kalerkantho


ভ্রমণ

নিকারাগুয়ায় গির্জার পোড়োবাড়ি ও ইভা মোরালেস

মঈনুস সুলতান

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



নিকারাগুয়ায় গির্জার পোড়োবাড়ি ও ইভা মোরালেস

ইসকুয়েলা হোরাইজনতি

নিকারাগুয়ার ইসতেলি বলে একটি মফস্বল শহরে সাময়িকভাবে বাস করছি। সপ্তাহ পাঁচেক হলো ‘ইসকুয়েলা হোরাইজনতি’ নামে এসপানিওল বা স্প্যানিশ শেখার একটি স্কুলে ভাষা শিখছি। ওয়ান ও ওয়ান টিচিং-লার্নিংয়ে আমার শিক্ষিকা সিনোরিতা এনতোনিয়েতা। সারা দিন নয়টা-পাঁচটা ইসকুয়েলার ছোট্ট কামরায়   হাত-পা গুটিয়ে এসপানিওল ভাষা মকশো করতে আমার বেজায় বিরক্তি লাগে। নতুন এই ভাষার ব্যাকরণের চেয়ে আমাকে অধিক আকর্ষণ করে কথ্য জবানে গালগল্প করার দক্ষতা, যাকে এসপানিওলে বলা হয় কনভারসাসিওন। তো, এই কনভারসাসিওন রপ্ত করার অছিলায় ইসকুয়েলার প্রিন্সিপালের অনুমতিতে আমি সিনোরিতা এনতোনিয়েতাকে নিয়ে বার কয়েক বিয়ার পাব ও রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসেছি। যদিও এসব আউটিংয়ের উদ্দেশ্য এসপানিওল ভাষায় কথাবার্তা বলতে দক্ষতা অর্জন; তবে ঘটনা হচ্ছে—এনতোনিয়েতার সঙ্গে আদতে আমার অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠছিল। কিন্তু সব কিছু হঠাৎ করে কিভাবে যেন বদলে গেল। ওয়ান ও ওয়ান টিচিং-লার্নিংয়ে আমার জন্য ইসকুয়েলা থেকে অন্য শিক্ষিকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলো।

সপ্তাহখানেক হলো, ইসকুয়েলায় এনতোনিয়েতার সঙ্গে দেখা হয়েছে হররোজ, কিন্তু কথা হয়নি একেবারে। আমার সহপাঠী কার্লোসের সঙ্গে তাকে জোড় বেঁধে রেস্তোরাঁয় লাঞ্চে যেতে দেখেছি, ফিরে এসেছে দুজন বিয়ারে বিভোর হয়ে। আজ শুক্রবার, বিকেলে কার্লোস তাকে একখানা ঝকঝকে মাউন্টেন বাইক গিফট দিয়েছে। খুব এক্সপেনসিভ গোছের সাইকেলের পেডালে পা দিয়ে সড়কের দিকে এনতোনিয়েতা তাকিয়ে আছে। শি লুকস রিয়ালি হ্যাপি। ভীষণ সুন্দর উপহার, পেয়ে যেন তার মনে বাজছে মৌন সেতার। বাইকে চেপে খুব হাঁকডাকে সে শিস কেটে ঘুরপাক করে।

উইকেন্ড মাত্র শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা লাগতেই ইসকুয়েলার ব্যবস্থাপক সিনিওর সনজেস খিচুড়ির হাণ্ডির মতো দেখতে বড় গোছের একটি বোলে ফ্লোরা-দে-কানা ব্র্যান্ডের রামে লেমন জুস ও জিনজার মিশিয়ে ক্রাশ আইসের সঙ্গে পুদিনাপাতা ভাসিয়ে দেন। সবাই কিচেন লাগোয়া টিনের শেডে বসে দু-এক পাত্র খাচ্ছে। বাইকবাজি করে ফিরে এসে এনতোনিয়েতা কার্লোসকে হোয়াইট বোর্ডের পেছনে টেনে নিয়ে গিয়ে চুমো খায়। বোলের তেজস্ক্রিয় ককটেল আধাখালি হতেই তামাম স্কুল যেন ডান্সের জন্য চুলবুল করে ওঠে। সিনিওর সনজেস রেকর্ড প্লেয়ারে মারিমবার মনোজ্ঞ মিউজিক চাপালে প্রথমে ফ্লোর হিট করে কার্লোস ও এনতোনিয়েতা। পাশ থেকে এক সহপাঠী ফিসফিসিয়ে বলে, কার্লোসের এসপানিওলে ভাষাজ্ঞান তেমন একটা না বাড়লেও প্রণয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রভূত পরিমাণে। এনতোনিয়েতার ভুরু ও গ্রীবায় চকচক করছে রুপালি স্বেদবিন্দু। সে কোমর বাঁকিয়ে ঘামে আর্দ্র পূর্ণ স্তনের দোদুল্যমানতা ছড়িয়ে ঘুরে গেলে আমার সঙ্গে তার চোখাচুখি হয়। তার দোসর জুটছে, নীরবে তাকে কংগ্র্যাচুলেট করতে চাই। কিন্তু তার দৃষ্টিতে আমি কোনো রিকগনিশন দেখি না। হক কথা বলতে আমি খানিকটা আঘাত পাই, তবে কুপোকাত হই না অত সহজে।

তাদের যুগল ডান্স তামাদি হলেও আমি এনতোনিয়েতার সঙ্গে আই কনটাক্ট করতে চাই না। তাই কার্টুনের এক শিশুতোষ বইয়ের আড়ালে মুখ ঢেকে বসে থাকি। ইসকুয়েলা হোরাইজনতির সবচেয়ে কম বয়সী শিক্ষয়িত্রী সিনোরিতিতা ইভা মোরালেস কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে—দিস ইজ ফ্রাইডে নাইট, চিয়ার আপ ম্যান। তার নিকারাগুয়ান একসেন্টে উচ্চারিত ইংরেজি বুলি কিউট শোনায়। শ্যামলা গাত্রবর্ণে সাজগোজহীনা এই নারীকে বালিকার মতো ইনোসেন্ট দেখায় বলে সবাই তাকে সিনোরিতার পরিবর্তে কিউট উচ্চারণে ডাকে সিনোরিতিতা। তার চোখ দুটিও কালো। সে যতটা না কথা বলে, তারও চেয়ে বেশি করে ছুঁয়ে যায় দৃষ্টি দিয়ে। ক্রমাগত ককটেল পান ও গরমে হলরুমটি ভাপসা হয়ে আছে। ইভা-ভেন ‘কনমিগো পর ফাভর’ বা ‘আসো, ছাদে যাই প্লিজ’ বললে আমি তার চোখের দিকে তাকাই। তার পরও দ্বিধা নিয়ে উঠে পড়ি।

