘিয়ে রঙের ফুলপ্যান্ট আর আকাশনীল শার্ট। প্যান্ট-শার্ট দুটি কোঁচকানো, তবে ময়লা নয়। একটা পলিথিন ব্যাগের ভেতর ব্যক্তিগত আরো কিছু জিনিসপত্র।

কাজুও কাজে লেগে গেছে। বাইরে থেকেই শুরু। আমার বাড়িটা ডিআইটি আমলের পাঁচ কাঠার প্লট। চারপাশে জায়গা ছেড়ে প্রায় আড়াই হাজার স্কয়ার ফিটের ওপর একতলা বাড়ি। টাকা-পয়সায় কুলোতে পারিনি বলে দোতলা করা হয়নি, শুধু একটা চিলেকোঠা আছে। এখন মনে হচ্ছে, দোতলা না করেই ভালো হয়েছে। বেশ কটি নামি ডেভেলপার কয়েক বছর ধরে ঘুরঘুর করছে। বেশিদিন এভাবে ফেলে রাখা যাবে না। আশপাশের বাড়িগুলো পুরনো কয়েকটি ছয়তলা, নতুনগুলো দশ থেকে চৌদ্দতলা। দুপুরে আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে খেলেও কাজুও পাশে ফ্লোরে বসে খেয়েছে এবং বলেছে, ডাল-ভাত তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার।

পুষ্প অবশ্য বলেছে, চেয়ারে বসে খেলে সমস্যা কী? আমি পুষ্পকে বলেছি, বাংলাদেশি কাজের ছেলে বা বুয়াকে ডাইনিংয়ে বসিয়ে খাওয়াবি কি না বল?

পুষ্প আর কথা বলেনি।

খাবার টেবিলেই আমার ফোন বাজে। হ্যালো শুনেই বুঝি নারী কণ্ঠ। বলি, আমি লাঞ্চে বসেছি, আধাঘণ্টা পর কলব্যাক করব। থ্যাংক ইউ। সাহারাকে খুব মেপে খেতে হয়। মিরপুর কিডনি ফাউন্ডেশনে সপ্তাহে দু-একবার নিয়ে যাই। আমি তেমন বেরোই না। বেশির ভাগ সময়ই এই কাজটা করে থাকে লীলাবতী। কখনো কখনো আতিকের অফিসের গাড়িতে লিফট নেয়।

রেয়ার ব্লাড গ্রুপের রোগীদের নিয়ে সমস্যা, চোখে চোখে রাখতে হয়। আমি এবি নেগেটিভ গ্রুপের দুজন মাত্র মানুষ দেখেছি—সাহারা খাতুন আর আমাদের ছোট ছেলে তৌফিক।

সাহারাকে হুইলচেয়ারটা দিয়েছে আতিক। এটা কেনা হয়েছিল তার বাবা মানে লীলাবতীর শ্বশুরের জন্য। কিন্তু এই চেয়ারে তার ছয়-সাত দিনের বেশি বসা হয়নি। বেয়াই সাহেব পুলিশের রিটায়ার্ড ডিআইজি এই চেয়ার থেকে হুমড়ি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে যান। তার পরই অজ্ঞান। একুশ দিন কোমা ও তিন দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। আতিক শাশুড়িকে দেয়াল ধরে ধরে হাঁটতে দেখেছে। বাবার মৃত্যুর পরদিন লীলাবতীকে বলেছে, বাবা মাত্র কয়েক দিন ব্যবহার করেছেন, এটাকে ঠিক পুরনো বলা যায় না। তোমার মাকে এটা দিলে কি পুরনো বলে তোমার বোনরা মাইন্ড করবে? লীলা বলেছে—চলো, এটা সঙ্গে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, দেখি কে কী বলে।

লীলাবতী বাড়ি এসে বিছানা থেকে টেনে তুলে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ক্রসবেল্ট বেঁধে দেয়। হুমড়ি খেয়ে পড়ার আর সুযোগ নেই। এ রকম আরামের চেয়ারে সাহারা নিজেই প্রথম দিকে অস্বস্তি বোধ করছিল। লীলাবতী মাকে অনেকটা জোর করে বসিয়ে রেখে সারা বাড়ি ঘুরিয়ে আনে। বাড়ির বাইরেও নেয়। এটা দেখে পুষ্প বলে, দারুণ তো!

লীলাকে জিজ্ঞেস করে, এটা কি মাকে একেবারে দিয়ে দিয়েছ, নাকি আবার ফিরিয়ে নেবে?

লীলা বলল, একেবারে।

তার মানে, এটা মায়ের সম্পত্তি হয়ে গেছে।

হ্যাঁ, এক শ বার।

তাহলে আমি মাকে রিকোয়েস্ট করব, মরার আগেই এটা যেন আমাকে উইল করে দিয়ে দেয়। তার মানে এই নয় যে ধাক্কা মেরে মাকে হুইলচেয়ার থেকে ফেলে আমি এটা নিয়ে নেব, মা মারা যাওয়ার পরই এটা নেব। বাকি জীবন চেয়ারে বসে কাটিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে কাটিয়ে দেব।

দোয়েলও মাকে হুইলচেয়ারে দেখে বলেছে, দারুণ তো!

দোয়েল বসার ঘরে গিয়ে এর জন্য আতিককে একটা ধন্যবাদও দিয়ে এসেছে।

আতিক লীলাবতীকে বলেছে, তোমার বোনগুলো ভালো, কিন্তু আমার নাক-উঁচু বোনগুলোর কেউ হলে পুরনোটা দেওয়ার জন্য হাজার কথা শুনিয়ে দিত।

লীলা কথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যায়। বউয়ের বোনরা ভালোই হয়, বউটাই হয় খারাপ।

চাকাওয়ালা চেয়ারটা পাওয়ার পর সাহারা খাতুন যেসব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল, সেগুলো আবার একে একে ফেরত নিতে শুরু করল। ঘরের ভেতরটা ঘুরে এসে দরজা খুলল। দরজা থেকে গেট দেখা যায়। তারপর আবার চাবি ঘুরিয়ে দরজার লক লাগানোর সময় ডান দিকে তাকিয়ে দেখে, বাইরের পাকা জায়গাটার ওপর ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে। বাইরের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তার ওপর মশারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এই দরজাটা খোলা রেখেই সাহারা খাতুন আমার রুমের দরজায় টোকা দেয়। তারপর ধাক্কা। আমি চোখ কচলে উঠে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে?

সাহারা বলে, তুমি তো আগে এমন অমানুষ ছিলে না?

জিজ্ঞেস করি—কেন, কী করেছি?

আমাকে মূল দরজায় নিয়ে এসে বলে, দেখো কত মশা। এমন মশার মধ্যে তুমি ঘুমাতে পারবে? তোমার ছেলে-মেয়েরা কেউ পারবে? তাহলে এই ছেলেটাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?

আমি জিজ্ঞেস করি, কী করতে চাও? আমার বিছানা ছেড়ে দেব?

সাহারা বলল, ছেলেটাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে এসো। টিভির সামনে বিছানো কার্পেটে ঘুমাক। এখানে মশা কম।

তা-ই করতে হলো।

কাজুও হাতজোড় করে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, আমি বাইরেই তো ভালো ঘুমাচ্ছিলাম। মশার কামড়ে কী হয়! বাঘ হলে একটা কথা ছিল। সাহারা তাকে ধমক দেয়। বলে, বেশি কথা বলতে নেই, ঘুমাও। কাজুও শুয়ে পড়ে। খানিকটা পিছিয়ে এসে সাহারা খাতুন সুইচ অফ করে দেয়। ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। হাতড়ে হাতড়ে নিজের ঘরে চলে আসি আমি। চেয়ার বিছানার কাছে নিয়ে শোবার কায়দাটা সাহারা ভালোই রপ্ত করেছে। মাঝে মাঝে এটুকুই দীর্ঘশ্বাস—ভেবেছিলাম জীবনে কারো ওপর বোঝা হব না, এখন দেখছি সেটাই আমার নিয়তি।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সাহারা দেখে, কাজুও দরজার বাইরের সিঁড়িতে বসে আছে। সে এগিয়ে যায়; জিজ্ঞেস করে, ঘুম হয়নি? নিজের দেশের জন্য মন খারাপ ছিল?

ভালো ঘুম হয়েছে, বলে কাজুও উঠে দাঁড়ায়। সাহারাকেসহ হুইলচেয়ারটা আস্তে আস্তে বাইরে বের করে নিয়ে আসে।

আমি গেট খোলার শব্দ শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। স্পষ্ট বুঝতে পারি, জাপানি গৃহভৃত্য কাজুও হুইলচেয়ার ঠেলে সাহারাকে গেটের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। চেয়ারে সাহারা খাতুন নিশ্চয়ই বসে আছে। কিন্তু দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আমি দেখতে পাচ্ছি না।

কাজুও কি কিছু খাইয়ে সাহারাকে অজ্ঞান করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে? তারপর মুক্তিপণ চাইবে? তাহলে সাহারাকে কেন? মুক্তিপণ আদায় করতে হলে পুষ্পকে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হতো। আমি লুঙ্গির গিঁট বেঁধে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে উল্টো দিকে সাহারা খাতুনের রুমে উঁকি দিই। অন্ধকার। সুইচ টিপে দেখি, বিছানা সত্যি খালি। আমি দরজা খুলে বেরিয়ে আসি, দরজার বাইরে কাজুওর পলিথিন ব্যাগ। আমি গেট খুলি, ডানে-বাঁয়ে দুই দিকে তাকাই। ডানে ও বাঁয়ে অনন্তদীর্ঘ পথ নেই, একটু পরপরই বাঁক। সাহারা খাতুনের চাকাওয়ালা চেয়ার কোনো এক বাঁকে ঢুকে পড়েছে। সুতরাং সে এখন আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

আমি আবার ফিরে আসি। আমার শরীরের দাবি অন্তত আরো এক ঘণ্টা ঘুম। আমি আলো নিভিয়ে দিই।

আমি আর সাহারা খাতুন অনেক দিন এক রুমে এক বিছানায় থাকছি না। তার মানে এই নয় যে আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। দুজন এখন যার যার সময়মতো ঘুমাই, ঘুম থেকে জেগে উঠি। তা ছাড়া কিডনির সমস্যাটা বেড়ে যাওয়ায় সাহারার রুমে ফ্লোরে একটা বুয়া ঘুমায়, কয়েক দিন ধরে নেই। মেয়েকে বিয়ে দিতে জামালপুর গেছে।

আমরা দরজা বন্ধ রাখলেও ভেতর থেকে লক করি না। কখন কার হার্ট অ্যাটাক হয়। ভেতরে মরে পড়ে থাকব, দরজা বন্ধ থাকায় কেউ ভেতরে ঢুকতে পারবে না, এটা ঠিক নয়। তা ছাড়া এই বয়সে কী এমন প্রাইভেসিই থাকতে পারে যে দরজা বন্ধ রাখতেই হবে। আমার বেলায় সাহারা খাতুনের আড়ালে দু-একটা ফোন করা, এর বেশি কিছু তো নয়। আর পাত্র-পাত্রীর কলাম পড়া।

এটা নিয়ে সাহারা খাতুন খুব বেশি চিন্তিত নয়। আমাদের বিয়েটাও হয়েছিল পত্রিকার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই।

‘এসএসসি অনুত্তীর্ণ ১৬ বছর বয়সী প্রকৃত সুন্দরী দীর্ঘাঙ্গী পাত্রীর জন্য সুশিক্ষিত সম্মানজনক চাকুরিতে নিয়োজিত অনূর্ধ্ব ৩০ বছর পাত্র চাই। পাত্রীর নামে ৫ কাঠার একটি প্লট রহিয়াছে। কেবল যোগ্য পাত্র যোগাযোগ করিবেন।’

