kalerkantho

প্রবন্ধ

অগ্নিঝরা গান

শামীম আমিনুর রহমান

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



অগ্নিঝরা গান

পোস্টার : কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

একাত্তর সালে মার্চের উত্তাল সময়। সব মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের প্রমত্ত চেতনায় বলীয়ান হয়ে মিটিং, মিছিল ও প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষকে উদ্দীপ্ত করছে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায়। এই আন্দোলনই কিছুদিনের মধ্যে আরো খরপ্রবাহিনী হয়ে পৌঁছে গেল মুক্তিযুদ্ধে।

বরিশাল শহরে জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আমি। ঢাকায় তখনো সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়নি। বরিশালের প্রথম সারির গানের স্কুল প্রান্তিক সংগীত বিদ্যালয়ের আমি কনিষ্ঠতম ছাত্র। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সে সময় নিয়মিত বিভিন্ন পাড়ার মাঠে সন্ধ্যায় গণসংগীত পরিবেশন করে আসন্ন সংগ্রামের জন্য সবাইকে উদ্দীপিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। কনিষ্ঠ বলে তাঁদের সঙ্গে গান গাওয়ার সুযোগ না হলেও মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁদের কাছাকাছি বসা হতো। বেশির ভাগ সময় যে গানটি তাঁরা ধরতেন সেটি হলো—‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। গানটি আমিও স্কুলে শিখেছিলাম। আমার কিশোর মনকে তা আলোড়িত করেছিল।

এর পরের কিছু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে গেল। ঢাকায় ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি  বাহিনী ঘুমন্ত মানুষের ওপর অত্যাচার আর হত্যাযজ্ঞ চালায়। সারা দেশে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে। বরিশালে সব মানুষ তখন প্রতিরোধ ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেকের মতো আমাদের পরিবারও শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। কারণ তখন বরিশালে পাকিস্তানি বাহিনীর আগমন ও আক্রমণ শুধু সময়ের ব্যাপার।

সবার সঙ্গে সরাসরি গ্রামে না গিয়ে শহর থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরে আমার বোনের সঙ্গে রায়াপুর গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে প্রায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করি। ঠিক হলো, সেখান থেকে দুলাভাই আমাকে ও বোনকে আমাদের দাদাবাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু এ দুই সপ্তাহে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা আমাকে আজও আপ্লুত ও গর্বিত করে।

বোনের শ্বশুরবাড়ির সামনে বরিশাল-ঝালকাঠি রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে খোলা মাঠের সঙ্গেই রায়াপুর স্কুল। সেখানে ওই এলাকার তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রশিক্ষণ নিত। প্রতিদিন বিকেলে গ্রামের এক অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক তাঁর সাধারণ একটি বন্দুক দিয়ে এসব ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিতেন। আমি দুলাভাইয়ের সঙ্গে প্রতিদিন সেখানে হাজির হতাম। প্রশিক্ষণ নয়, সেখানে আমার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ শেষে যখন সবাই খোলা মাঠে গোল হয়ে বসত, তখন প্রশিক্ষক সৈনিক আমাকে বলতেন, ‘শামীম, শুরু করো।’ আর আমি কচি কণ্ঠে ধরতাম ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়, হবে হবে হবে নিশ্চয়’। আমার গাওয়া সেই গান সবাই জড়ো হয়ে শুনত। বিদ্রোহের ওই একটি গানই আমার জানা ছিল। যে কয় দিন রায়াপুরে ছিলাম, ওই একই গান আমি তাদের প্রতিদিন শোনাতাম। তারাও একইভাবে নিশ্চুপ হয়ে সেটি শুনত। আজ অবাক হয়ে ভাবি, কী এমন শক্তি ছিল ওই গানে, যা শুনে মুক্তিপাগল মানুষগুলো আবেগতাড়িত হতো!

