kalerkantho


নীলান্তের মায়া

ভাষা রায়হান

৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



নীলান্তের মায়া

অঙ্কন : বিপ্লব

একটা ছবি আঁকব অনাগত সব মায়াময় সন্ধ্যার

শুধু তোমার-আমার-আমাদের জন্য।

যে রং এসে রাঙিয়ে দেয় তোমার দেওয়া প্রথম স্মৃতির চারপাশ

আকাশটা ঠিক তেমনই স্বপ্নীল-গাঢ় নীল।

সূর্যটা বিশ্রাম নিক, হাজার থেকে লাখো বছরের জ্বলন্ত ক্লান্তি।

পাখিরা ঝাঁক বেঁধে, ডানা মেলে উড়বে

ডুব দেবে গাঢ় নীলের গভীর থেকে গভীরে।

শূন্যর শান্তি; মুক্তির মায়া, ডানাহীন রাজ্যে দাঁড়িয়ে—অপলক দেখা।

বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়াটাকে রাখতেই হবে

অহংকারী হিংসায় হবে রক্তাক্ত।

ঝগড়াটে মেঘগুলোকে নিয়েই এখন সমস্যা

আজকাল তারা আসলেও—বৃষ্টিরা প্রায়ই সঙ্গে আসে না।

রঙের সাথে রঙের খেলা

রক্তের সাথে রক্তের মিশ্রণ

অপ্রত্যাশিত রক্তক্ষরণ।

দ্রুত তুলিতে তোমাকে ক্যানভাসে জীবন্ত করার

দৃঢ় আকাঙ্ক্ষায়, স্থির উপলব্ধি—প্রেমিকের।

তোমার অস্তিত্বের মাঝে নিজেরটা হারাই

বাস্তব থেকে ক্যানভাসে; ধন্যবাদে

একটি কাঠগোলাপ, তোমার খোঁপায়—ক্যানভাস থেকে বাস্তবে।

এই ছবিটা আঁকব আমার আমির-গহিনে

ভালোবাসার সকল উন্মাদনার রং, আভা, মিশ্রণে।

এই ছবিটা আঁকব সময়ের শেষ পর্যন্ত

সীমাহীন সন্ধ্যায়, আমার অসীম আকাশে

শুধু তোমাকেই ভালোবাসতে চাই।

প্রথমবার, শেষবার; মধ্যিখানে অসংখ্যবার-অসংখ্যবার।

 

লেখাটা শেষ করে তামিম ডায়েরিটা রেখে দিল তার টেবিলের ড্রয়ারে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেটটা নিয়েই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল; আস্তে আস্তে হেঁটে ক্যানভাসটার সামনে গিয়ে থামল, সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে পাশে রাখা অ্যাশট্রেতে নেভাল; কিছুক্ষণ ক্যানভাসটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে পাশের ছোট টেবিলে রাখা তুলিটায় রং মাখিয়ে হাতে নিল। তুলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকল আরো কিছুক্ষণ; তার এই নীল পেইন্টিংটা সে কোনোভাবেই শেষ করতে পারছে না এত দিন ধরে; কিছুতেই না। মায়া প্রথমবার এই ঘরে এসে তার এই পেইন্টিংটার সামনে চার-পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল; ‘কী দেখছিল মেয়েটা এই পেইন্টিংয়ে, ঘরে এত পেইন্টিং থাকতে সে কেন এটাই এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল।’ ‘নীল রং তার পছন্দের রং’—মায়া বলেছিল,’ হয়তো এই জন্য দেখছিল। ‘মায়া...মায়া’, এই মায়াকে নিয়ে হাজারটা কথা তার মাথার ভেতর খেলা করছে—সেই দিন থেকে এখন পর্যন্ত।

তামিম তুলিটা টেবিলের ওপর রেখে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকল; ‘না, মায়া কোনো মেসেজ দেয়নি’—তামিম মোবাইলটা ছুড়ে দেয় টেবিলের ওপর, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফের হাতে তুলে নিল ফোনটা। আবার ফেসবুকে ঢুকে সে মায়ার ছবি দেখতে থাকে, মেয়েটার সব কিছুই তার ভীষণ সুন্দর লাগে, বিশেষ করে চোখ; একদম চিতা বাঘের মতো—সুন্দর। তামিম মোবাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রেখে তার চেয়ারে হেলান দেয়। চোখ বন্ধ করে সে ভাবতে থাকে মায়ার এই ঘরে প্রথম আসা।

 

২.