যোগ্য অনেকেই যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু পাত্রী সাহারা খাতুনের পিতা শেষ পর্যন্ত আমাকেই পছন্দ করেছিলেন। আমি তখন বিস্কুট কম্পানির চাকরি ছেড়ে ৪৫০ টাকা বেতন স্কেলে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের সহকারী পরিচালক। পাত্রীর পিতা ও ফুফা সাতজন পাত্র প্রাথমিক বাছাইয়ের পর সাক্ষাৎকারের জন্য ডেকেছিলেন। সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর দুজনের একটি শর্টলিস্ট করা হয়। আমি ও সৈয়দ হামিদুজ্জামান। প্রাথমিকভাবে আমার মনে হয়েছে, সৈয়দ হামিদ দেখতেই শুধু আমার চেয়ে ভালো নন, সব দিক দিয়েই আমার চেয়ে যোগ্য। আমি তাঁর সামনেই পাত্রীর ফুফাকে বললাম, সৈয়দ সাহেব আমার চেয়ে যোগ্যতর, আমি বরং যাই।

তিনি বললেন, এত অস্থির হয়েছেন কেন। বিয়ে আপনাদের দুজনের কারো সঙ্গে না-ও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আপনার পাঁজরের হাড় দিয়ে যে নারীকে তৈরি করেছেন, তিনি হবেন আপনার পত্নী।

আলাদাভাবে আমাদের দুজনের ইন্টারভিউ শেষ হলো। পাত্রীর ফুফা বললেন, আমরা পুরো বিষয়গুলো—মানে আপনারা যা বলেছেন তা পর্যালোচনা করব। এর মধ্যে যদি কাউকে সাহারা খাতুনের জন্য মনোনীত করা হয়, আমরা টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব। তিনি তখন পাত্রী দেখার এবং তাঁর সঙ্গে বাতচিত করার সুযোগ পাবেন। তখন দুজনই সম্মত থাকলে আমরা বিয়ের তারিখ ধার্য করব। তখন পাত্রপক্ষের অভিভাবকের উপস্থিতি আবশ্যক হবে।

দুই দিন পর পাত্রীর ফুফার ফোন পেয়ে আমার মনে হয় নির্ধারিত খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিতে স্ট্যান্ডবাই তালিকা থেকে আমাকে ডাকা হচ্ছে। আমি তবু যাই এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।

তিনি বলেন—এ কথা সত্য, অন্য পাত্র যোগ্যতর। তবু আপনার সত্যবাদিতা পাত্রীর পিতা পছন্দ করেছেন এবং আপনার কাছে তাঁর কন্যাকে সমর্পণ করার নিয়ত করেছেন। তবে তার আগে আপনি পাত্রীকে দেখতে পারেন, কথা বলতে পারেন, আপনার অপছন্দ হলে আপনার প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আমাদের জানিয়ে যাবেন।

আমি বলি, তিনি আমার সত্যবাদিতা কেমন করে যাচাই করলেন?

তিনি বললেন, পাত্রীর প্লট নিয়ে আপনি সত্যভাষণ দিয়েছেন।

তখন দুই সদস্যের ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে আমি—এই দৃশ্যটি মনে পড়ল। পাত্রীর পিতার প্রশ্ন : আপনি কেন এই পাত্রীকে বিবাহে আগ্রহী হয়েছেন?

আমি জবাব দিই, পাত্রীর নিজস্ব মালিকানার পাঁচ কাঠার প্লট আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি জমির নিশ্চয়তা থাকলে আমি আমার চাকরির সঞ্চয় থেকে ধীরে ধীরে একটি বাড়ি করতে পারব। বাড়িতে স্ত্রীর বড় অবদান থাকায় স্ত্রীও মাথা তুলে কথা বলতে পারবেন।

এই জবাব তাঁকে সন্তুষ্ট করে। আমিও তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য বলে দিই, আমার পাত্রী দেখার প্রয়োজন নেই, আমি এমন একজন ভদ্রলোকের কন্যাকেই বিয়ে করতে চাই।

এভাবেই সাহারা খাতুন ও আমার বিয়ে, পাত্র চাই বিজ্ঞাপন পাঠ করে। আমার পাত্রী খোঁজার সেই অভ্যাস সম্ভবত ত্যাগ করতে পারিনি। এখন এটা দুরারোগ্য হয়ে উঠেছে।

 

দশ

 

ঘুম ভাঙে সাহারার ডাকে, আর কত ঘুমাবে? ওঠো। গরম লুচি আর খাসির পায়া নিয়ে এসেছি। ছেলেটা আমাকে তিন-চার মাইল ঘুরিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছে। এভাবে আমি কখনো শহর দেখিনি। সকালবেলাটা খুবই সুন্দর। ছেলেটা বলেছে, আমার ভালো লাগলে প্রতিদিন আমাকে নিয়ে বেড়াতে বেরোবে। আজকে কত দিন পর আমার কী যে ভালো লেগেছে!

আমাদের বিয়ের পর বছর দুয়েক সাত দিন-দশ দিন পর পর সাহারা নিজেই রেস্তোরাঁ থেকে নাশতা কিনে নিয়ে আসত। বলত—যত অস্বাস্থ্যকরই হোক, খেতে মজা রেস্তোরাঁর খাবারই।

আমি হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে আসি, পুষ্প ও তৌফিকও আসে, তৌহিদ ঘুম থেকে উঠে দেড়টা-দুইটার দিকে, ডাকাডাকি করে লাভ নেই। তৌহিদ থাকেও দোতলায়, চিলেকোঠায়, তবে এটা বেশ বড় আকারের। এর বাইরেও কিছুটা অংশ টিনের চাল দিয়ে ঢাকা। সব মিলিয়ে এটাই তৌহিদের স্টুডিও। তৌহিদ চারুকলা থেকে ভাস্কর্য নিয়ে পাস করেছে। তার কোনো শিল্পকর্ম বিক্রি হয়েছে এমন শুনিনি, তবে এটাও ঠিক, কোনো না কোনো উৎস থেকে তার কিছু টাকা আসে। গত দেড় বছরে তৌহিদ বাড়ি থেকে একটি টাকাও নেয়নি। ডাইনিং টেবিলের দুটি চেয়ার সরিয়ে সাহারা খাতুনের চাকাওয়ালা চেয়ার শূন্যস্থানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অনেক দিন পর সাহারাকে নাশতার টেবিলে পেলাম।

জাপানিরা এমনিতেই কাজপাগল। বলে কাজ করাতে হয় না। প্রো-অ্যাক্টিভ—নিজের থেকেই করে। কী করতে হবে এর কোনো ফর্দ তার হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তবু সেদিনই বাসার সামনের একচিলতে ড্রেনটা পরিষ্কার করে, লনমোয়ার ছাড়াই পাতলা দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো একটা কাঁচি দিয়ে বাগানের ঘাসগুলো ছেঁটে ফেলে, ঘরের ভেতরে দুটি রুমের ঝুলকালি ঝাড়ে।

সন্ধ্যার দিকে সাহারা খাতুন পুষ্পকে ডেকে বলে, স্টোররুমে তোদের কার কী আছে, যার যার রুমে নিয়ে যা। এটা ঠিক স্টোররুম নয়। একটা বাড়তি রুম, কাজুও হয়তো বলবে স্পেয়ার রুম। ভাঙা খাট, চেয়ারের হাতল, সাইকেলের চাকা, ভুঁড়ি কমানোর ব্যায়াম করার যন্ত্র, অচল ভিসিআর, দুটি কম্পিউটার মনিটর—এসবই। পুরনো আমলের একটা গিটারও ছিল।

পুষ্পকে ডাকলেও পুষ্প আবার জাপানি ভৃত্যকেই ডাকে। কোনটা কোন রুমে নিতে হবে আর কোনটা ঘরের বাইরে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে—পুষ্প একটা সাধারণ ধারণা দেয়।

সে জিজ্ঞেস করে, গিটার আর সাইকেলের চাকা দুটি কি সে নিতে পারে?

পুষ্প বলে দেয়, এগুলো সব রিজেক্টেড মাল। সে যা চায় তা-ই নিতে পারে।

ঘরটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়। মেঝেতে তেল চিটচিটে ময়লা ওঠাতে সাবানের গুঁড়া ছড়িয়ে গরম পানি ঢেলে ঝামা দিয়ে ঘষে আধাঘণ্টায় ফ্লোরটা ঝকঝকে করে ফেলে।

কাজুও জিজ্ঞেস করে, এই রুমে কে থাকবে?

পুষ্প যেমন বুঝেছে তেমনই বলে দেয়—ভাইজান বিয়ে করলে বউ নিয়ে এখানে থাকবে।

রাতের খাবারের পর সাহারা খাতুন বলে, ছেলেটাকে আসতে বল।

কাজুও আসে। এই প্রথম সাহারা তাকে তুই করে বলে—যা বাবা, তোর বিছানাটা আর বালিশটা নিয়ে আয়। এই রুমটাতে তুই থাকবি। ভেতরে তেমন মশা থাকে না, জানালায় নেট দেওয়া আছে।

কাজুও থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

সাহারা জিজ্ঞেস করে—দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তুই কি আমার বাংলা বুঝতে পারিসনি, নাকি আমাকে জাপানি ভাষা শিখে তোর সঙ্গে কথা বলতে হবে?

এটা সত্য, সে রুমে যেতে চায়নি। সাহারা খাতুন জোর করে তাকে এখানে ঢুকিয়েছে। আমিও সায় দয়েছি। বলেছি, নো প্রবলেম, এটা স্পেয়ার রুম, ঠিক পাশের রুমটা পুষ্পর, উল্টো দিকেরটা দোয়েলের, সেই রুমে একটা সিঙ্গল খাট, একটা টেবিল, একটা চেয়ার আর একটা ড্রেসিং টেবিল—এই হচ্ছে ফার্নিচার। দেয়ালের সঙ্গে আলমারি সংযুক্ত, তাতে কিছু পুরনো কাপড়, কিছু পুরনো বই। বিয়ের আগে লীলাবতী এই রুমে থাকত।

ওই যে বললাম, স্টোররুমটা কিন্তু গুদামঘর নয়, এটা স্পেয়ার রুম, গাড়ির স্পেয়ার চাকার মতো। এখানেই থাকবে সেই স্পেয়ার মানুষ। জাপানের নাগাসাকির কাজুও ইশিগুরো।

 

 

এগারো

 

কাজুও চপস্টিক দিয়ে ভাত খাওয়া শেখাতে চেষ্টা করে। তৃতীয় দিনই চপস্টিক দিয়ে ভাত খাওয়া শিখতে গর্ভবতী লীলাবতী চলে আসে। পুষ্প বরং কিছুটা পারে। লীলাবতীর কাঠিতে একটি ভাতের দানাও আটকা পড়ে না।

লীলা বলে, কাঠি দিয়ে খেলে আমাকে আসলে না খেয়ে মরতে হবে। পুষ্প বলে, আমি এটাই প্র্যাকটিস করব, তাতে খাওয়া কম হবে, শরীর স্লিম থাকবে।

কাজুও নিজে স্টিক ফেলে হাত দিয়ে খেতে শুরু করে।

খাওয়া তখনো শেষ হয়নি, লীলাবতীর বাসার কাজের বুয়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে লীলাকে বলে—সর্বনাশ হয়েছে, ম্যাডাম। তাকে ম্যাডাম ডাকতে লীলাই বুয়াদের শিখিয়েছে।

কিসের সর্বনাশ?

বুয়া যা বলল, তাতে বোঝা যাচ্ছে—দুজন মানুষ খুন হয়েছে, লাশের গন্ধ বের হয়েছে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে পুলিশ। সবাইকে স্টেটমেন্ট দিতে হচ্ছে, যারা বাড়িতে নেই, তাদের ডাকিয়ে আনা হচ্ছে। বুয়া বলেছে, সে ম্যাডামের ফোন নম্বর জানে না, কিন্তু ম্যাডামের বাবার বাসা চেনে, এক্ষুনি ডেকে আনবে। বুয়া আমাদের বাড়ির গেটে এসে পেছন ফিরে দেখে, দুজন পুলিশ তার পেছন পেছন আসছে। লীলাবতী বলল—বাবা, তুমিও আমার সঙ্গে চলো। আমি যাতে উল্টাপাল্টা কিছু বলে না ফেলি, তুমি একটু লক্ষ রাখবে, কেমন বাবা।

আমি বলি, আচ্ছা।

আমি আর লীলাবতী বুয়াকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকি, আমাদের অনুসরণ করে হাঁটতে থাকে দুজন শুকনা-পাতলা পুলিশ। শরীর দেখেই বোঝা যায়, এরা পুলিশ লাইনের, বাড়তি কামাই নেই, কিন্তু পিটি-প্যারেড প্রতিদিনই করতে হয়।

আমরা পুলিশ ঠেলে ভেতরে আসি। লিফট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠেই একটা দুর্গন্ধ পাই।

লীলাবতী বলল—বাবা, কী জঘন্য দুর্গন্ধ!