২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী বরিশাল শহরে আক্রমণ চালায়। আমাকে আর আমার বোনকে দাদাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রায়াপুরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকরা নিশ্চয়ই যার যার মতো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। অনেকেই স্বাধীনতার পর ফিরে এসেছে, কেউ কেউ হয়তো ফিরে আসেনি। কিন্তু একাত্তরের গানের সেই উপলব্ধি আগের মতোই আমাকে এখনো নাড়া দেয়।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামটি ছিল অনন্যসাধারণ। শুধু সামরিক ফ্রন্টে নয়, যুদ্ধ হয়েছিল নানা অঙ্গনে, একটা বড় পরিধিজুড়ে। সেই সংগ্রামের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, ক্রীড়া, চলচ্চিত্র, নাটক, ছবি আঁকা চর্চা, বেতার সম্প্রচার, হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ, মিছিল ও সভা আয়োজন, বিমান ছিনতাইসহ আরো অনেক ঘটনা। এই সব কিছুর মধ্যে একাত্তরের সংগীত অর্জন করেছিল এক বিশেষ মাত্রা এবং প্রবাহিত হয়েছিল স্বতন্ত্র ধারায়। স্বাধীনতা অর্জনে সংগীতের ভূমিকা কোনো অংশেই কম ছিল না।

বিষণ্ন চোখে বন্ধু আমার এসেছিল আমার কাছে

ষাটের দশকের বিখ্যাত সংগীতগোষ্ঠী বিটলসের সদস্য জর্জ হ্যারিসন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের বন্ধু ছিলেন। রবিশঙ্করের কাছে সেতার বাজানো শিখেছিলেন তিনি। একাত্তরে হ্যারিসন লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলেন ‘রাগা’ (RAGA) শীর্ষক অ্যালবাম নিয়ে কাজ করতে। রবিশঙ্কর সে সময় হ্যারিসনকে জানালেন, তিনি বাংলাদেশের নিপীড়িত ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি কনসার্ট আয়োজন করতে চান এবং এর জন্য তিনি হ্যারিসনের সহযোগিতা চাইলেন। এমন একটি কনসার্ট হবে, যা সাধারণ কনসার্টের চেয়ে অনেক বড়। অন্তত ২৫ হাজার ডলার পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। রবিশঙ্কর চাইছিলেন, হ্যারিসন যেন অন্য শিল্পীদের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে অনুরোধ করেন।

বাংলাদেশের মানুষের অসহায়ত্ব, যুদ্ধ, শরণার্থী সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে সে সময় পত্রিকায় বা ম্যাগাজিনে যা খবর বেরিয়েছিল, রবিশঙ্কর সেসব কাটিং সংগ্রহ করে হ্যারিসনকে দেখালেন, যাতে তিনি সংকটাকীর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। হ্যারিসন পুরো বিষয়টি অনুধাবন করে ভাবলেন, এসব অসহায় মানুষের জন্য তাঁর কিছু একটা করা উচিত।

এরপর যা হলো তা হ্যারিসনের নিজের লেখাতেই আছে—

“তিন মাস আমি টেলিফোন নিয়ে বসে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য এরিকসহ সবার সঙ্গে কথা বলেছি, যারা এটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল।...আমরা খুব সামান্যই রিহার্সাল করতে পেরেছিলাম, প্রকৃতপক্ষে একটি রিহার্সালে সবাই উপস্থিত ছিল, এমনটা কখনোই হয়ে ওঠেনি। নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে ছোট ছোট করে এটা করতাম। অনুষ্ঠানটির জন্য একটি পিরিয়ড ঠিক করলাম, যার মধ্য থেকে একটি দিন বেছে নিতে হবে। একজন ভারতীয় জ্যোতিষী বলল, সময়টি শুভ এবং আগস্টের শুরুতে হতে পারে। আগস্টের সঠিক দিনটি বেছে নিলাম, যেদিন ম্যাডিসন স্কয়ার খালি পাওয়া গেল এবং আমরা ওই দিনের জন্য ভাড়া করলাম।” [আই. মি. মাইন., জর্জ হ্যারিসন]