খুবই সংকীর্ণ সিঁড়িতে গা ঘেঁষে উঠে আসি আমরা ছাদে। ইসকুয়েলার মূল ঘরটি টালির ছানি দেওয়া, শুধু কিচেনের ওপর ঢালাই করা ছোট্ট রেলিংহীন ছাদ। মৃদু হাওয়ায় নিচ থেকে ভেসে আসে কচলানো লেবুর গন্ধের সঙ্গে মারিমবার লঘু সংগীত। আমি ফস করে সিগারিলো ধরালে ম্যাচিসের আলোয় ঝলসে ওঠে সিনোরিতিতা ইভার শ্যামল মুখ। কার্নিস থেকে খুব একটা দূরে নয়, ঈশান কোণজুড়ে নোনা ধরা এক গির্জা দাঁড়িয়ে আছে রহস্যময় পোড়োবাড়ির মতো। তার ওপাশে পাহাড়ে বুঝি বা চাঁদ উঠছে। তার আলোয় ঝিকমিক করছে কাচের কিছু শার্শি। রাতচরা কয়েকটি পাখি একসঙ্গে ডেকে ওঠে। আর এই দালানের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আমি বলি, লুকস লাইক ‘হাউস অব আসার’! ইভা মৃদু স্বরে জানতে চায়, তুমি কি এডগার অ্যালান পোর গল্প ‘হাউস অব আসার’-এর কথা বলছ? আমি ইয়েস বলে সায় দিলে সে আরেকটু কাছে সরে এসে বলে—রাইট, দিস ইজ জাস্ট লাইক ‘হাউস অব আসার’, এ হন্টেড চার্চ। প্রায় এক শ বছর আগে ভূতের উত্পাত শুরু হলে, বিশেষ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় কফিনের ডালা খুলে এ অঞ্চলের বুড়ো গভর্নরের লাশ যাজককে ফিসফিসিয়ে কিছু বললে তার পর থেকে মানুষ এ গির্জায় আসা বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে এখানে বাস করছে ঢাউস কয়েকটি শিয়াল আর ঘণ্টাঘরে একদঙ্গল বাদুড়।

আমরা টুকটাক কথা বলে বুঝতে পারি, এডগার অ্যালান পোর বেশ কিছু গল্প আমাদের দুজনেরই পড়া হয়েছে একাধিকবার। আমার জানতে কৌতূহল হয়, কার কবিতায় সিনোরিতিতার আগ্রহ অধিক? ফ্রেডরিক গার্সিয়া লোরকার ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কানসিওন বা সংগীতগ্রন্থ থেকে সে দুটি চরণ গুনগুন করে গাইলে আমি সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া থেকে পোর্ট এলিজাবেথে রেলগাড়িতে যাওয়ার পথে ডাইনিং কারে বসে এই স্প্যানিশ কবির লেখা ইমপ্রেসিওনেস ‘ই পাইসাখে’ বা ‘ইমপ্রেশন অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ’ বইটি পড়ার গল্প বলি। ইভা-নস ‘গুসতা লা মিসমা ক্লাসে ডে লিটারেতুরাস’ বা ‘কী আশ্চর্য! আমাদের দুজনেরই পছন্দ একই ধরনের সাহিত্য’, কে ‘মারাবিওসো’ বা ‘মার্ভেলাস’ বললে চেয়ে দেখি, কখন যেন পাহাড় থেকে উড়ে এসে আধখানা চাঁদ আটকা পড়েছে গির্জাবাড়ির ঘণ্টা টাওয়ারের আবডালে। তার ঘুলঘুলির ছিদ্র গলে জোছনার কিছু খুচরা কিরণ জড়োয়া গয়ার মতো এসে পড়েছে ছাদে। আমি ইংরেজিতে ‘হোয়েন দ্য মুন সেইলস আউট/দ্য বেলস ফেইডস ইনটু স্টিলনেস’ আবৃত্তি করি। আর সে গুনগুনিয়ে তাতে যুক্ত করে এসপানিওলে লেখা লোরকার অরিজিনাল চরণ দুটি। রহস্যময় গির্জার প্রেক্ষাপটে জোছনার প্রচ্ছন্ন কিরণের ভেতর লোরকার কবিতায় আমাদের মনে তৈরি হয় এক মরমি ঝরোকার। ঠিক বুঝতে পারি না, কখন যে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে আসার সময় ইভার শরীর আমার খুব কাছাকাছি চলে আসে। আমি তখন তাকে প্যাশোনেটলি স্পর্শ করি। সে মুখ তুলে গণ্ডদেশ বাড়িয়ে দিলে আমি চুমো খাই। আদা-লেবু ও পুদিনার মিশ্রিত সৌরভের ভেতর আমি শুনতে পাই, সে বিড়বিড় করে বলছে, মোচাস ‘গ্রাসিয়াস পারা সু তিয়েমপো’ বা ‘তোমার সময়ের জন্য অনেক ধন্যবাদ, সিনিওর।’

নিচে ততক্ষণে মিউজিকের তামাদি হয়েছে। ডান্স করনেওয়ালারা ফিরে গেছে যে যার ঘরে। কিচেন কাউন্টারে ককটেলের বোলটি উল্টা করে রাখা। কটকটে আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ইভা বারবার চোখের পলক ফেলে অ্যাডজাস্ট করে নিচ্ছে তার দৃষ্টি। আমি ‘আস্তা লুয়েগো’ বা ‘আবার দেখা হবে’ বলে বিদায় নিতে গিয়ে বলি, ‘তু এরেস রিয়েলমেনতে এনকনতাদরা’ বা ‘ইউ আর রিয়ালি লাভলি, সিনোরিতিতা।’