আমরা লীলাদের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে সব ফ্যান ছেড়ে দিই। ততক্ষণে পুলিশ এসে কলিংবেল টেপে।

আমি দরজা খুলি।

দুজন পুলিশ। অপেক্ষাকৃত বয়স্কজন বললেন, ঘটনা তো শুনেছেন। এটা একটা ফর্মালিটিজ, আপনাদের স্টেটমেন্ট নিতে হচ্ছে।

আমি বললাম, আমি ঘটনা কিছুই শুনিনি, তবে দুর্গন্ধ পেয়েছি। এটা আমার অ্যাপার্টমেন্ট নয়, কাছেই আমার বাসা। এখানে মেয়ে ও জামাই থাকে, দুপুরের খাওয়াটা মেয়ে আমার বাসায় আমাদের সঙ্গে খায়। আজও সেখানে ছিল। আপনারা খবর দেওয়ায় চলে এসেছে, ভাবলাম মেয়ের সঙ্গে আমিও যাই।

পুলিশ বলল, তাহলে আপনার স্টেটমেন্ট দরকার নেই। মেয়েকে আসতে বলুন।

লীলাও এসে আমার মতোই বলল, দুর্গন্ধ পেয়েছি, কী হয়েছে ভাই, বলুন তো শুনি।

পুলিশ বলল, সেটা জানার জন্যই আমরা আপনাদের কাছে এসেছি, সাহায্য করুন।

লীলা জিজ্ঞেস করল, দুর্গন্ধটা কোত্থেকে আসছে?

আপনি জানেন না?

আমি তো বাবার বাসায় ছিলাম।

চারতলায় ডান পাশের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে।

ওটা তো নায়লা খাস্তগিরের। রেন্টেড অ্যাপার্টমেন্ট।

নায়লা ম্যাডামকে চিনতেন?

এসব বিল্ডিংয়ে কেউ কি কারো বাসায় যায়? দেখা হতো নিচে, গেটে কিংবা লিফটের দরজার সামনে। হাই, হ্যালো—এ পর্যন্তই। আপনার সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছে?

সপ্তাহ দেড়-দুই হবে।

আপনাদের অ্যাপার্টমেন্টে কে কে থাকে?

আমি, আমার হাজব্যান্ড, বুয়া মাঝে মাঝে রাতে থাকে। দু-এক দিন আমার বোনরা থেকেছে।

আপনার হাজব্যান্ড কোথায়?

আতিক তো ট্রেনার, নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও ট্রেনিং দিচ্ছে। ও অ্যাকচুয়ালি ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং কনসালট্যান্ট। দয়া করে একটু ফোন করুন, লাউড স্পিকার অন রাখবেন। লীলা ফোন করে, লাউড স্পিকারে শোনা যায়—এই নম্বরটি এখন বন্ধ আছে। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন।

লীলাবতী বলল, সম্ভবত ক্লাস নিচ্ছে। যখন ক্লাসে থাকে, ফোন বন্ধ রাখে। দেড়-দুই ঘণ্টার ক্লাস শেষ করে আবার সুইচ অন করে।

পুলিশ বলে, আপনার স্বামীর নম্বরটি দিন।

লীলা নম্বর দেয়।

পুলিশ যখন ফোন করে, তখনো একই জবাব।

লীলা জিজ্ঞেস করে, কার লাশ?

পুলিশ বলে, মিসেস নায়লা খাস্তগির এবং সম্ভবত মিস্টার খাস্তগির।

লীলা বলল, আমরা শুনেছিলাম ডিভোর্সি।

লীলা শুনেছে আতিকের কাছে, কিন্তু তার নাম না নিয়ে বলল, হতে পারে নিচে কেয়ারটেকার বা অন্য কারো আলোচনায় শুনেছি।

আজ আপনার হাজব্যান্ড কোথায় ক্লাস নিচ্ছেন?

সম্ভবত ব্র্যাক সেন্টার ইনে। ওই যে মহাখালী থেকে গুলশান যাওয়ার পথে হাতের ডান পাশে কুড়িতলা বিল্ডিং ব্র্যাক সেন্টার, ওখানেই। তিন দিন আগে পড়িয়েছে কুমিল্লা বার্ডে।

আপনার হাজব্যান্ড কি অন্য কোনো ফোন নম্বর  ব্যবহার করেন?

পাঁচ বছর ধরে তো একটি নম্বরই দেখছি, ফোনটাও পুরনো মডেলের নকিয়া।

আপনি কি লাশ দেখতে চান? মানে যদি কোনোভাবে ভদ্রলোককে শনাক্ত করতে পারতেন!

এবার আমিই কথা বলি—দেখুন, আমার মেয়েটা প্রেগন্যান্ট, সাত মাস চলছে। আপনারা ডেকেছেন, তাড়াহুড়া করে হেঁটে এসেছে। রাস্তায় একটা রিকশাও ছিল না। এখন দুর্গন্ধে তো বমি হবেই, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসার অবস্থা হবে। বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

পুলিশ বলল—তাহলে থাক, আপনি বিশ্রাম করুন। যখন আমাদের দরকার হবে, সাহায্য করবেন। আপনার ফোন নম্বরটিও দিন।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই করব।

একটা ছোট কাগজে লীলাবতী নিজের ফোন নম্বর লিখে পুলিশকে দেয়।

পুলিশ বেরিয়ে যায়। আমার ফোন বাজে। আমি হ্যালো বলতেই নারীকণ্ঠের প্রশ্ন—জি, বলুন কেন ফোন করেছিলেন।

আমার সামনে লীলাবতী। ঘরে এয়ার ফ্রেশনার ছড়াচ্ছে। বললাম, আমি কেন ফোন করতে যাব?

দেখুন, ঠিক ১টা ২৫ মিনিটে আপনার নম্বর থেকে কল এসেছে। বলুন, পাত্রী সম্পর্কে কী জানতে চান?

দেখুন, সম্ভবত বাড়ির অন্য কেউ আমার ফোন থেকে কল দিয়েছে। আমি একটু বাইরে আছি। ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করব। তার পরও বললাম, স্যরি ফর ইওর ইনকনভিনিয়েন্স।

আমি ভালো করেই জানি, ফোনটা বাড়ির অন্য কেউ করেনি, আমিই করেছি। ৫১ বছর বয়সী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকার জন্য যে পাত্র চাই বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, সেটার রেশ ধরেই আমার ফোন। তারা অনূর্ধ্ব ৬০ পাত্র চাইছে। আমি এই পাত্রীর নাম রেখেছিলাম শুকতারা। আমি শুকতারাকে অনুরোধ করতে চেয়েছিলাম, অনূর্ধ্ব ৬০-এর বদলে অনূর্ধ্ব ৬৫ করুন। তাহলে আপনি হয়তো আরো উপযুক্ত পাত্র পেতে পারেন। সম্ভবত শুকতারাই আমার করা সেই ফোনের তখনই জবাব দিতে না পেরে দুই ঘণ্টা পর কলব্যাক করেছেন। আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলি, আমি এক কাপ চা পেতে পারি।

লীলাবতী বলে, তুমি দশ কাপ চা পেতে পারো, কিন্তু বাবা, তুমি আমাকে একা ফেলে যাবে না।

ঠিক আছে, আতিক না আসা পর্যন্ত তো আছি।

আতিক এলেও তোমাকে থাকতে হবে।

আমি টি ব্যাগ চোবানো গরম পানি পেয়ে যাই। লীলা জানে, কোনো সুগার প্রবলেম না থাকলেও আমি চায়ে চিনি, দুধ কিংবা বাড়তি কিছু নিই না।

লীলা বলল—বাবা, তুমি চা-টা খেয়ে একটু আরাম করে শোও। আমি তোমার পাশে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাব। আমার অস্বস্তি লাগছে।

 

 

বারো

 

কলিংবেল বাজে। এবার বুয়া দরজা খোলে। লীলার চেয়ে কিছুটা বেশি বয়সী সালোয়ার-কামিজ পরা একজন মহিলা ভেতরে ঢুকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমি বলি, বসুন।

মহিলা বলে, আমি মিসেস রশিদউদ্দিন। আমার নাম নাসরিন।

আমার মেয়ে সম্ভবত ওয়াশরুমে, বসুন।

লীলাবতী এসে আমার পাশে বসে।

নাসরিন রশিদউদ্দিন তাকে বলে—স্যরি, আপনার সঙ্গে আগে কখনো ফরমাল পরিচয় হয়নি। আমি চারতলায় ঠিক ওপরের অ্যাপার্টমেন্টটিতে থাকি।

লীলা বলে, তাতে কী? আমি আপনাকে দু-এক দিন নিচে দেখেছি। মহিলা বলল, মিসেস খাস্তগিরের পাশের ফ্ল্যাটের ইকরামউল্লাহ সাহেব পুলিশকে বলেছেন, আমার হাজব্যান্ড আর আপনার হাজব্যান্ডের ওই অ্যাপার্টমেন্টে আসা-যাওয়া ছিল। এটা তিনি নিজে দেখেছেন। এ বাসায় একজন মন্ত্রীকেও তিনি ঢুকতে দেখেছেন। আমার হাজব্যান্ডের আসা-যাওয়া ছিল কি না সত্যিই আমি জানি না। আমি একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াই, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সাড়ে সাতটায় বাসা থেকে বেরোই, ফিরি পৌনে তিনটায়। রশিদ মানে আমার হাজব্যান্ড দশটা পর্যন্ত ঘুমায়, তারপর মতিঝিল যায়, মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসা করে। ফিরে আসে সাড়ে নটা-দশটায়। পুলিশ আমাকে বলল, রশিদ সাহেবকে ফোন করুন। আমি একাধিকবার ফোন করলাম, কিন্তু ফোন বন্ধ। তখন পুলিশ আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন খুনটা রশিদই করেছে। আমি সব জানি, কিন্তু মিথ্যা কথা বলছি। কী করি বলুন তো?

লীলাবতী বলল, আমাকে তো তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেনি, শুধু ফোন করতে বলেছে। আতিক তখন পড়াচ্ছিল, ট্রেনার তো, ফোন ধরেনি। তবে আতিকের ওই অ্যাপার্টমেন্টে যেতে হতো মাসে একবার ভাড়ার টাকাটা আনতে।

আপনারা কি ওটারও মালিক?

আমরা কোনোটারই মালিক নই। আতিকের বন্ধু মালিক, ও টাকাটা তুলে বন্ধুর অ্যাকাউন্টে জমা দিত। আমি এটুকুই জানি।

এবার আমি জিজ্ঞেস করি, তাহলে মা সমস্যা কোথায়?

এবার নাসরিন রশিদউদ্দিন বলল, একটু আগে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে রশিদ ফোন করে বলল—একটা ঝামেলায় ফেঁসে গেছি। কয়েক দিন বাসায় আসতে পারব না। দুদিন পর থানায় গিয়ে আমাকে মিসিং দেখিয়ে একটা জিডি করে রেখো।

আমি বললাম, তুমি কি এ কথাটা আমাদের বলে ভালো করলে? এটা তো তোমাদের নিজেদের কনফিডেনশিয়াল আলাপ।

নাসরিন বলল—আংকল, আমার তো আপনাদের না বলে কোনো উপায় নেই। আমার হাজব্যান্ডই বলেছে,   যা-ই করি আপনার মেয়ের সঙ্গে আলাপ করে যেন করি।

আমার মেয়ের সঙ্গে আলাপ করে কী লাভ হবে তোমার?

