kalerkantho


সায়েন্স ফিকশন

অতিপ্রাকৃত কাহিনি শীতাবিবি

ধ্রুব এষ

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



অতিপ্রাকৃত কাহিনি শীতাবিবি

অঙ্কন : আসিফুর রহমান

হাটখোলায় বিজনকে দেখব ভাবিনি।

তা-ও এ রকম একটা শীতের রাত দশটায়। কি এগারোটায়ও হতে পারে। কি বারোটায়ও হতে পারে। সময়জ্ঞান থাকে না মাতালদের। হাতে ঘড়ি থাকলেও না, সঙ্গে মোবাইল ফোন থাকলেও না। সময় দেখে কে? বেহেড মাতাল ছিলাম আমি আর সহিদুল। তেলেগু কলোনির গঙ্গার ঠেকের বাংলা। তিন গ্লাস আর অর্ধেক গ্লাস করে। সঙ্গে পবিত্র আগাছার সিগারেট। ধরেছিল বেজায়। গঙ্গার ঠেক টলছিল, হাটখোলা টলছিল।

সহিদুল আর আমি চারুকলার বন্ধু। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে সহিদুল ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ে, আমি প্রিন্ট মেকিংয়ে বিএফএ, এমএফএ করেছি। সহিদুল সরকারি চাকরিজীবী হয়েছে, স্কুলের মাস্টার। আমি কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হয়েছি। ডিজাইন লে-আউট করি একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। এচিং, উডকাট করি না আর। সহিদুলও পেইন্টিং করে না। তবে এ নিয়ে কোনো প্রকার হায়-আফসোস নেই আমাদের। আর্টিস্টের ইনস্টিংক্টই আমাদের নেই হয়তো। কী করব? সন্ধ্যার পর আমরা হাটখোলা যাই, গঙ্গার বাংলা খাই এবং গান গাই। গান তো না, হুক্কাহুয়া। আমাদের এই হুক্কাহুয়া সিক্সটিজের ‘লিটল রিভার ব্যান্ডের’ কনসার্ট হয়ে যায় ঠেকে। হুক্কাহুয়া দিয়ে ওঠে আর সব শিয়ালও। ঠেকের শিয়াল। সে বিকট ক্যাওস হয় এক। ছাত্রনেতা, কবি, ট্রাক ড্রাইভার, আর্টিস্ট, বীমার দালাল, আড়তের মহাজন—কে না থাকে সেই ক্যাওসে।

সেদিন হুক্কাহুয়া বেজায় জমেছে।

আজম খানের ‘সালেকা মালেকা’ ধরেছিল সহিদুল।

 

ওরে সালেকা

ওরে মালেকা

ওরে ফুলবানু

পারলি না বাঁচাতে...।

হুক্কাহুয়া!

হুক্কাহুয়া!

সাঁঝের বেলায়

নদীর তীরে

সেই যে গেল

এলো না ফিরে...।

হুক্কাহুয়া।

হুক্কাহুয়া!

 

সময়গময় কে দেখে আর! সতেরো-আঠারো বছর আগের ঘটনা বলছি। মিলেনিয়াম বলে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে কিছুদিন আগে। এক শতাব্দী আরেক শতাব্দীতে পড়েছে। এই উপলক্ষে মিলেনিয়াম ডুম বানানো হয়েছে লন্ডনে। উৎসব-উল্লাসে কয়েক দিন মাতোয়ারা ছিল দুনিয়া। আমাদের দেশটা কি দুনিয়ার বাইরে নাকি? আমরাও শামিল হয়েছি, মাতোয়ারা হয়েছি। মিলেনিয়াম! মিলেনিয়াম। জিন্দাবাদ মিলেনিয়াম! দেশের অবস্থা এদিকে কেরোসিন। একদল আছে ক্ষমতায়, একদল সরকার পতনের আন্দোলন করছে। নিয়মিত ও নিয়মমাফিক হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন হচ্ছে। ভোগান্তির শেষ নেই সাধারণ মানুষের। গঙ্গার ঠেকে অলিখিতভাবে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা নিষেধ, কিন্তু দেশের এমন পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা মানে কে আর?

‘সালেকা মালেকা’র আগে সেদিন সন্ধ্যায়ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও বাগিবতণ্ডা হয়েছে কিছু। ঠাটারীবাজারের কসাই আজিজ ভাই জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছেন। ‘তারা আন্দোলন করবে, জ্বালাও-পোড়াও করবে, ক্ষমতায় যাবে, পাবলিকের কী? পাবলিক তো যেই গ্লাস হেই বাংলা। হরতাল দেয়, আবরোধ করে! আরে দুই গ্লাস বাংলা খায়ে যা গঙ্গার! দেখবি তোরাই দেশের পেসিডেন।’

সহিদুল বলেছে, ‘হক কথা বলেছেন, আজিজ ভাই। হক কথা। হক কথা।’

বীমার দালাল আতাইকুলার মনসফ ভাই বলেছেন, ‘হক মাওলা কথা বলেন, ভাই।’

তুমুল জিগিরের মতো হয়েছে, ‘হক মাওলা কথা! হক মাওলা কথা!’

মদ্যপানের লাইসেন্স আছে আমাদের। বাধ্য হয়ে এরশাদ আমলে করিয়ে নিয়েছি। রিনিউ করিয়ে নিই মেয়াদ থাকতে থাকতে। এই এক লোক, লে. জে. হু. মু. এরশাদ, সর্বনাশ করে গেছে দেশ ও দশের। সরকারিভাবে অনুমোদিত মদ-গাঁজার আবগারি দোকান ছিল আগে। দেশের সর্বত্র। লে. জে. হু. মু. এরশাদ সব বন্ধ করে দেওয়ায় ফেনসিডিল আর হেরোইন ঢুকেছে দেশে। ডাইলখোর, হেরোইনখোরে ভরে গেছে দেশ। ব্যাঙের ছাতার মতো দেশের সর্বত্র মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গজাচ্ছে। ব্যবসা। হোক। তাতে কী? আমরা কী চাই?

আমরা শুধু চাই রাস্তাঘাটে পুলিশ আমাদের না ধরুক, হেনস্তা না করুক। ধরেছিল একদিন। ভ্যানে উঠিয়ে নিচ্ছিল প্রায়, এই সময় পকেটের সর্বস্ব দিয়ে আট শ চল্লিশ টাকায় একটা রফা করে সহিদুল। পরদিনই নারকোটিকস ডিপার্টমেন্ট থেকে মদ্যপানের লাইসেন্স নিয়ে নিই আমরা। দরকার কি হাঙ্গামার? পুলিশের ঝামেলা আমাদের ভালো লাগে না। আরো একটা জিনিস, যখনকার কথা বলছি, তখন পর্যন্ত আমরা অ্যাভয়েড করে আছি। মোবাইল ফোন বলে একটা জিনিস। অনেকেই কিনছে। নেটওয়ার্ক থাকলেই হলো। যেখান-সেখান থেকে কথা বলা যায়। আমাদের এত কথা বলার নেই, বাবা! আমাদের যা বলার আমরা গঙ্গার ঠেকে বলি। আনসেন্সরড বলি, যা মনে হয়।

সালেকা-মালেকা হুক্কাহুয়ার পর আরো আধাগ্লাস করে নিয়ে সেদিনকার মতো আমরা গঙ্গার ঠেক থেকে উঠেছি। কলোনির গেটেই রিকশা ছিল কয়েকটা। সব সময় থাকে। এই শীতের রাতে চাদর, সোয়েটার, বানরটুপি,       মাফলার—যে যার মতো শীত আটকানোর ব্যবস্থা করে বসে আছে রিকশাওয়ালারা। রঙ্গ-তামাশাও করছে নিজেদের মধ্যে। আমি যাব শেখ সাহেব বাজার, সহিদুল জিগাতলায়। আমাকে নামিয়ে দিয়ে যাবে সে। মাতালরা রিকশা ভাড়া বেশি দেয়, তা-ও কোনো রিকশাওয়ালা আমাদের শীতকাতর আরজি শুনল না। এই শীতে তারা যাবে না এত দূর। এখানে বসে আছিস কেন তবে,    শালারা? যা না, বউ-বিবির সঙ্গে লেপ্টে শুয়ে থাক গিয়ে!

