kalerkantho


হাইনরিখ হাইনে

তোমাকে চাই রাগে-অনুরাগে

মাসুদু্জ্জামান

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তোমাকে চাই রাগে-অনুরাগে

‘আমার গানে ছিল উল্লাস ও আগুন, বেশ কিছু সুন্দর ফুলকি জ্বালিয়েছে তা,’ এখানে যদিও বলা হলো গানের কথা; কিন্তু গান নয় শুধু, স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল তাঁর কবিতায়। হাইনরিখ হাইনে, রবীন্দ্রনাথ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অনুবাদ করেছেন তাঁর কবিতা।

কার্ল মার্কসের সঙ্গে ছিল পত্র-যোগাযোগ। শুবার্ট, শুমান, ভাগনার, লিস্ট্, বের্টোল্ডির মতো প্রখ্যাত কম্পোজাররা সুরারোপ করেছেন তাঁর কবিতায়। কবি হয়েও তিনি ভেবেছেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা। জার্মানির ডুসেলডর্ফ থেকে ফ্রান্সের প্যারি ভ্রমণে ও সৃজনে যুক্ত ছিলেন আজীবন। অনিকেত, অস্থির, অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে লিখে গেছেন কবিতা। সেই সঙ্গে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন সাংবাদিক ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও, গানের বাণী রচনার কথা তো আগেই বলেছি। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে প্রেম ও অপ্রেমের উজ্জ্বল কিছু লিরিক রচনার জন্য খ্যাতিমান হয়ে আছেন এই কবি। ব্যক্তিগত জীবন পরিক্রমায় প্রেম বারবার তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছিল বলেই লিখতে পেরেছিলেন ওই সব কবিতা। কিন্তু সহজ ভাবের ফল্গুপ্রবাহ নয়, ‘দার্শনিক কাব্যগীতি’র জন্য বাইরের পৃথিবীতে তাঁর পরিচিতি ও খ্যাতি।

হাইনের জীবন ছিল দ্বন্দ্ব-সংকুল, কিন্তু প্রাজ্ঞজনোচিত অভিজ্ঞানে উজ্জ্বল। কবিতায়ও তার প্রভাব পড়ে। একজন হাইনে বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, তাঁর সৃষ্টির বহুমুখিতার মধ্যে কোনো সুবিধেবাদ নেই, এ তাঁর এক সর্বসমন্বিত মানসিকতার বিচিত্র প্রকাশ মাত্র। বাঙালি কবিদের অনুবাদেও হাইনের কবিতা আমাদের কাছে অন্য এক শিহরণ ছড়িয়ে দেয়। মনে পড়বে, হাইনেই তো বলেছিলেন, ‘আমাদের পৃথিবীটা মস্ত বড় সড়ক ওরে/আমরা মানুষ তার মুসাফির যত। ’ এই পরিক্রমণ সবচেয়ে তীব্র ও গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে হাইনের প্রেমের কবিতায়।

হাইনের জন্ম জার্মানির রাইন নদীর তীরে ডুসেলডর্ফে, দুশো বছরেরও আগে ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে। বাবা নাম রেখেছিলেন হ্যারি। জন্মগতভাবে ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলেন ইহুদি, কিন্তু ১৮২৫ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার সময় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিজের হাইনে নামের আগে জুড়ে দিয়েছিলেন হাইনরিখ নামটি। কুড়ি বছর বয়সে হামবুর্গের একটি পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। ডুসেলডর্ফের ফরাসি সংস্কৃতির অভিঘাতে ফরাসি শিল্প-সাহিত্যের প্রতি দেখা দেয় গভীর অনুরাগ। তাঁর জীবনের শেষ পঁচিশ বছরও কেটেছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিতে। শ্লেগেলের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ভারতবিদ্যার পাঠ। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে মনোনিবেশ করেন কাব্যচর্চায়। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। গেটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন ডক্টরেট ডিগ্রি। কিন্তু কবিতা যাঁকে আবেগায়িত সংরক্ত করে তোলে, তিনি তো কবিতাই রচনা করবেন।

