kalerkantho


এ সপ্তাহের বই

ফরিদ কবিরের স্মৃতিগদ্যে অনেক প্রশ্নের উত্তর

লীনা দিলরুবা

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ফরিদ কবিরের স্মৃতিগদ্যে অনেক প্রশ্নের উত্তর

আমার গল্প, ফরিদ কবির। প্রকাশক : আগামী, প্রচ্ছদ : এস এম সাইফুল ইসলাম। মূল্য :৮০০ টাকা

প্রতিটি মানুষের একটি গল্প থাকে। সে যে-ই হোক।

যেকোনো শ্রেণির, যেকোনো পেশার। কারো কাছে নিজের জীবনকে অকিঞ্চিৎকর মনে হলেও জীবনের অনেক অনেক ঘটনার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সে বিশেষ গল্পটির শরীরে একসময় শ্যাওলা জমে, তাতে চুপিসারে ডালপালা গজায়, একদিন সে গল্প মহীরুহ হয়ে যায়। অনেক অনেক পরে, সেই সাবালক গল্পটি বলার জন্য কথকের ভেতরে দহন শুরু হতে পারে। প্রচণ্ড বেগে সে গল্প বেরিয়ে আসতে চায় একান্ত গোপন গুহা থেকেও। কবি ফরিদ কবিরের বেলায় ব্যতিক্রম হলো, তাঁর জীবনে গল্প ছিল দুটি। একটি গল্প তাঁর পিতার, অন্যটি তাঁর নিজের। এবারের বইমেলায় ফরিদ কবিরের লেখা একটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘আমার গল্প’ শিরোনামে পাঠকের হাতে এসেছে। প্রায় চার শর বেশি পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের তাঁর পিতা সাদুল্লাহর গল্পটি যেন সিনেমার কাহিনিকে হার মানায়। অবশ্য নাটক-সিনেমা তৈরির জন্য যে স্ক্রিপ্ট লাগে, সেটি লেখার জন্য স্ক্রিপ্টরাইটার মেলে, কিন্তু জীবনের স্ক্রিপ্ট লেখার তো সে রকম সুযোগ নেই। তাই সিনেমা জীবনের মতো হয়, জীবন সিনেমার মতো নয়। জীবন আসলে জীবনের মতো বয়ে চলে। অনেকটা পরিকল্পনাহীন—অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন জীবন গল্প জন্ম দেয়, আর সেসব গল্প মানুষের বুকের মধ্যে গেড়ে বসে থাকে আর মজা লুটতে থাকে।

সাদুল্লাহর পিতা গণি মিয়ার ভাইয়েরা সম্পত্তির লোভে পড়ে তাঁকে মেরে ফেলে। গণি মিয়ার তিন সন্তান—সাদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আর ফাতেমাকে নোয়াখালী জেলা থেকে তিনটি পৃথক ট্রেনে উঠিয়ে দেয় গণি মিয়ার ভাইয়েরা, অর্থাৎ শিশুদের চাচারা। সাদুল্লাহর বয়স তখন ১১ বছর। একা সাদুল্লাহ এসে নামে ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে। নিঃসহায়, ছোট্ট বালক সাদুল্লাহ প্রথম দুদিন রেলস্টেশনের কলের পানি খেয়ে বেঁচে থাকে। পরে স্টেশনেই বড় হতে থাকা এক খুদে বন্ধু জুটে গেলে সে বন্ধুর সাহায্যে স্টেশনের অনতিদূরের ‘ভাই ভাই হোটেলে’র খোঁজ পায় এবং সেখানে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত উদ্বৃত্ত খাবারের অল্প কিছু অংশ নিজের জন্য ব্যবস্থা করতে পারে। সাদুল্লাহর পিতার জমির কোনো কমতি ছিল না। তাঁদের বাগানে এত বৃক্ষ ছিল যে ছোট্ট সাদুল্লাহ তা কোনো দিন গুনে শেষ করতে পারেনি। এ রকম ধনী পিতার সন্তানের এই করুণ জীবনকাহিনি শুনে বিশ্বাস হতে মন চাইবে না, গায়ে কাঁটা  দেবে, পাঠক বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়বেন। মনে হবে, কী পড়লাম এটা? যতটা নিষ্ঠুরতা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না, এর চেয়ে কয়েক শ গুণ বেশি নিষ্ঠুরতা কাউকে কাউকে দেখতে হয়। যেমন সাদুল্লাহ। নোয়াখালী থাকাকালে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছিল সে। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে ভাই ভাই হোটেলের মালিকের কৃপাদৃষ্টি পড়লে সেখানেই সে স্থায়ী হয়ে যায়। সেখানেই কাজ করতে করতে বালক সাদুল্লাহ যুবক হয়ে ওঠে। একদিন মালিকের বোনের মেয়ে কেরানীগঞ্জের মিনার সঙ্গে বিয়েও হয়ে যায় সাদুল্লাহর। প্রায় অশিক্ষিত সাদুল্লাহ সংসার গড়ে তোলেন ঢাকার জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনে। সংসার বাড়ে। সন্তানের মুখ দেখেন সাদুল্লাহ-মিনা দম্পতি। চারটি ছেলের দুটি বেঁচে থাকে, দুটি অকালে মরে যায়। একটি কন্যাও হয় তাঁদের। কন্যাটির নাম শিলা। এই বেঁচে থাকা দুটি ছেলে কে জানেন? বাংলাদেশের দুই নামকরা মানুষ। তাঁদের অনেক পরিচয়। আপাতত কবি পরিচয়টাই দিই। একজন ফরিদ কবির, আরেকজন সাজ্জাদ শরিফ। সাদুল্লাহ সারা জীবন কাজ করেছেন দোকানের কর্মচারী হয়ে। এরপর নিজেই একটি দোকান দেন। প্রথম জীবনে সাদুল্লাহর রোজগার ছিল সামান্য। পুরান ঢাকার প্রায় বস্তির পরিবেশে বসবাস করেও ছেলেরা কিভাবে ফরিদ কবির আর সাজ্জাদ শরিফ হলেন সেটা রীতিমতো বিস্ময়কর!