সহিদুল বলল, ‘হাঁটবি?’

‘আরে না। রিকশা পাব। এখানেই পাব।’

‘চেন পড়ে যদি রিকশার?’ বলে মাতাল সহিদুল হাসল।

আমিও হাসলাম।

এটা একটা ঘটনা। কয়েক মাস আগের। বৃষ্টির দিন এবং রাত ছিল। রাত এইতো দশটা কি এগারোটা, কি বারোটায়, ঝুপঝুপ বৃষ্টির মধ্যে গঙ্গার ঠেক থেকে বেরিয়ে আমরা ঠিক এখান থেকেই একটা রিকশা ঠিক করে উঠেছিলাম। শেখ সাহেব বাজার হয়ে জিগাতলা যাবে, আজব রফা, আটষট্টি টাকা। এসব যে কী করে পারে সহিদুল! জিগাতলায় নেমে তো ওই সত্তর টাকাই দেবে, নাকি। এক শ টাকাও দিয়ে দিতে পারে।

যাক। তেলেগু কলোনি ছেড়ে সেদিন নির্মাণাধীন রাজধানী মার্কেট পার হচ্ছি মাত্র, প্রথমবারের মতো চেন পড়ল রিকশার। রিকশাওয়ালা নেমে চেন ঠিক করল। গুলিস্তান দিয়ে যাবে। আবার চেন পড়ল জয়কালী মন্দির রোডের হোটেল সুপারের সামনে। আবার কিছুদূর গিয়ে পড়ল ফুটপাতের এক জড়িবুটির দোকানের সামনে। মজা পেয়ে গেলাম আমি আর সহিদুল। খেঁক! খেঁক! খেঁক!...খেঁক! খেঁক! খেঁক! রিকশার চেন পড়ে আর আমরা হাসি।

খেঁক! খেঁক! খেঁক!

রিকশাওয়ালার অবস্থা করুণ-কেরোসিন। আঠারো-উনিশবার চেন পড়ে গেল গুলিস্তান সিনেমা হল পার হওয়ার আগেই। রিকশাওয়ালা পারলে কেঁদে দেয়। হাতে-পায়ে ধরে। 

‘আপনেরা নাইমা যান, স্যার!’

‘আরেকটা রিকশা লইয়া যান গিয়া, স্যার!’

‘আমি আর পারুম না, স্যার।’

‘স্যার!’

‘স্যার!!!’

করুণ রিকশাওয়ালার কথা শোনে কোনো মাতাল? কোনোকালে শুনেছে?

রিকশাওয়ালা যত কাতর হয়, সহিদুল তত ভুজুংভাজুং দিয়ে তাকে বোঝায়, ‘যাও না, মিয়া। আর তো এইটুক।’

মারকুটে সংগ্রামী রিকশাওয়ালা না, নিরীহ অতিশয়। সহিদুলের ভুজুংভাজুং শুনে বেচারা আবার রিকশা টান দেয় এবং আবার এবং আবার চেন পড়ে রিকশার। আবার চেন পড়ে। পড়তেই থাকে। চারবারের পর থেকে আমরা হিসাব রাখছিলাম। শেখ সাহেব বাজার পর্যন্ত যেতে পাক্কা ছিয়াশিবার চেন পড়ল। আমার সঙ্গে থেকে যাবে বলে রিকশাওয়ালাকে মুক্তি দিল সহিদুল।

শেখ সাহেব বাজারে আমি থাকি খাজা আর্ট প্রেসের আগের গলিতে। তিনতলা হলুদ বিল্ডিংটার দোতলায়। এলাকার সমাজসেবক এ টি এম মহসিন ভাইয়ের বাড়ি এটি। এ টি এম মহসিন ভাই অবশ্য এই জীর্ণদশা বাড়িতে থাকেন না। মহল্লার বিরোধীদলীয় নেতা। দল আর কখনো ক্ষমতায় গেলে এলাকার সংসদ সদস্য হয়ে যেতে পারেন। থাকেন ধানমণ্ডি ১৯ নম্বরে। ছয় কাঠা জমির ওপর অট্টালিকা। বিগত সরকারের আমলে করেছেন। বিলকিস ভবন। এ টি এম মহসিন ভাইয়ের অকালপ্রয়াত প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল বিলকিস। আজব ব্যাপার, দ্বিতীয় স্ত্রীর নামও বিলকিস। ভবনের নাম নিয়ে তাই সমস্যা বাধেনি। শেখ সাহেব বাজারের বাসার নিচতলায় সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অফিস এ টি এম মহসিন ভাইয়ের। সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের তাগিদে ভাই রোজ বিকেলে একবার আসেন এলাকায়। অফিসে বসেন। এলাকাবাসীর অভাব-অভিযোগ শোনেন। আশ্বাস দেন, অর্থকড়ি দেন। মহল্লায় ঢুকলেই দেয়ালে দেয়ালে তাঁর ছবিসহ পোস্টার দেখা যায়—

‘এ টি এম মহসিন ভাইয়ের দুই নয়ন

এলাকাবাসীর উন্নয়ন।’

এমনি মানুষটা দিলখোলা আছেন। মহল্লার সিনিয়র ভাই কবি আসলাম সানীর রেফারেন্সে আমাকে থাকতে দিয়েছেন তেতলায়।

‘সানী ভাই যখন কইচে, থাকো মিয়া। ভাড়াভুড়া যা মনে হয় দিয়ো।’

দোতলায় থাকত আরো কয়েকজন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা গাঢাকা দিয়েছে তুরন্ত। রাতে এখন হানাবাড়ির মতো দেখায় বিল্ডিংটা। বিল্ডিংয়ের দারোয়ান সাদেক মুরব্বি বিরাট গাঁজাখোর। থাকে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অফিসে। থাকে, ঘুমায়। সামাজিক কর্মকাণ্ড করে এ টি এম মহসিন ভাই চলে গেলেই গাঁজার কলকি নিয়ে বসে নিশ্চিন্তে। দম দিয়ে ঝিমায়, নয় ঝিম খায়। নেত্রকোনার বারহাট্টা অঞ্চলের মানুষ। ভালো মানুষ আছে এমনিতে। বিল্ডিংয়ের গেটের একটা স্পেয়ার চাবি আমাকে নিজ দায়িত্বে বানিয়ে এনে দিয়েছে। নেশার আরামের মধ্যে হুজ্জত চায় না।

গেট খুলে খেঁক খেঁক করতে করতে সেদিন তেতলায় উঠেছিলাম আমি আর সহিদুল।

দেড়-দুই মাস পর আরেক ঘটনা। সহিদুল গেছে দেশের বাড়িতে, আমি সন্ধ্যায় একা গেছি ঠেকে। পেয়ে গেলাম কবি মুনাওয়ার মসিকে। পুরান ঢাকার কবি। লালবাগে থাকে। একসঙ্গে ফেরা যাবে। নিয়মমাফিক রাত নয়টা কি দশটা কি এগারোটায় আমরা ঠেক থেকে বের হয়েছি এবং রিকশা ঠিক করে উঠেছি। খেঁক খেঁক করতে করতে মুনাওয়ার মসিকে চেন পড়ার বিগত ঘটনা বলছিলাম। খেঁক খেঁক করে হাসছিল মুনাওয়ার মসিও। রিকশা মধ্যম গতিতে যাচ্ছিল। রিকশাওয়ালা আঁতকা হার্ড ব্রেক করল। মুনাওয়ার মসি ছোটখাটো মানুষ, এইটুকুতেই পড়ে যাচ্ছিল, ধরে আটকালাম। মুনাওয়ার মসি বলল, ‘আন্ধা নি মিয়া? কী অইলো?’