আজ শনিবার, উইকেন্ড মাত্র শুরু হলো। ইসকুয়েলা হোরাইজনতিতে হাজিরা দিয়ে আজ এসপানিওল ভাষা শেখার কোনো অবলিগেশন নেই। তাই ভোরবেলা একটি রেস্তোরাঁ থেকে ভাপা পিঠার মতো দেখতে কয়েকটি চিকেন তামালে, আগুয়াকারতের সালাদ ও পানির বোতল নিয়ে চলে আসি জায়েন্ট মাটাপালো গাছের ছায়ায়। ইসতেলি শহরের টাউন হলে ঔপনিবেশিক যুগের স্প্যানিশ প্রশাসকের রেখে যাওয়া নথি থেকে জানা যায় যে সত্তর-আশি ফুট উঁচু এই বৃক্ষের বয়স ১৫৩ বছর। মাটির ওপর ভেসে থাকা অজগরের দেহের মতো এর বাঁকানো শিকড়ের ওপর গুছিয়ে বসে আমি ব্যাকপ্যাক থেকে বাইনোকুলার বের করি। বয়স্ক এই বিটপী দাঁড়িয়ে আছে ইসতেলি শহর থেকে মিরাফ্লোরের হ্রদ-বনানী-প্রপাতে যাওয়ার পথে, পাহাড়ের রীতিমতো ঢালে। আমি যেখানে বসে আছি, তার শ পাঁচেক ফুট নিচে মোচড় দিয়ে নিসর্গকে চন্দ্রহারের মতো জড়িয়ে ধরেছে একটি নদী। তার রিভারবেডে ছড়ানো লোহিত বর্ণের অজস্র মারমোলিনা পাথর। স্রোতোজল তাতে কলকল্লোল করে বেজে চলে অহরহ। প্যারাসাইটের উত্পাতে এই বনস্পতির কাণ্ডে অনেক ফাঁপা খোঁড়ল। তাতে বহাল তবিয়তে বাস করছে বনবিড়াল, টুক্যান পাখির ঝাঁক ও একটি-দুটি উড়ুক্কু শিয়াল। আজ এই মুহূর্তে আমি একটু নির্জনতা খুঁজছি বটে, কিন্তু বৃক্ষতলের এই নিরল ভরে আছে বুনোজনের কূজন কোলাহলে।

প্রস্তুতি নিয়েই আজ আমি বেরিয়েছি, তার পরও শিকড়ের ওপর বসে মানসিকভাবে সব কিছু আবার গুছিয়ে নিই। নদীর পার ঘেঁষে টিনের চালওয়ালা গরিব-গুরবোদের একসারি ঘরবাড়ি। গেরিলা কমান্ডাররা যে রকম অপারেশনের আগে উঁচু কোনো জায়গা থেকে রেকি করে দেখে নেয় টার্গেটের পরিপার্শ্ব, সেভাবে আমি সাবধানে বাইনোকুলারে চোখ রাখি। ইভা মোরালেসের পরিবারের বসতবাড়ির জানালায় নীলাভ পর্দা দুলতে দেখা যায়। তাদের ঘরটি জরাজীর্ণ না হলেও তার দিকে তাকিয়ে এই পরিবার যে অর্থনৈতিকভাবে সম্পন্ন নয় তা বলা চলে। কপাটের পাশেই চিলতে আঙিনা, ওখানে টাঙানো রঙিন একটি সৈকতছাতা। তার তলায় কে যেন বসে আছে। মোরালেসদের সাদামাটা ঘরদুয়ারের সঙ্গে শৌখিন ছাতাটি ঠিক মানায় না। ইভা বেরোতে গিয়ে কপাট ধরে একটু দাঁড়ায়, তারপর দ্রুত ছুটে চলে আসে গাড়িঘোড়াহীন পাকা সড়কে। তার হাতে ওটা কী? মনে হয় একটি বল লোফাতে লোফাতে সাঁই সাঁই করে মেয়েটি তার শরীর ঘোরাচ্ছে ব্যালেরিনার দক্ষতায়।

এখনই মোরালেসদের বাড়িতে হাজির না হলেও চলে। তার আগে পুরো বিষয় একটু খতিয়ে দেখতে হয়। ইভা কি আমাকে প্রত্যাশা করছে? ইসকুয়েলায় এসপানিওল ভাষার ব্যাকরণ শিখতে গিয়ে গুরুচরণ হয়েছে আমার হালত আরো বার কয়েক। আমি পড়তে চাই এসপানিওলে লেখা কবিতা। শিক্ষয়িত্রী সিনোরিতাদের মধ্যে শুধু ইভা মোরালেসের আগ্রহ আছে কবিতায়। প্রিন্সিপাল সিনিওরা এডগেলিনার সঙ্গে দেনদরবার করে আমি গেল হপ্তায় করারে এসেছি যে কবিতা শেখানোর বিশেষ মেহনতের জন্য আমি সিনোরিতিতা ইভাকে ঘণ্টাওয়ারি এক্সট্রা পারিতোষিক দেব। যেহেতু ক্লাসের অন্যরা কবিতায় আগ্রহী নয়, তাই প্রিন্সিপাল আমাকে পারমিশন দিয়েছেন শিক্ষয়িত্রীকে নিয়ে বাইরের কোনো নির্জন রেস্তোরাঁ বা লাইব্রেরিতে বসে কবিতাবাজি করার।

রেস্তোরাঁয় ইভা যেতে চায়নি। সে আমাকে নিয়ে আসে যে স্কুলে, সে পার্টটাইম স্পোর্টস টিচার সেখানে। বাচ্চাদের স্কুলটির দুপুর একটার দিকে ছুটি হয়েছে। ইভা তালা খুলে আমাকে নিয়ে যে কামরায় ঢোকে, তার জানালা দিয়ে আসছে প্রান্তরছোঁয়া আলাবোলা হাওয়া। এই জিমনেসিয়াম কক্ষে ব্যায়াম করার যন্ত্রপাতি ও খেলার সরঞ্জাম রাখা। একটিমাত্র ডেস্ক, সেখানে আমাকে একখানা কবিতার বই হাতে বসিয়ে দিয়ে একটু দূরে সরে ইভা স্কিপরোপ দিয়ে দড়ির বৃত্তের ভেতর লাফায়। আমি থান ইটের মতো খান দুই অভিধান নিয়ে রুবেন দারিও নামের এক নামজাদা নিকারাগুয়ান কবির একটি কবিতা তরজমা করার জোর চেষ্টা চালাই। সফলতা আসে না সহজে, তাই সহায়তার জন্য তার দিকে তাকাই। মৃদুমন্দ লাফাচ্ছে সে খুব রিদমিক তালে, আর ফিকফিক করে হাসছে একা একা।

