kalerkantho


নীলিমা ও তার ছেলের গল্প

নন্দিতা নাজমা

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নীলিমা ও তার ছেলের গল্প

অঙ্কন : মানব

দীর্ঘদিন ধরে। দিন কী! বছরের পর বছর ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাওয়া সহিংস তেজটাকে জিইয়ে রাখার জন্য সে কী না করেছে।

যখন  নীলিমা ভাবছিল সে-ই কিছু একটা করবে। তিলে তিলে লোকটাকে মেরে ফেললে কেউ কিছু একটা ধরতে পারবে না। অপেক্ষার পর অপেক্ষা ছিল। সে অগ্রসর হতে গিয়েও কিভাবে যেন বারবার পিছিয়েছে। ঘটনাপ্রবাহ যেন এদিকেই ধাবিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।

লোকটার পেছনে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টার সার্বক্ষণিক তদারকি করতে করতে তেজভাব কিছুটা ম্রিয়মাণ হলে সে পাশের ঘরের আধখেঁচড়া বিছানায় গিয়ে লুটিয়ে পড়ে, আহত সাপিনীর মতো নিজের শরীর দুমড়ায়-মোচড়ায়। শপিং মলের বিরাট প্লাস্টিক ব্যাগটা খুলে আরো কিছু কাগজপত্রের ভেতর থেকে ভাঙাচোরা ফোনটা বের করে আনে। ওপরের গ্লাসটার অস্তিত্ব নেই। ছবি তোলা যেত তাতে।

সবচেয়ে কম দামি ক্যামেরা-মোবাইলটাই কিনে দেওয়া হয়েছিল ছেলেকে। ওর বাপ জানলে খেয়ে ফেলত। ফেটে যেতে যেতেও কেমন ঝুলে আছে  মোবাইলটা। তখনই নীলিমার দুর্ঘটনা-পরবর্তী দৃশ্যগুলো মনে পড়ে মাথা টলে যায়। কিছুটা থিতু হলে এই কোনো রকমে ঝুলে থাকা মোবাইলটাই জাগিয়ে রাখে নীলিমাকে। লোকটার জন্য কেন করে, কেন করে সে! পাশের ঘরে লোকটা অহরহ ডেকেই চলে নীলিমাকে—নীলু, ও নীলু। দরকার বা অবান্তর কিছুর জন্যই। মাঝেমধ্যে কী যেন সে বলতে চায়, নীলিমা সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে।    

কলেজে ঢুকে কার পাল্লায় পড়ে সিগারেট ধরেছিল কে জানে! অথচ এই ছেলেই আশপাশের কাউকে সিগারেট খেতে দেখলে নাক-মুখ সিটকাত; এমন ভাব করত যে তার শ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। গলায় এখন ছেলের খুশখুশ কাশি লেগেই থাকে। বাপের সামনে কয়েকবার ধরা পড়েছে। এ নিয়ে বাড়িতে মহা অশান্তি। মাঝখানে রোষানলে পড়ে নীলিমা। বাপ বলে, ছেলেকে সামলাতে পারো না। ছেলেকে গিয়ে বাপের অভিযোগের কথা বললেই খেপে উঠত। সে কি আদর্শ বাবা? বলতে বলতেই ছেলেটার মুখটা কেমন বিকৃত হয়ে যেত। ওই ছেলেকে নীলিমা চিনত না। ছেলের ওই ডায়ালগ বাবা জানি কেমনে একদিন শুনে ফেলল। টিপে টিপে হাতখরচ দিত। পিতা-পুত্রের সম্পর্কটা সাপে-নেউলের সম্পর্কের মতো হয়ে গেল। নীলিমা দম নিতে পারে না, শ্বাসকষ্ট হয়। ছেলেটাকে সামলাও; দেখো গিয়া আরো কিছু নেশাটেশা করে কি না। নাইলে এমন খিটখিটা মেজাজ হয়? অন্যদিকে তাকাইয়া কথা বলে। নীলিমাও সেটা খেয়াল করেছে। কেন অন্যদিকে তাকায় তার ছেলে? বাবার জন্য তার রাগ, ঘৃণা, অবহেলা, না কী কী খেলে সেই চোখে? বাবা অপু, তুমি এখনই টাকার নেশায় ছুটো না। আমি কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে তোমার যা যা দরকার লাগে কিনে দেব। ছেলেটা বাধ্য ছেলের মতো কথা শুনল। এক মাস ইংলিশ মিডিয়ামের একটা বাচ্চাকে পড়ানোর পর প্রথম বেতনের টাকাটা হাতে পেয়েই ছেড়ে দিল। নীলিমা ওটার হিসাব নেয়নি। ছেলের একটা ক্যামেরাঅলা মোবাইলের শখ ছিল, সেটাই সে কিনে দিল। ছেলেটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সে পাতাল খুঁড়ে ধন-সম্পদ বের করে আনে। প্রত্যেক মাসে একেকটা ঘুষের অফার দিয়ে ছেলেটাকে এগিয়ে নিয়ে যায় সে।