যৌবন সরসী নীড়ে তীব্র প্রেমানুভবের দ্বারা শিহরিত কবি এ সময়েই একের পর এক রচনা করেছেন প্রেমের কবিতা। পূর্বরাগের আকুলতা আর স্বপ্নবিভ্রমের আশা-নিরাশায় তাঁর এই সময়ের কবিতাগুলো দ্যুতিময়। হাইনের মনে তখন তীব্র প্রেমানুভব জাগছে, কিন্তু প্রেমাস্পদ সম্পর্কে খুব একটা সুনিশ্চিত নন তিনি। ফলে স্বপ্ন ও বিভ্রমের দোলাচলের ভেতর দিয়ে অভূতপূর্ব শঙ্কায় মনে হচ্ছে এ শুধুই স্বপ্ন আর আতঙ্ক : ‘সে এক স্বপ্ন বড় অদ্ভুত ভয়ঙ্কর যে কত,/প্রতিটি সকালে উঠেই প্রশ্ন করি/আজ কি আসবে সোনা?/সন্ধ্যায় আমি অভিযোগে ভেঙে পড়ি/আজকেও সে এল না। ’ প্রেম এভাবেই কবিকে যন্ত্রণায় ডুবিয়ে দেয়, তবু তা থেকে মুক্তি নেই : ‘সুন্দর ঝলমলে সোনালি তারারা ওগো/প্রিয়তমা আছে দূরে, তাকে শুধু বোলো—/ব্যথাভরে বুকে পাংশু, তবু হেম-নিকষিত/প্রেম নিয়ে আমি আছি এখনও। ’ প্রেম, চিরকালই হয়তো প্রকৃতি সংস্পর্শে কবিদের মনে অনাস্বাদিত অনুভবের সঞ্চার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হাইনেও ঘুরে বেরিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কবিতায়ও এসেছে গ্রামজীবনের ছবি ও নানান অনুষঙ্গ। রাত্রিযাপন করেছেন নানান সরাইখানায়। পথ চলতে চলতে যেসব তরুণীর সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাদের জন্যই অনুভব জেগেছে প্রেমের, প্রেমিকারাও বরণ করেছে তাঁকে। কিন্তু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেছে রাতের সুখস্বপ্ন। হাইনের গদ্য, এ সময়েই হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, কবিতা তার সারল্যে মিশে গেছে গদ্যে। একটা দৃষ্টান্ত দিই : ‘আজ মে মাসের প্রথম দিন; জীবনের সমুদ্র হয়ে বসন্ত যেন পৃথিবীর ওপরে নিজেকে ঢেলে দিচ্ছে, তার শাদা ফেনা ফুল হয়ে গাছে গাছে আটকে আছে। ’

হাইনের কবিসত্তার বিশিষ্ট দিক প্রেম। ছাত্রজীবন থেকে পরিণত বয়স অব্দি—প্রেমানুভবের দ্বারা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তাঁর হৃদয়। কবিকল্পনা দিয়ে একের পর এক প্রেমাস্পদের মানসী রূপ সৃষ্টি করেছেন তিনি, কিন্তু মধুরতা নয়, বিহ্বল হৃদয় যন্ত্রণায় ডুবে গেছে মন। প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তিই তাঁকে করে তুলেছে চিরবিরহী, যন্ত্রণাকাতর ভগ্ন মন নিয়ে তবু প্রেমিকাদের কাছেই ছুটে গেছেন বারবার। প্রেমিকারা কেন তাঁকে বুঝতে পারছে না, কবিতার ছত্রে ছত্রে ঝরে পড়েছে সেই আকুতি : ‘আমি কেন এত আতুর মলিন/লক্ষীটি সোনা একবার বলো!/কথা বলো প্রিয়ে প্রাণের প্রতিমা/কেন আর ভালোবাসবে না?’ যৌবনের স্বপ্ন-আবেগে প্রেয়সীকে কাছে পেতে চাইছেন এই কবি, গড়ে নিতে চেয়েছেন তিলোত্তমাকে, কিন্তু প্রকৃত প্রেম কখনো ধরা দেয়নি। ফলে হতাশায় বিহ্বল করুণ ম্লান অনুভবে ক্ষতবিক্ষত তাঁর হৃদয় : ‘কিন্তু বারে বারে হল ভুল,/যদিও ভালোবেসে আমি অন্ধ-আকুল,/প্রেমে ডুবে দেখি মেলে না প্রেম/ঘরে ফিরে আসি আতুর মলিন। ’ প্রেয়সীর চুম্বন প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘শপথ না করে দাও শুধু চুম্বন, / আস্থা রাখি না নারীর শপথে কোনো। ’

