kalerkantho


অনুচ্চারিত বোঝাপড়া

সুশান্ত মজুমদার

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অনুচ্চারিত বোঝাপড়া

কোনো কোনো হিতকামী, কখনো আমার মতো একই ধ্রুবের পথিক হৃদ্যস্বরে মুখ নামিয়ে আনেন—ব্যাপার কী, আপনার লেখা তো দেখি না? অতীতে এমন নিরীহ জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছেন বহু লেখক, ভবিষ্যতেও হবেন। যতই দেখাদেখি বলা হোক, লেখা আদতে পড়ারই বিষয়।

নিয়মিত লেখা ছাপা হতে না দেখে লেখক বুঝি লেখা ছেড়ে দিয়েছেন বা ফুরিয়ে গিয়েছেন এই সংশয়ে পাঠক থেকে প্রশ্নটা আসে। বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত লেখা দেখে আমরা ধরে নিই, লেখক সৃষ্টিশীল, সক্রিয় সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী। কেউ দ্রুত ও বেশি, কেউ ধীর ও কম লিখতে পারেন। ক্ষমতার তারতম্য আছে। প্রচার আছে যে বেশি বেশি লেখার কারণে লেখা দুর্বল, কম লেখার জন্য যত্নে লেখা ভালো হয়। মান নির্ণয়ে বা সাহিত্যের গুণাগুণ যাচাইয়ে উল্লিখিত বানোয়াট মাপকাঠি কস্মিনকালেও কাজে আসে না। শিল্পমূল্য নিরূপণে একটা অসার ধারণামাত্র। দৈনিক পত্রিকার সাময়িকী, কী সাহিত্য পত্রিকায় ছাপার হরফে লেখা না দেখে লেখক এখন নিষ্ক্রিয় বা তাঁর সৃৃষ্টিতে ভাটা, এমন নির্দোষ অনুমান পাঠক করতেই পারেন।

লেখা দেখতে না পেয়ে প্রশ্ন বা কৌতূহলের মুখোমুখি লেখক এটা তো উপলব্ধি করতে পারেন মুষ্টিমেয় হলেও লেখার পাঠক তিনি পেয়েছেন।

নচেৎ তাঁর লেখার অনুপস্থিতি নিয়ে আরেকজনের জানার আগ্রহ কেন হবে! সংযমী, সৃজনীশক্তির অধিকারী কখনো লেখা ছেড়ে দেন না। তাঁর মনে বিষয় যাতায়াত করে, চিন্তায় তা ঘনীভূত হয়। লেখকের পার্থিব জীবনের অবসান না হলে কখনো না কখনো সব জটিলতা ভেঙে তাঁর কলমের নবাঙ্কুর জেগে উঠবেই।

২.

পত্রিকায় লেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধারালো একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়-বিষয়ে বিপত্তির মতো আছে কিছু? লেখার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে মারাত্মক কোনো গুপ্তঘাতক। গোপন ও অন্তর্ঘাতী ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন স্তরের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লেখা যদি চ্যালেঞ্জ করে থাকে। হায় পোড়া দেশ; আর পরিত্রাণহীন শর্তে আটকানো লড়াকু লেখক। লেখার বিষয়ে ফাঁকফোকরের রাজনীতি, দল, সরকার, ধর্ম প্রসঙ্গে মোটা বা পাতলা দাগে বাঁকা কথা ছড়িয়ে আছে কি না। লেখা পড়ে এই বুঝি মনের মরিচা মুছে পাঠক নিজের বিবেচনা প্রস্তুত করে ফেলে। পাঠক ধরে ফেলে ওপরমহলের চালাকি, রাজনীতির নামে সংঘবদ্ধ স্বার্থান্ধ ও ভণ্ডদের অপতত্পরতা এবং ধর্মের অসারত্ব। প্রশ্নটা আবার সব লেখককে করা হয় না। বিশেষ বিশেষ লেখকের জন্য এটা বরাদ্দ।

মনোজগতের নির্মাণ-ভাঙন, অধীত জ্ঞানসম্ভারের কারণে লেখক থেকে লেখকের চিন্তা-চেতনায় রকমফের আছে। এই পার্থক্য চূড়ান্তভাবে লেখকের রচনাশৈলীকে প্রভাবিত করে। আমরা বহু লেখকের গল্প-উপন্যাস-কবিতা অনায়াসে সাধারণ চোখে পড়ে যেতে পারি। কোনো কোনো লেখক সাধারণ করে অতি সাধারণ বিষয় স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করতে পারঙ্গম। আবার কোনো লেখকের লেখার মর্ম উদ্ধারে মাথা খাটাতে হয়। অধ্যবসায়ী পাঠকই লেখকের কাম্য। প্রসঙ্গটি শেষাবধি লেখকের বিষয় প্রকাশের কলাকৌশল বা আঙ্গিক এবং গদ্যে গিয়ে স্থির হয়।