এর পরের ঘটনায় ইতিহাস রচিত হলো। দিনটি ছিল রবিবার। পয়লা আগস্ট। নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে দুটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। দুপুর ২টা ৩০ মিনিট ও রাত ৮টায়। অনুষ্ঠানের নাম রাখা হলো ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, ওস্তাদ আল্লারাখা, কমলা চক্রবর্তী প্রমুখ। এ ছাড়া ছিলেন এরিক ক্লাপটন, বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রসটন, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টার। অনুষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন নিজে। আলী আকবর খানের সরোদ ও রবিশঙ্করের সেতার এবং সঙ্গে আল্লারাখার তবলা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তানপুরা বাজিয়েছিলেন কমলা চক্রবর্তী। দর্শক ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। যা ভাবা হয়েছিল তার অনেক গুণ বেশি দর্শকসমাগম হয়েছিল। দর্শক চাহিদার কথা ভেবে একই দিনে দুটি অনুষ্ঠান করতে হয়েছিল। শুরুতে রবিশঙ্কর ভেবেছিলেন ২৫ হাজার ডলার কনসার্ট থেকে তুলবেন; কিন্তু ঐতিহাসিক ওই কনসার্ট থেকে শেষ পর্যন্ত দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮.৫০ ডলার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরো চেকটি তিনি বাংলাদেশের শরণার্থী শিশুদের সাহায্যার্থে ইউনিসেফের (ইউনাইটেড নেশনস চিলড্রেন ফান্ড) কাছে হস্তান্তর করেছিলেন।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নিয়ে তিনটি অ্যালবাম (রেকর্ড) প্রকাশিত হয়, যা বিখ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে এবং বাংলাদেশের জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হয়, যা ইউনেসকোর কাছে হস্তান্তর করা হয় (সে সময়ের গণনায় ১৪ মিলিয়ন ডলার)। সেদিনের সেই কনসার্টে আর্থিক সহায়তা ছাড়াও এক বড় প্রাপ্তি ছিল একটি নতুন দেশ ও তার সংগ্রামের কথা সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা।

[from Raga Mala, The Autobiography of Ravi Shankar, edited and introduced by George Harrison; Pub Genesis Publications Ltd, Australia. 1997]

এই কনসার্টে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের মন্তব্য থেকে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সাফল্য সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়—

‘এটা ছিল একটা চমত্কার বিষয়, সবাইকে করেছিল আলোড়িত। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সবার মধ্যে একটি বিশেষ অনুভূতি কাজ করছিল। রাতারাতি সারা বিশ্বের মানুষ জানতে পারল বাংলাদেশের নাম।’—পণ্ডিত রবিশঙ্কর

‘ঘটনার মাধুর্য ছড়িয়ে পড়ল এবং দর্শকও ছিল অভূতপূর্ব।’—রিংগো স্টার

‘এমন একটা সময়ে আমরা এখানে সংগীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলাম, এটা ভেবে সব সময় গর্ব বোধ করব। আমরা অন্তত পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও নিছক নিজেদের নিয়ে ভাবিনি।’—এরিক ক্লাপটন

‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি ছিল এক মহান অভিজ্ঞতা।’—লিওন রাসেল

জর্জ হ্যারিসনের বড় সাফল্য যে এই মহৎ কাজে তিনি সব নামি শিল্পীকে একত্র করতে পেরেছিলেন।

হ্যারিসন তাঁর লেখায় বলেছিলেন—সংগীতশিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব অহংবোধ সরিয়ে দিয়ে সবাই একত্র হয়েছিলেন। সবার মধ্যে কনসার্টের মূল অনুভূতি কাজ করছিল যে এটা আমাদের সমষ্টির চেয়ে অনেক বড় মহান কিছু।

বিষয়টি আমেরিকার সাধারণ জনগণকে এতটাই উদ্বুদ্ধ করেছিল যে হ্যারিসনের ভাষায়—শিশুরা ও জনগণ এতটাই অনুপ্রাণিত হলো যে তারা একটা কিছু করতে চাইছিল। তারা টাকা সংগ্রহ করতে লাগল এবং ইউনেসকোর দপ্তরে তা জড়ো করল এবং জানাতে চাইল যে সাহায্যের জন্য তারা আর কী করতে পারে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান এ সম্পর্কে মন্তব্য করেন—এটা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা এবং এর পর থেকে এটি অবশ্যই খুব সাধারণ বিষয় হলেও সে সময় ছিল অতুলনীয় ও সাহসী পদক্ষেপ এবং তাঁরা ছিলেন পথিকৃৎ।