একসময় আমি কষ্টেসৃষ্টে কয়েকটি ছত্রের অনুবাদ করি। তারপর চোখ তুলে দেখি, আমার নোট বুকের দিকে নির্নিমেষ চেয়ে আছে ইভা। তার এক হাতে স্কিপরোপ, মৃদু মৃদু হাঁপাচ্ছে সে এবং রিদম কাঁপতে কাঁপতে ছড়িয়ে পড়ছে তার বুকে। মৃদুস্বরে সে বলে, ইনতেনদে ‘লা পোয়েজিয়া’ বা ‘কবিতা বোঝো তুমি, সিনিওর’, এক্সেলেন্তে। উৎসাহিত হয়ে ভাবি, কবি রুবেন দারিওকে নিয়ে তার সঙ্গে একটু আলাপ করি।

অনেকক্ষণ হলো জায়েন্ট মাটাপালো বৃক্ষের শিকড়ে বসে আছি। যেতে চাইছি ইভা মোরালেসের গৃহে; কিন্তু ঠিক নিশ্চিত হতে পারি না, আসলেই কি সে আমার সঙ্গে আউটিংয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। জিমনেসিয়ামে বসে কবিতা তরজমা করার পরদিন আমার মেইল বক্সে পাই ছোট্ট এনভেলাপে কারতা ‘দে-আমর’ বা ‘লাভ নোট’। চিরকুটটিতে আমার তামাটে গাত্রবর্ণের সঙ্গে কাব্যরুচির তারিফ আছে। স্বাক্ষরের স্থানে নামের জায়গায় লেখা আমিগা ‘সিকরেতা’ বা ‘গোপন বান্ধবী’। যদিও কোনো প্রমাণ নেই, আন্দাজ করি, পত্রটি এসেছে ইভার কাছ থেকে। এসপানিওল ভাষায় জবাব দিতে গিয়ে উৎসাহে উত্তপ্ত হয়ে রুবেন দারিও মহোদয়ের কবিতার কয়েকটি চরণ তাতে যুক্ত করি। ইভার মিডল নেম মারগারিতা, সম্পূর্ণ নাম ইভা মারগারিতা মোরালেস। রুবেন দারিও মহাশয়ের কাব্যসংগ্রহে অনায়াসে পাওয়া যায় জনৈকা মারগারিতাকে নিয়ে লেখা একটি পদাবলি। আমি স্রেফ তা চিঠির সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে জুড়ে দিই, “মারগারিতা, ‘এসতা লিনডা লা মার ই এল ভিয়েনতো’,..বা ‘মারগারিতা, কী শোভা ছড়ায় শান্ত সমুদ্রের নীলাদ্রি/আর মৃদু হাওয়ায় ওড়ে কমলা ফুলের কুঁড়ি...’।” নিতান্ত সস্তা কৌশল, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হয় সঙ্গে সঙ্গে। আরেকটি কারতা দে-আমর বা লাভ নোট চলে আসে আমার মেইল বক্সে। ই-এনভেলাপের ভেতর থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ে একটি ঘূর্ণমান লাটিম। চিরকুটের একদিকে লেখা, ঘুরতে ঘুরতে লাটিমও অবশেষে চলে আসে স্থির বিন্দুতে...। উল্টো পিঠে শনিবার আউটিংয়ের পরিষ্কার প্রস্তাব। বনভোজনের জন্য যাওয়া কি যায় না এমন এক বনানীতে, যেখানে পাহাড়ের তিনটি ভিন্ন স্তরে খেলা করছে স্বতন্ত্র তিনটি ক্লাইমেটিক জোন?

অবশ্যই যাওয়া যায় এবং সে যাত্রার কথা ভেবে ব্যাকপ্যাকে পিকনিক লাঞ্চ নিয়ে আজ আমি বিপুল এই মাটাপালো বৃক্ষের তলা অবধি এসেছি। এখন আমন্ত্রণটি যদি ইভা মোরালেসের কাছ থেকে না এসে থাকে, চিরকুটের রচয়িতা যদি অন্য কোনো শিক্ষয়িত্রী হয়, তাহলে উদ্যোগটি কেঁচে যাবে নির্ঘাত। মনে খানিক দ্বিধা নিয়ে স্রেফ সিধা হেঁটে যাই মোরালেসদের বসতবাড়ির দিকে।

সৈকতছাতার নিচে ডেক চেয়ারে বসে আছেন ইভার বৃদ্ধ আবুয়েলো বা পিতামহ। পাশের টুলে বসে সে তাঁকে পত্রিকা পড়ে শোনাচ্ছে। তিনি কেরোসিন ঢালার ফানেলের মতো দেখতে একটি প্রিমিটিভ হিয়ারিং এইড বা হিয়ারিং ট্রামপেট কানে লাগিয়ে তা শুনছেন। আমাকে দেখতে পেয়েই রোলার স্কেট পরা পায়ে চাকা ঘরঘরিয়ে সে চলে আসে সড়কে। আমি ‘বুয়েন দিয়া’ বা ‘শুভদিন’ বললে সে ‘আসি কে ভিনো’ বা ‘তুমি সত্যিই এসেছ’, এক্সেলেন্তে বলে কাছে এসে হাত স্পর্শ করে। টাইটসের ওপর টি-শার্ট পরে আছে ইভা। তার ভরাট বুক দেখায় ল্যান্ডস্কেপের চিত্রে পাহাড়ের রেখার মতো। আমরা একত্রে সৈকতছাতার দিকে যেতে গেলে সে নিচু হয়ে পথে পড়ে থাকা বল তুলে নিখুঁত নিক্ষেপে ছুড়ে দেয় খানিক দূরে। ঘরের চৌকাঠের ওপর চালের সঙ্গে আংটা দিয়ে জুড়ে দেওয়া বস্কেটবল হুপে তা ঢুকে পড়ে অনায়াসে। ‘এরেস মুই আবিল’ বা ‘খুবই দক্ষ তুমি’ বলে আমি তার নিক্ষেপের প্রশংসা করলে সে গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকায়। তার কালো চোখে ভাসছে সম্মোহনের ছলছলানো জল। সে সামাজিক চুমোর জন্য গণ্ডদেশ বাড়িয়ে দিলে দেখি, ব্যক্তিগত ডায়েরিতে ভেলভেটের বুকমার্কের মতো তার দুই কাঁধে জড়িয়ে আছে কাঁচুলির কালো স্ট্র্যাপ।

