kalerkantho


দেখ না মন ঝাঁকমারি এই দুনিয়াদারি

আজাদুর রহমান

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দেখ না মন ঝাঁকমারি এই দুনিয়াদারি

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

‘আপন সাধনকথা/না কহিবে যথাতথা/আপনার আপনি তুমি হইবে সাবধান’—বাউল সাধনার এই যখন সাবধানবাণী, তখন তাদের খোঁজাখুঁজি করতে হয় কেরোসিনের কুপি হাতে করে। কারণ টর্চলাইট হাতে নিয়ে গেলে তারা সরে দাঁড়াবে, কেরোসিনের ডিবে হাতে করে গেলে তার থেকে যত ধোঁয়াই বের হোক না কেন, তাদের আকর্ষণ করবেই।

টর্চলাইটে তারা অনভ্যস্ত। ওতে তাদের চোখ ঝলসায়। কেরোসিনের ডিবে ওদের নিজেদের জিনিস। অবশ্য যাদের টর্চলাইটই সম্বল, তাদের পথ শহরের দিকে। গ্রামের দিকে, জনসাধারণের দিকে গেলে তাদের ঠিক হবে না। লালন গানের বেশ কতক ভাব ও ভুবন আছে। জানতে গেলে সহজ হতে হয়। যেতে হয় ডিবে হাতে করে। আমরা সাধারণরা সুরের মাদকতা, ভাবের ভাবালুতায় বুঁদ হয়ে যাই। মর্জিমতো মানে খুঁজি। কিন্তু সাধকরা শুধু গানেই মত্ত থাকেন না; বরং মানে নিয়ে তাদের কর্ম চলে, চলে সাধনভজন। গানের সাধনগত তত্ত্বকথাই হলো তাদের পরমবস্তু। আসলে লালন গানে এমন এক মেধামণ্ডিত ভুবন নিহিত থাকে যে মর্মভাবকে নানা দিক থেকে উপলব্ধি করা যায়।

কুষ্টিয়া যেন লালনের শহর। পথে নামলেই বাউলের দেখা মেলে। একেক বাউল আবার একেকভাবে কথা তোলেন। তাঁদের ভাবভঙ্গিও অন্য রকম। গভীর কথাকে তাঁরা এমন অবলীলায় এবং সহজ স্বরে বলতে পারেন যে সেসব নিগূঢ় কথাবার্তা ঠিক তালমতো ধরা যায় না; বরং উদাসী হয়ে এক মনে শুনতেই ভালো লাগে। কুমারখালীর নন্দলালপুরের ফকির শরাফউদ্দিনের কথাই ধরা যাক। শরাফশাহ্ মর্জিমাফিক কথা বলেন এবং বলতে বলতে একসময় কথার খেই হারিয়ে ফেলেন, তখন হঠাৎ করেই লালন চলে আসেন—‘উনি হলেন সেই, মানুষরূপে এসে অবতার করলেন। সেই মানে সেই রাজ, তাকে সামনে রেখে সে জ্ঞানের রাজা। সিরাজ সাঁই বলে কোন লালন নাই। লালনের জন্ম নাই, উনি ভিন্ন মানুষ। এখন একেকটা মানুষ একেকটা মন্তব্য করছে। বহু কিছু বিভ্রান্তি করছে। এসব কথা বলতে গেলে ছোট জ্ঞানে আমাদের কষ্ট হয়। আমার আব্বায় ক’ছে সাঁইজির আইনডা যেন ভ্যারাইটিজ না হয়। ’ লালনকে ঘিরে সাধারণের পাশাপাশি একান্ত ভক্ত কিংবা ভাবশিষ্যদের মধ্যেও সমান কৌতূহল বিদ্যমান। ফকির লালন আজও তাই এক রহস্যময় সাধক পুরুষের নাম। লালন কে, কী তার জন্মপরিচয়, লালন হিন্দু না মুসলমান কিংবা ব্যক্তিজীবনে তিনি স্ত্রী সম্ভোগ করতেন কি না ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক মানুষের আগ্রহ বেড়েই চলেছে। কৌতূহলের অন্যতম কারণ, লালন সম্পর্কে প্রাপ্ত অনেক তথ্যই নিশ্চিত করে বলা যায় না; বরং লালনের খোঁজ করতে গেলেই রহস্যময় হয়ে পড়ে প্রকৃত ঘটনা। জীবদ্দশায় তিনি যেমন প্রচার চাননি বা পাননি, তেমনি ধর্মাধর্মের প্যাঁচে পড়ে অনেকটা গোপনেই চলেছে তাঁর সাধন-ভজন। তা ছাড়া প্রচলিত ধ্যান-জ্ঞানের বাইরে এসে অখণ্ড মানবসমাজের কথা যাঁদের নিয়ে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তাঁরাও উঁচুদরের কেউ ছিলেন না। ফলে লালনের জন্মবৃত্তান্ত, জাতপাত ইত্যাদি কিছুই ভালো করে জানা যায়নি। সে কারণে ব্যক্তি লালনকে নিয়ে যাঁরাই গবেষণা করতে গেছেন, তাঁরাই ফাঁপড়ে পড়েছেন এবং পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