জর্জ হ্যারিসনের স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসন উল্লেখ করেছেন—‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মানবতার কল্যাণের জন্য রক সংগীত ইতিহাসে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মকাণ্ড।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ শিরোনামে কনসার্টটির প্রথম অ্যালবাম আমেরিকায় ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। পরের বছর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি অ্যালবামটি যুক্তরাজ্যে বের হয়। অনন্যসাধারণ এই কনসার্টটি পরবর্তীকালে সিডি, ডিভিডি আকারেও প্রকাশিত হয়। পুরো ডিজিটাল অ্যালবামটি এখন আইটিউন থেকে ডাউনলোড করা যায়। জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা আছে—মানবকল্যাণার্থে নিবেদিত সত্তা, যা দ্য বাংলাদেশ কনসার্টের জন্ম দিয়েছিল, তাদের সম্মানার্থে প্রতি ডাউনলোডের জন্য প্রাপ্ত অর্থ জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফে জমা হবে। আইটিউন, অ্যাপল রেকর্ডস ইনক এবং যেসব শিল্পী, গীতিকার ও প্রকাশক এই কনসার্টের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁদের কেউই এই অর্জিত আয় বা কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করবেন না।

কনসার্টে জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ’-এর কয়েকটি লাইন ছিল এ রকম—

My friend came to me, with sadness in his eyes

Told me that he wanted help

Before his country dies

Although I couldn't feel the pain, I knew I had to try

Now I'm asking all of you

To help us save some lives

Bangla Desh, Bangla Desh.

যখন সূর্য পশ্চিমে অস্তমিত—বাংলাদেশ : নিউ ইয়র্কের জোয়ান বায়েজ, লিভারপুলের লি ব্রেনান ও এসেনের জুলিয়ান ওয়ারডিং—

বাংলাদেশ কনসার্টের পাশাপাশি পশ্চিমে অন্তত তিনজন সংগীতশিল্পী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সমর্থনে তাঁদের রেকর্ড বের করেছেন। আমেরিকার বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর ‘বাংলাদেশ’ গানটি সেই সময়ে বিশ্বের সাধারণ জনগণের সমর্থন প্রাপ্তিতে একটি ভালো ভূমিকা রেখেছে।

জোয়ান শ্যান্দজ বায়েজ ১৯৪১ সালে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত-ইতিহাসে ‘ফোক সিঙ্গার’ হিসেবে তিনি বিশেষ এক মর্যাদায় আসীন। বিশ্বশান্তি ও মানবতার পক্ষে তিনি কাজ করেছেন, গান গেয়েছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের দুর্দশা ও তাদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বায়েজ। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে অবিচার আর আগ্রাসী আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে ও বাইরে যে সশস্ত্র যুদ্ধ চলছিল, তার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে সংগীতকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শুরু হয়েছিল প্রতিবাদ আর মুক্তিসংগ্রামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার আরেক যুদ্ধ। জোয়ান বায়েজের গাওয়া বাংলাদেশ বাংলাদেশ গানটি সাত কোটি বাঙালিকে সেই মুক্তিসংগ্রামের দিনের কষ্ট, ত্যাগ, মৃত্যু আর সংগ্রামের মধ্যে তাদেরকে করেছিল অনুপ্রাণিত, জুগিয়েছিল মানসিক শক্তি।

জোয়ান বায়েজের Song of Bangladesh-এর প্রথম কয়েকটি লাইন—

Bangladesh, Bangladesh

Bangladesh, Bangladesh

When the sun sinks in the west

Die a million people of the Bangladesh.

একাত্তর নিয়ে বিদেশে যেসব গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল তার মধ্যে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, জোয়ান বায়েজের ‘সং অব বাংলাদেশ’ এবং জজ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