তামিম মায়াকে তেমন ভালো করে চেনে না। যদিও তার এক বন্ধুর ছোট বোন, তার পরও সে চেনে না। দুই-তিনবার দেখা হয়েছে পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে, এই পর্যন্তই—কথাও হয়েছে খুব কম। অনেক দিন ধরেই মায়া তার ফেসবুকে আছে কিন্তু কথা হয়নি কখনোই; কিছু না ভেবেই সে কিছুদিন আগে মায়াকে মেসেজ পাঠায় ‘কেমন আছ’? কিছুক্ষণ পরে মায়া উত্তর দেয়—এভাবেই তাদের কথা বলা শুরু হলো। তামিম খুব বেশি কথা না বললেও মায়া তার কথা বলা চালিয়ে যায়। সে অবাক হয় ‘মেয়েটা এত কথা বলে কেন?’ তা-ও আবার সব অদ্ভুত রকমের কথা। সে বিরক্ত হয় কিন্তু মায়াকে কিছু বলে না। কথা বলা একটু কমিয়ে দেয় কিন্তু মায়া তার কথা থামাতেই চায় না। ভীষণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে ভদ্রতা করে মায়াকে স্টুডিওতে আসতে বলে, মায়া তার পেইন্টিং দেখতে চায় তাই।

এক সপ্তাহ পরে মায়া আসে তার স্টুডিওতে; এসেই সে তামিমের আঁকা ছবিগুলো দেখতে শুরু করে, এই নীল পেইন্টিংটা তার খুব পছন্দ হয়। ছবি দেখা শেষে মায়া ঠিক তামিমের সামনের চেয়ারটায় এসে বসে। তামিম কম্পিউটার থেকে চোখ না সরিয়েই কাজ করতে করতে মায়ার সঙ্গে কথা বলে। অনেক কথা; অনেক মানুষকে নিয়ে কথা; তামিম এত কথা বলার মতো ছেলে না, কিন্তু এই মেয়ের প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হচ্ছে।

‘কফি খাবে, না চা?’ —তামিম প্রশ্ন করে।

‘ব্ল্যাক কফি’—মায়া বলে, ‘আচ্ছা আপনি আমার থেকে ১০ বছবের বড় কিন্তু আপনাকে দেখলে অনেক বুড়া মনে হয়’ —মায়ার কথা শুনে তামিম হেসে বলে, ‘বয়স হয়েছে, দেখো সব দাড়ি পেকে গেছে।’ কফি খাওয়া আর কথা চলতেই থাকল; এমন সময় নামল বৃষ্টি। তামিম বারান্দার দরজাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, সে খুব বিরক্ত হচ্ছে ‘এই বেয়াদব মেয়েটা এখনো যাচ্ছে না কেন।’ ‘দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছে, কাজকর্ম নেই নাকি কোনো।’ ‘কি যে দরকার ছিল এই মেয়েকে মেসেজ দেওয়ার সেই দিন।’ একেই বলে ‘খাল কেটে কুমির আনা’। তামিম নিজের ওপরই এখন বিরক্ত হচ্ছে। তামিম বারান্দার দরজাটা আটকিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসল, মায়াকে একটু খেয়াল করে দেখল যে সে কতটা পাগল; ‘হসপিটালে দেওয়ার মতো পাগল না হলেও বেশ পাগল’; সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী—‘কিন্তু নিজেকে যতটা সে ভাবে, ততটা না’; ‘এই বিরক্তিকর শিয়াল থেকে দূরে থাকতে হবে’—তামিম নিজেকে বলে।

টানা আড়াই ঘণ্টা বক বক করে মায়া বিদায় নেওয়ার সময় বলে বসল, ‘আপনাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, চলেন প্রেম করি আমরা।’

মায়ার কথা শুনে হতবাক তামিম, কী বলবে না বুঝেই বলে, ‘তোমার মুখে কি কোনো কথা আটকায় না মায়া?’

ফোনের আওয়াজে তামিম একটু চমকে উঠল; চোখ খুলে, আস্তে করে চেয়ার থেকে মাথা তুলে সে টেবিলে রাখা মোবাইলটা হাতে নিল—‘মেসেজ এসেছে, তার বউ পাঠিয়েছে, ছেলের জন্য চকোলেট নিয়ে যেতে বলেছে বাসায় ফেরার সময়।’

৩.