আমার হাজব্যান্ড মিসেস আতিককে এটা বলতে বলেছেন যে আতিক সাহেব কদিন বাসায় না এলে যেন দুশ্চিন্তা না করেন। ঝামেলা কেটে গেলে হাজির হবেন।

লীলাবতী বলল, তার মানে কী? নায়লা খাস্তগির খুনের সঙ্গে আমাদের দুজনের হাজব্যান্ডই জড়িত।

আমি তা জানি না, তবে এটা মনে হচ্ছে, দুজনের একই ধরনের সমস্যা।

আবার কলিংবেল বাজে। বুয়া দরজা খোলে। সেই দুজন পুলিশ। একজন লীলাকে বলল—ম্যাডাম, আপনি ঠিকই বলেছিলেন, ব্র্যাক ইনে আতিক সাহেবের ক্লাস ছিল, কিন্তু তিনি সেখানে যাননি। আমাদের ট্র্যাকার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে বেনাপোলের কাছাকাছি কোথাও এই ফোন নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে শনাক্ত করেছে। যদি তিনি তাঁর নিজের নম্বর কিংবা ভিন্ন কোনো নম্বর থেকে আপনাকে ফোন করেন, তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত জানবেন এবং দয়া করে আমাদের জানাবেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনি ইনোসেন্ট। কিন্তু মিথ্যা কথা বলে নিজেকে একটি অপরাধের সঙ্গে জড়াবেন না। আর অনুগ্রহ করে বাসা থেকে বের হবেন না!

আমি বলি, বের হলে বড়জোর আমার বাসা, কাছেই, এই নিন, ঠিকানা রাখুন। আমি আমার সোনালি রঙের বিজনেস কার্ডহোল্ডার থেকে একটি কার্ড বের করে পুলিশকে দিই।

লীলাবতী বলল—কী করব, বাবা?

ফোনটা সাইলেন্ট মোডে নিয়ে এসো। এখন থেকে কোনো ফোন ধরবে না। পুলিশ তোমার ফোনও ট্র্যাক করছে। তারপর নাসরিনের দিকে তাকিয়ে বলি, তোমারও।

নাসরিনের চোখ থেকে কান্না ঝরতে শুরু করে। একসময় ফোঁপাতে থাকে, বলে—আমার যখন পাঁচ বছর, প্রগতি সরণির কাছে একটা ফুট ওভারব্রিজের গার্ডার ভেঙে পড়লে আমার বাবা মারা যায়, বাবা ছিল একটা রিকশায়। এরপর আমার মা ভীষণ বদ একটা লোককে বিয়ে করে। আমাকে বাড়ি থেকে পালাতে হয়। তারপর কঠিন সংগ্রামের জীবন। এ পর্যন্ত এসেছি। আমার দুটি ছেলে, সাত বছর আর পাঁচ বছর।

চোখ মুছতে মুছতে লীলাবতীকে বলে—ভাবি, ইউ আর সো লাকি, আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো বাবা নেই।

টিভিতে তখন ব্রেকিং নিউজ : রাজধানীর অ্যাপার্টমেন্টে সুন্দরী নায়লা খাস্তগির ও তার সঙ্গী খুন। অন্তত পাঁচ দিন আগে খুন করে খুনি দরজা বাইরে থেকে তালা মেরে পালিয়ে যায়।

সে রাত আমাকে লীলাবতীর সঙ্গেই থাকতে হয়। পরদিন খবরের কাগজে বিস্তারিত সংবাদ আসে। স্লিভলেস ব্লাউজ পরা নায়লা খাস্তগিরের বড় ছবি ছাপা হয়। নিহত অন্য ব্যক্তি সিআইপি নুরুদ্দিন মাহমুদ শামস। চিংড়ি রপ্তানি ব্যবসায় বিশেষ সাফল্যের জন্য তাঁকে কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন করা হয়েছিল। নায়লা খাস্তগির এই সিআইপির ব্যবসায় পুঁজি লগ্নি করেছিলেন।

আরেকটি সূত্র নায়লার সাবেক স্বামী বোরহান খাস্তগিরের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ব্যবসায় খাটানোর মতো তাঁর কোনো অর্থ ছিল না। অ্যাপার্টমেন্টটির মালিক নায়লা খাস্তগির হলেও তা নুরুদ্দিন মাহমুদ শামসের টাকায় কেনা বলে বোরহান খাস্তগির ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভবনের একজন দারোয়ান বলেছে, নুরুদ্দিন মাহমুদ শামস মাসে দু-একবার আসতেন। তিনি দীর্ঘ সময় থাকলেও রাত্রি যাপন করতেন না।

ভবনের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি পর্যালোচনা করে পুলিশের মনে হয়েছে, বহিরাগত খুনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি। একই ভবনের একজন ট্রেনিং কনসালট্যান্ট আতিকুল ইসলাম এবং ডলার-পাউন্ড ব্যবসায়ী রশিদউদ্দিনকে পুলিশ সন্দেহের চোখে দেখছে। আতিকুল ইসলাম গতকাল বিকেলের দিকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে পুলিশের ধারণা, রশিদউদ্দিনের অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। নিহতের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মূল্যবান কোনো সামগ্রী কেউ হাতিয়ে নেয়নি বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

বোরহান খাস্তগির এই পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেছেন, যেহেতু নায়লা তাঁর এক সন্তানের মা (সন্তান বাবার হেফাজতেই আছে), তিনি তাঁর সম্পর্কে কোনো অশোভন মন্তব্য করতে চান না।

পরদিন আবার পুলিশ এসেছে, কোনো ফোন এসেছে কি না জিজ্ঞেস করেছে, তাঁকে থানায় গিয়ে স্টেটমেন্ট দেওয়ার কথা বলেছে।

গর্ভবতী মেয়েটিকে নিয়ে টানাহেঁচড়ায় সন্তানের ক্ষতি হতে পারে—এ কথা বলে আমি সরাসরি পুলিশকে জানিয়ে দিই, আমার শ্যালক কিন্তু আপনাদের অতিরিক্ত আইজিপি। আমার মেয়ের মামা। আমি তেমন মিথ্যা বলিনি, যার কথা বলেছি সে সাহারার আপন ফুফাতো ভাই। হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যথিত হলেও সঙ্গে একজন বিতর্কিত নারী জড়িত থাকায় সিআইপি নুরুদ্দিন মাহমুদ শামসের পরিবার মামলা নিয়ে কোনো কথা বলেনি, একটি পয়সাও খরচ করেনি। কেঁচো খুঁড়তে আবার না কোনো সাপ বেরিয়ে আসে—এটাই তাদের আশঙ্কা। নায়লা খাস্তগিরের পক্ষে একটি পয়সা খরচ করার মতো কেউই নেই। সম্ভাব্য দুই সন্দেহভাজনের বেলায়ও একই কথা—তাদের সন্দেহের তালিকা থেকে মুক্ত করতে কিংবা তাদের পক্ষে লড়তে কেউ এগোয়নি। সাংবাদিকদের জন্যও কোনো ইনসেনটিভ নেই, ফলে তিন-চার দিনের মধ্যেই জোড়া খুনের মামলা নিয়ে কথাবার্তা থেমে গেল। পুলিশ নায়লা খাস্তগিরের অ্যাপার্টমেন্ট সিল করে রেখেছে। তাঁর সাবেক স্বামী বোরহান খাস্তগির বলেছেন, যেহেতু তাঁদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক তালাক সম্পন্ন হয়নি, তিনি সাবেক স্বামী নন, তিনিই বৈধ স্বামী। কাজেই নায়লা ও তাঁর সন্তানের প্রাপ্য অ্যাপার্টমেন্টটি তাঁদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য তিনি পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন। এখানেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, টাকা-পয়সা দিয়ে তিনি অ্যাপার্টমেন্টের দখল নিতে যাবেন না, দখল হস্তান্তরের জন্য আদালতের নির্দেশ প্রার্থনা করবেন।

তিন দিন পর পুলিশকে জানিয়েই লীলাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই, চেক আপ করিয়ে ফিরিয়ে আনি। ছয়-সাত দিনের মধ্যেই লীলাবতী ও নাসরিনের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

আমি আশ্বস্ত, এই লীলাবতীকে নিয়ে আর টানাহেঁচড়া হবে না। তবে খুনের রহস্য অনাবিষ্কৃত রয়ে যায়।

একান্তে লীলাবতী যতটুকু বলেছে, তাতে এটা মনে করার সংগত কারণ রয়েছে যে নায়লা খাস্তগিরের সঙ্গে আতিকের একটা সম্পর্ক ছিল। আমি সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইছি না। ওদিকে আতিকের ভয়ংকর অপছন্দের একজন মানুষ ছিল রশিদউদ্দিন। তার সঙ্গে আতিকের পেশাগত বা সম্পদের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। তবে নায়লা খাস্তগিরের সঙ্গে রশিদউদ্দিনের একই ধরনের সম্পর্ক আতিককে বিচলিত করে থাকতে পারে। অন্যদিকে সিআইপি নুরুদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে নায়লার সম্পর্ক দুজনকেই ক্ষুব্ধ করে এবং নুরুদ্দিন দুজনের কমন এনিমিতে পরিণত হয়। ঘটনার দিন লীলাবতী আমার বাড়িতে, নাসরিন কিন্ডারগার্টেনে, তার বাচ্চারা তারই স্কুলে, সম্ভবত দুজনই নুরুদ্দিনের আগমন প্রত্যক্ষ করে এবং প্রতারিত বোধ করে। সাময়িকভাবে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে নুরুদ্দিনকে ‘শট আউট’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের হাতে পিস্তল থাকার কথা নয়। সম্ভবত নুরুদ্দিন মাহমুদ শামসের পিস্তলই তারা ব্যবহার করে। নায়লা নিশ্চয়ই তাদের প্রাথমিক টার্গেট ছিল না। বেডরুমের প্রশস্ত ধবধবে বিছানায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তুতি পর্বে নির্বসন এক জোড়া নর-নারী গুলিবিদ্ধ হয়। নুরুদ্দিনকে হত্যার ব্যাপারে দুজন একমত থাকলেও নায়লা খাস্তগিরকে নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা। এমনও হতে পারে, নুরুদ্দিনকে বাঁচাতে চেষ্টা করে নায়লা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকা নায়লাকে আরো একটা গুলি করেছে তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিকের একজন।

হত্যার পর নগ্ন দেহ দুটিকে একটি চাদরে ঢেকে এলে ভালো হতো, অন্তত নায়লাকে তো ঢেকে রাখতে পারত। কিন্তু প্রেম এমনই ভয়ংকর যে দুজন প্রেমিকই নিষ্প্রাণ এই নারীর নগ্নতাকে বরং আরো বেশি করে প্রকাশ করল। হত্যাকাণ্ডের পর কেউ তাড়াহুড়া করেনি। এমনও হতে পারে, ড্রয়িংরুমে বসে নুরুদ্দিনের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে খেয়েছে। পুলিশ অ্যাশট্রেতে সিগারেটের তিনটি বাঁট পেয়েছে এবং প্যাকেটে অবশিষ্ট ছিল সতেরোটি সিগারেট। বেডরুমের এয়ারকন্ডিশনার চালু রেখে দরজা ভালো করে বন্ধ করেছে, সব আলো নেভানোর আগে বড় তালা ও চাবিও বের করেছে, প্রতিটি কক্ষই অটোলক করে প্রধান দরজায় বড় তালা ঝুলিয়ে দুজন যার যার অ্যাপার্টমেন্টে চলে যায়। সম্ভবত ভালো করে গোসল করে, খায়, ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, এমনকি বাড়তি পোশাকও ঢোকায়। সময়মতো বেরিয়ে যায়, আবার রাতে ফিরে আসে। ঘটনার তৃতীয় দিন রাতে আতিক ফেরেনি, রশিদউদ্দিনও না।

 

 

তেরো

 

তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্কে দোয়েল বাড়ি ছেড়েছে। সামনের ছুটির দিনেও হোস্টেল ছেড়ে আসবে না। ফোনে পুষ্পকে জানিয়েছে, বাসা থেকে কোনো কিছুই যেন তার জন্য পাঠানো না হয়। কাজুওর কারণে এ বাড়ির সব কিছুই তেজস্ক্রিয়তাদোষে দুষ্ট।

পুষ্পকে বলেছে, তার ভাই দুটি অপদার্থ, তার বোন লীলাবতী একটা আটার বস্তা, মা ভেজিটেবল আর বাবা মহামূর্খ। এই মানুষগুলোর সঙ্গে থেকে সে তার জীবনটা নষ্ট করতে চায় না, নাগাসাকি, হিরোশিমা কি চেরনোবিল কিংবা ভূপালের মানুষের মতো ধুঁকে ধুঁকে মরতেও চায় না। জীবন অনেক মূল্যবান। নিজের জীবনটাকে নিজেরই রক্ষা করতে হবে। পুষ্পকেও সাবধান হতে বলেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লেডিজ হোস্টেলে সিট বরাদ্দের জন্য আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে।

কাজুওর পীড়াপীড়িতে তার ব্লাড গ্রুপ ও টিস্যু সাহারা খাতুনের সঙ্গে ম্যাচিং করার পর ডাক্তার হারুনুর রশীদ অবাকই হলেন। হুবহু মিলে গেছে। তা ছাড়া দাতার কিডনির স্বাস্থ্যও চমৎকার। ট্রান্সপ্লান্টেশনের সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। কিন্তু বেঁকে বসল সাহারা খাতুন নিজেই। যে ছেলেটির স্মৃতিতে তার মা নেই, তার মায়ের কোনো ছবিও সে কখনো দেখেনি, এ রকম একটি অভাগা ছেলে কেন তার নিজের শরীরের একটি অংশ খুলে তাকে দিয়ে দেবে।

কাজুও সাহারাকে বলে—আমি দেব, কারণ আপনি আমার মা। আর দুটি ভালো কিডনি দিয়ে আমার কাজটা কী? একটা আপনাকে দিলে আমি অনেক দিন আপনাকে পাব। সেটা আমার লাভ। মডার্ন কিডনি হসপিটালের অপারেশন থিয়েটারে সাহারা খাতুন আর কাজুও ইশিগুরো। অপারেশনের আগে একটি বন্ড সই করিয়ে নেওয়া হয়—যদি অপারেশনজনিত কারণে মৃত্যু ঘটে, তাহলে ডাক্তার কিংবা হাসপাতাল দায়ী নয়। কাজুওর বন্ড সই করলাম আমি আর সাহারারটা আমাদের বড় ছেলে তৌহিদ।

হাসপাতালে ভর্তির আগের রাতে কাজুও পুরনো গিটারের তারে ভালো করে টানা দেয়, রেজিন দিয়ে ঘষে, তারপর একটু বাজায়ও।

অপারেশনের পর ডাক্তার বললেন, চমৎকার। দুজনই ভালো আছেন। আমাদের চোখে অপারেশন সাকসেসফুল, রিসিভারের কিডনি ফাংশন শুরু হলে বাকিটা বলা যাবে।

চার দিন হাসপাতালে কাটিয়ে কাজুও বাড়ি চলে এলো। বাড়ি ফিরে তার নিজ হাতে মেরামত করা গিটার বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করল : ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড। বব ডিলানের নিজের লেখা ও গাওয়া গান।

হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন

বিফোর ইউ ক্যান কল হিম আ ম্যান?

হাউ মেনি সিস মাস্ট আ হোয়াইট ডোভ সেইল

বিফোর শি স্লিপস ইন দ্য স্যান্ড

ইয়েস, হাউ মেনি টাইমস মাস্ট দ্য ক্যানন বল ফ্লাই

বিফোর দে আর ফরএভার ব্যান্ড?

দি আনসার মাই ফ্রেন্ড ইজ ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড

দি আনসার ইজ ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড।

 

বব ডিলান কাজুওর সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী। কাজুও তাঁর মতো রকস্টার হতে চেয়েছিল। কিন্তু সে জানে, তার হাতে সময় খুব কম।

ঠিক সাত দিন হাসপাতালে কাটিয়ে অষ্টম দিন এগারোটার দিকে সাহারা খাতুন ফিরে আসে। অবিশ্বাস্য আরোগ্য তাকে অভিভূত করে রাখে। সাহারা কাজুওকে ধরে বলে, আমার ছেলেটা। তারপর কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার নিজের পেটের দুই ছেলের একটা তো এবি নেগেটিভ। সে তো একবারও বলেনি—মা, তুমি আমার একটা কিডনি নাও। সাধলেই কি আর আমি নিতাম। বলতাম—থাক বাবা, তুমি বেঁচে থাকো। আমার আর কদিন।

সাহারা কাজুওর জন্য একটা নতুন খাট কিনিয়ে আনে, নতুন জাজিম, তোশক, বালিশ, চাদর। কাজুওকে সিঙ্গল খাটে কি ফ্লোরে ঘুমাতে দেবে না। কাজুও ঘুমিয়ে পড়লে নিজের হাতে মশারি গুঁজে দিয়ে আসে। ডেঙ্গু খুব খারাপ রোগ, চিকুনগুনিয়া আরো খারাপ।

সাহারা যখন কাছে যায়, কাজুওর ঘুম ভেঙে যায়। সাহারা বলে, আমি পা টিপে টিপে আসি, ঘুমের মানুষ তুই কেমন করে টের পাস যে আমি এসেছি?

ঘ্রাণে।

কাজুও বলল, জীবনে এই প্রথম আমি কারো কাজে লাগলাম।

কাজুও আমার হাঁটুতে মাণ্ডার তেল মালিশ করে। পুষ্পকে জাপানি ভাষা শেখায়, জাপানি হাইকু আবৃত্তি করে শোনায়, হারুকি মুরাকামির সাহিত্যমান নিয়ে আলোচনা করে। পুষ্প মনে করে, হারুকি অনেক উঁচু দরের লেখক; কিন্তু কাজুও বলে—তা ঠিক, তবে হারুকির চেয়ে উঁচু দরের অনেক লেখক আছে। কাজুও কারো কারো নাম বলে, পুষ্প বলে, এসব নাম আমি কোনো দিন শুনিওনি। কিন্তু তাঁদের কি পাঠক আছে?

আছে, কম। এম কে রলিংসের তো অনেক পাঠক। হারুকি অবশ্য তাঁর চেয়ে বড় লেখক।

কাজুও তৌহিদের চিলেকোঠার শোবার ঘর কাম স্টুডিওতে নগ্ন হয়ে তার ভাস্কর্যের মডেল হয়। তৌফিক কাজুওকে দিয়ে ভেভিড সৃষ্টি করতে চায় মাইকেলেঞ্জেলোকে অনুসরণ করে।

তৌফিকের ফরমাশ খুব কম, শুধু জুতাগুলো চকচকে করে রাখলেই খুশি।

সাহারা খাতুনকে আর হুইলচেয়ারে বসতে হয় না। এমনিতেই বেশ হাঁটাহাঁটি করতে পারে। তবু কাজুও     দু-এক দিন পর পর খুব ভোরবেলায় সাহারাকে এই চেয়ারে বসিয়ে ঠেলতে ঠেলতে গেটের বাইরে নিয়ে যায়। একবার বেরোতে পারলে তিন থেকে চার কিলোমিটার পথ তো ঘুরতেই হবে।

এক সকালে আমিও বেরোই। দূর থেকে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখি, ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। সাহারা খাতুন হুইলচেয়ার ঠেলছে। চেয়ারে বসে আছে আমাদের জাপানি গৃহভৃত্য কাজুও ইশিগুরো। আমি অবাক হই এবং এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের জন্য কাজুওকে বকাঝকা করতে এগিয়ে যাই। আমাকে দেখে সাহারা খাতুন একটু থতমত খায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে আমাকে ইশারা দেয় : ডোন্ট টক, কথা বলবে না।

আমি আরো এগিয়ে যাই।

ফিসফিস করে সাহারা খাতুন বলে, চুপ! দেখছ না আমার ছেলেটা ঘুমাচ্ছে।

আমার অবাক হওয়ার কথাই। এমন একটি জোয়ান বিদেশি মর্দ হুইলচেয়ারে ঘুমাচ্ছে, তার মায়ের বয়সী একজন অসুস্থ মানুষ তাকে ঠেলে নিয়ে চলছে।

সাহারা খাতুন আবার ইশারা দেয়—আমার পেছন পেছন এসো না, আমাকে আমার ইচ্ছামতো হুইলচেয়ার ঠেলতে দাও। আমার যেখানে ইচ্ছা, যত দূর ইচ্ছা, আমি যাবই। বুড়ো দামড়াটা শিশুর মতোই ঘুমাচ্ছে।

দোয়েল অপারেশনের দিন হাসপাতালে এসেছিল। বেশিক্ষণ থাকেনি। কাজুওর কিডনি সাহারা খাতুনের নষ্ট কিডনি সরিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে দোয়েল আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেয়। সাহারা খাতুনও ভয়ংকর তেজস্ক্রিয় পার্টিকল বহন করছে। তার কিডনি হাইলি রেডিও-অ্যাক্টিভ। সুস্থভাবে বাঁচতে চাইলে সবাই সাহারা খাতুনের কাছ থেকে দূর থাকবে।

একসময় সাহারা খাতুন নিজেও ভাবতে শুরু করে : মেয়েটা কি শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেল? আমার ফুফুরও তো এই রোগ ছিল। নিজের মাকে মানে আমার দাদিকে বলত ডাইনি বুড়ি। একদিন খালি বাড়িতে এই বুড়ো মানুষটির হাত-পা বেঁধে তাকে ইঁদারায় ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। সেই আছরই আমার দোয়েলের ওপর!

 

 

চৌদ্দ

 

কাজুও জাপানি খাবার রান্না করে। আমরা বেশ মজা করে খাই। টিফিন ক্যারিয়ারের চারটি বাটির তিনটিতে জাপানি ডিশ এবং ওপরের বাটিতে বাংলাদেশি ডেজার্ট ভরে কাজুও চলে যায় মেডিক্যাল কলেজের লেডিজ হোস্টেলে। সেখানে গিয়ে দোয়েলের খোঁজ করে। নিচ থেকে চারতলায় খবর পৌঁছে—দোয়েলের খোঁজে এক বিদেশি এসেছে। বিদেশি শুনে তাড়াতাড়ি নেমে আসে। বিদেশিকে দেখে স্বগতোক্তি করে—কিসের বিদেশি, এ তো সেই রেডিও-অ্যাক্টিভ নাগাসাকি প্রডাক্ট। দোয়েল আরেকটু এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে—ওরে বদমাশ, তুই এখানে কী চাস? তোর হাত থেকে বাঁচতে বাসা ছেড়েছি, ফ্যামিলি ছেড়েছি, এখন কি লেডিজ হোস্টেলও ছাড়তে হবে?

কাজুও টিফিন ক্যারিয়ারটা তার দিকে এগিয়ে বলে—নো ডেঞ্জার, নো রেডিয়েশন।

তুই আমাকে ডেঞ্জার আর রেডিয়েশন কী তা শেখাচ্ছিস? এক থাপ্পড়ে সব কটা দাঁত ফেলে দেব।

কাজুও বলল, তা অবশ্যই করবেন। কিন্তু না খেলে শক্তি পাবেন কোথায়। শক্তি না থাকলে আপনার যে নরম হাত, তাতে প্রতি থাপ্পড়ে একটা করে দাঁত পড়বে না। আমাকে একটা মেরে দেখতে পারেন।

বেয়াদব কোথাকার! গেট আউট! গেট আউট অব বাংলাদেশ। সব মেনে নিচ্ছি। আমি চলে যাব। এমনিতেও আমার হাতে বেশি সময় নেই। আপনি খাবারটা নিলেই চলে যাব।

দোয়েল দেখে, আশপাশে দু-একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী বিদেশির সঙ্গে তার কথোপকথন উপভোগ করতে শুরু করেছে। হোস্টেলের গেটে বিসদৃশ কোনো নাটকের অবতারণা হতে পারে—এই আশঙ্কায় আর কোনো কথা না বাড়িয়ে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।

সাহারা খাতুনকে বলেই কাজুওকে আমাদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের চৌহালির মীরকুটিয়া নিয়ে যাওয়ার নাম করে বের হই। দুদিন পর যখন ফিরি, কাজুওর চোখে বেশ বড় কালো গগলস। ফরসা চেহারায় কালোটা বেশ ফুটেছে।

সাহারা বলল, আমার ছেলেটাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।

পুষ্পও দেখে বলল, দারুণ তো!