রিকশাওয়ালা বলল, ‘আপনেরা নামেন!’

‘ক্যান মিয়া? অইলোটা কী?’

‘কিছু অয় নাই! আপনেরা নামেন!’

‘আমরা কি ভাড়া ঠিক কইরা উঠি নাই মিয়া? তোমারে কি ভাড়া দিমু না?’

‘ভাড়া লাগব না, আপনেরা নামেন!’

‘সমস্যা কী মিয়া?’

‘কিছু না, আপনেরা নামেন!’

ঘাড়ত্যাড়া রিকশাওয়ালা। খাড়ার ওপর নামিয়ে দিয়েছিল রাস্তায়।

সহিদুল থাকলে পারত না।

আজ, এখন, সহিদুল আছে।

রিকশায় উঠে রিকশার চেন পড়ার গল্প আমরা অবশ্য করি না আর।

সহিদুল রিকশা ঠিক করল। খেঁক খেঁক করে বলল, ‘জনি লিভার। দেখ।’

মধ্যবয়স্ক রিকশাওয়ালা। হিন্দি সিনেমার কমেডিয়ান জনি লিভারের মতো দেখতে। চাদর, লুঙ্গি, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ও কার্নিসওয়ালা হ্যাট পরে আছে জনি লিভারের লুক অ্যালাইক।

সহিদুল রিকশায় উঠে পড়েছে। আমিও উঠব, এই সময় দেখলাম বিজনকে। রাস্তার ওপারে। মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যাচ্ছে বিজন, যে রকম যায়। কী করে সম্ভব? এখানে এখন কিভাবে বিজন? ঝাপসা দেখছি না তো? না। বিজনই। সাদা হাফশার্ট, কালো প্যান্ট এবং পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল!

সহিদুল বলল, ‘এই! কী হলো?’

‘এক মিনিট!’

বিজন চলে যাচ্ছে দয়াগঞ্জের দিকে।

ডাক দিলাম, ‘এই বিজন!’

বিজন হলে নিশ্চয়ই দাঁড়াবে।

দাঁড়াল না।

বিজন না তাহলে?

নাকি শোনেনি?

আবার ডাক দিলাম, ‘এই বিজন!’

দাঁড়াল এবং তাকাল।

বিজন! বিজনই! শালা, আমার নেশা ছুটে গেল! সে কি আমাকে দেখে বিস্মিত হলো না?

‘এদিকে আয়!’

এমনি গাড়ি-ঘোড়ার চল কম এই রাস্তায়। রাত যত বাড়ে তত তা-ও কমে যায়। বিজন রাস্তা পার হয়ে এলো।

তুই এখানে! ঢাকায় কবে আসলি?

ম্রিয়মাণ হাসল বিজন। বলল, ‘এইতো।’

‘এদিকে কোথায় যাচ্ছিস?’

‘এইতো।’

‘মদ খাবি? আয়, মদ খাই।’

‘না।’

‘কেন রে শালা?’

‘এসব আমার আর ভালো লাগে না।’

‘ওরে সর্বনাশ! কী বলে রে! একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! সহিদুল।’

সহিদুল রিকশা থেকে নামল।

‘এই হলো বিজন।’

বিজন সম্পর্কে অবগত সহিদুল। সে বলল, ‘বিজন দাদা, আপনার কথা অনেক শুনেছি। আমি সহিদুল।’

‘হ্যাঞ্চিপ’ করল তারা। মাতাল হলে হ্যান্ডশেক ‘হ্যাঞ্চিপ’ হয়ে যায়। শব্দটা নিউ মার্কেট থেকে টোকানো। টোকাইরা বলে।

সহিদুল বলল, ‘রিকশা ছেড়ে দিই?’

বিজন বলল, ‘না! না! তা কেন? কেন? আপনারা যান, আমিও যাই।’

আমি বললাম, ‘যাই মানে? কোথায় যাবি তুই? কথা নেই বার্তা নেই ঢাকায় ঢুকেছিস ব্যাটা, ঢাকায় ঢোকার ভিসা কে দিল তোকে? আমার রিকমেন্ডেশন ছাড়া কে দিল? ওঠ রিকশায়!’

‘না রে।’

‘কী না রে?’

‘আমার কাজ আছে।’

‘এই শীতের রাতে তোর কাজ কী রে শালা? কোন চুলায় যাবি? সোয়েটার-চাদর কিছু তো পরিসনি। কেন রে? এত শীতেও শীত লাগছে না তোর?’

‘বুঝি না।’

‘বুঝিস না? যোগসিদ্ধ পুরুষ হয়ে গেছিস নাকি তুই? শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিস?’

‘তা না। আমার কাজ আছে। আমি যাই। আসলে আমি একটা শ্মশানঘাট খুঁজছি। বটগাছ আছে এমন একটা শ্মশানঘাট।’

‘বটগাছওয়ালা শ্মশানঘাট খুঁজতে ঢাকায় এসেছিস! তুই! দেখলি! কেন? আমাদের শহরের শ্মশানঘাটে বটগাছ আছে না একটা?’

‘টাউনের শ্মশানঘাট? সেই শ্মশানঘাট আর নাই রে। নদীর পেটে গেছে অর্ধেক। মাথা ডুবিয়ে পড়ে আছে অর্ধেক বটগাছ। আধামরা নদীতে। পার আরেকটু ভাঙলেই হলো।’

রিকশাওয়ালা বলল, ‘কী অইলো ভাই! যাইবেননি আপনেরা?’

সহিদুল বলল, ‘যাব তো মিয়া। দুই মিনিট।’

‘দুই মিনিট! দশ মিনিট তো পার কইরাই দিছেন।’

‘দশ মিনিট! তোমার দেখি সময়জ্ঞান বলতে কিছু নাই মিয়া। আচ্ছা, মিনিট হিসাব করে টাকা দেব তোমাকে!’

‘মিনিট হিসাব কইরা টাকা দিবেন! কত দেখলাম। গেলে উঠেন নাইলে আমারে ছাড়েন। আমার টাইম নাই।’

সহিদুল ভালো মানুষ, মদ্যপ, হল্লাবাজ; কিন্তু আরেকটা রূপ তার আছে। রিকশাওয়ালা সেই রূপটা দেখল। সহিদুল হিসহিস করে বলল, ‘এই চুপ! ডট ডট-এর পোলা! বসে থাক, চুপ!’

রিকশাওয়ালা যা বোঝার বুঝল।

আমি ম্রিয়মাণ বিজনকে বললাম, ‘বটগাছওয়ালা শ্মশানঘাট কেন খুঁজছিস?’

‘দরকার আছে। আমি যাই।’

‘ওরে-রে! তুই সেই ঠ্যাটাই আছিস। ঢাকায় কয়দিন থাকবি? বাসায় আয় কাল। সন্ধ্যার পরে হলে এখানে আয়।’

‘আচ্ছা, আমি যাই। সহিদুল ভাই, আমি যাই।’

‘দেখা হবে, দাদা। ভালো থাকবেন।’

সহিদুল বলল।

‘আপনারাও ভালো থাকবেন।’

বলে দ্রুত চলে গেল সে। মনে হলো পালাল।

আজব!

