kalerkantho


লেখার ইশকুল

আঁদ্রে জিদের পরিবর্তনশীল মানস

৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



আঁদ্রে জিদের পরিবর্তনশীল মানস

১৯৪৭ সালে সহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ফরাসি লেখক আঁদ্রে জিদ। জন্ম ১৮৬৯ সালের ২২ নভেম্বর প্যারিসে। জিদ ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আট বছর বয়সে তাঁকে প্যারিসের ইকোল আলসাসিয়েনে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। ১৮৮০ সালে বাবার অকালপ্রয়াণের পর তাঁর মায়ের একমাত্র কাজ হয় ছেলেকে মানুষ করা। বাড়িতে এসে যাঁরা পড়াতেন, তাঁদের আচরণ ছিল বেশ কড়া। শারীরিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পর তাঁকে আবার ইকোল আলসাসিয়েনে ফিরতে হয়। ১৮৮৯ সালে তিনি বেকালরিয়েট পরীক্ষা পাস করেন এবং সে বছরই সিদ্ধান্ত নেন, জীবন কাটাবেন লেখালেখি, সংগীত আর দেশভ্রমণে। ১৮৯১ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘দ্য নোটবুক অব আঁদ্রে ওয়াল্টার’।

বিশ শতকের হাতে গোনা কয়েকজন লেখকের অন্যতম ছিলেন আঁদ্রে জিদ। লেখক ও একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আঁদ্রে জিদ ছিলেন স্বকীয়তার অধিকারী। তাঁর খ্যাতি মূলত তাঁর লেখার জন্যই। কিন্তু তিনি অন্য অনেক লেখকের চেয়ে আলাদা ছিলেন একদিক থেকে: তিনি মোটেই অসামাজিক ছিলেন না। বন্ধুত্ব তাঁর কাছে ছিল একটা বড় প্রয়োজনীয়তার নাম। বন্ধুত্ব বজায় রাখার বুদ্ধিও তাঁর ছিল। সে জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখা, চিঠিপত্র, জার্নাল এবং তাঁর সম্পর্কে অন্যদের লেখায়। একাগ্রচিত্তে লেখার মধ্যে শুধু ডুবে থাকার মানুষ ছিলেন না তিনি। নিজের লেখা ও বন্ধুদের লেখা সম্পর্কে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তাঁর সময়ের প্রায় সব ফরাসি লেখকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল, দেখা-সাক্ষাৎ হতো অনেকের সঙ্গেই। এ ছাড়া সে সময়ের জার্মানি ও ইংল্যান্ডের অনেক লেখকের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল। লেখক বন্ধুদের কাছে তাঁর লেখা এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তাঁর চিঠিপত্রের সংখ্যা কয়েক হাজার। তিনি প্রতিনিয়তই লেখালেখির অনুপ্রেরণা পেতেন লাতিন, ফরাসি, জার্মান ও ইংরেজি ক্লাসিক রচনা থেকে। মানুষের পারিপার্শ্বিক জীবন ও বাইবেল থেকেও প্রাণশক্তি সংগ্রহ করেন জিদ।

গদ্য কাহিনি, নাটক, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা, ডায়েরি—সবই লিখেছেন তিনি। তবে সব কিছুর ওপরে তাঁর কথাসাহিত্যের স্থান। অবশ্য কথাসাহিত্যেও এনেছেন নতুনত্ব। সফল ধারাও বারবার অনুসরণ করেননি তিনি। প্রথম দিকের প্রতীকধর্মী রচনা থেকে আত্মজীবনীমূলক সিরিয়াস লেখাও আছে তাঁর। ক্লাসিক্যাল দিক থেকে ফ্রান্সে তাঁকে উঁচু মানের স্টাইলিস্ট মনে করা হয়।

মোটের ওপর জিদের লেখায় উনিশ শতক থেকে চলে আসা রীতিপ্রথার সীমা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন বারবার। মানুষের নিজের আসল চেহারার ওপর পড়ে থাকা মুখোশ খোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। মুখোশের ভেতর থেকে আসল চেহারা বের করে আনার কাজ করেছেন তিনি। নিজের আগের লেখার ধরনকেই উতরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন নিরন্তর। সামনে কী ধরনের লেখা আসতে পারে, তারও ইঙ্গিত আগের কোনো লেখায় দেখা গেছে। লেখক হিসেবে যে মূল্যবোধ মেনে চলছেন, সেটিরও নিরন্তর বদল হয়েছে তাঁর ভেতরে। তিনি মনে করতেন, মূল্যবোধের সঙ্গে মানুষের মনের দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের সতত পরিবর্তনশীল নাটক তাঁর কাছে আগ্রহের একটা বিষয়। তিনি এ নাটক বারবার নতুনরূপে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, দ্বন্দ্বের এই নাটক মূলত ব্যক্তির নিজের মধ্যেই চলমান থাকে। এর সঙ্গে জড়িত আর যা যা ঘটে, সবই কাকতালীয়। ১৮৯৩ সালে তিনি প্রথম আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। কড়া প্রোটেস্ট্যান্ট আবহে বড় হওয়ার কারণে একসময় তাঁর দম বন্ধ মনে হতে থাকে। ভেবেছিলেন আফ্রিকা ভ্রমণের মাধ্যমে ওই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেন। আরব জগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তিনি সে অবস্থা থেকে মুক্তি পান। এভাবেই পরিবর্তন ঘটতে থাকে তাঁর লেখক মানসের। 

 

দুলাল আল মনসুর



মন্তব্য