কিন্তু পরক্ষণেই বলল—কী ব্যাপার, কাজুও কাঁদছে নাকি। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে—লাল কেন? ও মাই গড! রক্ত না তো?

কাজুও বলল, এমন কিছু নয়, সামান্য একটু সমস্যা হয়েছিল। ডাক্তারের হাত তেমন পাকা না হলে যা হয়।

পুষ্প বলল, মানে?

কাজুও বলল, ঠিক হয়ে যাবে।

কী ঠিক হয়ে যাবে? চশমা খোলো, দেখি তোমার কী হয়েছে।

কাজুও চশমা খোলে না।

পুষ্প জোর করে চমশা খুলে আরেকবার চেঁচিয়ে ওঠে—তোমার চোখে ব্যান্ডেজ কেন?

এবার আমিই বললাম, ও কিছু নয়, ঠিক হয়ে যাবে। ও একটা কর্নিয়া দিতে চাইছিল আর আমার বন্ধু মোজাম্মেল শিকদারের কর্নিয়া দরকার ছিল।

বাবা, তুমি কী বললে—কাজুওর চোখ তুলে নিয়েছ একটা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জন্য? বেসিক না সোনালী কোন ব্যাংকের যেন হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছে সেই মোজাম্মেল শিকদার।

আমি বললাম, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কি মানুষ না! মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় বড় কথা বলে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এটা-ওটা আদায় করে, এমন লোকের সংখ্যা কি কম নাকি? মোজ্জাম্মেলের কী দোষ। আমার বন্ধুমানুষ।

পুষ্প বলল—বাবা, তুমি ঠিক করোনি। পরক্ষণেই আরো যোগ করল—বাবা, তুমি অন্যায় করেছ।

আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বলি, ন্যায়-অন্যায়ের তুই কী বুঝিস? যে কথাটি কাউকে বলিনি তা হচ্ছে, মোজাম্মেলকে এমন তরতাজা কর্নিয়া জোগাড় করে দেওয়ায় পুরো দশ লাখ টাকা আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছে। টাকাটা কাজে লাগবে। কী করব এখনো ঠিক করিনি। বাড়িটা ডেভেলপারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা যদি না ভাবতাম, তাহলে আজই ইট-বালু-সিমেন্ট কিনে দোতলাটা পুরো করার কাজে হাত দিতাম।

তত দিনে দুটি ঘটনা ঘটেছে। লীলাবতীর দুবার ফলস পেইন ওঠার পরও বাচ্চা হলো না। ঠিক করল, দিল্লির কোনো এক হাসপাতালে ভর্তি হবে। বাচ্চা সেখানেই হবে। ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ, হাসপাতালে ভর্তির কাগজপত্র এবং এমন একটি প্রত্যয়নপত্রও যে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে থাকলেও দুই থেকে তিন ঘণ্টা আকাশভ্রমণ লীলাবতীর জন্য ঝুঁকির কারণ হবে না—সবই ব্যবস্থা করা হলো। কার মাধ্যমে ভিসা করাতে হবে এটাও।

তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিসা ফির বাইরে কত টাকা খরচ করলে দ্রুত ভিসা মিলবে, তা-ও জানা হয়ে গেল। এ কাজগুলো করে দিল লীলাবতীর ননদ, আতিকের ছোট বোন ফারজানা মুশতারি। তার সঙ্গে আতিকের যোগাযোগ সম্ভবত শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

লীলাবতী একাই গেল। গর্ভবতী এমন একটা মেয়েকে প্লেনে তুলে দিতে আমি মনের সায় পাচ্ছিলাম না। কিন্তু লীলা ফিসফিস করে বলল—বাবা, একেবারে চিন্তা করবে না, দিল্লি এয়ারপোর্টে আতিক আমাকে রিসিভ করবে।

আমি বললাম, তাহলে তো ভালো।

ভারতের সঙ্গে আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তি সম্ভবত নেই। তা ছাড়া আতিককে তাদের আলাদা করে চেনার দরকারই বা কী? আমি লীলাবতীকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত দিয়ে এসেছি। এয়ারপোর্টের টার্মিনালে ঢোকার আগে লীলা বলল—বাবা, তোমাকে বলি, দুটি খুনের একটাও আতিক করেনি। তবে এটা সত্য, নায়লা খাস্তগিরের সঙ্গে আতিকের একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, এর আগে নায়লার সম্পর্ক ছিল রশিদউদ্দিনের সঙ্গে। নায়লা দীর্ঘদিন নুরুদ্দিন মাহমুদ শামসের কেপ্ট ছিল, এই অ্যাপার্টমেন্টটাও তাঁর কাছ থেকে আদায় করেছে। কিন্তু সিআইপি যখন টের পেলেন, তাঁর কিনে দেওয়া অ্যাপার্টমেন্টে নায়লা ফষ্টিনষ্টি করছে অন্যদের সঙ্গে, তিনি তাকে ঘাড় ধরে বের করে দিচ্ছিলেন। সিআইপিকে প্রতিহত করার জন্য সে রশিদউদ্দিন ও আতিককে ফোন করে। দুজনই যায়। ঝগড়ার একপর্যায়ে ঠাণ্ডা মাথা ও কম কথার মানুষ নুরুদ্দিন মাহমুদ শামস পিস্তল বের করে নায়লাকে লক্ষ করে ট্রিগার টেপেন, নায়লা পড়ে গেলে তিনি আতিকের দিকে তাক করেন। রশিদ আচমকা সিআইপির ওপর লাফিয়ে পড়ে, পিস্তল কেড়ে নেয় এবং তাঁকে গুলি করে—যেভাবেই বলি না কেন, আতিককে বাঁচাতেই রশিদ এই কাণ্ডটা করেছে। দেখো বাবা, রশিদের কিন্তু আতিককেই গুলি করার কথা, কারণ নায়লা তখন আতিকের, আর রশিদ সাবেক।

আমি বারবার বলি, সাবধানে থাকিস। শরীরের যত্ন নিস। প্লেনে বাম্পিং হওয়ার অবস্থা হলে বালিশ আঁকড়ে ধরে রাখিস।

 

 

পনেরো

 

ভাড়া করা ট্যাক্সিতে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসছি। গাড়ি আমিও কিনব, হাতে আরো কিছু টাকা আসুক। আমি ফোনের কললিস্ট ধরে একটি নম্বরে সেন্ড বাটন টিপি। নারীকণ্ঠেরই জবাব—হ্যালো, কে বলছেন?

আমি আপনাকে একবার ফোন করেছিলাম পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দেখে। আপনিই কি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান?

জি, বিজ্ঞাপনটা আমারই।

আমার কৌতূহল—আপনি কোন বিষয় পড়ান?

কোন বিষয় পড়ালে আপনি সন্তুষ্ট হবেন, বলুন শুনি। স্যরি, তার আগে জিজ্ঞেস করা দরকার, আপনিও কি পাত্রী খুঁজছেন?

জি, আমিই।

আপনার স্ত্রী কি মৃত, না জীবিত? জীবিত হলে ডিভোর্সটা পাকাপাকি করেছেন তো?

এখনো করিনি। একটা কিছু চূড়ান্ত না করে করা কি ঠিক হবে? বোঝেনই তো, এত দিনের সংসার। আমি আপনাকে যে জন্য ফোন করেছি, সে কথাটা একটু বলে নিই। আপনি বিজ্ঞাপনে যে অনূর্ধ্ব ৬০ বছর বয়স্ক বলেছেন, এটা কি একটু রিকনসিডার করা যায়?

কী করতে হবে বলুন?

অনূর্ধ্ব ৬০-এর জায়গায় অনূর্ধ্ব ৬৫ বছর।

আপনার বয়স কি ৬৫ বছর?

জি, সার্টিফিকেটে।

তাহলে তো প্রকৃত বয়স আরো দুই বছর বেশি। আমার একান্ন, কিন্তু অ্যাকচুয়াল। তাহলে আপনার সঙ্গে আমার বয়সের ডিফারেন্স দাঁড়ায় ১৬ বছর। তার মানে তিন-চার বছরের মধ্যে আমাকে আবার পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দিতে হবে।

তিন-চার বছর? মাত্র তিন-চার বছর!

আমি আর কথা না বাড়িয়ে বলি—থ্যাংক ইউ, ম্যাডাম। থাক তাহলে, আমার মনে হয় আমি ঠিক মানানসই হব না। তা ছাড়া আপনার কথাটিও তো সত্য হতে পারে—আর তিন-চার বছর।

তিনি বললেন, আমার কথায় কিছু মনে করবেন না। ১২ বছর শিক্ষকতা করলেই নাকি মাথা নষ্ট হয়ে যায়, আমার তো ২৪ হলো। আমি ফিজিকস পড়াই। আসলে আমি একজন পার্টনার চাইছি, যিনি গায়ে খেটে আমাকে সাহায্য করতে পারবেন। আমি বাবার কাছ থেকে ১৭ কাঠার একটি কমার্শিয়াল প্লট পেয়েছি। এখানে মাল্টিস্টোরিড মার্কেট করব। আমি এমন একজনকে চাই, যিনি একদিকে আমার হাজব্যান্ড হবেন, অন্যদিকে আমার এই বিশাল প্রকল্পের সিইও হবেন। আপনি অনুগ্রহ করে আমাকে ভুল বুঝবেন না।

আমি বললাম, আমি তো নিজেকে প্রত্যাহার করেই নিয়েছি।

প্লিজ, নেভার মাইন্ড!

আমি কিছুই মনে করব না। তিনি আরো কঠিন কিছু কথা বললেও, এমনকি আমার যৌন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আমি চুপ করে থাকতাম। বরং আমার ভয়টা অন্য জায়গায়। ধরে নিচ্ছি, তিনি রাজি হয়ে গেলেন, পাত্রের বয়স অনূর্ধ্ব ৬০ থেকে বাড়িয়ে অনূর্ধ্ব ৬৫ করলেন, আমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, কোনো সমস্যা নেই—২১ দিন সময় দিলাম, সাহারা খাতুনকে ডিভোর্স দেওয়ার প্রসেসটা শুরু করুন। একটা উকিল নোটিশ দিয়ে আমাকে কপিটা দেখাবেন। তখন আমি কী করব? আমি কি সত্যিই উকিলের কাছে যাব?

কিংবা ধরা যাক, তিনি সাহারা খাতুনের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে বললেন—এই বয়সে বড় আপা আর যাবেন কোথায়। তাঁকে তালাক দেওয়ার কথা চিন্তাও করবেন না। আমি মানিয়ে নিতে পারব। বরং চলুন কাজি অফিসে, চুপচাপ নিজেদের বিয়ের কাজটা সেরে ফেলি।

তখন আমি কী করব? পদার্থবিজ্ঞানের এই শিক্ষিকাকে নিয়ে আমি কাজি অফিসে রওনা হব?

না, আমি কিছুই করব না। আমি পালিয়ে বেড়াব। তিনি ফোন করলেও আমি ধরব না। সাহারা খাতুনের বিরুদ্ধে কিছু ছোটখাটো অভিযোগ আমার রয়েছে। কিন্তু এর কোনোটাই তালাক দেওয়ার জন্য উপযুক্ত কারণ নয়।

তাহলে আমি পাত্র চাই বিজ্ঞাপন পড়ছি কেন? কেনই বা সাড়া দিচ্ছি, একি দুরারোগ্য ফ্যান্টাসি ব্যাধি?