মায়ার অফিস শেষ হয় ৬টায়। কিন্তু সব কাজ গুছিয়ে বের হতে বেজে যায় ৮টা। ঠিক সন্ধ্যা ৭টায় সে তার অফিসের শেষ কাপ চাটা খেতে খেতে আগামীকালের কাজের একটা বর্ণনা দিচ্ছিল তার এইচআরের ছেলেটাকে। এমন সময় তার মেসেজ এলো। মায়া একটু বিরক্ত হয়েই ফোনটা হাতে নিল; মেসেজ দেখে সে একটু অবাক হলো। ‘এই লোক কেন মেসেজ দিল?’; কিছুক্ষণ চিন্তা করেই সে উত্তর লেখা শুরু করল। মায়া ভীষণ বদমেজাজি এবং বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এ সব কিছুই তার সম্পর্কে সবাই জানে। যা জানে না তা হলো, সে খুব পরোপকারী ও ভীষণ বুদ্ধিমতী। যদিও তার বুদ্ধির অপব্যবহার সে কখনোই করেনি। মায়া মেসেজের উত্তরে লিখল ভালো আছি; তাকে মেসেজ করেছে তামিম রহমান, তার বড় ভাইয়ের বন্ধু ও মধ্যবয়সী এক পেইন্টার। তামিম সম্পর্কে তার কিছু ধারণা হয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে— ‘আজকাল তো অপরিচিত কত মানুষেরই একে অপরের সম্পর্কে ধারণা-ভুল ধারণা হয় এই ফেসবুকের কারণে।’ তামিমের বয়স বড়জোর ৪০ হবে, সুদর্শন বউ আর বাচ্চা আছে; কিন্তু লোকটার কিছু একটা সমস্যা আছে বিচক্ষণ মায়ার—এটা বুঝতে বেশি কষ্ট হয়নি। তামিমের সব লেখা, পেইন্টিং-ফেসবুকে যা দেয় তা দেখলেই বোঝা যায় এটা। তার ধারণা ঠিক কি না সেটা বোঝার জন্য সে মেসেজ দিতেই থাকে; কৌতূহল হয় লোকটাকে জানার ও তার সমস্যাটা জানার; মেসেজ চালাচালি করতে করতেই সে বাসার পথে রওনা দেয়।

গাড়িতে উঠেই সে তামিমের আরেকটা মেসেজ পায়; ‘আচ্ছা, এই লোকটা কী চায় আমার কাছে?’ আজকাল তো কেউ শুধু খোঁজখবর নিতে মেসেজ দেয় না, কাজ থাকলেই দেয়; অথবা তার সঙ্গে প্রেম করার যাদের ইচ্ছা হয় তারা মেসেজ করে; এই ধরনের মানুষের মেসেজের বন্যা হয় ইনবক্সে মাঝে মাঝে। যদিও এই বিশেষ ধরনের মেসেজের সে কোনো উত্তর দেয় না, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে তখন সে এমন উত্তর দেয়, যেটাকে ভদ্র ভাষায় গাল বলে। একবার এক ছেলে তাকে মেসেজ দিয়েছিল ‘আপনি দেখতে চাঁদের মতো হলেও আপনার মুখটা ডাস্টবিন’—মায়ার এ কথাটা মনে পড়লেই হাসি পায়। সে তামিমকে মেসেজের উত্তর দিল, ‘সে কোথায় কাজ করে।’

 

৪.

বেশ কিছুদিন মায়া আর তামিম মেসেজ দেওয়া-নেওয়া করছে; তার তামিমের ওপর ভয়ংকর কৌতূহল জন্মেছে; সে বোঝার চেষ্টা করছে তামিমকে প্রতিনিয়ত; এমন ধরনের প্রশ্ন করছে সে যাতে তামিম অপ্রস্তুত হয়ে যায়, এতে করে তার তামিমকে বুঝতে সুবিধা হবে। যদিও তামিম তাকে পাগল ভাবছে। এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত, কিন্তু তার এটাতে কিছু যায় আসে না; সে তামিমকে বুঝতে চায় যেকোনো মূল্যেই, তার তামিমকে নিয়ে প্রাথমিক ধারণা ভুল হতে পারে অথবা নাও হতে পারে, যেটাই হোক তার জানতে হবে।