এনডিসির উল্টো দিকের ফুটপাতে সে কখনো কাগজ বিছিয়ে, কখনো ধুলোমাখা সিমেন্টের ওপর বসে থাকে। যদিও ওই পাশটায় গাছের ছায়া একেবারেই নেই। ওর বাবার যখন মনে হচ্ছে ছেলে সঙ্গদোষে পড়েছে। ঠিকমতো কোচিং, কলেজের ক্লাসগুলো করে কি না! নিজেরও চিন্তা হয়, এ বয়সের ছেলেপেলে ফেনসিডিল, গাঁজা, সিসা নাকি কী সব ছাইপাশ খেয়ে পড়ে থাকে। ঢোকার-বেরোনোর গেটটার ওদিকে বসলে অন্যদের কথোপকথনে এসব বেরিয়ে আসে। প্রথম দিকগুলোতে ওদিকটায় বসত সে। এসব জাগতিক অথবা কাল্পনিক গল্পগুজবে নীলিমার মাথাটা ঘুরে যেত। মাঝেমধ্যে বিভ্রমের মধ্যেই চলে যেত সে—অপুটা বোধ হয় এ রকমই হচ্ছে। নীলিমার কোনো গল্প ছিল না। সে বোবা হয়ে বসে থাকলেও অন্যদের গল্পগুজব কানে ঠিকই ঢুকে যেত। অপুর বাবার সঙ্গে নীলিমার কথোপকথনের অধিকাংশ সময়জুড়ে থাকত শুধু অপুর চালচলন, হঠাৎ পরিবর্তন, মুখটা হাঁ করলে যে সিগারেটের গন্ধ বের হয়ে আসে ইত্যাদি। নীলিমার তো দাম্পত্য জীবন বলতে আর কিছু ছিল না। তাদের মধ্যকার ছাইপাশ ভালোবাসা অথবা কখনোই না-হওয়া ভালোবাসা বলতে তো কিছুই ছিল না। অসুন্দর হওয়ার কারণেই কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক, অপুর বাবা কেমন যেন একটা নিরাপদ দূরত্বে সরে শুত। এ নিয়ে নীলিমার আক্ষেপ, কামনা-বাসনার কোনো খেদ ছিল না। ছেলেটাই তার সব।

ছেলেপুলে না হওয়ার অপরাধে তার বিয়েটাই তো ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশেষে পাঁচ বছরের মাথায় অপুর আগমন। রোদ-বৃষ্টি থাকলে সে ছাতা মেলে বসে অথবা পেছনের কলোনিটায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সাইডটায় বসলে আশপাশে কাউকে পাওয়া যায় না। নীরবতাই তার ভালো লাগে। মেইন গেটের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা যায়। অনেক ভিড়ের মধ্য দিয়ে ছেলেটা বের হয় না। ছাত্রদের ভিড় হালকা-পাতলা হলে ছেলেটা ব্যাকপ্যাক নিয়ে গোমড়া অথচ চোখে-মুখে আনন্দের একটা ঝিলিক নিয়ে ঠিকই বের হয়ে আসে। যাত্রাবাড়ী আর কত দূর! প্রথম দিকে তার ঘোর আপত্তি ছিল, আমি তো একাই পারি। একটু ঔদ্ধত্যের ভাব নিয়েই বলেছিল, খালি ফেউয়ের মতো লেগে থেকো না তো! নীলিমা গায়ে মাখেনি ওসব কথা। সে ছেলেকে ঘুষের ওপর রেখেছে।

ছেলে জানে, মা থাকা মানে ভালো কিছু স্ন্যাকস না হয় বিরিয়ানির প্যাকেট থাকবেই। চোখের ঝিলিকটা তো ওই কারণেই। নীলিমার কাছে তো আলাদিনের চেরাগ আছে। সে এসে এসে এসব খরচের টাকা দিয়ে যায়। ছেলে বলে কথা! সেদিনও তার ব্যাগের ভেতর এ রকম দুটি বিরিয়ানির প্যাকেট চারদিকে তার উপস্থিতি টের পাইয়ে ক্ষ্যান্ত হয়েছিল।