 

ষোলো

 

তত দিনে দোয়েলের তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্ক কমে এসেছে। হোস্টেল থেকে বাড়িতে আসতে শুরু করেছে। কাজুওর সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মুখ ফসকে বলেও ফেলেছে, তোমাদের জাপানি বাবুর্চির রান্না তো ভালোই। কিংবা বাহ্! জাপানি মালিটা তো ভালোই বাগান করতে জানে।

একটি ভাঙা বড় চেয়ারের দুই পাশে অকেজো সাইকেলের দুটি চাকা বেঁধে এবং আরো কিছু জোড়াতালি দিয়ে কাজুও একটি রকিং চেয়ার বানিয়েছে। এটাতে বসলে ভেঙে পড়তে পারে। তখন অন্তত তিন মাস পঙ্গু হাসপাতালে পড়ে থাকতে হবে—এই আশঙ্কায় সবাই এটাকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু সরকারি দলের ছাত্রফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোলাগুলিতে ফিফথ ইয়ারের ছাত্রী নাতাশা কর্মকার গুলিবিদ্ধ হলে সবাইকে হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দোয়েল বইপত্রের ভারী বোঝা নিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখে, সামনের বারান্দায় বিদঘুটে ধরনের একটি রকিং চেয়ার। দোয়েল তাতে বসে এবং হাত-পা ছেড়ে দিয়ে দোল খায়।

বাহ্, বেশ আরামের তো! এ কথা বলে দোয়েল দোল খেতেই থাকে। যে কদিন বাড়িতে থাকছে, এই চেয়ার তার নিত্যসঙ্গী।

দোয়েল কাজুওকে আটকে বলল, ঘরের ভেতর কালো গগলস পরার মতো অরুচির কাজ জাপানিরা কেমন করে করে?

কাজুও বলল, অনুগ্রহ করে জাপানিদের এর মধ্যে টানবেন না। আমার চোখে সামান্য একটা সমস্যার কারণে চশমা দিয়ে রাখতে হয়েছে।

দেখি কী হয়েছে বলে এক টানে তার চশমাটা খুলে দোয়েলও চিৎকার করে ওঠে। তোমার এক চোখে ব্যান্ডেজ কেন?

পুষ্প কারণটা ব্যাখ্যা করে—বাবা খুব বাজে একটা লোককে একটি চোখের কর্নিয়া দিতে এই বোকা জাপানিটাকে বাধ্য করেছে।

কাজুও বলে, আসলে দুটি চোখের তো দরকার হয় না। পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা দেখার জন্য একটি চোখই যথেষ্ট। দোয়েল রাগে ফুঁসছিল। তারপর ‘একটি চোখই যথেষ্ট’—এই কথাটি নিজ মুখে একবার বলে কাজুওর গালে কষে এক চড় বসিয়ে দেয়। তারপর বলতে থাকে, অই জাপানির বাচ্চা! তুই একটা কুত্তা, তুই একটা শুয়োর—আমি তোকে ঘেন্না করি। তুই এ জীবনে আর কোনো দিন খাবার নিয়ে আমার হোস্টেলে আসবি না। যদি আসিস, আমি ছাত্রফ্রন্টের পাণ্ডাদের দিয়ে তোকে জনমের মার খাওয়াব, তখন বাপের নাম ভুলে যাবি।

তেজস্ক্রিয়তার ভয় তুচ্ছ করে দোয়েল বাড়ির এরুম থেকে ওরুমে ছুটল এবং চিৎকার করে সবাইকে বকাঝকা করতে করতে বলল—তোমরা অমানুষ, তোমরা ডাকাত, বাবা একটা কসাই। একটা আহাম্মক জাপানিকে পেয়ে তোমরা একের পর এক তার সর্বনাশ করে চলেছ। আল্লাহ তোমাদের ওপর গজব নাজিল করবেন। মনে রেখো, আমি এই কথা বলে দিলাম।

সাহারা খাতুন দোয়েলকে বলল, আমি আসলে বুঝতে পারিনি কখন এত বড় সর্বনাশটা হলো। শুধু তোর বাবাই জানত।

সাহারা মিথ্যা বলেনি। আমি জানতাম, আর জানত কাজুও। দোয়েলকে কিছুটা মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স পড়তে হয়েছে। পেনাল কোডের কয়েকটি ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে তার বক্তব্যকে পোক্ত করতে শিখেছে।

অত্যন্ত ক্ষিপ্ত দোয়েল চেঁচিয়ে সবাইকে বলল—আমি তোমাদের শেষবারের মতো সাবধান করে দিচ্ছি। যদি কাজুওর শরীরের আরেকটা কিছুতে তোমাদের কারো হাত পড়ে, আমি এক কোপে সেই হাত কেটে ফেলব। আমি পেনাল কোডের ৩২৬ ধারায় তোমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেব। পার্মানেন্ট ডিসফিগারেশনের শাস্তি বড় কঠিন—মনে রেখো।

সে রাতটা দোয়েল খুব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে। একবার দেখলাম, সে হাতে দা নিয়ে ঘুরছে আর বিড়বিড় করছে, আমি নিজেই জাপানির বাচ্চাটাকে খুন করব। কোরবানির গরুর মতো জবাই করে মাথাটা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলব। কাজুও আমাকে চেনে না।

সে রাতে পুষ্প ছিল না। কলেজ থেকে স্টাডি ট্যুরে কক্সবাজার গেছে। এবারেরটা তেমন মজার ট্যুর হওয়ার কথা নয়, কারণ দুদিন তাদের রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে কেস স্টাডি রিপোর্ট লিখতে হবে। পুষ্প থাকলে তার সঙ্গে কথা বলে রাগটা কিছুটা কমাতে পারত।

দোয়েল কতক্ষণ ঝিম মেরে বারান্দায় কাজুওর বানানো রকিং চেয়ারে বসে থাকে, একটুও দোল খায়নি। মনে হয়, মেজাজ একটু শান্ত হয়ে এসেছে।

দোয়েল রান্নাঘরে যায়। মাশরুম ও বেবি কর্ন মিশিয়ে একটা স্যুপ বানায়। স্বচ্ছ ক্রিস্টাল বাটিতে স্যুপ নিয়ে কাজুওর রুমের দিকে যখন এগোয়, আমার মেজাজ চড়ে যায়। আমি ধমকে উঠে বলি, কাজের মানুষ, স্যুপ খাইয়ে মাথায় তোলার দরকার নেই।

দোয়েল আঁতকে ওঠে। হাত থেকে মেঝেতে পড়ে স্যুপভর্তি কাচের বাটি ভেঙে খানখান হয়ে যায়। স্ফটিকাকার কাচ এভাবে ভাঙার কথা নয়। হয়তো কাচে ভেজাল ছিল।

শব্দ শুনে কাজুও বেরিয়ে আসে। দোয়েলকে বলে, আপনি খালি পায়ে কেন? এক্ষণ স্যান্ডেল পরুন। কাচে পা কাটবে, কাচের গুঁড়া পায়ের পাতায় ঢুকলে বের করা কষ্টকর হবে। আপনি সরুন, আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন, সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি। জাস্ট ফাইভ মিনিটস।

দোয়েল চেঁচিয়ে বলে—তুই ভাগ, গাধার বাচ্চা গাধা। তোর তো তিন সপ্তাহ কমপ্লিট বেডরেস্টে থাকার কথা, আজ মাত্র তিন দিন। তুই এক্ষণ রুমে যা। এ বাড়িতে মানবতা বলে কিছু নেই। আমি জানি, দোয়েলের শেষের বাক্যটি আমাকে উদ্দেশ করে বলা। আমার মানবতা বলে কিছু নেই। কিডনি নিলাম, চোখ নিলাম—আরো কী কী নেব ভাবছি। অনাদরে অন্য বাড়িতে অন্যের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা নয়নাকে কিছু একটা দিতে পারলে ভালো হতো। আমি নয়নার মায়ের সঙ্গে কথা বলি। জানতে পারি, তার শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক আছে, সমস্যা শুধু বাঁ স্তনে। একটি গুটলি ক্রমেই বেড়ে উঠছে, বায়োপসির ফলাফলও ভালো নয়, হয়তো ক্যান্সারই। এমনিতে সিলিকন ব্রেস্ট ইমপ্লান্টেশনের কথা শুনেছি; কিন্তু কারো স্তন কেটে অন্যের স্তনে বসানোর কথা কখনো শুনিনি। যদি পারাও যায়, স্তন পাব কোথায়? কাজুওর তো স্তন, যোনি, গর্ভাশয়—এসব নেই। কাজুও পুরোদস্তুর পুরুষ। দোয়েলের কথায় কান দিলে চলবে না। আমার বাঁ হাঁটুর মালাইচাকিতে ফাটল ধরেছে। এটা পাল্টাতে তো সমস্যা নেই। বেশ, তা-ই হবে।

কাজুও কাচের গুঁড়া পরিষ্কার করছে, দোয়েল হাতে দা নিয়ে রকিং চেয়ারে না দুলে ঝিম মেরে বসে আছে। আমার ভয় লাগছে।

 

 

সতেরো

 

কাজুও ইশিগুরোর জীবনের বাকি কাহিনিটুকু আমি শোনাব। আমি দোয়েল, আমার বাবা আর সাহারা খাতুনের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান।

আমার বাবাকে খুন করার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। দা নিয়ে বসে ছিলাম। এর পরিণতি ভালো হতো না, আমি জানি। কাজুও আমাকে শিখিয়েছে—ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের মাঝখানের লম্বা আঙুলটি কিছুক্ষণ ভালো করে চেপে ধরে রাখলে রাগ কমতে থাকবে, এমনকি খুন করার ইচ্ছা থাকলে তা-ও। অনেকক্ষণ আঙুল চেপে ধরে রেখে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, আমার ঘুম এসে যায়। কিন্তু ঘুমাইনি। আমার বাবা হাবাগোবা জাপানিটার সঙ্গে কসাইয়ের আচরণ করে চলেছে—শাণ দেওয়া ছুরি নিয়ে বসে আছে, যা দরকার তার শরীর থেকে কেটে নিয়ে নেবে। আমার বাবা একটা জল্লাদ।

স্যুপের বাটিটা হাত থেকে পড়ে গেলে ভীষণ শব্দ হয়। কাজুও উঠে পড়ে। তার বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও আমাকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই কাচের গুঁড়া পরিষ্কার করে, তারপর নিজের রুমে চলে যায়।

আমার রাগ কিছুটা পড়ে আসতে চোখ যায় সকালের খবরের কাগজের ওপর মার্কারের দাগের দিকে। একটি পাত্র চাই বিজ্ঞাপন—নিশ্চয়ই বাবা হাইলাইট করে রেখেছে।

‘এক কন্যাসন্তানের জননী, মধ্যবয়সী, সংগত কারণে স্বামীকে তালাক দেওয়া, পুনরায় বিবাহ করতে চাই। পাত্রের ঢাকা শহরে থাকার জায়গা থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন। পাত্রের দাড়িতে আপত্তি নেই।’

বাবার হাইলাইট করার কারণে শেষ পঙিক্তটি জ্বলজ্বল করছে : পাত্রের দাড়িতে আপত্তি নেই। তার মানে এই কথাটা বাবার পছন্দ হয়েছে।

বাবা সারা জীবনই ক্লিন শেভ করা একজন মানুষ। মাস তিনেক ধরে কোনো কাজ করার সময় ডান হাতটা কাঁপে। দু-এক দিন শেভ করতে গিয়ে গাল কেটে ফেলেছে। সম্ভবত সে কারণেই আর দাড়ি কাটছে না। সেই পাত্রী যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করুক। কিন্তু বাবা এটা মার্কার দিয়ে দাগাতে যাবে কেন? বাবা মাকে ছেড়ে দেবে—এমন কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখিনি। যদি ছেড়েই দেবে, তাহলে কি কাজুওর কিডনি তুলে এনে ওটা দিয়ে মায়েরটা অপসারণ করে?

তাহলে ব্যাপারটা কী?

