kalerkantho

সাক্ষাৎকার

কহেন অনঙ্গ বউ

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



কহেন অনঙ্গ বউ

পুতুলখেলার ছলে বেণি দোলাতে দোলাতে একদিন বড় বোন সুচন্দার হাত ধরে চলে এলেন চলচ্চিত্রে। জহির রায়হানের ‘সংসার’-এ (১৯৬৮) হলেন শিশুশিল্পী। তারপর অনেক পথ...! আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখ এই অভিনেত্রী। এ বছর অভিনয়ে ৫০ বছর পূর্ণ হলো ফরিদা আক্তার ববিতার। রমজানের এক পড়ন্ত বিকেলে সত্যজিৎ রায়ের ‘অনঙ্গ বউ’-এর মুখোমুখি হলেন দাউদ হোসাইন রনি

 

বাসায় ঢুকেই চমকে যেতে হলো। ড্রয়িংরুমের লাগোয়া বারান্দায় খাঁচাবন্দি দুই পাখির তুমুল ঝগড়া—একটা ময়না, আরেকটা তোতা। ময়না বলে, ‘অনিক কই? অনিক কই?’ তোতা বলছে, ‘এইটা এই দিকে দে, ওই এই দিকে আয়।’ একবার-দুবার না, টানা বলেই যাচ্ছে ওরা। মনে হচ্ছে দুজন নারী-পুরুষের মধ্যে কথার পিঠে কথার প্রতিযোগিতা চলছে। অবাক করার বিষয়, ময়নার কণ্ঠটা অবিকল ববিতার! ‘টাকা আনা পাই’তে ববিতা যেভাবে রাজ্জাককে আহ্লাদি স্বরে বলেন, ‘ওরে আমার কে রে!’

তোতার কণ্ঠটা বদমেজাজি পুরুষের। মনে হলো কোনো রাজমিস্ত্রির কথা রেকর্ড করে নিজের কণ্ঠে বসিয়ে নিয়েছে সে। নির্মাণাধীন বাড়িতে যে রকম ঠুসঠাস আওয়াজ হয়, তোতার কথা বলার সময় সে রকম কিছু শব্দ প্রতিবার একই রকম পাওয়া যাচ্ছে। সে কারণেই রেকর্ডেড মনে হচ্ছে।

‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝগড়া শুনছেন! খেয়েদেয়ে এদের কোনো কাজ নেই, কথা আর কথা’—ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে বললেন ববিতা।

কুশলাদি বিনিময় শেষে জিজ্ঞেস করি, ওরা তো আপনার কণ্ঠ একেবারে কপি করে নিয়েছে! হেসে উঠলেন আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপি’, “ওরা তো আমার হাঁচিকাশিও কপি করে। খুব দুষ্টু, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বলে ‘খোদা হাফেজ’। সারাক্ষণ অনিক অনিক করে (ববিতার একমাত্র ছেলে অনিক)। আমি বলি, ‘অনিক কানাডায়’। ওরাও বলে, ‘অনিক কানাডায়’। হা হা হা।”

কম বয়সী এক গৃহপরিচারিকা এলো মোবাইল হাতে, এগিয়ে দিল ববিতার দিকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরো এক গৃহপরিচারিকা। ববিতা বলেন, ‘আসুন, ওই টেবিলে গিয়ে বসে কথা বলি।’

ববিতাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। দারুণ সাজিয়েছেন ফ্ল্যাটটা। চারদিকের দেয়ালে ছবি আর ছবি—সত্যজিৎ রায়, রোমান পোলানস্কিসহ পৃথিবীখ্যাত মানুষদের সঙ্গে তাঁর ছবি। ডাইনিং, শোবার ঘর আর বসার ঘরের মিলন মোহনায় অদ্ভুত এক ছাদখোলা বারান্দা। বিশাল সেই বারান্দায় নানা পদের গাছ, পাখি, পানির ফোয়ারা, বসার টেবিল-চেয়ার। দরজার পাশেই একটা গাছে ফুল ফুটেছে। ববিতা এগিয়ে গিয়ে ফুল হাতে দাঁড়ালেন। গৃহপরিচারিকাকে মোবাইল দিয়ে বললেন, ‘ছবি তুলে দাও।’ মোবাইল বের করে আমিও তাঁর ছবি তুলতে শুরু করলাম। ‘আপা, ফুলটার নাম কী?’ ঝটপট বললেন, ‘নাইটকুইন। রাতে এই ফুলটা অনেক বড় হয়ে যাবে।’

আমি বলি, বাহ্, অলটাইম কুইনের হাতে নাইটকুইন। একটু কি আড়চোখে তাকালেন ‘বসুন্ধরা’র ছবি? কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। ছবি তোলা শেষে চেয়ার-টেবিল দেখিয়ে দিলেন।

একমাত্র ছেলে থাকে বিদেশে, বাসায় আপনি ছাড়া দুজন মাত্র গৃহপরিচারিকা। অভিনয় ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। একাকিত্ব পেয়ে বসে না আপনাকে?

লোনলিনেসের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছি। দেখছেন না, চারপাশে আলাদা একটা দুনিয়া বানিয়ে রেখেছি। সকাল-বিকাল ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি।

 

আপনি তো কিশোরী বয়সেই চলচ্চিত্রে পা রেখেছিলেন। অন্য সব কিশোরীর মতো কৈশোরটা এনজয় করতে পারেননি বলেই কি বাসাটাকে এভাবে সাজিয়েছেন? গাছ, পাখি, মাছ...