সেই ছোটবেলা থেকেই এ রকম সে। অন্তর্মুখী, ম্রিয়মাণ ও গোপনীয়তাপূর্ণ। শ্রী বিজন চক্রবর্তী। সে আমাদের ছেলেবেলার বন্ধু। মান্না, অমিয়শঙ্কর, ফরিদ, শামীম, বাপি, তুষার, রোমেন ও আমার। মান্না, সে ও আমি, প্রাইমারি স্কুল থেকে একসঙ্গে পড়েছি। বড় হয়ে উঠেছি এক জল-হাওয়ায়। তার বাবা বিনয় চক্রবর্তী আমাদের হাই স্কুল সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। বছর দশেক আগে রিটায়ার করেছেন। বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন ক্লাস নাইন ও টেনে। অত্যন্ত কড়া শিক্ষক ছিলেন। পড়া না পারলে বা ক্লাসে বদমায়েশি করে ধরা পড়লে বেত দিয়ে পেটাতেন না অবশ্য বেধড়ক, দুই কান ধরে এক ঠ্যাঙে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন। নাইন-টেনে আমি আর বিজন দুজনই ছিলাম বি সেকশনে। ক্লাস করেছি বিনয় চক্রবর্তীর। কান ধরে একঠ্যাঙে হয়েছি কয়েকবার। আমিও, বিজনও।

বাপি, মান্না, তুষার, শামীম, ফরিদ ভালো ছাত্র ছিল। ক্লাসে তাদের রোল নম্বর সব সময় এক থেকে দশের মধ্যে থাকত। আমাদের রোল নম্বরের লেখাজোখা নেই। আমরা ছিলাম নিরেট গাধাদের দলে। বিজন ও আমি। তবে পরীক্ষায় বসে কিন্তু আমরা নকলটকল করিনি কখনোই। এসএসসিতে টেনেটুনে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছিলাম। এইচএসসিও স্থানীয় কলেজ থেকে দিয়েছি। ওই টেনেটুনে সেকেন্ড ডিভিশন। দলের মধ্যে আমাদের থেকেও গাধা ছিল একমাত্র অমিয়শঙ্কর। এসএসসিতে থার্ড ডিভিশন সে, এইচএসসিতেও থার্ড ডিভিশন। পড়াশোনা করেনি আর। মনিহারি দোকানের পত্তন করেছিল টাউনের বালুর মাঠ মার্কেটে। মুক্তি স্টেশনারিজ। সেই দোকান আছে এখনো। অমিয়শঙ্কর বিয়ে করেছে এবং এক গণ্ডা পোলাপানের বাপ হয়েছে গত ছয় বছরের উদ্যমে। তিন মেয়ে এক ছেলে। সমস্যা নেই, টাকা-পয়সাও করেছে বিস্তর। তবে শালা কৃপণ। কিপটার কিপটা। কানা পয়সা আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে না। কানা পয়সা বলা ঠিক হলো না। কানা পয়সার চল নেই আর, দেখাও যায় না। তবে অমিয়শঙ্করের আঙুলের ফাঁক গলে কি দশ পয়সার কয়েনও পড়ে না।

এইচএসসির পর বিজন বিকমে ভর্তি হয়েছিল। তত দিনে চারুকলার ভূত ঢুকে গেছে আমার মাথায়। চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ব। পড়েছি। কমার্শিয়াল ডিজাইনার হব ভাবিনি। তবে কী হব ভেবেছিলাম? আর্টিস্ট? তা-ও না। চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়লাম কেন তবে? বলতে পারব না। পড়লেও কখনোই তেমন কিছু হতে আমার ইচ্ছা করেনি একবারও। ইচ্ছা করে না। বিজনও আমার মতো এ ক্ষেত্রে। কিংবা আমি তার মতো হয়তো। সে কখনোই কিছু হতে চায়নি। কথাটা একদিন ঢাকার একজন বুদ্ধিজীবী পণ্ডিতকে বলেছিলাম। বুদ্ধিজীবী পণ্ডিত পরিহাসপ্রিয়। বলেছিলেন, ‘এটা কি সংখ্যালঘু কমপ্লেক্স?’

শালা খাটাশ! সংখ্যালঘু তোরা। মিডিয়াবাজ বুদ্ধিজীবীরা!

বিজনের কপাল ভালো, এসব মিডিয়াবাজদের দৌরাত্ম্য থেকে অনেক অনেক দূরে বাস করে সে। টেনেটুনে বিকম পাস করেই চাকরি পেয়ে গিয়েছিল ব্যাংকে। সেই চাকরিতে বহাল আছে এখনো। ল্যাভেনডিশ টাইপ ছেলেবেলা থেকেই। দৃঢ়চেতা হয়নি মোটেও। এটা স্কুল লাইফে যত ধরা পড়েনি, কলেজ লাইফে ধরা পড়েছিল তত। মাত্রাতিরিক্ত লাজুক ছেলে সে একটা। নার্ভাস হয়ে পড়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই। কলেজের বিশ্বসুন্দরী ঝুমার সঙ্গে একদিন রিকশায় উঠতে হয়েছিল তাকে। সে এক দৃশ্য। পরে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল যে রিকশায় দেড়বার হার্ট অ্যাটাক করেছিল বিজন। আমি ধরেছিলাম, ‘কাহিনি কী, খুলে বল তো।’

বলেনি শালা। বিশ্বসুন্দরী ঝুমার সঙ্গে কেন রিকশায় উঠেছিল সে? আজও রহস্য। ঝুমা এখন থাকে লালমাটিয়ায়। ডি ব্লকে। তিন ছেলেমেয়ের মা, ব্যবসাদারের বউ। মুটিয়ে গেছে কিছুটা; কিন্তু রূপবতী আছে আগের মতোই। আমাদের আঞ্চলিক সমিতির সভায় প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা হয় এখানে-ওখানে। দেখা হলে বাসায় যেতে বলে। বিজনের কথা তুলেছিলাম একদিন। হি হি করে হেসে বলেছে, রিকশায় কিছুদূর গিয়ে সেদিন বিজনকে চুমু খাবে বলেছিল সে। বিশ্বসুন্দরী কম দস্যুও ছিল না। আট-নয় মাস আগে আমি তাকে বলেছি, ‘তোর প্রেমিক তো বিয়ে করেছে।’

‘কী বলিস! হি হি হি! আমার কথা ভাবল না একবার!’

‘পালিয়ে বিয়ে করেছে। বেণীমাধব ডাক্তারের দ্বিতীয় পক্ষের বউকে।’

‘বেণীমাধব ডাক্তারের দ্বিতীয় পক্ষের বউ! বেণীমাধব ডাক্তার আবার বিয়ে করেছেন নাকি?’

‘স্যরি, স্যরি। বউ না, মেয়ে। বেণীমাধব ডাক্তারের দ্বিতীয় মেয়ে। শিবানী।’

‘শিবানী! কোনটা? তিন মেয়ে না বেণীমাধব ডাক্তারের? ছোট একটার তো সব সময় নাক দিয়ে শিকনি পড়ত দেখেছি।’

‘ও-ই। বিনয় স্যার ত্যাজ্যপুত্র করতে চেয়েছিলেন ছেলেকে। শহরের হিন্দুসমাজের মাথারা নিবৃত্ত করেছেন। ষোলোঘরের কিরণশঙ্কর উকিল বলছেন, এ রকম কোনো আইন আর নেই। থাকলে বিনয় স্যার এত দিনে আর বিজনের বাবা থাকতেন না।’

‘আহা রে! এতিম হয়ে যেত বেচারি! ত্যাজ্যপুত্রদের এতিম বলে তো, নাকি?’