অপু বের হয়ে এলো, যখন বাকি একটা-দুটো ছেলের বের হওয়া বাকি ছিল শুধু। আকাশের এক কোণে কেমন গাঢ় ধূসর কালো মেঘ জমেছিল। অথচ ওটা মেঘের মাস ছিল না।

নীলিমা সাধারণত তাকিয়ে তাকিয়েই ছেলের আসাটা দেখে। মাঝখানের ডিভাইডারে আসবে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়েই। তারপর তার কাছে পৌঁছতে মুহূর্ত মাত্র। নীলিমার মনটাতে বিষণ্নতা ভর করেছিল। ছেলেটার বাবার সঙ্গে বিছানায় শুয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে। মাঝরাতে সে পাশের ঘরের আলুথালু বিছানায় এসে বাকি রাত পার করেছে। ঝগড়া বাড়তি হলেই লোকটা বৃহস্পতিবার অফিস শেষে বাড়ি ফেরে না। রবিবারে বিকেল-সন্ধ্যায় অফিস করে বাড়ি ফেরে। আজও নিশ্চয়ই এ রকমটা হবে। এ রকমভাবে উধাও হয়ে যাওয়াটা নীলিমার খুব অপছন্দের। কত রকমের কিছু হতে পারে, তার অথবা ওদের। ফোনটাও অফ করে ফেলে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলে কিভাবে হবে! এসব চিন্তা করতে করতেই সে গাঢ় কালো মেঘের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আনতে আনতেই দেখে অপু রাস্তায়। কালভার্ট রোড থেকে উল্টো দিকের রাস্তায় উঠে আসা দুরন্ত গতির পার্সেল ভ্যানটি তখন ফকিরাপুলের দিকে। ছিটকে পড়া চশমা আর ভাঙা মোবাইল কাছাকাছিই পড়ে ছিল।  

নীলিমা হাউমাউ করে কান্না, নীরবে চোখের জল ফেলা—কোনোটাই করে নাই। স্তব্ধ হয়েছিল সে। এগিয়ে আসা লোকেরা যখন স্কুটার ঠিক করে নিকটবর্তী প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, সে এক পলক দেখে নিয়েছিল। এ ছেলে বাঁচবে কিভাবে? বেরিয়ে আসা মগজের অংশ লোকজন কাপড়ে চেপে ঠেলেঠুলে ভেতরে ঢোকায়। সেই কাপড় মুহূর্তেই রক্তে ভিজে চুপচুপ হয়ে ওঠে। প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে ছেলেটা বেঁচে আছে কি না মরে গেছে, তা না দেখেই আবার পাঠায় ঢাকা মেডিক্যালে।

নীলিমার কোনো অনুভূতি ছিল না। ছেলের মগজ থেকে ক্রমাগত বিপুল রক্তের প্রবাহ তার রক্ত চলাচলকে স্থবির করে দেয়।

সব কিছু অবশ হয়ে আসতে আসতে একসময় সে শুধু টের পায়, এটা কি তাহলে মৃত্যু? এখন নীলিমা যে অবস্থায় আছে। নীলিমা জীবিত ছিল না।

ছেলের বাবা তো লাপাত্তা। নিয়মমাফিক যা হয়ে এসেছে এতকাল, সে তো রবিবার সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবে না।

ঘটনার পরপরই আত্মীয়-স্বজন মিলে অফিসে খুঁজে এসেছে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারে, রবিবারেও ছুটি নেওয়া। বাসার লোকজন জানে না, মোবাইল বন্ধ, সবাই বেশ অবাক হয়। বাবার কলিগরাও ছুটে আসে। এই বয়সের একটা তরতাজা ছেলের ঘটনা তো সহজে মেনে নেওয়া যায় না। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব—সবাই, যারা আবেগ ধরে রাখতে পারেনি, কান্নায় ভেঙে পড়েছে। নির্বিকার নীলিমাকে কেউ কেউ বলেছে কাঁদো, একটু মন খুলে কাঁদো, কষ্টটা কমবে। জীবিত মানুষ কাঁদে, মৃত মানুষ কাঁদে কেমনে?