আমি কিচেনে ফিরে গিয়ে আবার স্যুপ বানাই। অন্য একটি বাটিতে ঢেলে সন্তর্পণে কাজুওর ঘরে ঢুকি। এত রাতে বাবার জেগে থাকার কথা নয়। আমি কাজুওর ঘরে ঢুকেছি, এটা বাবা দেখুক আমিও চাই না। কাজুও ঘুমাচ্ছে।

আমি এই প্রথম একজন ঘুমন্ত বিদেশি দেখলাম, সিনেমায় নয়, আমাদের বাড়িতেই, পুরনো স্টোররুমটাতে। জাপানিরা কি একটুখানি হাঁ করে ঘুমায় নাকি। সাইড টেবিলে স্যুপের বাটিটা রেখে আমি কাজুওর গালে আলতো করে স্পর্শ করি। গালটা গরম। কপালে হাত রাখি—বেশ গরম। তার মানে জ্বর। আমি ডান হাতের তালু উল্টে গলায় হাত রাখি। কাজুও চোখ খোলে। আমাকে দেখে হুড়মুড় করে উঠে বসে। আমি ধমকের স্বরে বলি—শুয়ে থাকো, আমি তোমার গাটা স্পঞ্জ করে দিই। টেম্পারেচার বেশ, ইনফেশন আছে।

কাজুও বাচ্চা ছেলের মতো কাতর কণ্ঠে বলে—প্লিজ! এ ঘর থেকে চলে যান। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। আমার শরীরে যথেষ্ট তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে। ক্যান্সারাস রেডিয়েশন।

চুপ করো, স্যুপটা খাও।

প্লিজ! আপনি চলে যান। স্যার রাগ করবেন।

চুপ! একেবারে চুপ!

আমার একটা পুরনো ওড়না ভিজিয়ে স্পঞ্জ করার চেষ্টা করি। কাজুও আমাকে রেডিও-অ্যাক্টিভ আইসোটোপের ভয় দেখায়।

কাজুও বলল, এটাই তার প্রথম জ্বর। এটা ওয়ার্নিং। তার মিশন কমপ্লিট করতে হলে কমপক্ষে শরীরের তিনটা অর্গান কাউকে না কাউকে দিতে হবে। তার হাতে নাকি সময় খুব কম।

আমি বললাম, তোমার শরীরের বাকি যা আছে, আমি সব চাই।

মানে? শব্দটা সে উচ্চারণ করেনি। কিন্তু এটাই বলতে চেয়েছে। আমি আমার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে তার মাথা, বুক, হাত, পেট, শরীরের এপাশ-ওপাশ, পা, পায়ের পাতা, করতল—সব স্পর্শ করি এবং বলতে থাকি—এটা চাই, এটা চাই। এভাবে আলতো করে হলেও কাপড়ের ওপর দিয়ে তার শিশ্ন স্পর্শ করি—আমি এটাও চাই।

কাজুও বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি মেডিক্যাল থার্ড ইয়ার। বয়স ২১। কাজুওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কত?

সাড়ে ছাব্বিশ। কিন্তু আমাকে কি বুড়ো দেখায়?

না তো, আমি তো ভেবেছি টোয়েন্টিফোর।

আমার সেকেন্ড প্রফেশনাল ফাইনাল সামনে। বাসায় আসব না প্রায় এক মাস। আমার একটি পুরনো কম দামি মোবাইল ফোনে একটা সিম ঢুকিয়ে আমার ফোন নম্বরটা তুলে দিয়ে বললাম, প্রতি রাতে বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে ফোন করব। তেমন কথা নয়, শরীর কেমন, কী খেয়েছ—এসব জিজ্ঞেস করব। তিন দিন পর পর ব্যাটারি চার্জ করালেই চলবে।

পরীক্ষার পড়া আর শেষ হতে চায় না। এক-দু মিনিট কথা বলি। জিজ্ঞেস করি, তুমি কি টোকিওর ডিজনি ওয়ার্ল্ডে গেছ? বলে, না। একদিন জিজ্ঞেস করি, তোমার কি কোনো জাপানি কিংবা ইংলিশ গার্লফ্রেন্ড ছিল কিংবা আছে? জবাব দেয়, না। প্রশ্ন করি, বিয়ে করলে তুমি কী চাও—প্রথমটা ছেলে না মেয়ে? কাজুও বলে, নো বেবি। নো ম্যারেজ।

তেত্রিশতম দিনে বাসায় ঢোকার সময় দেখি, কাজুওর হাঁটুতে বড় ধরনের ব্যান্ডেজ।

আমি নিশ্চিত, একটা অঘটন ঘটেছে। মা বলল, তোর বাবার হাঁটুর অবস্থা খুব খারাপ ছিল, কাজুওর হাঁটু খুলে লাগিয়েছে। এটাকে বলে নি রিপ্লেসমেন্ট। এখন তো বেশ হাঁটতে পারে। সামনের মাস থেকে গল্ফ খেলবে বলেছে। জাপানিদের অর্গান একেবারে নাম্বার ওয়ান।

আমি আবার চেঁচিয়ে উঠি—কসাই, তোমরা কসাই! তারপর রাগের মাথায় জাপানিটাকে যাচ্ছেতাই গালাগাল দিই, কষে একটা চড়ও মারি। বলি, তুই মর। সে রাতে হয়তো আরো কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য তার ঘরে গিয়ে দেখি, আমার ফোনটা হাতে নিয়ে বিষণ্ন মনে কাজুও বসে আছে।

আমি বলি—কাজুও, আই অ্যাম স্যরি। আমি রাগটা সামলাতে পারিনি। আমি তোমাকে মারতে চাইনি। মুখ ঘুরিয়ে কাজুও বলল—নো প্রবলেম, ইটস ওকে, ইটস ওকে। আমিও ঘুরে তার দিকে তাকিয়ে দেখি, আনত চোখ দুটি অশ্রুছলছল।

অদ্ভুত আবেশ তখনই আমার চোখ কান্নায় ভরে দেয়। আমি কাজুওকে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি। আমাকে সকালেই ক্লাসে চলে যেতে হবে, তারপর টানা কদিন হোস্টেলে। আমি ভেতর থেকে কাজুওর ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে আলোর সুইচ অফ করে তাকে টেনে বিছানায় নিয়ে এসে বলি, তোমার সঙ্গে আধাঘণ্টা শুয়ে থাকব।

কাজুও বলল—নো নো, ইউ মাস্ট নট। আপনি আমার সঙ্গে শোবেন না। আমি হাইলি রেডিও-অ্যাক্টিভ।

আমি বলি—চুপ, একটি কথাও না। আমি এ বছরই তোমাকে বিয়ে করব, ডিসেম্বরে। তারপর জাপান চলে যাব। কাজুও আমাকে বাধা দিতে থাকে। আমি বলি, তাহলে কালই তোমাকে বিয়ে করব।

সে রাতে কাজুওর সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়নি। কিন্তু একজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে যা যা হওয়া সম্ভব, তার বাধা সত্ত্বেও সবই হয়েছে। আমি যখন সন্তর্পণে তার রুম ছেড়ে যাই, তখন রাত সাড়ে তিনটা। সে রাতে কাজুও ভীতু মেয়েমানুষের মতো বলে ফেলে—যদি আপনি প্রেগন্যান্ট হয়ে যান? আমি তাকে মিথ্যা বলি—আমার সেফ পিরিয়ড চলছে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কথাটা যে সত্য নয়, আমি তো জানি। কাজুও বলল, তার পরও যদি ঘটে যায়, প্লিজ! ডিসকন্টিনিউ ইট। আমার জিন ক্রমোজম নিয়ে বাচ্চাটা ২৭ বছরের বেশি বাঁচবে না। দ্যাটস আওয়ার লিমিট! মানে? আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছি, জাপানিরা মানে নাগাসাকির লোকজন খুব আজগুবি কথা বলে। হতে পারে, এটা অ্যাটমিক রেডিয়েশনের ফল। আমি হোস্টেলে চলে যাই।

একুশতম দিন সন্ধ্যায় কাজুও হোস্টেলে এসেছিল, আমি অবেলায় ঘুমাচ্ছিলাম। হোস্টেলের খালারা ডাকাডাকি করেছে, না ওঠায় কাজুওকে বলেছে, নেই। তার রান্না করা খাবারের বাটি রেখে গেছে। আমি রাত বারোটার পর ফোন করি। ঠিক করে রেখেছি, আমি বলব—কাজুও, আমি নেক্সট যেদিন আসব, তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব—জাস্ট থার্টি মিনিটস। ওটা আবার করব, আমার খুব ভালো লেগেছে। ফোন বারবার একই কথা শোনায় : এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন।

পরদিন মধ্যরাতে আবার ফোন করি। আজ বলব—শোনো কাজুও, আমি তোমার শরীরের সব জায়গায় চুষে চুষে চুমোর দাগ বসিয়ে দেব। এটা হচ্ছে আমার সিলমোহর। তার মানে তোমার শরীরের বাকি যা কিছু আছে, সবই আমার। নাগাসাকির কাজুও ইশিগুরো, তুমি আমার। তোমার সঙ্গে আমার ওটা করতে ইচ্ছা করছে।

কিন্তু ফোন একই কথা বলে।

আমার মনে হয়, বোকাটা সম্ভবত ফোনটা হারিয়ে ফেলেছে। ব্যাটারিতে চার্জ নেই। এমনও হতে পারে, ফোনটা কাজুওর খাটের নিচে পড়ে আছে।

আমি পরীক্ষা শেষ করে সাত দিন পর ফিরে আসি। কোথায় পালাবে কাজুও। আজ রাতে পনেরো মিনিটের জন্য হলেও তোমার সঙ্গে শুয়ে থাকব।

কে কী মনে করবে—এসব না ভেবে প্রথমেই কাজুওর রুমে ঢুকি। আলো জ্বালি। নেই। বিছানার ওপর পড়ে আছে আমার পুরনো মোবাইল সেট।

পুষ্পকে জিজ্ঞেস করি, জাপানিটা কোথায়?

পুষ্প বলে, কাজুওর ব্যাগে একটা জাপানি হাতপাখা ছিল। ওটা মাকে দিয়েছে। আমাকে দিয়েছে চপস্টিক আর নিজের হাতে মেরামত করা গিটার।

মানে?

পুষ্প বলে, নেই?

কোথায় গেছে অসুস্থ মানুষটা। একটা চোখ নেই, একটা কিডনি নেই, হাঁটু নেই।

বাবা আমাদের ফ্যামিলির সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে—কারো কোনো অর্গান, মানে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দরকার কি না? কেউই সাড়া দেয়নি। মানে দরকার নেই। বাবা তখন একটি কিডনি, একটি চোখ, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, টেস্টিস—সবসহ নগদ ৪১ লাখ টাকায় জাপানিকে বিক্রি করে দিয়েছে। দেখিসনি, আমাদের বাড়ির পেছন দিকটায় ইট-বালু আনা হয়েছে, গাড়ির গ্যারেজ তৈরি হচ্ছে। এ সপ্তাহেই বাবা গাড়ি কিনবে, খুব ভালো জাপানি গাড়ি। বাবা বলেছে, গাড়ি পছন্দের সময় দাম দেখে কিপ্টেমি করলে চলবে না।

আমি নির্বাক তাকিয়ে থাকি পুষ্পর দিকে।

পুষ্প বলে, কাজুওর নিজেরও তাড়াহুড়ো ছিল। তার বয়স ২৭ বছর হয়ে গেলেই নাকি শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। যা যা দরকার, সাতাশের আগেই নিয়ে নিতে হবে। কাজুও নিজেই বাবাকে চাপাচাপি করছিল।

পুষ্প বলল, তুই রেডিয়েশন নিয়ে কাজুওর সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছিস। মা বলেছে, তুই চড়ও মেরেছিস। এ জন্যই তোকে কিছু দেয়নি।

আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।

আমি পিরিয়ড মিস করেছি এক মাসেরও বেশি হয়ে গেছে। আজ সকালেই নিজের প্রেগন্যান্সি টেস্ট করালাম—পজিটিভ।

আমি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম, আমাকেও দিয়েছে। পুষ্প জিজ্ঞেস করল, কী?

আমি বললাম, আরেকটা স্পেয়ার মানুষ। আমার পেটে।



মন্তব্য