‘ওয়ান কাইন্ড অব এতিম বলাই যায়।’

কোর্ট ম্যারেজ করেছে বিজন। লাইন ছিল। শালা আমাকেও কখনো বলেনি।

ত্যাজ্যপুত্র করতে না পারলেও ছেলের ওপর থেকে বিনয় চক্রবর্তীর রাগ কমেনি একফোঁটাও। নমঃশূদ্র ঘরের মেয়ে শিবানী। জাতে মেলে, না পাতে মেলে? এদের তিনি তাঁর সংসারে রাখবেন না। বিয়ে করে বিজন বউ নিয়ে উঠেছে নূতনপাড়ার লাগোয়া চাণক্যপাড়ায়। দেবল সাউয়ের ঘর ভাড়া নিয়েছে। এই পাড়ায় অমিয়শঙ্করও থাকে। সেবার বাড়ি গিয়ে ধরেছিলাম বিজনকে, ‘ঘটনা কী তোর?’

‘কী ঘটনা?’

‘শিবানীর সঙ্গে লাইন দিচ্ছিস, আমাকেও একবার বললি না।’

‘লাইন দিই নাই।’

‘কী বলিস? লাইন নাই ঝাইন নাই, আঁতকা তুই শিবানীকে বিয়ে করে ফেললি? কোর্ট ম্যারেজ!’

‘করেছি তো।’

‘তোর কি কথা বলতে বিরক্ত লাগছে?’

‘নাহ্!’

‘তাহলে শিবানীকে তুই কেন বিয়া করলি, বল।’

‘সে বলল।’

‘সে? কে? শিবানী বলল?’

‘না। আরেকজন। আমার সঙ্গে থাকে।’

‘কী বলিস? তোর সঙ্গে থাকে! সে কে? এখন সে কোথায়?’

‘আছে। আমি তাকে কখনো দেখিনি। আমার সঙ্গে কথা বলে সে।’

‘কথা বলে? জিন-ভূত নাকি?’

‘না, মানুষ।’

‘ছেলে না মেয়ে?’

‘মেয়ে। পাঁচ-ছয় বছর হবে বয়স।’

‘বয়স বুঝতে পারলি কী করে তুই? দেখিস নাই বললি!’

‘দেখি নাই। কণ্ঠ শুনে আন্দাজ করা যায় না?’

‘অ। সে তোকে বলল বিয়ে করে ফেলতে আর তুই বিয়ে করে ফেললি? দেখ, আজগুবি কথা বলবি না। বলতে চাস না, বলতে হবে না। আজগুবি কথা কেন বলবি? এহ্!’

‘আজগুবি না। সে যা বলে আমি শুনি।’

‘শিবানীর সঙ্গেও সে থাকে নাকি? না হলে শিবানী তোকে বিয়ে করল কেন? তুই বলতেই রাজি হয়ে গেল?’

‘আমি বলিনি, সে বলেছে।’

‘কে? শিবানী? শিবানী তোকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে?’

‘হুঁ।’

‘কেন?’

‘সে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’

‘আমি তো সেই কথাই বলছি। শিবানী নিজে তোকে বিয়ের প্রস্তাব দিল!’

‘দিল।’

‘কী করে? কেন?’

‘বললাম না, সে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’

‘কে? ওই যে তোর সঙ্গে থাকে?’

‘হুঁ।’

এতক্ষণ পর একটা পাতার বিড়ি ধরাল বিজন। আমাকেও একটা দিল। আমিও ধরালাম। টেণ্ডু পাতার বিড়ি। ইন্ডিয়ান জিনিস। নদীর ওপারের হাটে পাওয়া যায়। বর্ডার দিয়ে আসে। টানা টানতে হয়। না হলে নিভে যায়। আমরা নদীর ঘাটে বসেছিলাম এবং নদী থেকে কুয়াশা উঠতে দেখছিলাম। আশ্বিন মাসের নদীর কুয়াশা। অমাবস্যার অন্ধকারেও। বিড়ি শেষ করে বিজন বলল, ‘দীপার কথা মনে আছে তোর?’

‘কোন দীপা? হাসননগর না জামাইপাড়ার দীপা?’

‘গার্লস স্কুল রোডের দীপা। দীপান্বিতা।’

‘দেবেন পুরকাইতের মেয়ে? মনে আছে। কেন?’

‘জাতিস্মর ছিল না সে?’

আমাদের দুই-চার বছরের ছোট দীপা। আট-নয় বছর বয়স তখন আমাদের। সারা শহর ভেঙে পড়েছিল একদিন গার্লস স্কুল রোডের দেবেন পুরকাইতের বাসায়। তিন মেয়ে দেবেন পুরকাইতের। বাণীদি, রানুদি ও দীপা। শোনা গেল, আগের জন্মে নাকি জাতিস্মর ছিল দীপা। পূর্বজন্মের কথা বলতে পারে। কী কথা? আগের জন্মে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বলরাম শীলের বউ ছিল সে। কুয়ায় পড়ে মরে গিয়েছিল। তার ভাশুরের নাম ছিল জগন্নাথ। জায়ের নাম কাত্যায়নী। ভাশুরপো সুবল। আর তার নিজের নাম ছিল পুতুলরানী। উত্তর চব্বিশ পরগনা কোথায়, কত দূরে, সেটাই আমরা তখন জানতাম না। সাড়ে তিন-চার বছর বয়সের দীপা এসব কোত্থেকে, কিভাবে বলছে? কেউ কি তাকে শিখিয়ে দিয়েছে? কী করে সম্ভব?

মধ্যপাড়ার বিভু ডাক্তারের আত্মীয়-স্বজন আছে কলকাতায়। বিভু ডাক্তারের ছেলে উদয়দা কলকাতায় গিয়েছিল। উত্তর চব্বিশ পরগনায় গিয়েছিল। দেখা পেয়েছিল জগন্নাথ শীল ও বলরাম শীলের। তারা পুতুলরানীর কথা বলেছে। ঘটনা সত্যি। জল তুলতে গিয়ে কুয়ায় পড়ে সেই পুতুলরানীর মৃত্যু হয়েছিল। বলরাম শীল আবার বিয়ে করেছেন। সেই বউটাকেও দেখে এসেছে উদয়দা। বাচ্চা বউটার নাম ফুলমালা।

দীপার এই গল্প শহরে ছিল কত দিন? দীপাও এখন আর মনে করতে পারে না। আমরাও ভুলে গিয়েছিলাম। আমার একদিন মনে পড়েছিল হঠাৎ। মান্নাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ফোন করে। মান্নার বোন জয়ার বন্ধু দীপা। তাদের বিয়ে একই শহরে হয়েছে। জয়া বলেছে, দীপার কিছুই মনে নেই। কিছুই মনে করতে পারে না। ওসব কথা বললে শুধু হাসে।

ঘটনা কী ছিল তাহলে?

আপ্পাদা তখনই বলেছিল, ‘ব্লাফ।’

বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আপ্পাদা। উদয়দার বন্ধু। ধরেছিল উদয়দাকেও, ‘তুই এত বড় একটা ব্লাফ দিলি, উদো!’

বিজনের মুখে হঠাৎ সেই জাতিস্মর দীপার কথা কেন?

‘শিবানী জাতিস্মর।’

বিজন বলল।

‘কী?’

‘হ্যাঁ। আগের জন্মের কথা মনে আছে তার।’

‘তোকে বলেছে?’

‘হুঁ।’

‘আগের জন্মে কে ছিল সে?’