সেলফ সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বরচিত নিষেধাজ্ঞা—যা-ই বলি তা লেখকের সৃজনশীলতার ওপর স্বহস্তে কুঠারাঘাত। উপর্যুপরি আপসে কালক্রমে লেখক হয়ে দাঁড়ায় স্টাবলিশমেন্টের দাস। স্টাবলিশমেন্টবিরোধী কত লেখক নিজের সৃষ্টি ক্ষমতার চারপাশে পাঁচিল তুলে পুরোপুরি ক্রীতদাস হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, লেখক নিজের লেখা শাসন করেন কখন? একাত্তরে জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধকালে কোনো লেখকের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণ্যহত্যা, চরম যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রকাশ্যে গল্প-কবিতা লেখা ছিল অসম্ভব। দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসরদের মারণযজ্ঞ বিষয়ে পত্রিকাগুলো মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হয়েছে। নির্বিকার হত্যাকাণ্ডের হিংস্র সময়ের মধ্যে লেখক তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তবু গোপনে সক্রিয় ছিলেন কোনো কোনো কবি ও লেখক। কবি শামসুর রাহমানের কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ঘুরে কলকাতার পত্রিকায় ছদ্মনামে ছাপা হয়েছে। জাহানারা ইমামের অবিস্মরণীয় জাতির গৌরবগাথা ‘একাত্তরের দিনগুলি’র বহু ঘটনা ডায়েরিতে গোপনে লেখা ছিল। ধরা পড়ার ভয়ে তাও সাংকেতিকভাবে তিনি লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক একজন লেখক নিজের লেখার ওপর নিজে কেন সেন্সরশিপ আরোপ করবেন? একটাই কারণ, আজ অবধি লেখক অনুকূল বাস্তবতা, মুক্তচিন্তা ও ভিন্নমত প্রকাশের উপযোগী কোনো পরিবেশ পাননি। পরনির্ভরশীল, বিবদমান, নৈরাজ্যময় রাষ্ট্র জীবন-জীবিকায় ক্লান্ত শিল্পী-সাহিত্যিকদের জন্য অন্তত মেধা ও প্রতিভা বিকাশের সহায় অবস্থান রচনা করতে পারেনি।

উত্তরাধিকারভাবে বাংলাদেশ কতগুলো সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাধি উপহার পেয়েছে। প্রথম ও প্রধান হচ্ছে গণতন্ত্রচর্চার রুদ্ধ পথ। একাধিকবার সামরিক শাসনের কবলে পড়ে চুরমার হয়েছে প্রতিটি ইনস্টিটিউশন। ব্যক্তির উত্থান যেখানে নেই সেখানে রুগ্ণতাই হচ্ছে স্বাস্থ্য। মেরুদণ্ড হারানো অসম্পূর্ণ মানুষের নামের কাঠামো তাই বুট ও রাইফেলের সামনে নতজানু, ভক্তিতে গদগদ হয়ে থাকে। শিল্প-সাহিত্য তো সামান্য চোখ রাঙানিতেই নেতিয়ে পড়া ছিঁচ-কাঁদুনের সারাৎসার। কত শাসন এলো গেল—রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী-শাসিত সরকার হলো। কত কথা ও প্রতিশ্রুতির বুনুনি, ধোঁয়াটে স্বপ্নের বিন্যাস, লক্ষ্য ও মুক্তির নামে উঁচু স্বরগ্রাম। কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য এ দেশের কোথাও যথার্থ কোনো ভুবনডাঙ্গার খোঁজ মেলেনি। এ দেশে লেখকদের ভবিতব্যই বুঝি অগণতান্ত্রিক, অস্থির, অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রতিনিয়ত জীবনযাপন। যে দেশে সৃজনশীলতার জন্য লেখকদের উপযুক্ত নির্মল শ্বাস গ্রহণের আবহ নেই, সে দেশে মানসম্পন্ন শিল্প-সাহিত্য রচিত হতে পারে না।