ইভা তার আবুয়েলো বা পিতামহের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ছাতার নিচে আমি তাঁর পাশে টুলে বসি। ‘সম্বব্রেরো দে বাকেরো’ বা কাউবয় হ্যাট পরা বৃদ্ধের ঝুপসি ভুরুর নিচে ক্যাটার্যাক্টের ছানি পড়া ঘোলাটে চোখ। তিনি তাঁর হ্যান্ডেলবার গোঁফ মুচড়ে বলেন, ‘তুমি কি মিরাফ্লোরের বনানী দেখতে গিয়েছ? এখনো যাওনি, ঠিক আছে, টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে সামনে তাকাও।’ ইভা তেপায়ার ওপর থেকে টেলিস্কোপটি নিয়ে টেনে লম্বা করে আমার হাতে দেয়। আবুয়েলোর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হলেও তিনি আমার হাত ছুঁয়ে ঠেলে নিশানা ঠিক করে দেন। দুরবিনের কাচ ভেদ করে আমার দৃষ্টি মাটাপালো বৃক্ষের পত্রপল্লবের ওপর দিয়ে সবুজ বনানী অতিক্রম করে চলে যায় বেশ দূরে, মিরাফ্লোর পাহাড়ের মাঝামাঝি গাছপালায় নিবিড় ঢালু জায়গায়। আমি বেশ কয়েকটি ঘর ও কিসের যেন স্থাপনা দেখতে পাই। চিমনি দিয়ে আকাশে ধোঁয়ার ক্ষীণ রেখাও দেখা যায়। আবুয়েলো গমগমে স্বরে বলেন, “তুমি তাকিয়ে আছ আমাদের ফার্মের দিকে। ‘ফিনকা নেবলিনা দেল বসকেস’ বলে পরিচিত এই খামার আবাদ করেন আমার প্রপিতামহ, ১৮১৩ সালে। জঙ্গল কেটে মাত্র ৫০ একর জমি নিয়ে খামারের সূত্রপাত হয়। আমার আমলে খামারটি বিস্তৃত হয়ে দাঁড়ায় তিন হাজার দুই শ সাত একরে। তিনটি ধাপে এখানে আজও ফলছে কফি, ইক্ষু, মিষ্টি আলু ও অর্কিড।” পুরনো আমলের জাহাজি দুরবিন, আমি আবুয়েলোর বর্ণনা শুনতে শুনতে পাওয়ারফুল লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখি, পাহাড়ের ঢালে চরছে গরুর পাল, ঘোড়ার পিঠে একজন ‘বাকেরো’ বা ‘কাউবয়’ সব কিছুর দেখভাল করছে। আবুয়েলো তাঁর খামার সম্পর্কে কথা বলতে বলতে আমাকে টুকটাক প্রশ্ন করেন, কিন্তু জবাব দেওয়ার কোনো সাবকাশ না দিয়ে চলে যান প্রসঙ্গান্তরে। বয়স্ক হলেও ধবধবে সাদা গালপাট্টা জুলফি, হ্যান্ডেলবার গোঁফ ও ফানেলের মতো হিয়ারিং ট্রামপেটে তাঁকে ডাকসাইটে দেখায়। তিনি আমার দিকে ঘোলা দৃষ্টি তুলে বলেন, ‘ইসতেলিতে হোটেলে থাকছ, এরা সামান্য রুমভাড়া বাবদ অনেক টাকা চার্জ করবে। পরেরবার এলে আমাদের ফার্মের গেস্টহাউসে উঠো। তোমার কোনো খাইখরচ লাগবে না। তত দিনে সরকারের পালাবদল হবে, আর ফার্মটিও ফিরে আসবে আমাদের হাতে।’ ‘ফিনকা নেবলিনা’ বা ফার্মের বিষয়টি আমার কাছে ধাঁধার মতো মনে হয়। ইভাদের পরিবারের ঘরদুয়ারের হালত দেখে তো মনে হয় না এরা মিরাফ্লোরের বিশাল একটি খামারের মালিক। তাই আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ইভার দিকে তাকাই। সে বিপন্ন মুখে বলে, ‘আমি পরে তোমাকে সব খুলে বলছি।’ ঝুপসি ভুরুর নিচে ঘোলাটে দৃষ্টিকে ঘষা কাচের মতো আরো ঝাপসা করে আবুয়েলো বলেন, ‘দিগা লে তদোস’ বা ‘তাকে সব কিছু বলবে’, তারপর যেন বিড়বিড় করে একান্তে উচ্চারণ করেন, ‘পরকে নস অকুলতান লা ভেরদাদ’ বা ‘আমরা সত্য গোপন করব কেন?’