‘তা বলেনি। বলেছে সে অনেক কিছু মনে করতে পারে।’

‘আগের জন্মের? কী মনে করতে পারে বলেছে?’

‘না। তবে আমি তার কথা বিশ্বাস করি।’

‘অ।’

‘দেবী ভাব আছে শিবানীর মধ্যে।’

‘দেবী ভাব মানে?’

‘কখনো কখনো দেবী হয়ে যায় সে।’

‘ফাইট দেয় কেমন?’

বিব্রত হলো বিজন। তড়িঘড়ি বলল, ‘বাসায় চল তুই। আমাদের সঙ্গে খেয়ে যাবি দুটি। শিবানীর রান্না ভালো। ঢেঁড়সের একটা চচ্চড়ি করে।’

‘তোর বউ জাতিস্মর, দেবী ভাবসম্পন্ন, না তুই পাগল হয়ে গেছিস? বুঝতে হবে। চল যাই তোদের বাসায়।’

শিবানীকে দেখলাম ম্যালা দিন পর।

 ছোট থাকতে অনেক দেখেছি। সত্যি নাক দিয়ে সব সময় শিকনি পড়ত শিবানীর। শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়, দেখলাম তাই হয়ে গেছে মেয়েটা। পাথরের ভাস্কর্যের মতো হয়েছে দেখতে। শান্ত, স্নিগ্ধ। চমৎকার একটা মেয়ে। জড়তাহীনভাবে কথা বলল অনেক। জাতিস্মর বা দেবী ভাবের মতো কিছুই তার মধ্যে দেখলাম না।

পেঁপে ভর্তা, পোস্ত বড়া, কই মাছের পাতুরি, কুমড়া পাতা মুড়িয়ে চ্যাপা শুঁটকি, টক আর ডাল রান্না করেছিল শিবানী। নানা মুগ্ধতার মধ্যে এই একটা মুগ্ধতা দেখলাম পাক্কা এক শ ভাগ ঠিক আছে বিজনের। শিবানী সেরা রাঁধুনি, কিন্তু ঘটনা কোত্থেকে কী করে ঘটল? কী হয়েছিল? শিবানী তাকে প্রস্তাব দিল আর কোর্টে গিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলল দুনিয়ার সেরা ম্রিয়মাণ বিজন। এক লাইনে ঘটনা এটাই। ফরিদ, মান্না, শামীম, নাসের, অমিয়শঙ্কর, রোমেন, তুষার একটা কেউ কিছু বলতে পারল না। অথচ তারাও থাকে শহরেই। ফিসফাসমূলক কিছুও নাকি কখনো শোনেনি। কথা হলো? নাকি বিজন যা বলেছে সত্যি? পাঁচ-ছয় বছর বয়সের একটা অদেখা বাচ্চা মেয়ে আছে এত সব কিছুর নেপথ্যে? কেন?

আড়াই-তিন মাস পর আবার গেছি শহরে। রাত দশটার দিকে নদীর ঘাটে বসে ম্রিয়মাণ বিজন বলল, ‘সে তো জন্ম নিতে চাচ্ছে।’

‘কী? কে?’

‘মেয়েটা।’

‘শিবানী পোয়াতি?’

‘হুঁ।’

‘আগে বলবি না! শালা চ্যাম্পিয়ন! কত মাস?’

‘দুই মাসের মতো।’

‘গুড! তুই তাহলে বাবা হয়ে যাচ্ছিস! আমরা তাহলে কাকা হয়ে যাচ্ছি!’

আমার উচ্ছ্বাস একফোঁটাও স্পর্শ করল না বলে মনে হলো বিজনকে। তার ম্রিয়মাণ গলায় সে বলল, ‘সে একদিন বলল, সে জন্ম নিতে চায়।’

‘কে?’

‘তোকে বলেছি। আমার সঙ্গে থাকে যে মেয়েটা।’

‘সে জন্ম নিতে চায় মানে? তার না পাঁচ-ছয় বছর বয়স। সে আবার কী করে জন্মাবে?’

‘পুনর্জন্ম নেবে।’

‘তুই কোন যুগে বাস করিস?’

 ‘সে আর আমার সঙ্গে থাকে না। কথা বলে না।’

‘শিবানীর সঙ্গে থাকে এখন?’

‘হুঁ।’

‘কথা বলে? শিবানীর সঙ্গে?’

‘জিজ্ঞেস করিসনি। শিবানীকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করি না।’

‘ভয় পাস?’

‘না।’

‘তুই একবার ঢাকায় চল। তোকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার।’

‘সাইকিয়াট্রিস্ট? কেন?’

‘কেন মানে? তুই তো মানসিকভাবে অসুস্থ!’

‘তুই আমার কথা বিশ্বাস করিসনি?’

‘কোন যুক্তিতে বিশ্বাস করব বল?’

‘আমি যুক্তি দিতে পারব না। তার সঙ্গে শেষ যেদিন আমার কথা হয়েছে, সে কিছু কথা বলেছে। আগের জন্মে তার নাম ছিল শীতা। শীতাবিবি। রাম-সীতার সীতা না, শীতকালের শীত থেকে শীতা। খুব শীতের মধ্যে জন্মেছিল বলে তার বাপ মেয়ের নাম রেখেছিলেন শীতা। আদর করে শীতাবিবি বলে ডাকতেন।’

‘বাপের নাম বলেছে?’

‘সূর্যকান্ত দেখাঁ।’

‘সূর্যকান্ত দেখাঁ! দিকযানের?’

‘তুই চিনিস?’

‘কিচ্ছাদার না? ধর্মপাশার গাছতলা গ্রামে একবার তার কিচ্ছা শুনেছিলাম। তার মেয়ে ছিল শীতাবিবি?’

‘হুঁ।’

বদ্ধ উন্মাদ একটা। সন্দেহ নেই। কিন্তু তার এই কথাটা আমাকে খটকায়ও ফেলে দিল খানিক। দিকপালের কিচ্ছাদার সূর্যকান্ত দেখাঁর মেয়ে ছিল শীতাবিবি!

‘তোরা কি তোদের মেয়ের নাম শীতা রাখবি?’

‘শীতাবিবি। সে বলেছে।’

শহর থেকে সেবার ঢাকায় ফিরেছিলাম সূর্যকান্ত দেখাঁকে মাথায় নিয়ে। দেখাঁর দেখা কী করে পাই? কলিগ রোবায়েত উপায় বাতলে দিল, ‘সাইমন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।’

‘সাইমন ভাই?’

‘সাইমন জাকারিয়া। কিচ্ছাদার পালাকার—এসব মানুষকে নিয়ে কাজ করেন।’

‘অ।’

নামে চিনি। কিন্তু সাইমন জাকারিয়ার সঙ্গে আমার কখনো পরিচয় হয়নি। রোবায়েত তার বন্ধু কবি টোকন ঠাকুরকে ধরে দিল। টোকন ঠাকুর একটা ল্যান্ডফোন নম্বর দিল সাইমন জাকারিয়ার। ফোন করলাম। সাইমন জাকারিয়া না, ফোন ধরে এক মহিলা খড়খড়ে গলায় শাপান্ত করলেন, ‘আবার ফোন করছত! তোর মায়ে নাই? বইনে নাই? হারামির বাইচ্চা।’

কী সর্বনাশ!