বিখ্যাত এই গায়কদের পাশাপাশি আরো অন্তত দুজন ইউরোপীয় সংগীতশিল্পী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গান গেয়েছিলেন এবং সেগুলোর রেকর্ডও বেরিয়েছিল। একজন হচ্ছেন লিভারপুলের গায়ক ও কবি লি ব্রেনান। একাত্তরের মার্চে ঢাকায় নিরীহ জনগণের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ব্রেনানকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষকে সাহায্য করার একটি পথ খুঁজতে তিনি লিভারপুলের বাঙালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক মাহবুবুর রহমান ব্রেনানের পূর্বপরিচিত ছিলেন। তিনি পরামর্শ দেন, একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে ব্রেনান গান গেয়ে বাংলাদেশের জনগণকে সাহায্য করতে পারেন। আর ব্রেনান ঠিক তাই করেছিলেন। বাংলাদেশের জন্য তিনি চারটি গান রচনা করেন এবং সেগুলোর একটি রেকর্ডও প্রকাশ করেন। সেখানেই তাঁর কাজ থেমে থাকেনি। তিনি তাঁর দল নিয়ে লিভারপুলের বিভিন্ন পাব ও রেস্টুরেন্টে গানগুলো গেয়ে বাংলাদেশের দুর্দশার প্রতি মানুষকে সচেতন করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর একটি গানের পঙিক্ত—

Come brothers and sisters of Bangladesh

Unite together and stay that way.

And remember the good times

Are coming at last

The freedom fighters are on their way.

শ্রোতাদের ব্রেনান অনুরোধ করতেন, যদি গান ভালো লাগে তবে তারা যেন রেকর্ডটি সংগ্রহ করে। রেকর্ড বিক্রির টাকা নিজেই সংগ্রহ করে তুলে দেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর হাতে। তিনি সে সময় লন্ডনে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্রেনানের গানসংবলিত রেকর্ডটি দুষ্প্রাপ্য। বাংলাদেশে তার একটিমাত্র কপি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রক্ষিত আছে। সেটি দান করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মাহবুবুর রহমান।

আরপিএমের রেকর্ডটিতে মোট চারটি গান ছিল—

সাইড এ-তে : Freedom Fighters I Mr. Human এবং সাইড বি-তে : Fight, fight I We will survive. রেকর্ডটির খোলসে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর একটি বার্তা মুদ্রিত আছে।

বাংলাদেশের জনগণ সত্য ও ন্যায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে। বিজয় আমাদের। আমাদের চরম সংগ্রামে লি ব্রেনান, ডন, পেট হামাস, জন ব্রাউন, জিথি সেফটনকে তাঁদের সহানুভূতি ও সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

—আবু সাঈদ চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

লি ব্রেনানের পাশাপাশি জার্মান তরুণী জুলিয়ান ওয়ার্ডিং একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে গান গেয়েছিলেন। ওয়ার্ডিং জার্মানির এসেনে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সত্তরে গায়ক হিসেবে মাত্র তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। পরবর্তীকালে অবশ্য জার্মান পপগানের একজন জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তাঁর একটি গান জার্মান পপগানের তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে এবং পরে প্রায় ১৪ সপ্তাহ ধরে শীর্ষ দশের তালিকায় স্থান করে নেয়। ওয়ার্ডিংয়ের ‘বাংলাদেশ’ গানটি রেকর্ড আকারে প্রথমে ১৯৭২ সালে জার্মানি থেকে প্রকাশিত হয়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বেতার থেকে প্রচারিত অগ্নিঝরা গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাসহ সব মানুষকে করেছিল সংঘবদ্ধ ও প্রাণিত। সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি গান-বাজনাকে ভরসা করে চলেছিল রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আরেক সংগ্রাম।

সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতারকে কেন্দ্র করে বহু অমর গান রচিত হয়। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এসব গান গোবিন্দ হালদারের অমর সৃষ্টি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে রেডিও কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, সংগঠক, লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, কলাকুশলী ও সাধারণ মানুষের অক্লান্ত শ্রম।