এই যে প্রত্যাখ্যান, সে শুধু অভিমানের, অপ্রাপণীয় রোমান্টিক অনুভবের। প্রেমের এই বিয়োগাত্মক পরিণতির কথা ভেবেই প্রেমকে এরপর তিনি তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে জর্জরিত করেছেন। আত্মযন্ত্রণায় ডুবে গেছেন।

হাইনের জীবনে, বলা বাহুল্য, আবির্ভাব ঘটেছে অনেক নারীর। তাঁর প্রথম প্রেমিকা ছিলেন এক রাখাল তরুণী জোসেফা। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। জোসেফা ছিলেন বেশ সুন্দরী। এই সৌন্দর্য আর ফরাসি বিপ্লবের প্রতি আসক্তি থেকে জোসেফার প্রতি তাঁর অনুরাগ জন্মে। এরপরে হাইনের জীবনে আবির্ভাব ঘটে প্রেমিকা মলির। মলির প্রতি হাইনের ছিল তীব্র আকর্ষণ। মলি ছিলেন তাঁর চাচা সলোমনের কন্যা। হাইনে তাঁর প্রতি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন যে মলির বিয়ে হয়ে গেলে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর মনে যে প্রশান্তি নেমে আসে, তা-ই তাঁর হৃদয়-যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে দেয়। এরপর তিনি প্রেমে পড়েছিলেন মলির বোন মিঙ্কার। হেলোয়াসে নামের আরেকটি মেয়েও তাঁর মনে প্রেমানুভব জাগিয়ে তুলেছিল। একদিন যে জোসেফা হাইনেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, পরে সেই আবার ‘কবি’ ভেবে হাইনেকে কাছে পেতে চেয়েছেন। কিন্তু ততদিনে তিনি হামবুর্গ থেকে আমস্টারডামে যাওয়ার পথে জড়িয়ে পড়েছেন ইভার সঙ্গে। বিবাহিত নর্তকী সিনিওরা ফ্রানসেস্কাও ভালোবেসেছিলেন কবিকে। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি বলে কোনো প্রেমই স্থায়ী হয়নি আর ক্রমাগত কবি হাইনে রোমান্টিক অ্যাগনিতে ডুবে যেতে যেতে রচনা করে গেছেন অসংখ্য কবিতা। এই কবিতাগুলোতে খুঁজে পাওয়া যাবে চিরবিরহী কবি হাইনের দীর্ঘশ্বাস ও হৃদয়-যন্ত্রণা থেকে উৎসারিত অমোঘ কিছু প্রেমের পঙিক্ত। প্রেমের কবিতা হিসেবে সেই কবিতাগুলো এতটাই অনবদ্য হয়ে উঠেছিল যে তার অভিঘাতে পাঠক-হৃদয় আজও কেঁপে কেঁপে ওঠে। হাইনের জীবনী লেখকেরা বলেছেন, ভ্রমণ করতে দারুণ ভালোবাসতেন হাইনে, সেই সঙ্গে ভ্রমণপথেই ঘটেছিল অনেক প্রেমিকার আবির্ভাব। কিন্তু যতবার তিনি প্রেমে পড়েছেন, ততবারই মনে হয়েছে ‘বেদনায় ভরে গেছে পেয়ালা। ’ যাকে তিনি প্রকৃতপক্ষে পেতে চান, সে শুধু অধরাই থেকে যাচ্ছে। আবার যে প্রেম ধরা দিচ্ছে, মনে হচ্ছে—না, এই প্রেম তো আমি চাইনি। আর তখনই তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এই রমণীদের প্রত্যেককেই আমি দ্বিতীয় মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মতো আমার মস্তিষ্কের শিলা দিয়ে গড়েছি। সেই কঠিন ভাঙচুরের আঘাত আমার রয়েছে। এরা আমারই সৃষ্টি। এদের সবাইকে যদি সত্যি সত্যি ভালোবাসতাম, তবে তো মরেই যেতাম। ’