তাই সাদুল্লাহর গল্পের পর তাঁর বড় ছেলের গল্পটিও আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়তে বাধ্য হই।

ফরিদ কবিরের কবি হয়ে ওঠার কালটা ছিল সত্তর থেকে আশির দশকের মধ্যে। পরিবারে আর্থিক অনটন যা-ই থাকুক, কবিতার প্রতি তাঁর আবেগের কোনো কমতি ছিল না। কবিতার এই আবেগ ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। কলকাতা-ঢাকার প্রায় সব উঠতি কবি, প্রতিষ্ঠিত কবিদের সঙ্গে তাঁর চেনাপরিচয়-ওঠাবসা হতে থাকে। অগ্রজদের কাছ থেকে প্রশ্রয়ও পেয়েছিলেন তিনি অনেক। একবার কবি শামসুর রাহমানকে জিল্লুুর রহমান সিদ্দিকীর উপস্থিতিতে কবিতার মাত্রা নিয়ে রীতিমতো জ্ঞান দিয়ে এসে কবিতাও শুনিয়ে এলেন।

কবিতার প্রতি ভালোবাসা, নেশা, ক্রমে নারীতে প্রবাহিত হতে থাকে। ফরিদ কবিরের বইটির গুণ হলো, তিনি যখন যে প্রসঙ্গে গেছেন, সেখানে তিনি পুরোপুরি প্রকাশিত হয়েছেন। কোনো প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো জড়তা বা দ্বিধা কাজ করেনি। জানি না, জীবনীগ্রন্থ কতটা অনুমোদন করে কিন্তু তিনি এতটা অকপট ছিলেন এই বইতে যে এটা রীতিমতো দুর্ধর্ষ লাগবে সবার কাছে। গণিকা-গমন থেকে শুরু করে জীবনের কানাগলির কোনোটিই তিনি বইতে প্রকাশ করতে বাকি রাখেননি। ফরিদ কবিরের ‘আমার গল্প’ পড়ে সম্পর্কিত মানুষগুলোর, বিশেষ করে নারীদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, বিষয়টি নিয়ে ভাবনা চলে আসে। যতটা নিষ্ঠুরতা সাদুল্লাহ অর্থাৎ তার পিতাকে দেখতে হয়েছিল, ততটা না হলেও ফরিদ কবিরকেও দারিদ্র্য আর হতাশার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে যেতে হয়েছিল। জীবন তাঁকে অনেক বেশি নিষ্ঠুরতা উপহার দিয়েছে বলে বইয়ে নারীসংক্রান্ত, নারীর প্রেম কিংবা শরীরী বিষয়গুলো পড়তে গিয়েও নারীঘটিত স্পর্শকাতরতার চিন্তা মাথায় এলো না। একই সঙ্গে বইটি লিখতে গিয়ে ফরিদ কবির সৎ ও অকপট ছিলেন বলে এটুকু প্রশ্রয় তিনি পাঠকের কাছ থেকে অনুমোদন করে নিতে পেরেছেন।                  

আমরা যারা তাঁর পরের প্রজন্মের মানুষ তাদের জন্য বইটি এই কারণে মূল্যবান যে আমরা অনেক ঘটনার সঙ্গে নিজেদের বোঝাপড়াটা ঝালিয়ে নিতে পেরেছি। এ ছাড়া বইটি আরেকটু কম স্বাস্থ্যের হলেও ক্ষতি ছিল না। কখনো কখনো কোনো কোনো অধ্যায় বাড়তি লাগছিল। তবে ফরিদ কবিরের গদ্য লেখার হাত এতই সাবলীল যে বইটি পড়তে পড়তে চমৎকার সময় কাটল।


মন্তব্য