বিচিত্র এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গানগুলো সৃষ্ট হয়। প্রথম দিকে বেতারকেন্দ্রে, যুদ্ধের আগে ধারণ করা গানই বেশির ভাগ সম্প্রচার করা হতো। রেডিও কর্তৃপক্ষ ভাবল, স্বাধীনতাযুদ্ধের উপযোগী নতুন কিছু গান প্রয়োজন। দায়িত্ব দেওয়া হলো বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানীকে। তিনি বিষয়টি তাঁর কলকাতাবাসী বন্ধু কামাল আহমেদকে জানালেন। এর কিছুদিন পর আহমেদ তরুণ গীতিকার গোবিন্দ হালদারকে নিয়ে ঢাকায় এলেন। হালদার সংকোচে তাঁর গানের দুটি ডায়েরি লোহানীর হাতে তুলে দিলেন। লোহানীর ভাষায়—গোবিন্দ যেন ‘সেভিয়ার’রূপে আবির্ভূত হলেন। গোবিন্দ হালদারের সাদা গানের খাতার মলাটে বড় করে লেখা ছিল—‘জয় বাংলার গান’। গানের কথাগুলো যেন যুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে একাকার হয়ে গেল। এরপর যা ঘটেছিল তা তো ইতিহাস, যার সাক্ষী ভাগ্যবান কিছু মানুষ, যাঁরা একাত্তরের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। লোহানী শিল্পী ও সুরকার আপেল মাহমুদ এবং সংগীত পরিচালক সমর দাসকে অনুরোধ করলেন গোবিন্দ হালদারের গানগুলো নিয়ে কিছু করার জন্য। আপেল মাহমুদ তাত্ক্ষণিক সুরারোপ করে গাইলেন—‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। কিছুদিনের মধ্যেই রেডিওর তারে ভেসে এলো গানটি। মুখে, মনে, আবেগে সে গান উচ্চারিত হলো রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে, সারা বাংলায়। জাগিয়ে তুলল সবাইকে। সমর দাসের সুরে সৃষ্ট হলো কালজয়ী গান—‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল’। একের পর এক গাওয়া হলো মোহনীয় সব গান। ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ বিজয়ের পরই যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে গোবিন্দ হালদার লিখলেন ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না’। বাংলাদেশ বেতারে খবরের প্রারম্ভিক সংগীত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ গানটি এখনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সদ্যঃপ্রয়াত শিল্পী আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, শহীদ ভাইয়ের স্মরণে’ এবং ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে’ গানগুলোর সঙ্গে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরপরই বেজে ওঠে সুজেয় শ্যামের সুর করা ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’। গানটির প্রথম প্রচারের মুহূর্তের স্মৃতি সুজেয় শ্যামকে আজও আবেগতাড়িত করে। সময়ের সঙ্গে এসব ঐতিহাসিক গানের আবেদন একটুও ক্ষুণ্ন হয়নি। সে সময় সর্বাধিক প্রচারিত হয় যে গানটি তা সম্ভবত ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রারম্ভিক সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’ এবং অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’, গোবিন্দ হলদারের লেখা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকবাট’ ও ‘চল্ চল্ চল্’, নাঈম গওহরের লেখা ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’, সমর দাসের সুরে ‘ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা’, আবুল কাসেম সন্দীপের লেখা ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান’—অগ্নিঝরা সময়ের এই অনবদ্য গীত সৃজনের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের এক শক্তিশালী উপাখ্যান।

আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুত্ফুর রহমান, অজিত রায়, সুখেন্দু চক্রবর্তী, মাহমুদুন নবী, ইকবাল আহমেদ প্রমুখ বহু গানে সুর দিয়ে জনগণের সংগ্রামে উদ্দীপিত এক বোধ সৃষ্টি করেছিলেন। কিছু গান ছিল সলিল চৌধুরী ও গণনাট্য সংঘের সুরারোপিত। কালের প্রবাহে গানগুলো হারিয়ে যেতে বসেছিল। চলমান সংগ্রামকে দীপিত করার জন্য এই গান সে সময় সত্যিকার অর্থে এক মাত্রা সৃষ্টি করেছিল। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গানও সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানই পূর্ণতা পেত না।