ইভা উঠে পড়লে আমি তার মাতা-পিতাকে হ্যালো বলতে চাই। সে মৃদুস্বরে বলে, ‘বাবা তো নেই অনেক বছর হয়ে গেল। তুমি কি সত্যি সত্যি দেখা করতে চাও মায়ের সঙ্গে?’ আমি ফ্রুটকেক নিয়ে এসেছি। অনিচ্ছায় ইভা আমাকে নিয়ে ঘরে ঢোকে। কামরার শৌখিন সাজসজ্জা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল এই সাদামাটা ঘরের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। মেঝেতে গরুর ধবধবে সাদা লোমের কালচে-খয়েরি চিত্রা পাকড়া গালিচা পাতা। একটি জমকালো গ্র্যান্ড পিয়ানোর পেছনে বসে রিডের ওপর বেতের চাঙারি রেখে তার মা যবের দানা থেকে কাঁকর বাছছেন। আমার সঙ্গে তিনি আত্মীয়-স্বজনের মতো সাবলীলভাবে কথাবার্তা বলেন। কফি মেকারের পাশে কাঠের খালি কৌটা দেখিয়ে খুব আন্তরিকভাবে বলেন, ‘বিদেশি সিনিওরকে যে এক পেয়ালা কফি অফার করব, সে উপায়ও নেই।’ এই কফি মেকারটি খুবই দামি, হয়তো অ্যান্টিক। আমি তাঁর কথা শুনতে শুনতে শেলফের ওপরের তাকে রাখা প্যানটেক্স, নাইকন, অলিম্পিয়া ও কোডাক ক্যামেরাগুলো দেখি। তার মা ইভার বাবার কথা উল্লেখ করেন, ‘মোরালেস হাসপাতাল থেকে ফিরলেই আমরা ফিয়াসতা বা পার্টির আয়োজন করব। ইভার বন্ধু যখন, তোমাকে দাওয়াত করার কি আছে, চলে এসো। সিনিওর মোরালেস ভালোবাসেন পেদরো আলবিনেসের পিয়ানোতে বাজানো সোনাটা। আমি একটু-আধটু প্র্যাকটিস করছি। সিনিওর মোরালেস ফিরলেই জমকালো ফিয়াসতা হবে। ভাবছি সেদিন একেবারে মন মজিয়ে বাজাব।’ ইভার চোখে স্পষ্টত অস্বস্তি দেখি। তার বাবা সিনিওর মোরালেসের মৃত্যু হয়েছে না বছর কয়েক আগে! তবে কি আমি ভুল শুনলাম? নাকি সে এসপানিওলে যা বলেছে, তা বুঝতে ভুল হলো? আমি তার দিকে তাকালে সে ইঙ্গিতে আমাকে উঠতে বলে। তার মা সিনিওরা মোরালেসের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে তিনি বলেন, লো ‘সিয়েনতো তানতো’ বা ‘আই অ্যাম সো স্যরি, কে ফুয়ে তোতালমেনতে মি কুলপা’ বা ‘ভুলটা সম্পূর্ণ আমারই, একটু সাবধান হলে সিনিওর মোরালেসকে হাসপাতালে যেতে হতো না।’

আমরা সড়কে এসে মিরাফ্লোরের দিকে রওনা হই। ইভা রোলার স্কেটের চাকাওয়ালা জুতা পরে ঘরঘরিয়ে আগ বাড়ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে চলছি। মিরাফ্লোরের  পাহাড়ি গন্তব্য অনেক দূর। এভাবে ওখানে পৌঁছা যাবে না। পথে পিকআপ, ভ্যান, চাই কি মাইক্রোবাসও পাওয়া যেতে পারে বলে ইভা আশ্বস্ত করে। তার জননী সিনিওরা মোরালেসের কথাবার্তা আমার কানে লেগে আছে। তাঁর স্বামী সিনিওর মোরালেস হাসপাতাল থেকে ফিরলে তিনি পেদরো আলবিনেজের সোনাটা বাজিয়ে সেলিব্রেট করবেন। আলবিনেজের নাম আমি শুনেছি, তবে তাঁর রচিত সিম্ফনি আমি কখনো শুনিনি। কিন্তু হাসপাতালের বিষয়টি কী? সিনিওর মোরালেসকে নিয়ে রহস্যটা কোথায়? আমি দাঁড়িয়ে পড়ে ইভাকে সরাসরি প্রশ্ন করি। আমার কাঁধে হাত রেখে ভারসাম্য রক্ষা করে সে বলে, ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বেশ কয়েক বছর পর বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়। খামারের বিষয়-আশয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। পেশায় তিনি ছিলেন ফটোগ্রাফার। তখন বিপ্লবের কারণে আমেরিকার সঙ্গে নিকারাগুয়ার যোগাযোগ খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি নির্বাচিত হলে তিনি পাশের দেশ কোস্টারিকা হয়ে গোপনে আমেরিকায় যান সপ্তাহখানেকের জন্য। ফিরে এলে তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে ছিলেন বছর কয়েক। বই পড়তে ভালোবাসতেন বাবা। অ্যালান পো ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন অ্যালান পোর বইয়ের ভিন্ন ভিন্ন কিছু সংস্করণ। কারাগারের সেলে বসে সারা দিন তা পড়তেন। এই আচরণকে পাতি বুর্জোয়া অভ্যাস আখ্যা দিয়ে জেলার তাঁর চশমা জব্দ করেন। চশমা ছাড়া তিনি পড়তে পারতেন না একেবারে। আমার বয়স যখন তেরো, তখন তাঁর হার্টের অসুখ খুব বাড়াবাড়ি হয়। জেলারকে ধরেকয়ে মা কারাগারে পৌঁছে দেন কিছু ওষুধ। কয়েদিদের সেলে মেডিসিন রাখা নিষিদ্ধ ছিল। জেলারের পাশের কামরায় একটি আলমারিতে সব কারাবন্দির ওষুধপত্র নামের লেবেল লাগিয়ে একসঙ্গে রাখা হতো। চশমা না থাকায় বাবা তখন চোখে খুব কম দেখতেন। ভুলে অন্য এক কারাবন্দির ওষুধ খেয়ে নিলে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে শহরের হাসপাতালে তাঁকে আনা হয়, তিন দিন পর ওখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।’

ইভা সত্যিকারের স্পোর্টস গার্ল, রোলার স্কেটে এগিয়ে যেতে তার দেহে কোনো হেলদোল হয় না। সে সমকোণের বাহুর মতো পাকা সড়কে তার শরীরের ছায়া দিয়ে জ্যামিতির রেখাচিত্র আঁকলে আমি বলি, ‘লো সিয়েনতো তানতো’, ‘আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি’, তোমার মা অনেক সাফার করছেন। সে রোলারের বেগ নিয়ন্ত্রণে এনে বলে, “মা কিন্তু মানসিক রোগী নয়। তবে মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়ে বলে, ‘আমি কারাগারে ওষুধ পৌঁছে না দিলে এই অ্যাকসিডেন্ট হতো না।’ কখনো তার মনে হয়, বাবা হয়তো হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসবেন ঘরে। বাট আই অ্যাম টেলিং ইউ ওয়ান থিং, মা কিন্তু পিয়ানোতে পেদরো আলবিনেজের সোনাটা সত্যিই ভালো বাজায়। আমাদের বাড়িতে আসো আরেক দিন। মায়ের মুড ভালো থাকলে সে হয়তো বাজিয়ে শোনাবে।”