কাহিনি শুনে টোকন ঠাকুর বলল, ‘ভুল কিছু একটা হয়েছে। বিকেলে এক কাজ করেন, আজিজ মার্কেটে চলে আসেন আপনি। সাইমন আজ আসবে আজিজে।’

বিকেলে আজিজ মার্কেটের এক বইয়ের দোকানে দেখা হলো সাইমন জাকারিয়ার সঙ্গে। টোকন ঠাকুর আলাপ করিয়ে দিল। আমার ধারণা ছিল, বয়স্ক একজনকে দেখব। তা না, সাইমন জাকারিয়া অতি তরুণ এবং সজ্জন। সূর্যকান্ত দেখাঁর কথা শুনে বলল, ‘জয়গুরু! চিনি তো দাদাকে। হাটে দেখা হয়, মাঠে দেখা হয়। প্রাণের মানুষ বড়!’

‘উনার তো পরিবার-পরিজন আছে।’

নাহ্। কিচ্ছার আগে দাদার বন্দনা শোনেননি?

আমি, অধম সাঁই

তিন কুলে কেউ নেই

পিতা চন্দ্রকান্ত রাখলাইন

সূর্যকান্ত নাম...।

আসলেও তিন কুলে কেউ নেই দাদার। যারা ছিল তারাও থাকেনি। বউ-মেয়ে। উনার স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। মেয়ে হয়েছিল, দাদা মেয়ের নাম রেখেছিলেন শীতা।

আমি বললাম, ‘শীতাবিবি।’

‘আপনি তো জানেন দেখি। হ্যাঁ, শীতাবিবি। আমি দুবার মেয়েটাকে দেখেছি। ছোট্ট দেবীর মতো ছিল দেখতে। জ্বর হয়ে এমন একটা মেয়ে মরে যায়! দাদা উন্মাদ ছিলেন কিছুদিন।’

‘এখন তো সুস্থ?’

‘এখন সুস্থ। তবে দিকযানে থাকেন না আর, বাদশাগঞ্জে থাকেন শুনেছি।’

ঠিক করলাম, বাদশাগঞ্জ যাব। দেখা করব সূর্যকান্ত দেখাঁ মানুষটার সঙ্গে। কিচ্ছাদার। আমি তার একটা কিচ্ছাই শুনেছি, দেখেছি। আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের কিচ্ছা। অনবদ্য পারফরম্যান্স। এই আলীবাবা, এই চোরের সর্দার, এই মর্জিনার ‘পাট’ করছেন। ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে গিয়েছিল। না হলে গাছতলায় যাওয়ার কথা না আমাদের। আমি, সহিদুল, তিনু ও সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থর বাড়ি ধর্মপাশায়। আমরা তাকে ডাকি শিক-ধার-তো। শিকধারতো একদিন তাদের ভাটি অঞ্চলের বর্ষাকালের কথা বলছিল। গাছতলার কথা বলছিল। একটা গ্রামের নাম গাছতলা। এই গ্রাম একবার না দেখলে হয়? নাম শুনে এ রকম অন্তত আঠারো-উনিশটা গ্রাম দেখতে গেছি আমরা।

ঘোর বর্ষাকাল ছিল তখন। গাছতলা গ্রাম ছিল না আর, দ্বীপ হয়ে গিয়েছিল। আমরা দুই দিন ছিলাম সেই দ্বীপে। এক রাতও ঘুমাইনি। এক রাতে আজব জোছনা দেখেছি, এক রাতে কিচ্ছা দেখেছি, শুনেছি। চারুকলা লাইফের ঘটনা। সাত-আট বছর পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। বাদশাগঞ্জ গাছতলার নিকটবর্তী গ্রাম। সূর্যকান্ত দেখাঁর সঙ্গে দেখা করে আমি তাকে কী বলব? তার হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাব?

কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

অফিস থেকে ছুটি নিলাম দুই দিনের। একা যাব। ট্রেনে উঠব সাড়ে বারোটায়। ঢের দেরি আছে। মাত্র সকাল পৌনে আটটা বাজে। ঘুম থেকে উঠেই আমি এক মগ কফি খাই। পত্রিকা পড়ি। ইত্তেফাক ও আজকের কাগজ রাখি। দুটি পত্রিকায়ই নিউজ করেছে। দুটি নিউজই কয়েকবার পড়লাম।

পল্লীবাংলার কিচ্ছাদার সূর্যকান্ত দেখাঁকে খুন করা হয়েছে।

মানে কী এর?

বান্দরবান যাব ঈদুল আজহার ছুটিতে। রাঙামাটির সাই সিংকে আগেই বলে রেখেছিলাম। হলো না। জ্বরে পড়ে ছুটির চার-চারটা দিন শেখ সাহেব বাজারেই কাটল। সহিদুল ছুটি কাটাতেই গেছে ইন্ডিয়ায়। চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়ে যাবে। চোখ দেখাবে, চোখের সমস্যা। তার আরো আট-নয় দিন লাগবে ফিরতে। সে পর্যন্ত ঢাকায় যে কয়েক দিন থাকব, একা যেতে হবে গঙ্গার ঠেকে। জ্বরে ভীষণ দুর্বল হয়ে গেছে শরীর। আর্নড লিভ নিলাম আরো চার দিনের। দেশ-ঘর দেখে আসি একবার।

আবার বিজন ও নদীর ঘাট।

ম্রিয়মাণ বিজন বলল, ‘তুই আর কিছুদিন থেকে যা।’

‘কেন?’

‘আর আট দিন পর জন্মাবে ও। দেখে যাবি।’

‘এত দিন তো থাকতে পারব না রে, ভাই। আমি বরং ঢাকায় গিয়ে আবার আসব। ডেট তো দিয়েছে?’

‘১৩ তারিখ। ১৩ ডিসেম্বর। অঘ্রানের ২১ তারিখ পড়বে।’

‘আমি ১৩ তারিখেই আসব।’

‘আসিস। ফরিদরা কেউ তোকে কিছু বলেছে?’

‘তোকে নিয়ে? না তো। কী?’

‘তারা মনে করে আমি পাগল হয়ে গেছি।’

‘তুই কি শীতাবিবির কথা তাদের বলেছিস?’

‘না।’

‘তাহলে কেন?’

‘আমি সব সময় একটা বটগাছ খুঁজি তো।’

‘বটগাছ খুঁজিস মানে?’

‘তার সঙ্গে আবার আমার কথা হয়েছে।’

‘বটগাছের সঙ্গে! তুই এ কথা ফরিদদের বলেছিস? তারা কেন তোকে সুস্থ মনে করবে?’

‘বটগাছের সঙ্গে না, শীতাবিবির সঙ্গে। সে আমাকে বলেছে সে সব সময় একটা বটগাছে থাকে। বটগাছের ভেতরে থাকে। কোনো একটা শ্মশানে সেই বটগাছটা। কোন শ্মশানে, সেটা বলেনি।’

‘শীতাবিবি না এখন শিবানীর পেটে! মায়ের পেট থেকে বাচ্চা কথা বলতে পারে?’

‘সে থাকে একটা বটগাছের ভেতরে।’

‘তুই কি নিবি আর এক ঢোক?’

‘দে।’

মাতাল হয়েও কেউ ম্রিয়মাণ থাকে?

থাকে। বিজন।

ওমর ভাই সহিদুলের মেজো দুলাভাই। অধ্যাপক মাসুদুল আহসান ওমর। সাইকিয়াট্রিস্ট। চিকিৎসা করেন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে। ঢাকায় ফিরে তাঁর চেম্বারে গিয়ে একদিন কথা বললাম ওমর ভাইয়ের সঙ্গে। ওমর ভাই বললেন, ‘ঢাকায় নিয়ে আসো তোমার বন্ধুকে।’

নিয়ে আসব। শীতাবিবির জন্মটা হয়ে যাক। সে জন্মাবে ১৩ ডিসেম্বর। কনকনে শীত থাকবে আমাদের শহরে। পাহাড়ি ঠাণ্ডা। শীতাবিবি শীতে জন্মাবে। ১২ ডিসেম্বর দুপুরের পর পর আমার অফিসের নম্বরে কল দিল ফরিদ।

‘তুই কি অফিসে?’