প্রেমকে হাইনে এভাবেই কখনো ‘মিথ্যে’, কখনো ‘প্রবঞ্চনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রেমিকার সঙ্গে শারীরিক মিলনের মুহূর্তেও তাই তাঁর মধ্যে জেগে উঠেছে মৃত্যু বা শীতলতার অনুভব। হাইনে, মনে পড়বে আমাদের, জার্মানির শেষ রোমান্টিক কবিদের একজন। রোমান্টিক প্রেমানুভব তখন অবসিত হয়ে যাচ্ছে বলেই হয়তো তাঁর কবিতায় প্রেমের আর্তি, আবেগ ও প্রেমকলায় তারুণ্যের শিহরণ থাকলেও সেই প্রেমকে মনে হয়েছে মায়া, ক্ষণস্থায়ী, মিথ্যা, অলীক, দ্বিধাপন্ন। রোমান্টিক প্রেমকল্পনাকে তিনি যেন ভেঙে দিচ্ছেন বারবার। প্রেমের কবিতায় ভর করছে ঘৃণা, মৃত্যু, বিবমিষা, ক্ষোভ। হাইনের কবিতাগুলোকে তখন মনে হয় পাঠককে অবিশ্বাসের অশ্রুবাষ্পে উচ্ছ্বসিত আবেগে বুঝি কেবলই ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। তাঁর কবিতায় ফুটে বেরুচ্ছে তীব্র শ্লেষ, ব্যঙ্গ, যা হাইনের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘প্রিয়তমা দূরে গেলে, হাসি/ভুলে গেলাম একেবারে। / ছেদো রসিকতায় মাঝে মাঝে দাঁত বেরোলেও / হাসতে পারলাম না আর। ’ আরেকটি কবিতায় বলেছেন, ‘সামনে এসে দাঁড়াল আমার ছোট্ট প্রিয়া; মিষ্টি, সুসজ্জিতা / মাথা হেঁট করে বলি : আপনিই বুঝি কনে? / সত্যি নাকি? তবে প্রিয়তমে, সাদর অভিবাদন! / কিন্তু, সত্যি বলছি আমার চোয়াল যেন আটকে গেল/টেনেটুনে ঠাণ্ডাস্বরে বেরুল কথাগুলো। /ওমা, প্রেয়সীর দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল / হঠাৎ কাতর অশ্রুরাশি, সে-অশ্রুবন্যায়/আমার মধুর চিত্র প্রায় ধুয়েমুছে সাফ/আহা মিঠে আঁখিজোড়া, স্নিগ্ধ প্রেমের তারকারাজি/জাগ্রতে আমায় বারবার মিছে বলেছ, জানি;/স্বপ্নেও তাই, তবু তোমাদের আজও স্বচ্ছন্দে বিশ্বাস করি। ’ বিশ্বাস? এ তো সেই প্রতিবচন, যার মধ্য দিয়ে অনিবার্য প্রেমানুভবের ভেতরে অবিশ্বাস এনে অপ্রেমে রূপান্তরিত করেছেন। তীব্র ব্যঙ্গ আর শ্লেষে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছেন চিরায়ত প্রেমের রোমান্টিক অনুভবকে।