পথের গান

সীমান্ত এলাকায় ও পশ্চিম বাংলায় শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেওয়া নানা শ্রেণির মানুষ ও যুদ্ধরত মুক্তিবাহিনীকে অনুপ্রেরণা জোগাতে গড়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। শিল্পী শাহীন সামাদ তাঁর একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আমরা তখন মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরে বেড়াচ্ছি, গান গেয়ে শোনাচ্ছি।  দিন-রাত ঘুরে বেড়ানো, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন, নাওয়া-খাওয়া ঠিক নেই এমনই অবস্থা। সবাই আমাদের সানন্দে স্বাগত জানাচ্ছে। আমাদের মতো আরো কয়েকটি দলও একই রকমভাবে কাজ করে যাচ্ছিল মুক্তাঞ্চলে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে কত ঝুটঝক্কি। তার পরও একেকটি অনুষ্ঠান কী যে অপরূপ জীবন্ত হয়ে উঠত। মুক্তিযোদ্ধারা মোহাবিষ্ট হয়ে শুনত। বলতে গেলে মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার ট্রাকই হয়ে উঠল আমাদের জীবন, ঘরবাড়ি। ট্রাকেই খাওয়া, ঘুম, হাত-মুখ ধোয়া। কাপড়চোপড়ের করুণ দশা। ভ্রাম্যমাণ ক্যারাভানে শত সমস্যার মাঝেও ছিল অনাবিল এক আনন্দময় প্রেরণার জীবন। খোলা আকাশের নিচে এক চাদরে গা জড়িয়ে রাতযাপন—যেন একটি পরিবার। এমনি করেই কাটছিল সময়, দিন, রাত্রি।’

সে সময় এই দলের সঙ্গে আমেরিকান আলোকচিত্রী/চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিনের পরিচয় হয়। লেভিন তখন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন বলে ভারতে এসেছিলেন। ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীনতা লাভ করায় লেভিন চলচ্চিত্রটি তৈরি না করলেও দীর্ঘকাল পর তাঁর সেসব ফুটেজ ব্যবহার করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকার প্রয়াত তারেক মাসুদ নির্মাণ করেছিলেন ‘মুক্তির গান’ ছবিটি। এই অসামান্য আখ্যানে আছে ইতিহাসের সব উপাদান। কলকাতার ‘বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’র চেষ্টায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী শরণার্থী হয়ে ভারতে এসেছিলেন, তাঁদের নিয়ে কলকাতার ১৪৪ লেনিন সরণিতে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম শিল্পী সংস্থা’। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লেনিন সরণিতে জড়ো হয়ে এ দেশের সংগীতশিল্পীরা রূপান্তরের গানের মহড়া শুরু করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে গণ-অভ্যুত্থানকালে এবং পরবর্তী সময়ে যেসব গান হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের সঙ্গী সেসব গান আরো পরিশীলিতভাবে তাঁরা পরিবেশন করেন শরণার্থীশিবির ও পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয়শিবিরে। উদ্বাস্তুদের মনোবল এতে খুবই উজ্জীবিত হয়। শুধু উদ্বাস্তুশিবির নয়, এই দলটি মুক্তাঞ্চলেও গেছে। যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধারা এই দলের সান্নিধ্যে ও গানে প্রেরণা পেয়েছেন। সংগঠনের সভাপতি ছিলেন সন্জীদা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বেনু। শাহীন সামাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৭ আর শেষ পর্যন্ত সেটা দাঁড়ায় ১১৭-তে। শান্তিনিকেতন ও কলকাতার মহাজাতি সদনসহ দলটি বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। নাট্য নির্দেশক ও চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন, মহাজাতি সদনে বাংলাদেশ দলের পরিবেশনার পর কলকাতার প্রখ্যাত গণসংগীত গোষ্ঠী ক্যালকাটা কোয়ারের অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। বাংলাদেশের অংশের উপস্থাপনা এতটাই সার্থক ও মানসম্পন্ন হয়েছিল যে এরপর ক্যালকাটা কোয়ারের প্রধান রুমা গুহঠাকুরতা দল নিয়ে মঞ্চে উঠতে রীতিমতো দ্বিধা করছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ার দিল্লি টেলিভিশনে একটি সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেখানে সংগীত পরিবেশনা, পেছনের ব্যাকড্রপ, সজ্জা ও আলোকসম্পাতের জন্য শিল্পী সংস্থা বিশেষ প্রশংসিত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী নামে একটি সংগঠনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ব্যারিস্টার বাদল রশিদের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি সাংস্কৃতিক দল অর্থ সংগ্রহের জন্য ভারতের মুম্বাই, গোয়া, পুনে, কানপুরসহ বিভিন্ন শহরে গণসংগীত পরিবেশন করে। এই দলের সদস্য ছিলেন আপেল মাহমুদ, আব্দুল জব্বার, স্বপ্না রায় প্রমুখ। শিল্পী নমিতা ঘোষের লেখায় জানা যায়, এই অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেছিলেন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত চিত্রাভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরীসহ অনেকেই। সংগীত পরিচালক বাপ্পা লাহিড়ীও মুম্বাইয়ে বাঙালি শিল্পীদের সঙ্গে তবলা বাজিয়েছিলেন। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ব্যানারেও অনেক সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শরণার্থীদের সাহায্যার্থে বাংলাদেশ ও ভারতের সংগীতশিল্পীরা যৌথভাবে কলকাতার জোড়াবাগান পার্ক, স্কুল-কলেজ, পার্ক সার্কাসের মাঠে এবং রবীন্দ্রসদনে বিচিত্রানুষ্ঠান আয়োজন করেন। বাংলাদেশের শিল্পীদের পাশে ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, কাজী নজরুল ইসলামের দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনুরুদ্ধসহ আরো অনেকে।

