kalerkantho


সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ

সৈয়দ শামসুল হক

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ

আমি সাহিত্য আড্ডায় বহুবার লক্ষ করেছি যে আবুল মনসুর আহমদের নাম উল্লেখ করলে তাঁর ভাষাচিন্তা ও সংস্কৃতিচিন্তা নিয়ে একটা দেয়াল তৈরি হয়। তাঁর ভাষাচিন্তার ভেতরে ছিল—একটা প্রমিত ভাষা হবে, যা পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়ে লেখা।

কিন্তু সম্ভবত তিনি যেটা লক্ষ করেননি সেটা হচ্ছে প্রমিত ভাষা। এভাবে একখান থেকে নিয়ে গড়ে তোলা যায় না। ভাষার ধ্বনির একটা ওজনের ব্যাপার আছে এবং সেটা যে অঞ্চলের সে ওজনটা সঠিকমতো পাওয়া যাবে, সেটিই প্রমিত ভাষা। এটা এমন নয় যে শান্তিপুরের ভাষা, পশ্চিমবঙ্গের ও গঙ্গাপাড়ের ভাষা আমরা তুলে নিয়েছি। এটা প্রণয়নের, উচ্চারণের, বর্ণের ও শব্দের ওজনের ব্যাপার আছে। এ জায়গায়ই অনেকের বোঝার ভুল হয় বলে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে তারা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে থাকে যে এগুলো কেন নয়। আবুল মনসুর আহমদ ভাষাচিন্তা সম্পর্কে যা কিছুই করেছেন, সেটার দুঃখজনক প্রবাহ আমরা এখনো লক্ষ করি। কারো ভেতরে ভেতরে তা এখনো লক্ষ করা যায়, তা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত এবং এ ধরনের আলোচনা থেকে আরো পরিষ্কার হতে পারে। বরং আমি বলব আবুল মনসুর আহমদের জীবন একটা সময়ে চিনতেন, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের পরস্পর বিরোধিতা, তাঁদের সিদ্ধান্ত—এগুলোর একটা খুব চমৎকার ছবি পাওয়া যায়, যদি আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যজীবন ও কর্মজীবনকে আমাদের চোখের সামনে রাখি।

আমি বলতে পারি যে তাঁর সাহিত্যটাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। তবে তাঁর ভাষাচিন্তা সেভাবে প্রয়োগ করতে পারেননি। তাঁর ব্যঙ্গ রচনার কথা বলা হয়েছে এবং তিনি যে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রচনা করেছেন সেটা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পরবর্তীকালে কাউকে ঠিক এ ধারায় লিখতে আর দেখছি না এবং এটাও দেখছি যে মাহফুজ আনাম আছেন, তিনি একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন। কার্টুনেরও অনেক জনপ্রিয়তা বাজারে আমরা দেখি, কিন্তু কার্টুন ও ব্যঙ্গ রচনা—এগুলো থেকে সরে যাচ্ছে। এগুলো কিন্তু আমাকে খুব উদ্বিগ্ন করে। সমাজ কতটা স্পর্শকাতর বা অনাবশ্যক হলে এগুলো থেকে আমরা দূরে সরে আসি। সুতরাং আবুল মনসুর আহমদ শুধু পড়ব, আলোচনা করব এবং এর ধারাবাহিকতা কোথাও দেখব না, তা কিন্তু হয় না। আমি মনে করি যাঁরা সাহিত্য রচনা করছেন, তাঁদের এ বিষয়ে মনোযোগের ব্যাপার হতে পারে। আর দুই-একটা ব্যক্তিগত কথা বলি—সেটা হলো আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে একাধিকবার আমার সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছে। এ সুযোগে বলে রাখি যে আমি তাঁর প্রতি পারিবারিকভাবেও খুব কৃতজ্ঞ। এ জন্য পারিবারিকভাবে কৃতজ্ঞ যে আমার বোনের যখন বিয়ে হচ্ছিল, তখন পাত্রপক্ষ খুব বিচলিত হয়েছিল, নামহীন-পরিচয়হীন একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে। পাত্রের বাবার আবার বন্ধুপ্রতিম আবুল মনসুর আহমদ। তখন তিনি পাত্রের বাবাকে বললেন, যে সৈয়দ শামসুল হকের বোনের চেয়ে আর বড় পরিচয়ের দরকার নেই, বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, বিয়ে দিয়ে দাও এবং বিয়েটা হয়। এ কারণে আমি খুব কৃতজ্ঞ। যে দুই-তিনবার আমি তাঁর বাসায় গিয়েছি আমাকে না খাইয়ে আসতে দেননি এবং খাবারের আইটেম ছিল কোরমা-পোলাওসহ আরো মজাদার খাবার। তাঁর এ ভালোবাসা লেখকদের প্রতি বেশি ছিল। অন্যরা লেখকদের নাম শুনলে মাতাল বাউণ্ডেলে ভাবে, সেখানে তিনি সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এটা তাঁর মননশীলতার বড় পরিচয়। আমি খুব সৌভাগ্যবান যে তাঁদের মতো মানুষের সংস্পর্শ পেয়েছি।

কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, হাসির পেছনে অশ্রু আর কামড়ের পেছনে দরদ—এটা যখন আমরা আবুল মনসুর আহমদের লেখায় আবিষ্কার করি, তখন এটাও দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করি যে আমরা হাসির পেছনে এখন অশ্রু দেখতে পাই না, কামড়ের পেছনে দরদ দেখতে পাই না। আমরা সমালোচনায় লাফ দিয়ে উঠি, তত্ক্ষণাৎ উত্তেজিত হয়ে যাই এবং কেউ যদি আমাদের নিয়ে হাস্যরসের অবতারণা করে, তার পেছনে যে অশ্রুটি পড়ছে তা লক্ষ করি না। মনসুর আহমদের জীবন বা কর্ম আলোচনা করলে এ কথাগুলোও বলা হয়। আমি বারবার বলি যে বড় মানুষদের কাছে নেওয়ার মানে হলো তাঁদের সময়টা কেমন ছিল, তাঁরা কী করে গেছেন এবং আজকের সময়টা কোথায় আছে—এটাই অনুধাবনের বিষয়। আরেকটি কথা বলব, তা হলো এখানে যে তিনটি বিষয় অর্থাৎ সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; এ ছাড়াও আরো দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারত, আর তা হলো—আইনজীবী ও ব্যবসায়ী আবুল মনসুর আহমদ। তাঁর অনেক লেখায় তাঁর আইনজীবীর পরিচয় পাওয়া যায়। আর ওই সময় তিনি প্রেস করেছিলেন, তখন যা ছিল খুব দুর্লভ। এখনকার মতো অতটা সহজলভ্য ছিল না। আমার খুব ভালো লাগছে যে মাহফুজ আনাম আছেন, যিনি পুত্র হিসেবে আবুল মনসুর আহমদের নিশান উড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাহফুজ আনামকে দেখলে আমাদের আবুল মনসুর আহমদের কথা মনে পড়ে যায়। তবে আমি বিচলিত এ কারণে যে তাঁকে নিয়ে কেন পারিবারিকভাবে আয়োজন করতে হবে। এমন একজন মানুষকে নিয়ে কেন অন্যরা বড় ধরনের আলোচনা করেন না। আমাদের কি তাহলে এমন কাউকে রেখে যেতে হবে, যারা আমাদের স্মরণ করবে। এটা খুব দুঃখজনক। এটা যেন না হয়, যাঁরা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের শুধু পরিবার স্মরণ করবে।

আমরা যেন তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাঁদের পিতৃতুল্য ও মাতৃতুল্য মনে করি। মানুষের চলে যাওয়ার পর যে কাজটুকু থেকে যায়, সে কাজ নিয়ে কথা বলার জন্য যখন পরিবারের প্রয়োজন হয়, তখন আমি ব্যথিত হই। আবুল মনসুর আহমদের কথা আমি খুব গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাঁর প্রথম বই ‘আয়না’ আমার জন্মের সালে বের হয়। তারপর ‘ফুড কনফারেন্স’ ১৯৪৪ সালে। এ দুটি বইয়ের কথা আমি ভুলতে পারি না। তিনি শুধু ব্যঙ্গই লেখেননি, রবীন্দ্রনাথ, পরশুরাম, গোরক্ষনাথের মতো রচনা করে তিনি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক চিত্রকে ব্যঙ্গ রচনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এটা ভাবা যায় যে, যে সময় শেরে বাংলার মতো নেতারা ছিলেন, সে সময়ে তিনি রাজনৈতিক সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। এখনকার কোনো লেখক লিখতে গেলেই ধর্মান্ধদের হাতে নিহত হওয়ার ভয় পায়। এতে তিনি চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

[গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে আবুল মনসুর আহমদের স্মৃতি সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনের (সাহিত্য) সভাপতির ভাষণ এটি। ]

অনুলিখন : ইমরান মাহফুজ


মন্তব্য