তাহলে প্রেম কি শুধুই ছলনা বা আত্মপ্রবঞ্চনা, যেমনটা ভেবেছিলেন আধুনিকেরা পরবর্তীকালে? প্রেম কি তাহলে রোমান্টিক আকুলতা ও উদ্বেগ মাত্র? কিন্তু হাইনের কাছে প্রেম ঠিক এ রকমটা নয়, বরং তাঁর প্রেম আরো গভীর, বিচিত্র, করুণ ও মাধুর্যময়; অনিঃশেষ আর অফুরান। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনবদ্য অনুবাদে হাইনের এই প্রেমানুভবই উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়েছে এই কবিতায় : ‘ভালোবেসেছিলাম তোমাকে, এখনো তোমাকে ভালোবাসি/এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলে/ভালোবাসা আগুনের মতো/এ শহর ছাই হয়ে গেলে আমি হাসি শিখরের হাসি,/ভালোবেসেছিলাম তোমাকে, এখনো তোমাকে ভালোবাসি। ’ শরীরকে ছাড়িয়ে হাইনের প্রেম এভাবেই চিরায়ত হৃদয়ানুভবের ভেতর দিয়ে প্রেমকেই করেছে মহিমান্বিত। শারীরিক প্রেমকে তিনি অস্বীকার করেননি অর্থাৎ তাঁর প্রেম প্লেটোনিক ছিল না, আবার শরীরসর্বস্বও নয়।

মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাঁর দেখা হয় এলিসে ক্রিনিেস নামের তরুণীর সঙ্গে। কবি তাঁকে ‘মুশে’ বলে ডাকতেন। মুশের সেবা-যত্ন হাইনের রোগশয্যার দিনগুলোকে কিছুটা হলেও আনন্দে ভরিয়ে তুলেছিল। জীবনের এই অন্তিম পর্বেই তিনি রচনা করেন ‘লা মুশে’র কবিতাপুঞ্জ। মুশেই ছিলেন তাঁর সর্বশেষ প্রেমিকা। মুশেকে নিয়ে তিনি যে প্রেমের কবিতাগুলো লিখেছিলেন সেগুলো ছিল গভীর আত্মদর্শন আর অধ্যাত্মবোধে উজ্জ্বল। প্রেমানুভবের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল মানবিক চিরায়ত অনুভব : ‘অমর আত্মা, ভেবে রেখো মনে/দুঃখশোকে পড়ে না যেন ভেঙে/মর্ত্য ছেড়ে যাবার সময় এলে/মৃত্যু ও রাত পাড়ি দিয়ে, পথ চলে। ’ নিজের শবযাত্রা নিয়ে তিনি এ কারণেই লিখতে পারেন এ রকম কবিতা, ‘হয়তো হবে না কোনো প্রার্থনাগীত, হবে না কোনো সংগীতধ্বনি...। ’

১৮৫৬ সালে জীবনাবসান হয় হাইনের। মৃত্যুকেও তিনি মহিমান্বিত করে বলেছেন, ‘মৃত্যু সে তো স্নিগ্ধ এক রাত। ’ আরেকটি কবিতায় বলেছেন, ‘সূর্য-আলোয় ঝলমল করে সাগর/বুঝি সে সোনায় গড়া/ভাইরে আমার মরণ ঘনিয়ে এলে/এখানে ফেলিস আমায় তোরা। ’ সাধারণ মানুষের জন্য মমত্ববোধ আর তীব্র প্রেমানুভবের কারণে হাইনরিখ হাইনে এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জার্মান কবি। ১৯৯৭ সালে তাই পৃথিবীজুড়ে উদ্যাপিত হয়েছিল তাঁর জন্মের দ্বিশত-বার্ষিকী। আজও কবিতাপ্রেমীদের কাছে হাইনে প্রিয় নাম, প্রিয় কবি।


মন্তব্য