নমিতা ঘোষ একাত্তরের জন্য শেষ অনুষ্ঠান করেছিলেন ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ১০টায় প্রিয়া সিনেমা হলে। বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী নিবেদিত বিক্ষুব্ধ বাংলা বিচিত্রানুষ্ঠানের মাধ্যমে তা শেষ হয়। বুলবুল মহলানবীশ একাত্তরের জন্য সমবেত কণ্ঠে গাওয়া তাঁর শেষ গানটির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, সবার ভেতরেই প্রচণ্ড উত্তেজনা। ৪টা কখন বাজবে। আমাদের গানও রেকর্ড করতে হবে তার আগে। বিজয় ঘোষণার প্রথম মুহূর্তেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাজানো হবে সেই গান।

বিজয় নিশান উড়ছে ওই

খুশির হাওয়ায় ওই উড়ছে।

বাংলার ঘরে ঘরে

মুক্তির আলো ওই ঝরছে।

এই গানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিজয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলেন শহীদুল ইসলাম, সুজেয় শ্যাম ও অজিত রায়।

একাত্তরে সাধারণ মানুষের মনে সংগীতের প্রভাব কেমন ছিল? একাত্তরে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কলকাতায় শরণার্থীশিবিরে কর্মরত অক্সফামের কর্মকর্তা জুলিয়ান ফ্রান্সিসকে ২০১২ সালে ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার সম্মানে ভূষিত করে। শরণার্থীশিবিরে কর্মরত ডাক্তাররা ফ্রান্সিসকে জানিয়েছিলেন, হতাশা ও দুঃখ-দুর্দশায় দিন দিন শরণার্থীদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। ডাক্তারদের ধারণা ছিল, শরণার্থীশিবিরে একটি করে হারমোনিয়াম ও এক জোড়া তবলা দিলে হয়তো ক্যাম্পবাসীর মন উত্ফুল্ল থাকবে, সেই সঙ্গে তাদের শারীরিক অবস্থারও উন্নতি ঘটবে। ক্যাম্পের বাসিন্দা বাংলাদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমির পাল ফ্রান্সিসকে কিছু বাদ্যযন্ত্র জোগাড় করার জন্য অনুরোধ করলেন। ফ্রান্সিস ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ না নিয়ে সরাসরি নিজেই প্রতিটি ক্যাম্পে একটি হারমোনিয়াম ও এক জোড়া তবলার ব্যবস্থা করেন। সমির পালের কাছে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের উৎস। তাই সমগ্র যুদ্ধের চেয়ে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ কোনো অংশেই কম নয়।

কোনো এক বর্ষার দিনে সমির পাল জুলিয়ান ফ্রান্সিসকে বলেন, ‘তাকিয়ে দেখুন জুলিয়ান ভাই, আমাদের কিছুই নেই, আবার আমাদের সবই আছে। আমাদের আছে সংগীত, স্বপ্ন আর শ্রদ্ধা। আমাদের প্রতি আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং আমাদের প্রতি আপনার আস্থা ও বিশ্বাসের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

এর কয়েক মাস পর কলকাতার গোবরডাঙ্গা ক্যাম্পের ডাক্তাররা ফ্রান্সিসকে জানান, শরণার্থীদের অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে।



মন্তব্য