হা হা হা। ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল মায়ের মতো ডাক্তার হব। এরপর তো জহির ভাই আমাকে সিনেমায় আনলেন। আমি বললাম, এই একটাই করব, আর করব না। ‘সংসার’-এ আমি ছিলাম শিশুশিল্পী। ছবিটা ফ্লপ। তারপর জহির ভাই বললেন, ‘এবার নায়িকা হও।’ কারণ ‘জ্বলতে সুরজ কে নিচে’ ছবিটার নায়িকা হওয়ার কথা ছিল শবনম আপার, উনি শিডিউল দিতে পারছিলেন না। জহির ভাইকে প্রযোজক বললেন, ‘তোমার বাসায়ই তো নায়িকা আছে।’ তখন আমার নাম ছিল সুবর্ণা। পশ্চিম পাকিস্তানের বড় বড় আর্টিস্ট ছিলেন ছবিতে। নাদিম সাহেবের ট্রিপল রোল। তখনো বলেছি, এটাই কিন্তু শেষ, আর করব না। ছবিটা কমপ্লিট হলো না। তখন জহির ভাই ববিতা নাম দিয়ে নায়িকা করলেন ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিতে। তখনো আমি বলেছি—একটাই করব, আর না। কারণ শুটিংয়ে বড় আপাকে দেখেছি, অনেক কষ্ট করে। আমি মায়ের মতামত মেনে ডাক্তারই হব। আমি তো তখন একেবারে পিচ্চি একটা মেয়ে।

 

‘শেষ পর্যন্ত’ যেদিন মুক্তি পেল, সেদিনই আপনার মা মারা গেলেন। খুশির দিনটা জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার দিন হয়ে গেল...

খুশির দিন তো হতেই পারে না। পরে জানলাম ছবিটা খুব হিট হয়েছে। টিনএজাররা আমাকে খুব পছন্দ করেছে। তারপর আমাদের বাড়িতে ডিরেক্টর, প্রডিউসারদের লাইন পড়ে গেল। ‘স্বরলিপি’র পরিচালক এলেন। তখন জহির রায়হান বললেন, ‘এটাই তোমার নিয়তি, আর কোথাও যেতে পারবা না।’

 

তখনকার যে আমাদের সামাজিক অবস্থা, সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের কি সমাজের অন্য লোকেরা ভিন্ন চোখে দেখত?

সমাজের লোকেরা তো অন্য রকমই দেখত। আমার দাদা-চাচারা ভীষণ রক্ষণশীল। পরিবারের মেয়ে বোরকা পরে গ্র্যাজুয়েশন করে আসত। আমরা ফিল্মে এলাম মানে বারোটা বেজে গেছে! আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিল বাবার দিকের প্রায় সবাই। মায়ের দিকের কেউই এমন ছিলেন না। মা যশোরের মেয়ে তো, খুব সংস্কৃতিমনা ছিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, নাচ-গান করার রেওয়াজ ছিল।

 

বাবাও তো যশোরেরই?

হ্যাঁ, বাবা ততটা রক্ষণশীল ছিলেন না। তবে পরে দাদা-চাচারা যখন দেখলেন বিশ্বব্যাপী আমাদের নাম ছড়িয়ে পড়ল, তখন তাঁরা বলতেন—এই জানো আমি কে? আমি ববিতা-সুচন্দার চাচা, আমি দাদা।

 

চলচ্চিত্রে আপনার গার্ডিয়ান ছিলেন জহির রায়হান। যুদ্ধের সময় তো আমরা উনাকে হারিয়ে ফেলি। এরপর আপনার জার্নিটা কি সহজ ছিল?

আমি ফিল্মে আসি ১৩ বছর বয়সে। নায়িকা হলাম ১৫ বছর বয়সে। চিকনা-পাতলা ছিলাম। আমাকে কাপড়টাপড় পরিয়ে মোটা বানানোর চেষ্টা করা হতো। বাবা বললেন, ‘সব জায়গায় ভালো-মন্দ মানুষ আছে, মা। তুমি কেমন করে চলবা, সে দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। এখানে আমি তোমাকে পাহারা দিয়ে কিছু করতে পারব না।’ আমার একটা দুর্নাম ছিল, এই পিচ্চি মেয়েটা খুব অহংকারী, কারো সঙ্গে গল্প করে না...ইয়েটিয়ে। তখন জহির ভাই নাই। আপা তাঁর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমি একা একা শুটিং করি। দেশ-বিদেশে যাই। আমি শুটিংয়ে যেতাম মোটাসোটা বই নিয়ে। কারো সঙ্গে গল্প বা পরচর্চা না করে বই নিয়ে বসতাম। অন্যরা বলত—বাবা! বই পড়ছে! তাহলে তো কথা বলা যাবে না, ডিস্টার্ব করা যাবে না। সত্যি বলতে কি, আমি বইয়ের দুটি লাইনও পড়িনি। এই গোপন কথাটা আজকে বলে দিলাম (হাসি)। তখন যারা বলত ববিতা অহংকারী, কারো সঙ্গে গল্প করে না, তারাই এখন আমাকে বেশি সম্মান করে। দর্শকরাও আমাকে পছন্দ করেছেন। পুরস্কৃত হয়েছি। বিদেশের বিভিন্ন ফেস্টিভালে অতিথি হয়ে গেছি।

বাংলাদেশের আর কোনো অভিনয়শিল্পী আপনার মতো এত এত বিদেশি উৎসবে আমন্ত্রিত হননি। সেই দিনগুলোর কথা শুনতে চাই...