‘কিন্তু তামিমকেই কেন তার জানতে হবে, এ রকম কত মানুষ আছে আশপাশে যাদের সম্পর্কে মায়া কিছুই জানে না বা জানতেও চায় না।’ ‘না, তার তামিমকে বোঝা না পর্যন্ত স্বস্তি হবে না’। বুদ্ধিমান মানুষদের এই এক সমস্যা, অগাধ কৌতূহল আর হিসাব মেলানোর অভ্যাস-বদভ্যাস। মায়া ব্যাপারগুলো আরেকটু ভালো করে বোঝার জন্য নিজে সেধে তামিমের সঙ্গে দেখা করতে চায়; অজুহাত, তামিমের আঁকা ছবিগুলো দেখা। তামিমকে নিয়ে তার ধারণা যে লোকটা ‘ভীষণ বুদ্ধিমান ও সরল’; অথবা ‘ভীষণ বুদ্ধিমান ও শয়তান’— ‘কোনটা সেটা বুঝতে হবে’। মায়া এসব চিন্তা করতে করতে নিজের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে তার বারান্দায় যায়; কফি খেতে খেতে বাসার সামনের কুকুরগুলো দেখতে থাকে সে; কুকুরগুলোকে সে নিয়মিত খাবার দেয়, আদর করে আবার বকাও দেয়। কুকুর যদিও তার পছন্দের প্রাণী, তার পরও এদের ভেতর একজনকে সে একটু বেশি পছন্দ করে। একটা সাদা মেয়ে কুকুর। মায়া কুকুরটার নাম দিয়েছে ‘ছোট মায়া’। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রাণী জাতের কয়েকজনের খেলাধুলা দেখে আনন্দিত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অবিশ্বস্ত প্রাণী জাতের একজন’; ‘পৃথিবীতে যে সব কিছুকে দামি গণ্য করা হয় তার কিছুই তাকে কখনো এত আনন্দিত করতে পারে না, যতটা এরা করে, মায়ার ভেতর অসংখ্য ছোট ছোট মায়াকে একসঙ্গে। মায়া ভাবে, আবার সে তার ‘তামিম চিন্তার’ ভেতর ডুবে যায়।

 

৫.

দুপুর ৩টা। তামিমের স্টুডিওতে ঢুকেই প্রথমে মায়া তার আঁকা সব ছবি দেখতে থাকল। নীল রঙের একটা পেইন্টিং তার খুব পছন্দ হয়েছে। ‘ছবিটা খুব সুন্দর’ মায়া বলে। তামিমের কোনো ভাবান্তর হলো না, মায়া দেখল। এবার মায়া গিয়ে তামিমের সামনের চেয়ারটায় বসল। সে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তামিমকে দেখল, তামিম কম্পিউটারে কাজ করছিল, ‘বয়সের ছাপ পড়েছে কিন্তু এখনো বেশ সুদর্শন তামিম’ এবং ‘লোকটা একটু পাগলাটে ধরনের সরল’—মায়া মুগ্ধ। সে বুঝতে পারে যে তামিমও তাকে বোঝার চেষ্টা করছে, সে বুঝতে দেয় না নিজেকে। ইচ্ছা করেই এমন সব কথা বলতে থাকে যাতে তামিম দ্বিধায় পড়ে যায়, বিরক্ত হয়। মায়া বুঝে গেছে তামিম ভীষণ বুদ্ধিমান লোক। এখন সে দেখতে চায় তার বুদ্ধির দৌড় কত দূর। কথা-কফি-কথা চলতেই থাকে। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হয় আর তামিম চেয়ার থেকে উঠে বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকে। একটা মধ্যবয়সী লোক, চোখভর্তি ভালো লাগা আর বাচ্চাদের মতো সুন্দর একটা হাসি নিয়ে বৃষ্টি দেখছে। কী সুন্দর দৃশ্য—মায়া আবারও মুগ্ধ। এবার মায়ার যেতে হবে, অনেক শুনেছে, জেনেছে বুঝেছে সে তামিমকে; ঠিক যাওয়ার সময় তার খুব মন খারাপ হলো, সে দরজা থেকে ঘুরেই হুট করে তামিমকে বলে বসল, ‘আপনাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, চলেন প্রেম করি আমরা।’ তামিমের মুখটা কালো হয়ে গেল। সে একটু রেগেই মায়াকে বলে, ‘তোমার মুখে কি কোনো কথা আটকায় না মায়া?’

বাসায় ফেরার সময় সারাটা পথ শুধু একটাই দৃশ্য মায়ার চোখে—তামিমের সেই দরজায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা; মায়া বারবার শুনতে পাচ্ছে সেই একটা কথা—‘তোমার মুখে কি কোনো কথা আটকায় না মায়া।’

 

৬.