বরফ, চা-পাতা ঢেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বারো ঘণ্টা আগের জীবিত ছেলেটা মৃত মানুষের খাটিয়ায় শুয়ে থাকে। ছেলেটার মৃত্যুর চেয়েও এখন জরুরি বিষয় হয়ে ওঠে ছেলের বাবাকে খুঁজে বের করে আনা। অলিগলি, এখান-সেখান তন্ন তন্ন করে অবশেষে বিশেষভাবে কলুষিত এক বন্ধুর পরিবারের লোকজনের মারফত ছেলের বাবাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তার আবেগটা ছিল বাঁধভাঙা। জীবিত মানুষ তো কাঁদতেই পারে। সে হাউমাউ করে কেঁদে লুটিয়ে পড়ে ছেলের লাশের পাশে। মাঝেমধ্যে বিলাপ করতে করতে নীলিমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘তুই দেইখ্যা রাখিস নাই, তোর সামনে দিয়ে ছেলে কেমনে মরে?’

যদিও সব কিছুর পর অপুর বাবার রাগ, কান্না একসময় নীরবতায় রূপ নেয় সময়ের ফেরে। লোকটা একদম পাল্টে যায়। কথা বলা, চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া—সব কিছুতেই কেমন একটা অন্যমনস্ক ভাব। পেনশনযোগ্য চাকরিতে পৌঁছতে এখনো মেলা দেরি। না হলে ভোরবেলায় উঠে সে পারলে অফিসেও যায় না। এ রকম স্থবিরতা কাটিয়ে অপুর বাবা বাসায় থাকলে নামাজের ওয়াক্তে নামাজ পড়তে মসজিদে অনেক সময় কাটিয়ে বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরে সে যখন সারা বাড়ি হেঁটে বেড়ায়, স্পস্টত বোঝা যায় যে সে ছেলেকেই খুঁজে বেড়ায়।  

হয়তো বা অপু, অপুর মা-বাবার গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত, আরো অন্য শোকাহত পরিবারগুলো যেভাবে শোক বয়ে বয়ে জীবন কাটায় সেভাবেই। কিন্তু মৃত নীলিমা একদিন জীবিত হয়ে ফিরে আসে।

এলোমেলো, সব কিছুই এলোমেলো। কয়েক মাস পর, অপু যাওয়ার পর। অপুর বাবা অফিসে। নীলিমার কেন জানি শরীর টেনে ঘর গোছাতে ইচ্ছা হলো। গোছাতে গোছাতে অপুর বাবার কাঠের ড্রয়ার, যেটা আগে সব সময় লক করে উনি অফিসে যেতেন, সেখানে চোখ আটকে যায় নীলিমার। আজ সেটা খোলা দেখে কেমন একটা বিস্ময় নিয়ে নীলিমা সেটা খুলে ফেলে। কাগজপত্র, কলম, ছোট টাওয়েল—এগুলো সরিয়ে যা পেল, তাতে সে হিম হয়ে বসে থাকে। অপু যখন  মারা যাচ্ছিল, তখন ওর বাবা...।   

সেদিনের পর থেকেই অপুর বাবাকে পুত্র হন্তারক হিসেবে ধরে নেয় নীলিমা। অপুর বাবা তাকে ঠকিয়েছে বলে কোনো দুঃখবোধ তার আগে-পরে কখনোই ছিল না। এ জীবনটা যে এক মেকি জীবন, তা সে জেনে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু এই ব্যাপারটার সঙ্গে অপুর মৃত্যুর একটা সম্পর্ক আছে। তার তা-ই মনে হয়। ওপরওয়ালা মানুষের পাপের শাস্তি যে কিভাবে দেয়! অপুর বাবা তখন কই ছিল, যখন আজরাইল এসে অপুকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে বলে তার ডানা মেলে বসেছিল। জিঘাংসা তাকে পাগল বানিয়ে ফেলে।   

সে জেনে বা না জেনে, বুঝে বা না বুঝে জমিয়েছে পাতার পর পাতা যত সব ওষুধের। যখন যার কাছে যেমনটা শুনেছে। অপেক্ষায় ছিল সেগুলোর জুতসই ব্যবহারের। নিজেও টেস্ট করে দেখেছে কোনটা বর্ণহীন আর স্বাদহীন।

এরই মধ্যে অপুর বাবা একদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়তে মসজিদে যাবে, দেখে আর উঠতে পারে না। পাশে শুয়ে থাকা নীলুকে উল্টো দিকের হাত দিয়ে ডেকে ওঠায়। নীলু এ পাশের হাত-পা নাড়াতে পারছি না। এরপর অপুর মা-বাবার জীবন আবার অন্য খাতে প্রবাহিত হয়। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। রাইট সাইড প্যারালাইজড। ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোকটা হয়ে গেছে। ওষুধপাতি আর ফিজিওথেরাপি দিয়ে যতটুকু সারিয়ে তোলা যায়।