মিরাফ্লোরের পাহাড়ে বনানীর পরিসর বৃহৎ। ওখানকার ওপরের লেয়ারের হ্রদের কাছাকাছি পৌঁছার জন্য হালফিল তৈরি হয়েছে পাকা সড়ক। আমরা যেতে যেতে একটি পিকআপ ট্রাক দেখতে পেলে ইভা হাত তুলে তা দাঁড় করায়। ট্রাক চেরা কাঠ নিয়ে যাচ্ছে ফিনকা নেবলিনা ফার্মের দিকে। তো, আমরা সামনে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসি। ইভা রোলার স্কেটের জুতা খুলে আমার হাতে দিয়ে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে পরে নেয় হাইকিং শু। পিকআপ স্টার্ট দিলে আমি চাকাওয়ালা ভারী জুতা হাতে মুখ ভোঁতা করে বসে থাকি।

পিকআপ আখের নিবিড় ক্ষেতের ভেতর আঁকাবাঁকা সড়কে ওপরে উঠতে শুরু করলে গাড়ির আওয়াজে দুই পাশে ওড়ে ‘রেনচেরা’ পাখির ঝাঁক। একজন চাষিকে দেখি, হাঁটু ভেঙে আখ কেটে বাঁধছেন আঁটি। মিনিট বিশেক পথ চলার পর আমরা চলে আসি আরেকটি ক্লাইমেটিক জোনে। উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে খানিক দূরের বনানী পরিষ্কার দেখা যায়। ওপরের লেয়ারে ক্লাউড ফরেস্টের সবুজ ব্যালকনিতে কারা যেন ঝুলিয়ে দিয়েছে রাশি রাশি সাদা মসলিনের চাদর। বেসামাল বাতাসে উড়ে যাচ্ছে একটি-দুটি শুভ্র গিলাফ। লালচে রঙের ধূলি উড়িয়ে পিকআপটি বাঁক নেয়, সঙ্গে সঙ্গে নিচের লেয়ারে দেখি ইক্ষুবন ছাড়িয়ে পত্রপল্লবের সবুজ মশাল জ্বেলে দাঁড়িয়ে কয়েকটি সুঠামদেহী জায়েন্ট মাটাপালো বৃক্ষ।

চারদিকে নুড়ি ছিটকে পিকআপ উঠে যাচ্ছে ওপরে। এদিকে রাবারের গাছে গাছে ধাতব পাত্রে সংগ্রহ করা হচ্ছে আঠালো নির্যাস। ফিনকা নেবলিনার শুরু এখান থেকেই। জালিতারের একটি বহুতল অর্কিড হাউস অযত্নে ধসে পড়তে পড়তে যেন কায়ক্লেশে দাঁড়িয়ে আছে। ইভা ফিসফিস করে বলে, ফিনকা নেবলিনাতে তার পূর্বপুরুষরা অনেক বছর ধরে আখ ও কফির চাষ করছিল, তবে বছর পঞ্চাশেক আগে তার আবুয়েলো বা পিতামহ তিন শ প্রজাতির অর্কিড জালিতারের এই ইমারতে বন্দি করে গুছিয়ে ফোটাতে শুরু করেন কমার্শিয়ালি। ইভা বিষয়টি সুশারে বলার আগেই আশপাশের ডালপালায় ঝাপটা মেরে লেঙ্গুড় উঁচিয়ে পরস্পরের দিকে দাঁত-মুখ খিঁচে কোন্দল বাধায় একদল কুচকুচে কালো হাউলার মাংকি। এদের ভাঙা ডাল হাতে যূথবদ্ধ বাঁদরামি দেখতে দেখতে মনে হয়, সব রওনা হচ্ছে লাঠিসোঁটা নিয়ে চর দখলের লড়াইয়ে।

পিকআপ এখন খুব লো গিয়ারে ওপরে উঠছে। দেখি, একটি গাছের ডালে বিমর্ষ মুখে বসে আছে শিশুসন্তান কোলে শান্তশিষ্ট এক বানর দম্পতি। সড়কের ওপর দিয়ে এখন ভেসে যাচ্ছে থোকা থোকা মেঘ। কিছু নাম-না-জানা গাছ থেকে ঝুলছে শ্মশ্রুধারী সাধু-সন্ন্যাসীর জটাজুটের মতো মস। কফিক্ষেতের পাশে পিকআপটি দাঁড়াতেই আমরা নেমে পড়ি। কফির ঝোপে ঝোপে মচ্ছব করে উড়ছে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রজাপতি। মাঝে মাঝে তাদের তাড়া করে উড়ছে তুলতুলে লাল বুকে সবুজ ডানার লেজ ঝোলা ‘কোয়েতজাল’ পাখি। ফিনকা নেবলিনা ফার্মের দিকে উঠে যাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আমরা টুকটাক কথা বলি। সান্দিনিস্তাদের উদ্যোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মোরালেস পরিবার আইনি নির্দেশে ফার্মের মালিকানা হারায়। দানিয়েল ওর্তেগার সরকার কফি, রাবার ও ইক্ষুর তাবৎ আবাদ ভাগ করে দেয় আটটি আলাদা সমবায় সমিতিকে। এই কো-অপারেটিভগুলোর কর্তা হয়ে বসেন পার্টি ক্যাডার ও গেরিলা যুদ্ধের কমান্ডাররা। ফার্মের  ৩০-৪০টি শ্রমজীবী পরিবারকে গেরিলা যুদ্ধে অবদানের জন্য দেওয়া হয় পাঁচ একর করে কফিক্ষেতের টুকরো জমি। যেতে যেতে আমরা দেখি, ক্ষুদ্রচাষিরা গাছের তলায় স্তূপ করে শুকাচ্ছে লালচে রঙের কফি বিন।