মায়ার মেজাজ খুবই খারাপ। তামিম তার মেসেজের উত্তর দেয় না, ফোন করলে ধরে না। মায়া একবার চিন্তা করে সে তামিমের স্টুডিওতে যাবে, কিন্তু ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর দেখাবে ভেবে যায় না। অহংকারী মায়া কিছুদিন আর মেসেজ দেয়নি। কিন্তু নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে সে আবারও একদিন মেসেজ পাঠায়। আবারও কোনো উত্তর আসে না। মায়া অস্থির হয়ে যাচ্ছে, সে তামিমের এই নীরবতা মেনে নিতে পারছে না; কষ্ট পাচ্ছে, কষ্ট বাড়ছে। সে বুঝতে পারে তামিম তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, নিজেকে বোঝায় ‘তামিম তার অনেক কাছে এসেও কখনোই কাছে আসেনি;’ আসলেই কি কাছে আসেনি?’ না, তার ধারণা ভুল; ‘তামিম হয়তো কাজ নিয়ে ব্যস্ত, তাই তাকে উত্তর দিতে পারছে না’, ‘এত ব্যস্ত যে একটা উত্তর দেওয়া যায় না?’

‘উত্তর না আসাই ভালো’, —তার নিজের সংসার আছে। তামিমের আছে। এসব ছেলেমানুষি এখন আর মানায় না তাদের। মায়া তামিমের প্রতি দুর্বল হয়ে গেছে, এটা সে বোঝে; এটাও বোঝে যে এই দুর্বলতা অনেক বিপজ্জনক তার ও তামিমের জন্য; অনেক সময় মানুষ সব কিছু বুঝেও কিছুই বুঝতে চায় না, মন আর মস্তিষ্কের এক মেজাজ খারাপ করা যুদ্ধ শুরু হয়; এই যুদ্ধে যে-ই জয়ী হোক না কেন, হার শুধুই মায়ার। মায়া খুঁজে পায়...মায়া হারিয়ে যায়...মায়া ধরে যায়...মায়া খুঁজে যায়...মায়া থেকে যায়...তামিম বয়ে যায় রক্তের মতো মায়ার গভীর থেকে গভীরে।

মায়া তার বিছানা থেকে নেমেই পায়ে স্যান্ডেল পরে নেয়; ফোনটা খাটে রেখেই সে রুমের দরজা খুলে বসার ঘরে আসে। খাবার টেবিলের ওপর থেকে বিস্কুটের প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে সে নিচে যায় তার কুকুরগুলোকে খাওয়াতে। নিচে নেমে দেখে তার অপেক্ষায় ছোট মায়া বসে আছে, তাকে দেখে ছোট মায়া লাফাফাফি শুরু করে দেয়। ‘হয়েছে, হয়েছে আর আহ্লাদ করতে হবে না’—বলে বিস্কুট বের করে দেয় ছোট মায়া ও তার পরিবারকে। ‘ছোট মায়ার জন্য একটা পাত্র ঠিক করতে হবে, তার নাম রাখবে তামিম’—চিন্তাটা মাথায় আসতেই মায়া হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ে ছোট মায়ার পাশে।

 

৭.

শাফিন ল্যাপটপটা বন্ধ করে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে বারান্দায় গেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং বানাতে থাকল আর সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তাগুলোও রিং হতে থাকল। ‘আচ্ছা, তামিম আর মায়ার গল্পের শেষ, কী লিখবে সে?’ শাফিন অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে থাকে; ধোঁয়াগুলো আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে বাতাসে মিলিয়ে যেতে থাকল, শুধু মুখে তার স্বাদ রয়ে গেল। ‘আমাদের সবার জীবনেই একটা মানুষ আসে যে একদম সিগারেটের মতো, অদৃশ্য হয়ে গেলেও সঙ্গে রয়ে যায় তার অস্তিত্বের স্বাদ; হাতে-মুখে-ঠোঁটে-শরীরে অথবা হৃৎপিণ্ডে। সিগারেটের নেশার মতোই তার নেশা হয়ে যায়, সময়-অসময়ে তাকেই শুধু প্রয়োজন হয়, ঠিক সিগারেটের মতো। ‘গল্পের শেষ কী হবে?’ নামহীন-সংজ্ঞাহীন-স্বীকৃতিহীন নৈতিক-অনৈতিকের মাঝখানে ঝুলন্ত; ভালোবাসার গল্পগুলোর শেষ লেখা অনেক কঠিন সব সময়। শেষ হয়; শেষ হয় না; অথবা শেষ হয়েও শেষ হয় না...কখনোই।



মন্তব্য