‘নীলু নীলু’—অপুর মা যখন এদিকটার ঘরে পড়ে থাকে। নীলিমার ইচ্ছা হলে শোনে, না হলে না শোনার ভান করে পড়ে থাকে। অপুর বাবা ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেলে একপাশের হাত-পা ঠেলে জরুরি কাজ সারার জন্য দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। মাঝেমধ্যে একটু উল্টেপাল্টে পড়ে গেলে কিছু অঘটন ঘটলেও নীলিমা তাতে পাত্তা দেয় না। থাকুক, ওভাবেই থাক। সেদিন অপুর বাবা কেমন যেন চোখ-মুখ বিকৃত করেই নীলু নীলু বলে চিল্লাল। নীলু ভাবল, যমে বোধ হয় সত্যি ধরল। প্লাস্টিকের উত্কট গন্ধ এত দিনে নাকে-মুখে সয়ে গেছে। লোকটা কি রাগ করল নাকি? চোখ-মুখ ঠিকরে যেন রাগ বের হচ্ছে। মুখটার বিকৃত ভাব তার প্যারালাইসিসের আসল বিকৃতিকে উতরে গেছে। রাগ না অন্য কিছ,ু খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে নীলিমা টের পায়। লোকটা কাঁদে, অপুর বাবা কাঁদে। লোকটার এ রকম অসহায় কান্না নীলিমা কখনোই আশা করেনি।

‘নীলু নীলু, আমার বাঁচতে ইচ্ছা করে না। ছেলেটার লাশ কাঁধের মধ্যে নিলাম। ’ কোনো কারণে সে পরিপূর্ণভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। নীলিমা জানে, অপুর বাবা এটা পারবে না। যতই অপুর বাবা কান্নাকাটি করুক, নীলিমার মন টলবে না। দুর্বোধ্য একটা হাসি খেলে যায় তার ঠোঁটের ওপর দিয়ে। নীলিমা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে অপুর বাবার কাণ্ড। একটু সোজা, তারপর... তারপর কী! হ্যাঁ, তাই তো—লোকটা ভারসাম্য রাখতে পারছে না। কিন্তু সে নীলিমার সাহায্যও চাইল না। এবার লোকটার পুরনো বিল্ডিংয়ের শক্ত মেঝের ওপর পড়ে যাওয়া ঠেকায় কে? শরীরের সমস্ত ভার নিয়ে জিনিসপত্র ঠেলেঠুলে প্রচণ্ড শব্দে সে মাটিতে পড়েই যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ই নীলিমার কী জানি হলো, সে দেখল অপু দৌড়ে আসছে, আরামবাগের রাস্তায়, এনডিসির গেট থেকে—‘বাবাকে ধরো। ’

সে রাত ঘুমাতে পারেনি নীলিমা। তার ভেতরে জমে থাকা প্রতিহিংসার এত সহজ-সরল সমাধান হয়ে যাবে, এটা তার ব্যর্থতা, আর জমে থাকা দুঃখবোধকে কোনোভাবেই প্রশমিত করতে পারে না।

অনেক ভোরে সে প্রতিদিন গ্যাসের চুলায় বড় হাঁড়িতে গরম পানি চড়ায়। সেদিনও উঠে ম্যাচের কাঠি জ্বালায় আর নেভায়। এভাবে জ্বলা আর নেভায় একসময় ছোট রান্নাঘরে দাউ দাউ আগুন জ্বলে। বড় শপিং মলের ব্যাগের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা অপুর বাবার সিলছাপ্পর মারা এয়ার টিকিটের কপি, হোটেলের বিল পরিশোধের টাকা, ড্রিংকসের বোতল। বিশেষভাবে কলুষিত বন্ধুটিও ছবিগুলোতে আছে। অপুর বাবার মুখ যেন বিগলিত হাসি আর কামনার তাড়নায় উছলে উঠছে, বক্ষসংলগ্না মেয়েটির সান্নিধ্যে।

অপুর শরীরটা যখন নিথর হয়ে আসছিল, ঠিক সেই সময়টায়। নীলিমা হিসাব কষে মিলিয়ে দেখেছে বারবার।

চোখের সামনে সেসব বহু দিনের জমিয়ে রাখা জিনিস পুড়ে যেতে দেখে নীলিমা। অপু মারা যাওয়ার পর সে কাঁদতে পারেনি। আজ সে সশব্দে প্রাণ খুলে কাঁদে। ওদিকে অপুর বাবার বিছানায় অন্য এক অপু ঘুমায়। সে এসবের কিছুই টের পায় না। নীলিমার হাতে ধরা প্রায় দ্বিখণ্ডিত মোবাইলটি, সেটির পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়, কি যায় না...।


মন্তব্য