মিনিট তিরিশেক হেঁটে বেহদ মেহনতে আমরা উঠে আসি ফিনকা নেবলিনার কাছে। এখান থেকে ফার্মের অফিস, কফি সংরক্ষণের দালান, ইক্ষু নিংড়ে গুড় তৈরির কারখানা ইত্যাদি পরিষ্কার দেখা যায়। ফার্মের স্থাপনার পাশেই মোরালেস পরিবারের সাবেক রেসিডেন্স—ছনের ছানি দেওয়া শ্যালে। বিপ্লবের পর পরিবারটি ফার্মের দখলিস্বত্ব হারালেও তারা রেসিডেনশিয়াল শ্যালেতে বাস করে আরো বছর সাতেক। ইভার জন্মও হয় এই শ্যালেতে, বিপ্লবের বছর কয়েক পর। তবে তার পিতা সিনিওর মোরালেস যুক্তরাষ্ট্রে সংগোপনে আলোকচিত্রের প্রদর্শনী সেরে দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে তাদের চার প্রজন্মের বসতবাড়ি থেকে পরিবারকে বহিষ্কার করা হয়। সেই থেকে তারা বর্তমানের ভাড়া বাসায় বসবাস করছে।

ফার্মের স্থাপনা দেখতে আমার আগ্রহ হলেও ইভা ওখানে যেতে চায় না। আমি তাকে নিচে রেখে মিনিট বিশেকের জন্য সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই ওপরে। শ্রমিকরা ইক্ষু নিংড়ে জ্বাল দিচ্ছে, চিমনি দিয়ে বেরোচ্ছে ধোঁয়া। ফার্মের আউটলেটে পৌঁছার জন্য আমাকে উঠে যেতে হয় আরেকটি টিলার ওপর। ওখান থেকে ঈশান কোণে তাকিয়ে দেখি, গাছপালাহীন একটি প্রান্তর যেন গড়িয়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। আর ঘাসে মুখ ডুবিয়ে চরছে ধবধবে সাদা চিত্রাপাকরা গরুর পাল। আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে প্যাকেট করা কফি বিন। আমি ওখান থেকে কেসো ‘ফ্রেসকো’ বা ফ্রেশ চিজ কিনি। কাউন্টারের সেলস গার্ল তা গাছের সবুজ পাতায় মুড়ে দিতে দিতে মস্ত বড় একটি কাঠের পিপা থেকে ঢেলে অল্প একটু পানীয় টেস্ট করতে দেয়। ইক্ষুর ফার্মেন্টেড নির্যাসের সঙ্গে বাতাবিলেবুর তাজা রস মিশিয়ে তৈরি এই ড্রিংকস বেবিদা ‘দে-মোরালেস’ বা ‘মোরালেস পরিবারের পানীয়’ বলে পরিচিত। আমি ছোট্ট একটি বোতল কিনলে সেলসগার্লের কাছ থেকে আরো জানা যায়, একসময় এই পানীয় শুধু মোরালেস পরিবারের অতিথিদের পরিবেশন করা হতো। তবে হালফিল কো-অপারেটিভের লোকজন তা কমার্শিয়ালি বাজারজাত করছে। আমি আউটলেটের জানালা দিয়ে খানিক দূরে টিলার অন্য ধাপে সাবেক মালিকদের বসতবাড়ির শ্যালেটির দিকে নির্দেশ করে জানতে চাই, কারা বাস করে ওখানে? জবাব আসে, শ্যালেটিকে গেস্টহাউস বানিয়ে ইদানীং ইকো ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশবান্ধব পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। নিচে নামার পথে আখ মাড়াইয়ের শেডের কাছে এসে আমি আবার ওপরের দিকে তাকাই। দেখি, শ্যালের আঙিনায় ঝুলছে ইস্পাতের দোলনা। তাতে দোল খাচ্ছে অজানা কোনো পর্যটক পরিবারের বাচ্চা। আন্দাজ করি, অনেক বছর আগে হয়তো শিশু ইভা এই দোলনায় দোল খেত।

নিচে নেমে ইভাকে দেখতে না পেয়ে আমি চারদিকে তাকাই। বেশ খানিকটা দূরে একটি স্কয়ারের মতো জায়গায় দেখি, সে একমনে রোলার স্কেট করছে। আমি ওখানে চলে এলে দেখি, জায়গাটি সিমেন্টে বাঁধানো, পাশে আখ জ্বাল দেওয়ার বড় বড় উনুন। এক কোণে রাখা কাঠে তৈরি ড্রায়ার ফ্রেম দেখে অনুমান করি, এখানে কফি বিন চয়ন করে রোদে শুকানো হয়। তোমার শৈশবের বাড়িঘর দেখে এলাম বললে ইভা আমার চারপাশে ঘরঘরিয়ে নিখুঁত বৃত্তে রোল করতে করতে বলে, ‘মাঝে মাঝে আমারও যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু কো-অপারেটিভের লোকজন আমাকে চেনে। আমার এখানে আসা-যাওয়া তাদের পছন্দ হবে না বলে আমি ওদিকে পা বাড়াই না। ছোটবেলায় এই কফি শুকানোর পাকা চাতালে আমি রোলার স্কেট করা শিখি। তাই মাঝে মাঝে এখানে আসতে ইচ্ছা হয়।’ সে এবার রোল করতে করতে চলমান পায়ে সিমেন্টের চাতালে ষড়ভুজ আঁকতে আঁকতে মুখের সামনে দুই হাতে কাপ করে ডাকে, ‘ব্রি...সা।’ একটু থেমে থেমে তার ব্রি...সা উচ্চারণ পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে চারদিকে। তাকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। ঝোপঝাড় মাড়িয়ে পড়িমরি করে ছুটে আসে একটি কুকুর। ব্রিসা নামের কুকুরটি তার পা লেহন করলে সে একটি কফি ড্রায়ারের ফ্রেমে হেলান দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে। ব্রিসা এখন তার চোখে-মুখে-গলায় জিব দিয়ে চাটছে। ব্রিসা কি তোমার কুকুর? আমি জানতে চাই। ইভা জবাব দেয়, ‘বালিকা বয়সে আমরা যখন শ্যালেতে বাস করতাম, তখন ব্রিসার মা অদনচিয়া ছিল আমার নিজস্ব কুকুর। উত্খাত হলে তাকে ফার্মে ফেলে রেখে আমরা উঠে যাই ভাড়া বাড়িতে। কয়েক বছর পর অদনচিয়ার মৃত্যু হয়। ব্রিসা তার সন্তান। আমাকে কিভাবে যেন সে এখনো মনে রেখেছে।



মন্তব্য