kalerkantho


প্রদর্শনী

শিল্পের প্রাণময় ভাবাবেগ প্রকাশ ছাপচিত্রে

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শিল্পের প্রাণময় ভাবাবেগ প্রকাশ ছাপচিত্রে

শিল্পী : মো. রফিকুল ইসলাম

ছাপচিত্রের ইতিহাস বহু প্রাচীন। পদ্ধতিগত ভিন্নতায় বরাবরই ওই শিল্পমাধ্যমটি বিশেষভাবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

কৌশলগত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও শিল্পের প্রাণময় ভাবাবেগ প্রকাশে ছাপচিত্র শিল্পীদের কাছে লাভ করেছে গভীর অন্তরঙ্গতা। শিল্পরসিক মাত্রই এর প্রতি অনুভব করেছেন ভিন্ন আকর্ষণ।

বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পচর্চার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ছাপচিত্র মূলধারারই অন্তর্ভুক্ত। অনেক খ্যাতিমান শিল্পীই ছাপচিত্রের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন কালোত্তীর্ণ সব মাস্টারপিস। ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে ছাপচিত্রের পরিধি। কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, রফিকুন্নবী—বরেণ্য এসব শিল্পীর ছায়াতলে এ দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছাপচিত্রানুরাগী।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জয়নুল গ্যালারিতে শেষ হলো চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের বার্ষিক ছাপচিত্র প্রদর্শনী। এতে অংশ নেওয়া ৫০ জনের ১০০টি ছাপচিত্র কর্ম নিয়ে ছিল এ আয়োজন। অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবিক অর্থে এখনে শিল্প পরিমণ্ডলে পা রাখলেও তাদের শুধু শিক্ষানবিশ হিসেবে খাটো চোখে দেখাও বোধ হয় সুবুদ্ধির পরিচয় নয়।

এ প্রদর্শনীতে উডকাট, এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট, লিথোগ্রাফ প্রভৃতি ছাপচিত্রের নানা মাধ্যমের কাজের ছিল সরব উপস্থিতি। বিষয়-বৈচিত্র্য ও মাধ্যমগত ভিন্নতার নানা ব্যঞ্জনায় প্রদর্শনীটি ছিল শিল্পানুরাগীদের কাছে বিশেষ কৌতূহলের। সামগ্রিক বিবেচনায় বেশির ভাগ কাজে একাডেমিক মুনশিয়ানা ও দক্ষতা প্রদর্শনের স্থির চিন্তা থাকলেও কারো কারো কাজে সে চিন্তা সমূলে বাতিল। নিয়ত নিরীক্ষা ও গণ্ডি পেরোনোর স্ব-ইচ্ছার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল চোখে পড়ার মতো।

একই প্রদর্শনীতে বিভিন্ন মাধ্যমে বিচিত্র বিষয়ের উপস্থাপন ভাবিয়ে তোলে নানা ভাবনায়। শিল্পরসিক মাত্রই ভাবের গভীরে ডুবতে ভালোবাসেন। মুখোমুখি দাঁড়াতে চান নতুন নতুন চিন্তাজগতের সামনে। যেখানে প্রকাশ পায় মানবিক চিন্তাচেতনার বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত। প্রাত্যহিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিকতার বিচিত্র বিষয়াদি এক্ষেত্রে শল্পে মূর্ত হয়ে উঠেছে পৃথক পৃথক ভাবনায়। ফুল-লতাপাতা, ফুলদানি, মাটির পাত্র, যন্ত্রপাতির অংশবিশেষ, নাগরিকজীবন, মানুষ-মানুষের কর্মব্যস্ততা, নৈসর্গের সৌন্দর্য প্রভৃতির শৈল্পিক পরস্ফুিটন ছিল অনবদ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের এবারকার বার্ষিক প্রদর্শনীতে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১১টি পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাকিব সেলিম ‘কিছু প্রাচীন পাথরের গল্প’ শিরোনামে এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে করা ছাপচিত্রটির জন্য লাভ করেন ‘শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদ পুরস্কার’। দিপংকার সিংহ ‘বিশুদ্ধতার জন্ম’ ছাপচিত্রের জন্য ‘জয়নুল আবেদিন পুরস্কার’, রফিকুল ইসলাম ‘মুক্তি’ শিরোনামের কাজটির জন্য ‘শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া স্মৃতি পুরস্কার’, সঞ্চিতা বিশ্বাস ‘সমন্বয় বিধান’ শিরোনামের কাজটির জন্য ‘শিল্পী মাহমুদুল হক পুরস্কার’, চিত্তরণ সাহা ‘কাকের কল্পনা’ শিরোনামের কাজটির জন্য ‘শ্রেষ্ঠ নিরীক্ষাধর্মী পুরস্কার’ লাভ করেন। এ ছাড়া বর্ষসেরা পুরস্কার লাভ করেন তাফান্নাম কাগজী, শাহেদ হোসাইন, আশরাফুল আলম, আতিক ফয়সাল, গুলতেকিন সাদিয়া ও শাকিল মৃধা। নিজ নিজ বর্ষের সেরা কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা এ পুরস্কার পান।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকার বাইরের কিছু কাজ অবশ্য উল্লেখের দাবি রাখে। উর্মি রায়ের ‘সাধকের প্রতিকৃতি’, কামরুল ইসলামের উড়ন্ত পাখিদের কম্পোজিশন, ফয়সল আবিরের ‘বৈশ্বিক ধাঁধা’, অভিজিৎ মণ্ডলের ফুলদানির স্টিল লাইফ, স্বপন কুমার সানার চেয়ারের কম্পোজিশন আলাদাভাবে শিল্পানুরাগীদের দৃষ্টি কাড়ে।

নবীন শিল্পীদের জন্য প্রদর্শনীটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক ভূমিকা রাখবে আগামী পথচলায়। হয়তো এই বার্ষিক প্রদর্শনীর উৎসাহ-অনুপ্রেরণাই হয়ে উঠবে ছাপচিত্রানুরাগীদের ভবিষ্যৎ জীবনের পাথেয়।


মন্তব্য