তাহলে কি লেখক হাতে কলম জমিয়ে অপেক্ষায় থাকবেন তাঁর প্রেরণা উপযোগী সময় ও পরিবেশের জন্য? লেখার মতো বিষয় যখন লেখকের করোটির নিচে প্রবল চাপ দিতে থাকে তখন কাগজের বুকে অক্ষর ফুটিয়ে তোলা ছাড়া আর কোনো উদ্ধার নেই। লেখা মানে নিস্তারহীন এক যুদ্ধ। এখানে লেখক একা—তাঁর উপনিবেশে সে একা। কোনো বিপত্তি প্রতিকূলতা তাঁর একান্ত অন্তর্প্রদেশের রক্তক্ষরণকে নিবারণ করতে পারে না। আশার কথা, শত সীমাবদ্ধতা, অপ্রত্যাশিত ভ্রুকুটি, ক্ষোভ, গ্লানি সহ্য করেও আমাদের লেখকরা লেখালেখিতে একনিষ্ঠভাবে মগ্ন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ফেরারি’ গল্পের হানিফ ডান হাতে শক্ত করে কোরআন শরিফ ধরে রাস্তায় হাঁটে। পাশের ভিক্টোরিয়া পার্কের কালচে সবুজ আভা মেশানো ঠাণ্ডা হাওয়া একটা ঝাপটা দিলে হানিফের বুকের খাঁচা দুলে ওঠে। বাড়ির সামনে এসে মিলিত মানুষের চিত্কারে সে তছনছ হয়ে যায়। মহল্লার আরো লোকজন এসে পড়ে। সম্মিলিত শোকধ্বনি পুলিশ সার্জেন্টের পা হয়ে সলিড একটা লাথি মারে হানিফকে। তার অবসন্ন আঙুলের ফাঁক দিয়ে কোরআন শরিফ গড়িয়ে পড়ে। গল্পে ধর্মগ্রন্থের এই পড়ে যাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ফেরারি’ গল্পটি প্রথমে ছাপাতে সে সময়ের পত্রিকা সাহস পায়নি। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর-এ’ গল্পটি অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থটির কম্পোজ চলাকালে কম্পোজিটরও ওই ধর্মগ্রন্থ হাত থেকে পড়ে যাওয়া নিয়ে আপত্তি করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন অনড়—আদৌ তিনি গল্পটি পরিবর্তন করেননি। লেখকের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাস প্রথমে প্রগতিশীল নামে বহুল প্রচলিত একটি দৈনিকের সাহিত্য পৃষ্ঠায় ছাপা শুরু হয়। তখন দেশে সামরিক শাসন। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ সামরিক শাসনবিরোধী বিষয় হওয়ার কারণে কয়েক কিস্তি ছাপার পর বন্ধ হয়ে যায়।  

হাসান আজিজুল হকের ‘খনন’ গল্পে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের খাল কাটা বিপ্লব নিয়ে যথেষ্ট ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আছে। খাল কাটা হলে গ্রামের চেহারা বদলে যাবে—নদীর দুই পারের বিরান মাঠে আবাদ হবে, তখন হেসেখেলে দুটি ফসল হবে। গল্পের চরিত্র শাহেদের প্রশ্ন, খালে পানি এলে, মাঠে ঠিকমতো আবাদ হলে যে ফসল হবে তার মালিক কি যারা কাজ করছে তারা হবে? উত্তর নেই। শাহেদের উত্তর আছে—সরকারি খরচে জমির মালিকরা নিজেদের জমির জন্য সেচের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। যারা নদী কেটে খাল তৈরি করছে, তারা জমিরও মালিক নয়, ফসলেরও মালিক নয়। গল্পের এই বাস্তবতা নিয়ে ওই যে খোঁড়া সমালোচক, তাঁর স্বরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ‘হাসানের রাগ আমরা দেখতে পাচ্ছি একটি দলের ওপরেই। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের স্বাধীনতার সোল এজেন্ট দলটির যে অপরাধকীর্তির অবধি ছিল না, তাদের কোনো কুকীর্তির সবিস্তারে দূরে থাক কোনো কাহিনী তার গল্পে আসন জুড়েনি। ’ কী হাস্যকর অভিযোগ! এর সম্পর্কে গল্প লিখলে ওর সম্পর্কে কেন লেখা নয়?

এত পরিচিতের থেকে উদাহরণ দিয়েছি। দেশের কত লেখকের লেখা প্রচ্ছন্ন নিষেধের কারণে দরজা থেকে ফিরে এসেছে। লেখক নতুন আগ্রহে উচিত প্রসঙ্গের দিকে এগিয়েছেন। মধ্য কিছু আছে? আছে লেখকের অনুভূতি ও দেখার অনুভব। আছে মানুষের এলোমেলো অগোছালো হৃদয়ের ময়লা, আছে মানব ভাগ্যের দুর্মর উত্থান। আছে প্রথাসিদ্ধ, কখনো প্রথাবিরুদ্ধ আশ্চর্য সব জীবন নিংড়ানো উচ্চারণ। আছে লেখকের পর্যবেক্ষণ ও অনিঃশেষ মানবমুখিতা। আছে মানুষের মানবিক ক্ষুধা ও পাশবিক ক্লেদ, আছে যুগপৎ হর্ষ ও বিষাদের স্বাদ। ব্যক্তি-লেখক ও সমাজ-ব্যক্তি ঘনিষ্ঠ সহোদর। হ্যাঁ, কোনো সাহিত্য জীবনস্রোত বিচ্ছিন্ন নয়।


মন্তব্য