kalerkantho


মঞ্চ নাটক

অভিনয়-গীতে অনবদ্য ‘দমের মাদার’

মাসিদ রণ

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অভিনয়-গীতে অনবদ্য ‘দমের মাদার’

‘দমের মাদার’ নাটকের দৃশ্যে পারভীন আখতার পারু ও শুভাশীষ দত্ত তন্ময়। ছবি : রাজীব হালদার

সম্প্রতি সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে হয়ে গেল নাট্যম রেপার্টরি থিয়েটারের জনপ্রিয় নাটক ‘দমের মাদার’-এর মঞ্চায়ন। দীর্ঘদিন পর মঞ্চে ‘দমের মাদার’, তাই দর্শকের আগ্রহ যেন একটু বেশিই দেখা গেল।

শিল্পকলার বিরক্তিকর নিরাপত্তার পাঁচিল ডিঙিয়েও যে সাধারণ দর্শক নাটকটি দেখতে এসেছে, এটা সত্যিই দলটির জন্য প্রাপ্তির। শুধু সাধারণ দর্শকই নয়, চোখে পড়ার মতো ভিড় ছিল বিভিন্ন নাট্যদলের নাট্যকর্মী, নির্দেশক ও লেখকদের। মঞ্চে ঢুকতেই যেন ভিন্ন এক জগতের আস্বাদ পাওয়া গেল। চারদিকে আগরবাতির ম ম গন্ধ। নাটক শুরুর বেল বাজাল। সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হলো সুগন্ধি গোলাপজলের ধারা। সব মিলিয়ে যেন মিলাদ মাহফিলে বসে আছি, দর্শকের এমন অনুভব হয়। শুরু হলো গীতনির্ভর আখ্যান ‘দমের মাদার’, গানে গানে মাদারের জয়কীর্তন। বাদ্য-বাজনা, গায়েনের চমৎকার গায়কি আর দমের মাদাররূপী শিল্পী ও অনুসারীদের ভক্তিসুলভ অঙ্গভঙ্গি দর্শককে নিয়ে যায় ভাবের জগতে। শুরু হয় মাদারের জীবনী বন্দনা।

মূল কাহিনীতে দেখা যায় বংশপরম্পরায় সাধক জরিনা মাদারের ভক্ত। তাঁর নিজেরও অসংখ্য ভক্ত রয়েছে, যারা বিপদে-আপদে জরিনার শরণাপন্ন হয়। যুগ যুগ ধরে জরিনার পূর্ব পুরুষ মাদার বন্দনা করে মানুষের মধ্যে অহিংসার বাণী পৌঁছে দিয়েছে। ভক্তি গীতের মাধ্যমে ঈশ্বরকে প্রাপ্তিই এই ভক্তকুলের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু হঠাৎই জরিনার এই ভক্তিকাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এলাকার চৌধুরী পরিবারের পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রবীণ সদস্য। তিনি মূলত তথাকথিত শাসক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি। তাঁর চাওয়া প্রতিবন্ধী পোতার সঙ্গে জরিনার অনুপস্থিতিতে মাদার ভক্তদের যে পথ দেখাবে সেই নূরের বিয়ে দেওয়া। কিন্তু বিচক্ষণ জরিনা বুঝতে পারেন মাদারের ভক্তি বিনাশ করার জন্যই চৌধুরীর বেটা গভীর ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। একদিকে বাইরের শত্রুর কাছ থেকে, অন্যদিকে আপন নাতনির সঙ্গে মাদারের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করতে থাকেন জরিনা। যে নাতনিকে তিনি যোগ্য সাধকরূপে তৈরি করেছেন আশৈশব থেকে, সে গায়েনের উচ্ছল প্রেমে ভাসতে থাকে। সে সাধক জীবনের চেয়ে সংসার-সন্তানের স্বাদ, শরীরের কামনা পূরণের কথা বড় করে দেখে। জরিনা আর নূরের কথোপকথনে উঠে আসে মানবের অস্তিত্ব সংকট, ধর্মের চেয়ে দাদির জনপ্রিয়তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নাতনির যৌবনের উন্মাদ স্রোতে ভাসার বাসনা। নূর প্রেমের দোহাই দিয়ে মাদারের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গায়েনকে পাঠিয়ে দেয় শত্রুর মোকাবিলা করতে। প্রেমের জন্য মাদারের ভক্ত না হয়েও গায়েন জীবন বিসর্জন দেয়। আর খাঁটি প্রেম থেকে বঞ্চিত হওয়ার দাগা সইতে না পেরে নূর আত্মহননের পথ বেছে নেয়। যে দাদি আজীবন মাদারের বন্দনায় জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনিও প্রিয় নাতনিকে হারিয়ে ক্ষোভে মাদারকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু অসীম শক্তি বেঁচে থাকে ভক্তদের মাঝে। ভক্তরা আবারও মাদারের বন্দনায় মেতে ওঠে।

‘মাদার পীরের আখ্যান’ অবলম্বনে রচিত এ নাটকে উঠে এসেছে বাংলার লোকরীতিভিত্তিক মাদার পীরের পালাগান।

নাটকটির রচয়িতা সাধনা আহমেদ দেখাতে চেয়েছেন ধর্ম, সংসার, আত্মীয়, প্রেম—সবই এক সূত্রে বাঁধা। মানুষের জীবনে প্রতিটিরই সমান গুরুত্ব রয়েছে। কোনোটিকে ছেড়ে কোনোটি সফল হতে পারে না।   নির্দেশনা দিয়েছেন ড. আইরিন পারভীন লোপা। যেহেতু নিজেই একজন দুর্দান্ত অভিনেত্রী, তাই প্রতিটি পাত্রপাত্রীর বাচিক ও আঙ্গিক অভিনয়ে তিনি যথেষ্ট পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। মূলত নাটকটি যতটা না গল্পনির্ভর, তার চেয়ে বেশি অভিনয় ও গীতনির্ভর। লোপা খুবই নিরাভরণ সেটে প্রতিটি দৃশ্য চমৎকার করে বোঝাতে পেরেছেন। আলোক পরিকল্পনায় জুনায়েদ ইউসুফ দুর্দান্ত। আর আগেই বলা হয়েছে সংগীত এই নাটকের প্রাণ, সে ক্ষেত্রে পরিমল মজুমদার ও শিশির রহমান অনবদ্য।

নাটকের প্রধান তিনটি চরিত্র জরিনা, চৌধুরীর বেটা ও গায়েনের ভূমিকায় পারভীন আখতার পারু, শুভাশীষ দত্ত তন্ময় ও শিশির রহমান সাবলীল। এ ছাড়া অন্যান্য চরিত্রে পারভীন সুলতানা কলি, ফজলে রাব্বি সুকর্ণ, জান্নাতুল ফেরদৌস, তারক নাথ দাস প্রমুখ।


মন্তব্য