সোভিয়েত ইউনিয়নের এত এত ফেস্টিভালে গেছি, তখন নিজেকেই প্রশ্ন করেছি, ববিতা কি বাংলাদেশে বেশি পপুলার, না সোভিয়েত ইউনিয়নে? ১৯৭৪ সালে সত্যজিতের ‘অশনি সংকেত’ দিয়ে শুরু। বার্লিন ফেস্টিভালে পুরস্কৃত হলাম। যেখানেই যাই সেখানেই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এই হচ্ছে হিরোইন অব সত্যজিৎ রে। বড় বড় বয়স্ক নায়িকার ভিড়ে আমি বাচ্চা একটা মেয়ে। আমাকে বলা হতো ডার্লিং অব দ্য ফেস্টিভাল। আরো যেটা হতো, ফেস্টিভালের ওপেনিং ও ক্লোজিং করানো হতো আমাকে দিয়ে। এটা যে কত বড় সম্মানের! তাসখন্দ, মস্কোতে দশ-বারো বার গেছি। আমার ছবিগুলো ওদের ভাষায় ডাবিং করে সিনেমা হলে চালানো হতো। হলে গিয়ে নিজেই অবাক, আরে আমি রাশিয়ার ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছি! এমনও হয়েছে, ট্যাক্সি ড্রাইভার বা পার্লারের মেয়ে বলেছে, ‘অ্যা, ইউ ববিতা? ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ?’ ‘কেনু আত্রিজ’, ‘ও চিন ক্রাচিবা’ বলে আমাকে জড়িয়েও ধরত। সবচেয়ে বড় যে প্রাপ্তি, আমি ওখানে জুরিবোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হলাম। তখন ভারতের রাজকাপুর সুপারস্টার। তাঁকে খুব দাম দেওয়া হতো। হলের সামনে রাজকাপুরের কয়েকটা ব্লো-আপ টানানো, তার পাশে এই ববিতার পাঁচ-ছয়টা ব্লো-আপ টানানো থাকত।

 

আপনার ব্লো-আপগুলো কি শুধু ‘অশনি সংকেত’-এর ছবি দিয়েই করা হতো?

নো! ‘অশনি সংকেত’ দিয়ে শুরু। ‘বসুন্ধরা’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘লাঠিয়াল’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘দহন’, ‘হারজিত’—সবগুলো প্রদর্শিত হয়েছে। আর কমার্শিয়াল ছবি গেছে মার্কেটিংয়ের জন্য। পরিবেশকরা ছবিগুলো নিয়ে গিয়ে ডাবিং করে নিজের দেশে চালাবে। আমার ছবিগুলো তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন হলে চলার কারণে রাস্তায় বের হওয়াই মুশকিল হয়ে যেত। এই বিষয়টি আলমগীর কবির ভাইও দেখে এসেছেন। ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’ নিয়ে উনি ফেস্টিভালে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে উনি বলেছেন—‘ও মাই গড, আমি কী দেখে এলাম! আমাদের ববিতা সোভিয়েত ইউনিয়নে একনামে পরিচিত।’ এই সম্মানগুলো আমি অর্জন করেছিলাম।

 

বলা যায়, সেভেনটিজের ঢালিউড পুরোটাই আপনার দখলে ছিল! ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার চালু হওয়ার পর টানা তিনবার পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

ভাগ্য ভালো যে ভালো ছবিগুলো আমি করতে পেরেছিলাম।

জহির রায়হানের সঙ্গে আপনার শেষ ছবি কোনটা?

‘লেট দেয়ার বি লাইট’, যেটা একটা ইন্টারন্যাশনাল ছবি হতে যাচ্ছিল। ছবির পুরো পাণ্ডুলিপি ছিল জহির ভাইয়ের মাথার ভেতর। কোথাও লেখা ছিল না। যে কারণে জহির ভাই শুধু বলতেন, ‘এটাই হবে আমার জীবনের শেষ ছবি।’

 

শেষ ছবি! মানে কোন অর্থে?

সেটা তো আমি জানি না।

 

‘এটা সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি, এরপর আমার আর কোনো ছবি না বানালেও চলবে’—এ রকম কিছু কি বুঝিয়েছিলেন?

হতে পারে। ছবিটা উনি এমনভাবে বানাচ্ছিলেন, নিজেই এটার ক্যামেরাম্যান ছিলেন। উনি ছাড়া ছবির কোনো কিছুই কেউ জানত না। সেই ছবিটা আর কমপ্লিট হলো না। নেগেটিভগুলো খান আতাউর রহমান, ভারতের কয়েকজন পরিচালকসহ আরো অনেকেই দেখেছেন। সুচন্দা আপা নিজেও পরে চেষ্টা করেছেন, এটা কী করা যায়? শেষ করা যায় কি না? কিন্তু কেউই পারল না।

 

জহির রায়হানের সঙ্গে আপনার শেষ কথাটা কী হয়েছিল?

ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে হারালেন। উনি তখন একটু ধার্মিক হয়ে গিয়েছিলেন। বড়দি (পান্না কায়সার) সুচন্দা আপাকে নিয়ে আজমির শরিফ গেলেন। এখানে সেখানে ভাইকে খুঁজছিলেন, কিন্তু কোথাও তাঁকে পেলেন না। এর পরের ঘটনা তো সবাই জানে। বলা হলো যে শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধান পাওয়া গেছে, তাঁকে খুঁজতে জহির ভাই মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টরে গেলেন। তারপর তো আর ফিরে এলেন না।

 

বের হয়ে যাওয়ার সময় কি আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

না। আমি তো তখন গেণ্ডারিয়ায় থাকি। আমি জানতাম না যে জহির ভাই আজকে শহীদুল্লা কায়সার দাদার জন্য যাচ্ছেন। শুধু এটা মনে আছে, ইন্ডিয়ান একজন ব্রিগেডিয়ার বললেন, তোমাদের বাড়িতে আমরা ডিনার করব। আরো বললেন, তোমরা একটা সুখবর পেতে যাচ্ছ। জহির ভাইয়ের কাছেও শুনেছি একটা সুখবর আছে, কিন্তু কী সেটা আমাদের বলেননি। মনে আছে, আমার একটা খাসি মোরগ ছিল। আমরা রান্নাবান্না করি, আর সুখবরের অপেক্ষায় থাকি। সুখবর আর আসেনি।

 

সেই সুখবরটা কী হতে পারত, ধারণা করতে পেরেছিলেন?

জানি না। আমি তো অনেক ছোট  ছিলাম। অত কিছু বুঝি না। সুচন্দা আপা হয়তো ধারণা করতে পারেন।

 

‘অশনি সংকেত’ প্রসঙ্গে আসি। এই ছবিতে অভিনয়ের গল্প আমরা অনেকবার শুনেছি। অল্প কথায় যদি বলেন...

ছবিটা সত্যজিত্বাবুর আরো অনেক আগে বানানোর কথা ছিল। শুনেছি, উনি অনেক দিন ধরে নায়িকা খুঁজছিলেন। উনার তো অনেক নায়িকা ছিল। উনার নিজের তৈরি জয়া ভাদুড়ী ছিলেন, শর্মিলা ঠাকুর ছিলেন। উনারা তো ববিতার চেয়েও সুন্দরী (হা হা হা)। তবে উনি যখন আমার ক্যামেরা ফেস, কথা বলার স্টাইল, ম্যানারিজম দেখলেন—সব কিছুতেই অনঙ্গ বউকে খুঁজে পেয়েছেন, ‘ইউরেকা! পেয়ে গেছি আমার অনঙ্গ বউ।’ বলে চিত্কার করে উঠলেন তখনকার অনেক অভিনেত্রীই তখন নানা কথা বলেছেন, বিশেষ করে শর্মিলা ঠাকুর এক পত্রিকায় বলেছেন, ‘আমরা থাকতে দাদা বাংলাদেশের কোথাকার কোন ববিতাকে নিয়ে শুটিং করছে।’

 

সেই শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে কিন্তু আপনি পরে একটা ছবিও করেছেন—‘দূরদেশ’।

হ্যাঁ, করেছি। তো কী! কাজ তো কাজই।

 

আপনার ওয়ালে দেখলাম আপনাকে লেখা সত্যজিতের একটা চিঠি। ‘অশনি সংকেত’ রিলিজ করার কত দিন পর পর্যন্ত আপনাদের যোগাযোগ ছিল?

একেবারে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কলকাতা গেলেই দাদার ওখানে যেতাম। বলতাম—দাদা, আমি ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছি, চিংড়ি নিয়ে এসেছি। দাদা বলতেন—‘নিয়ে আয়, তুই জলদি নিয়ে আয়।’ তারপর দাদার বাসায় যেতাম।  সব সময় দাদার সঙ্গে যোগযোগ হতো। ‘অশনি সংকেত’-এর পর দাদা বলতেন, ‘আমি চাইলে কলকাতার অনেক ছবি করতে।’ এমনকি দাদার শিল্পী জয়া বা শর্মিলা কিন্তু পরে বোম্বেতে বিরাট মার্কেট পেয়েছিলেন। দাদার চিঠি এখনো আমার কাছে আছে; তিনি লিখেছেন, ‘তোকে বোম্বের ছবিতে নেবার জন্যে বেশ কিছু প্রডিউসার আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। তুই যদি করিস, তাহলে ওদের ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। নিজেই কথা বলে নে। নিজেরটা নিজে বুঝে নিবি।’ তখন মনে হলো, শর্মিলা, জয়া ভাদুড়ীর মতো আমিও যদি একটা স্থান করে নিই বোম্বেতে, তো কেমন হয়? মা বেঁচে নেই। বাবা অসুস্থ। ভাই-বোনরা যার যার প্রফেশন নিয়ে ব্যস্ত। আমি যে বোম্বে যাব বা কলকাতায় গিয়ে একা একা ছবি করব, সেই পরিবেশটা তখন ছিল না। আবার মনে হলো, আমি বাংলাদেশের মেয়ে, এ দেশ আমি ছেড়ে বিদেশে যাব। বোম্বের সেই প্রডিউসাররা এসেছিলেনও। আমি তাঁদের বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছি।

 

কোন কোন ছবির অফার পেয়েছিলেন মনে পড়ে কি?