‘হ্যাঁ।’

‘খবর শুনেছিস?’

‘কী?’

‘শিবানী, বিজনের বউটা তো মারা গেছে রে।’

‘কী বলিস? কখন?’

‘গত রাতে।’

‘বাচ্চাটা?’

‘হয়নি। পাগলের মতো হয়ে গেছে বিজন। রাত থেকে একটা কথাও বলেনি। শ্মশানে গিয়ে খেপে গিয়েছিল হঠাৎ। শিবানীর মুখাগ্নি করেই ছুটে গিয়েছিল শ্মশানের বটগাছটার দিকে। বটগাছটাকে অশ্রাব্য গালাগালি করেছে।’

‘ও এখন কোথায়?’

‘বাসায়ই।’

‘তুই?’

‘আমিও বাসায়। মাত্র ফিরলাম। সন্ধ্যার পর আবার যাব।’

‘ঠাণ্ডা কেমন?’

‘ঠাণ্ডার কথা আর বলিস না রে, ভাই! জন্মে এমন ঠাণ্ডা পড়তে দেখিনি!’

১৩ তারিখ ডেট দিয়েছিলেন ডাক্তার। ১২ তারিখ দুপুরের পর থেকেই লেবার পেইন উঠেছিল শিবানীর।

ঢাকা থেকে আমাদের শহরে যেতে আট-নয় ঘণ্টার মতো লাগে। সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠলাম সন্ধ্যা ৬টায়। শহরের বাসস্ট্যান্ডে নামলাম রাত ২টার কিছু পর। বাস থেকে নামতেই ঠাণ্ডার কামড়। নাক-কান কনকন করে উঠল। হুডির হুড উঠিয়ে একটা শীতগ্রস্ত রিকশা ঠিক করে উঠলাম। চাণক্যপাড়া যাব।

এত রাতেও গেট খোলা বাসার। অন্ধকার বারান্দায় একটা মূর্তি হয়ে বসে আছে বিজন। দুই টুকরা সাদা থান পরে আছে। শীতের কাপড় আর কিছু পরেনি। বসে আছে মাটিতে। আচার হলো এই সময় সে কুশাসনে বসবে।

‘বিজন।’

নিরুচ্চার থাকল।

‘এই বিজন, কথা বল তুই। কী হয়েছে?’

বিড়বিড় করে সে কিছু বলল।

‘কী বলছিস?’

‘ভালো না সে। ভালো না। ভালো না। ভালো না সে।’

‘কে? কার কথা বলছিস তুই?’

‘বটগাছে থাকে সে। বটগাছের ভেতরে।’

‘বিজন!’

‘শিবানীকে খুন করে চলে গেছে সে।’

‘কে?’

‘মেয়েটারে! মেয়েটা! মেয়েটা! শীতাবিবি! ভালো না সে। শীতাবিবি। ভালো না। ভালো না।’

‘বিজন!’

‘শোন। আমার কথা তো বিশ্বাস করবি তুই?’

‘করি। করব। বল।’

‘আমি ঘুমিয়েছিলাম, তবু দেখেছি। স্পষ্ট দেখেছি। শিবানীর পেট থেকে বের হয়ে হেঁটে সেই বটগাছের কাছে চলে গেছে সে। ঢুকে পড়েছে বটগাছের ভেতরে। খাট থেকে পড়ে গিয়েছিল শিবানী। মরণ ঘুম আমাকে ধরেছিল। উঠে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে। মাটিতে ছোট ছোট পায়ের ছাপ ছিল। রক্তমাখা ছাপ। বটগাছের শিকড়বাকড়েও ছিল। আমি দেখেছি। বটগাছের ভেতরে ঢুকে গেছে সে।’

‘কোন বটগাছ?’

‘ভুলে গেছি। খুঁজছি। পেয়ে যাব।’

‘পেলে কী করবি?’

‘কী করব? কিছু একটা করব। আটকাতে হবে তাকে। আটকাতে হবে। না হলে আবার জন্ম নেবে সে।’

অন্ধকারে বিজনের চোখ-মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। নিশ্চয়ই বড় ম্রিয়মাণ চোখ-মুখ। আজব! যুক্তিহীন একটা বিশ্বাসের জগৎ তার আছে করুণ এই ম্রিয়মাণতার মধ্যেও। সেই জগতে বাস করে সে। সেই জগতে আছে সেই বটগাছ, শীতাবিবি থাকে যে বটগাছের ভেতরে। কেউ বিশ্বাস না করলে কী?

অন্ধকারে আমি বিজনের ঠাণ্ডা হাত ধরে বসে থাকলাম।

পরে আর যতবার গেছি শহরে, বিজন নদীর ঘাটে বসে অনেকবার সেই বটগাছের কথা বলেছে। এখনো পায়নি। তবে সে খুঁজছে। কোথায় আছে সেই বটগাছ? পৃথিবীর কোথায় আছে সেই বটগাছ? ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবে সে একদিন।

আহারে বিজন!

ঢাকায় একবার নিয়ে আসতে পারলে হতো। ওমর ভাই দেখতেন। কিন্তু বিজন জন্মাবধি শহরের বাইরে কোথাও যায়নি। ঢাকায় কি আসবে সে?

সেই বিজন কিনা হাটখোলার রাস্তায়!

কোথায় উঠেছে না উঠেছে কিছুই তো জিজ্ঞেস করে রাখলাম না। বেহেড মাতাল হলে এমন বাজে ভুল হয়। কমন সেন্স নষ্ট হয়ে যায়।

কী করলাম! দূর!

পরদিন সকালে আমাকে ঘুম থেকে ওঠাল সাদেক মুরব্বি। সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অফিসে একটা পুরনো ল্যান্ডফোন আছে। সাদেক মুরব্বির অনুমতিক্রমে সেই ফোনের নম্বরটা আমি নিকটবর্তী কয়েকজনকে দিয়েছি। তাদের কেউ ফোন করেছে নাকি?

হ্যাঁ।

সাদেক মুরব্বি বলল, ‘আপনের ফোন। আপনের বন্ধু।’

ঘুম চোখে নিচে নেমে গিয়ে ধরলাম, ‘হ্যালো।’

‘হ্যালো? আমি ফরিদ রে।’

‘অ। তুই এত সকালে?’

‘দুর্ঘটনা ঘটে গেছে রে একটা। বিজন তো সুইসাইড করেছে।’

‘কী? কখন?’

‘কখন তো কেউ বলতে পারে না। রাত বারোটার দিকে তার ঘরের দরজা খোলা, আলো জ্বলতে দেখে দেবল সাউরের ছেলে, নীলকৃষ্ণদা ডাক দিয়েছিল তাকে। সাড়া না পেয়ে ঘরে ঢুকে দেখে কড়িকাঠ থেকে সে ঝুলছে।’

কী বলছ ফরিদ! বারোটার দিকে! হাটখোলায় রাস্তায় তখন আমি কথা বলছি বিজনের সঙ্গে। সহিদুল ছিল, সহিদুল দেখেছে। কথাও বলেছে। কী করে সম্ভব তাহলে?

এটা তুই কী করলি বিজন?

কেন করলি?

শীতাবিবি তোকে প্ররোচিত করেছে?

শীতাবিবি!

শীতাবিবি কি আবার জন্ম নিতে যাচ্ছে?

শীতাবিবি!

শীতাবিবি হাসল। হি হি করে হাসল।

কোন বটগাছের ভেতর থেকে হাসল?



মন্তব্য