না, মনে নেই। তখন আমার বয়সও কম ছিল। গেলে হয়তো টিকে যেতাম। চেহারা খারাপ ছিল না, ফিগারও ভালো ছিল, অভিনয়ও খারাপ করতাম না (হা হা হা)।

 

রাজ্জাকের সঙ্গে কবরী, শাবানা এবং আপনার জুটি গড়ে উঠেছিল। এই জুটি হওয়া নিয়ে নাকি আপনাদের মধ্যে ঝামেলা হতো?

আমার সঙ্গে হতো না। আমার মনে হতো, জুটি করলে অন্যের ওপর নির্ভর করে এগোতে হয়। আমার নিজস্ব ক্ষমতা আছে, জুটি প্রথায় বিশ্বাস করি না। বরং সমবয়সী জাফর ইকবালের সঙ্গে আমি ছবি করেছি, আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে। লোকে পছন্দও করেছে। এর বাইরে আমার কিন্তু সে রকম জুটি ছিল না।

 

শাবানার সঙ্গেও তো ছবি করেছিলেন?

হ্যাঁ, করেছি, দুই-তিনটা। ‘সোহাগ’ তো সুপারহিট। খুবই ভালো একজন মানুষ।

 

আপনাদের সম্পর্ক কেমন?

খুব ভালো। দেখা হলে এখনো জড়িয়ে ধরে, পুরনো কথা স্মরণ করে চোখের পানি ফেলি। শাবানা আপা প্রায়ই বলতেন, ‘এই ববিতা, তুমি এত ভারত যাও, আমার জন্য ভালো কিছু শাড়ি নিয়ে এসো।’ আমি নিয়ে এসে বলতাম—আপা, এই যে শাড়ি নেন। অনেক খুশি হতেন উনি। উনার অপারেশন হয়েছিল লেক ভিউ ক্লিনিকে। দেখতে গিয়েছিলাম। কী যে খুশি! কিছু পত্রিকা আমাদের নামে উল্টাপাল্টা নিউজ করত। কিন্তু উনি উনার মতো ছবি করতেন, আমি আমার মতো।

রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, জাফর ইকবাল ছাড়াও ওয়াসিম, মাহমুদ কলি, ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন...

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম ছবিই তো আমার সঙ্গে, সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’। ওয়াসিমের সঙ্গেও আমার সুপারডুপার হিট ছবি রয়েছে—‘রাতের পর দিন’। ও যখন নতুন, তখন মোহসীন ভাই ভয়ে ভয়ে বললেন, ছেলেটা ‘মিস্টার পাকিস্তান’ হয়েছিল, কুস্তি করত। আমি বলেছি, ও আল্লা, উনার সঙ্গে আমাকে মানাবে? এত লম্বা-চওড়া মানুষ, আমি ছোটমতো মানুষ।

 

সোহেল রানা, ফারুক, জাফর ইকবাল—এঁদের সবাই নাকি আপনার প্রেমে পড়েছিলেন?

আমি বোধ হয় দেখতে কুিসত ছিলাম না...হা হা হা। একসঙ্গে কাজ করতে গেলে ভালো লাগা ভালোবাসা হবেই। যদি বলি হয়নি, তাহলে তো মিথ্যা বলা হবে। মিথ্যা কেন বলব! তবে সত্যি করে বলি, আমি জাফর ইকবালকে খুব লাইক করতাম। হি ওয়াজ রিয়ালি স্মার্ট, সুন্দর গান করত। শুটিংয়ের ফাঁকে আমাকে গান শেখাত, বেশির ভাগই ইংরেজি গান। আনফরচুনেটলি ছেলেটা হারিয়ে গেল। ওর মধ্যে ছেলেমি ছিল। আর বাকি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের সবার সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পেয়েছি। কেন জানেন? মানুষের শেখার কিন্তু শেষ নেই। সবার কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিখেছি।

 

এই যে সবাই আপনাকে পছন্দ করতেন, সবাইকে ম্যানেজ করতেন কী করে? দেখা গেল আপনি ফারুকের সঙ্গে কাজ করছেন, ওদিকে সোহেল রানা রাগ করে আছেন...

এগুলো একটু-আধটু হয়ই। কেন হবে না? ম্যানেজ করার কিছু ছিল না। হয়তো ফারুকের সঙ্গে একটা ছবি করছি, আরেকজন ভাবল ছবিটার নায়ক সে হলে ভালো হতো। পরের ছবিটাই হয়তো তার সঙ্গে করা হতো। প্রফেশনালিজম ছিল বলেই এগুলো নিয়েও চলতে পেরেছি। সব সময় চিন্তা থাকত, ছবিটা যেন ভালো হয়। আমি যেন অ্যাওয়ার্ড পাই, ফেস্টিভালে যেতে পারি।

 

কতগুলো ছবিতে অভিনয় করেছেন এ পর্যন্ত?

পৌনে তিন শ হবে। ছবির সংখ্যা আরো বাড়ত পারত। আমার ছেলে অসুখে পড়ায় অনেক ছবি করতে পারিনি। মা হওয়ার পর ওর লেখাপড়া, স্কুলে যাওয়া, পরীক্ষা দিতে গেলে স্কুলের সামনে গাড়িতে বসে থাকতাম। তখন ভুলে যেতাম আাামি নায়িকা ববিতা, তখন আমি মা। ও পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল।

পৌনে তিন শ ছবির মধ্যে আপনার চোখে সেরা ৫ ছবি কী কী?

‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘আলোর মিছিল’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘নয়নমণি’, ‘কসাই’, ‘লাঠিয়াল’, ‘বাঁদি থেকে বেগম’, ‘দহন’, ‘স্বরলিপি’...

 

দশটা হয়ে গেল তো! তা ছাড়া ‘অশনি সংকেত’-এর কথা কি ভুলে গেলেন?

‘অশনি সংকেত’ থাকবে সবার আগে। তারপর ‘আলোর মিছিল’, ‘বাঁদি থেকে বেগম’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’।

 

এই সময়ের কথা বলি। যৌথ প্রযোজনার অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন বা আমদানি করা ছবি নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আপনাকে কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না।

না না। আমাদের যখন থাকার প্রয়োজন ছিল থেকেছি, প্রটেস্ট করেছি। কাটপিস নোংরামির বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলাম।

 

এফডিসিতে এখন অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে...

এখন যারা আছে তারা সামাল দিক। নতুনদের তো জায়গা করে দিতেই হবে।

 

আপনি তো যৌথ প্রযোজনার ছবিতেও অভিনয় করেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে, ভারতের সঙ্গে করেছেন। তখন নিয়ম-কানুন কেমন ছিল?

তখন নিয়ম-কানুন মানা হতো। এমন কোনো নিয়ম না হলেই ভালো যেটা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যায়। এখান থেকে একজন আর্টিস্ট নিয়ে ওখান থেকে বাকি সব নিয়ে ছবি করলে তো হবে না।

 

কিন্তু এভাবে কি ছবি হয়? ‘অশনি সংকেত’-এর অনঙ্গ বউ চরিত্রে আপনাকে প্রয়োজন ছিল বলেই সত্যজিৎ আপনাকে নিয়েছেন। কোন চরিত্রে কাকে প্রয়োজন সেটাও যদি সরকার নির্ধারণ করে দেয়...?

ছবিটা কে বানাচ্ছে সেটাও দেখতে হবে।

 

‘অশনি সংকেত’-এর পর মৃণাল সেনও নাকি আপনাকে নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন?

হ্যাঁ। বিএফজে-এ (বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন) আমাকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার দিয়েছিল। সেটা নিতে যখন কলকাতায় গেলাম, তখন মৃণালদা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পরে আর কথা আগায়নি। সুচিত্রা-উত্তমের ছবিগুলো যাঁরা বানাতেন, তাঁরাও নিতে চেয়েছিলেন আমাকে। ওই অল্প বয়সেই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের ছবি করেছি। সে সময় যতই অমুকতমুক থাকুক না কেন, সত্যজিতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো পরিচালক ছিলেন না। তাই অন্য পরিচালকদের ছবি করিনি।

 

ইউটিউবে আপনার করা পাকিস্তানি ছবির অনেক কাটিং পাওয়া যায়। পাকিস্তানিরাই এসব শেয়ার করে।

ওখানে বেশ কিছু ছবি করেছি। ‘নিগার’সহ দুই-তিনটা পুরস্কারও পেয়েছি। ‘নাদানি’, ‘আপস’, ‘মিস ব্যাংকক’সহ কয়েকটা করেছি।

 

নাদিমের সঙ্গে কয়টা ছবি?

ওই একটাই—‘দূরদেশ’।

 

আপনার আরেকজন পাকিস্তানি নায়ক ছিল?

নাম তো মনে পড়ছে না।

 

ফয়সাল?

ও, হ্যাঁ হ্যাঁ।

 

ইন্ডিয়ানরাও আপনার গান, নাটকীয় দৃশ্য শেয়ার করে ‘গেহরি চোট’ ছবির। ওখানে তো ‘দূরদেশ’ মুক্তি পেয়েছে ‘গেহরি চোট’ নামে।

ছবিটাতে আমার লিপে লতা মুঙ্গেশকরের একটা গান আছে। দৃশ্যটা এমন : আমার ভাই-বোন হারিয়ে গেছে, আমি মন্দিরে পূজা করছি। সেখানে আমার মা শর্মিলা ঠাকুর, ভাই রাজ বাব্বর বসে আছে। মা বারবার দেখছে মেয়েটাকে, এত আপন লাগছে কেন? বাংলাদেশে যখন রিলিজ হয়, তখন গানটা বাদ দেওয়া হয়। হিন্দিতে কিন্তু আছে গানটা।

 

শর্মিলা ঠাকুর, রাজ বাব্বর, শশী কাপুর, পারভিন ববি, নাদিম—ওঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

অদ্ভুত মানুষ ওঁরা। যত বড় শিল্পী, মন তত নরম। শর্মিলাদি, শশী কাপুর এত সুন্দর সুন্দর কথা বলতেন, আমার ভালো লাগত। ওঁদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে খুঁটিনাটি অনেক কিছু শিখেছি। শুটিংয়ের সময় একদিন শর্মিলাদি বলছেন, ‘এই ববিতা, তোমার কাছে লালপেড়ে সাদা শাড়ি আছে? আমার লাগবে।’ এমন আন্তরিকতা ছিল। পারভিন ববি কী যে ভালো মহিলা! হোটেলে আমার পাশের রুমেই থাকতেন। দেখা হলেই জড়িয়ে ধরতেন। সৌমিত্রদা, সন্ধ্যা রায়ের কথাও বলি। ঈদের দিন শুটিং ‘অশনি সংকেত’-এর। ছোট মানুষ, মনটা খারাপ করে কাঁদছি। তখন মানিকদা একজনকে ডেকে বললেন, তারাবাতি নিয়ে এসো। প্রডাকশনের লোকদের ডেকে বললেন সেমাই রান্না করতে। তারপর সবাই তারাবাতি পুড়িয়ে, আতশবাজি করে আমাকে ঈদের আনন্দ দিল। অসাধারণ সব মুহূর্ত!

 

এই যে একের পর এক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পাচ্ছেন...

এ বছর লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পেলাম চারটা—ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, জাতীয় পুরস্কার ও কলকাতার টেলিসিনে। বাংলাদেশে তো অভিনয়ের জন্য অনেক পুরস্কার পেয়েছি। টেলিসিনে কলকাতার পুরস্কার। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ করার পর ববিতা কিন্তু অনেক পপুলার ছিল পশ্চিমবঙ্গে।

 

‘লাইফটাইম পুরস্কার’ দেওয়ার মানে কি শিল্পীকে এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, ‘তোমার বয়স হয়েছে, যা দেওয়ার তা দিয়ে দিয়েছ। এবার অবসরে যাও।’ একজন শিল্পী কি কখনো অবসরে যেতে পারেন?

না।  কাজ তো কখনো শেষ হয় না। লাইফটাইম মানে যে শিল্পী শেষ হয়ে গেলেন, তা নয়। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি আর পারছি না। মানুষ যত ম্যাচিউরড হয় তত শেখে, জানে। এই বয়সে আমার আরো ভালো ভালো  চ্যালেঞ্জিং রোল পাওয়ার কথা ছিল। ভালো গল্প ভালো পরিচালকের ছবি করার কথা। দুর্ভাগ্য, আমি তা পাচ্ছি না। নায়িকা মানেই যে নাচ-গান করতে হবে তা তো নয়, হতেই পারে না। গল্পের নায়িকা তো ৩০-৪০-৫০ বছর বয়সীও হতে পারে। এখানে এমনটা হয় না। মুম্বাইয়ে শ্রীদেবী কত ভালো ভালো ছবি করে গেলেন—‘ইংলিশ ভিংলিশ’, ‘মম’। এমন চরিত্র তো আসতে হবে।

 

আপনি তো বাংলাদেশ হওয়ার আগে থেকেই অভিনয় করছেন। আমাদের সীমাবদ্ধতাটা কোথায়? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

বাংলাদেশের জন্মের আগেই অভিনয় শুরু করেছি। তার পরপরই তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সে সময় জহির রায়হান থেকে শুরু করে খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ মিতা, কাজী জহির, কামাল আহমেদ, আমজাদ হোসেনের মতো অসাধারণ সব পরিচালক ছিলেন। আমজাদ হোসেন এখনো আছেন। কিন্তু সে সময় উনার কাজগুলো ছিল চ্যালেঞ্জিং, পর্দায় সমাজকে তুলে ধরেছেন। ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’—এসব ছবি মাইলস্টোন। বিদেশে আমরা এসব ছবি নিয়ে ফেস্টিভালেও গেছি। তখন যাঁরা ছবি প্রডিউস করতেন তাঁরা ছিলেন শিল্পানুরাগী, সত্যিকার অর্থেই ভালো কিছু সৃষ্টি করতে চাইতেন। পরিচালকরাও ছিলেন অসাধারণ। শেখ নিয়ামত আলী সোশ্যাল স্ট্র্যাটেজির ওপর নির্মাণ করেছেন ‘দহন’। কার্লোবি বেরি উৎসবে যখন ছবিটা নিয়ে গেলাম, বিদেশিরা জানতে চাইল তোমাদের দেশ এত গরিব, মডার্ন ইক্যুপমেন্ট নাই, তার পরও তোমরা এত ভালো ভালো ছবি কিভাবে বানাও? এত সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফি! আব্দুল্লাহ আল মামুনও ভালো ছবি বানিয়েছেন। মোহসীন সাহেব বানিয়েছেন ‘বাঁদি থেকে বেগম’। ছবির রাইটার ও প্রযোজক আহমেদ জামান চৌধুরী। পরে এঁদের কেউ সিনেমা ছেড়ে চলে গেছেন, দেশ ছেড়ে গেছেন, কেউ মারা গেছেন। স্যরি টু সে, এর পরে যেসব প্রডিউসার এসেছেন, তাঁরা প্রথমেই বলে দেন, আমি বোম্বাই মার্কা ছবি বানাব। চারটে গান, তিনটে ফাইট...থাকতে হবে। পরিচালক যদি বলে—না, আমি এটা বানাব না, তখন অসুবিধা হয়ে যায়। পরিচালককেও তো চলতে হবে।

 

‘বোম্বাই মার্কা’ ছবির কথা বললেন, সেই বলিউডই কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর বদলে গেল এবং এই সময়ে এসে চমত্কার সব ছবি বানাচ্ছে। আমাদের বিবর্তনটা তো হয়নি...

হয়নি কারণ তাদের মতো রাইটার আমাদের নাই।

 

আমার মনে হয়, এখানে ভালো রাইটার আছেন। কিন্তু প্রযোজক-পরিচালকরা তাঁদের কাছে যান না। আপনি যেমন গেছেন সেলিনা হোসেনের কাছে, প্রযোজনা করেছেন ‘পোকামাকড়ের ঘর বসতি’।

হ্যাঁ, অনেকগুলো পুরস্কারও পেয়েছে ছবিটি। প্রযোজক হিসেবে আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। কথা হলো, ছবিটা কিন্তু একেবারেই চলেনি। দুটো বিষয় মাস্ট থাকতে হবে—পয়সা ফেরত আসতে হবে, আবার অ্যাচিভমেন্টও থাকতে হবে। ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘সারেং বউ’, ‘নয়নমণি’, ‘ভাত দে’—এই ছবিগুলো তো দুটোই পেয়েছে। পয়সা, পুরস্কার-সম্মান সবই পেয়েছে।

 

একজন ববিতা বা রাজ্জাককে দেখে অনেকেই অভিনয়ে এসেছে। কিন্তু আশির দশকের পর ডিরেক্টরদের সেই পরম্পরাটা আর থাকেনি। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন এসেছেন, কিন্তু কন্টিনিউইটি নেই...

হ্যাঁ, নেই। এর সঙ্গে কিন্তু আরো কিছু ব্যাপার জড়িত, যেটা আমি করেছি। এই যে সত্তরটা পুরস্কার (পুরস্কারের তাক দেখিয়ে), আমি এই ছবিগুলোর জন্য পারিশ্রমিক নিইনি। ‘ডুমুরের ফুল’, ‘বসুন্ধরা’র মতো ছবিগুলোর প্রস্তাব যখন এসেছে, তখন অন্য সব ছবির মতো পারিশ্রমিক নিতাম না। বরং সুভাষ দত্তদাকে বলে দিতাম, আপনাকে কিছু দিতে হবে না। উল্টো আমি হাসতে হাসতে একটা নেগেটিভের ক্যান গিফট করে দিয়েছি। ‘দহন’-এ কোনো পয়সা নেইনি। কারণ আমি চেয়েছি, পরিচালক ছবিটা ভালোভাবে নির্মাণ করুক, যেন বিশ্বের নামি ফেস্টিভালগুলোতে যেতে পারে। ওরা তো নিশ্চয় আলতুফালতু ছবি নেবে না। জানি না এখনকার ছেলেমেয়েরা কতটা করে। আমি তো শুনেছি, এখনকার ছেলেমেয়েরা বলে—আগে বাসায় টাকা পাঠাও, তারপর শুটিংয়ে আসব। (হাসি)

এখনকার অনেক পরিচালক গর্ব করে বলেন, তাঁরা অ্যাওয়ার্ডের জন্য ছবি বানান না। যাঁদের ছবি বিভিন্ন দেশের ফেস্টিভালে যায়, তাঁদের বিদ্রুপ করে অনেকে।

এটা মোটেও ঠিক না। এ কারণেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

আপনারা যখন শুরু করেন, তখন এই অঞ্চলের চারটা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল—মুম্বাই, ঢাকা, টালিগঞ্জ, করাচি। এগিয়ে ছিল কারা?

ওই সময়ে আমরা কোনো অংশে কম ছিলাম না।

 

অনেকে কিন্তু আবেগ দেখিয়ে বলেন, ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রি তুলনামূলক বেটার ছিল।

বেটার তো ছিলই। তখনকার ছবিগুলো দেখলেই বুঝবেন সেটা।

 

চারটা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থা কি একটু করুণ?

পাকিস্তানের ইন্ডাস্ট্রি কখনোই ভালো ছিল না। কমার্শিয়াল নাচ-গান ছাড়া আর কিছু ছিল না।

 

রিসেন্টলি কয়েকটা ভালো ছবি অবশ্য হয়েছে।

হতে পারে।

 

পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রি?

শুনেছি, ভালোই নাকি করছিল। এখন নাকি আবার খারাপ যাচ্ছে।

 

হ্যাঁ, বাণিজ্যে খরা যাচ্ছে, কিন্তু ছবিগুলো ভালো হচ্ছে। আর বলিউড তো...

ওরে বাবা! হলিউডের পরেই তো এখন বলিউড।

 

এখন তো আপনার হাতে অনেক সময়। কী করেন অবসরে?

যুক্তরাষ্ট্রের সংগঠন ডিসিআইআইয়ের (ডিস্ট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনাল) শুভেচ্ছাদূত আমি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করি। এটা করে খুবই আনন্দ পাই। ওদের পড়ালেখা করানোর ব্যবস্থা করে দেই। এর বাইরে সারাক্ষণ কথা বলি ছেলের সঙ্গে। কানাডা যাই কিছুদিন পর পরই। ঈদের আগেই ওর কাছে যেতে চেয়েছিলাম। জুলাইয়ে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হবে, সে জন্য অপেক্ষা করে আছি, প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কারটা নিয়েই যাব।

(বলতে বলতেই ছেলের ফোন। ফোন ধরার আগেই বলে নিলেন, ‘ওদের ওখানে এখন সকাল। অফিসে যেতে ৪৫ মিনিট লাগবে, পুরো সময়টা ও আমার সঙ্গে কথা বলবে। হ্যালো...হ্যাঁ, আব্বু...’]

শ্রুতলিখন : সুদীপ্ত সাইদ খান

ছবি : সুমন ইসলাম আকাশ



মন্তব্য