লালনের যা কিছু তা শুধু তাঁর গানের মধ্যেই বিদ্যমান। পদাবলিতেই মূলত মিশে আছেন তিনি। ফলে সমকালেও যাঁরা তাঁকে সন্ধান করতে যাচ্ছেন, অগত্যা তাঁরাও বারবার অর্পিত হচ্ছেন তাঁর গানের কাছেই। লালন গানে এমন এক ভাবুক মনোভাব এবং সরলতা আছে, যা শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত—নির্বিশেষে সবাইকে আকৃষ্ট করে। অতি সাধারণের পাশাপাশি মীর মশাররফ হোসেন কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো মহীয়ানরাও পদে পদে আবিষ্ট হয়েছেন এ মরমি সাধকের সাধনগীতির ওপর। শুধু গান সংগ্রহ কিংবা সংকলন নয়, বাউলদের প্রতি আলাদা দরদ এবং শ্রদ্ধা পোষণ করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে কারণে গ্রাম্য বাউলরাও কোনো কোনো সময় মর্যাদাবান হয়ে উঠে এসেছেন তাঁর কলমে—

...তাঁরা (বাউলরা) গরিব। পোশাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝবার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় কত সহজভাবে সহজভাবে তারা বলতে পারত।

লালনপথ গুরুবাদী। বাউলধর্মের আচার-আচরণ, কর্মকরণ, সাধনভজন—বলতে গেলে পুরোটাই গুরুশিষ্য পরম্পরায় প্রবাহিত হতে থাকে। পরম্পরার ধারা ধরে একজোড়া গুরু-শিষ্যকে পার করে এগিয়ে গেলেই লালনের দেখা মেলে। সুতরাং লালন কে, কী তাঁর ধর্মমত, জীবন-প্রণালী ইত্যাদি জানতে অনিবার্যভাবেই আমরা সমর্পিত হই লালনের গান ও রেখে যাওয়া বাউলসমাজের ওপর।

ফকিরি ভাষায় সাধারণ মানুষ হলো আউল। আউলরা গুরুদীক্ষা পেয়ে বাউল হয়। বাউলের কোনো গ্রন্থ নেই, বাউল একটা টাইটেল, অন্য কথায় সর্বকেশী; তাঁরা সন্ধানে চলেন—হাওয়ার সন্ধান। বাও হলো বাতাস আর উল মানে সন্ধান। দৌলতপুরের শ্যামলা বাউল শফি মণ্ডল যেমন বললেন, ‘বাউলরা বাতাসেরই সন্ধান করেন। বাতাসের মধ্যে অনেক মহৎ আবিষ্কার যেমন আছে, তেমন মহৎ আত্মাগুলো বাতাসেই বিদ্যমান থাকে। আমরা তো নেটওয়ার্ক জানি না, তবে যাঁরা কল্যাণ চিন্তা করছেন, তাঁরা সবাই বাতাসের মধ্যেই বিরাজিত আছেন। ’ এক-দুই কথায় বাউলকে সংজ্ঞায়িত করা কষ্টকরই বটে। সে যা-ই হোক, হাওয়ার সাধনায় নারীর অবদান অপরিহার্য। সাধিকা ছাড়া সাধকের সাধনা পূর্ণ হয় না—

ঘরে বাইরে একই মন/তবে হবে গুরুর দরশন।

মূলত সাধুসঙ্গিনী তথা সেবাদাসীকে নিয়েই শুরু হয় যুগলসাধনা। সেবাদাসীরা সাধনার ব্যাপারে সর্বদা চেতন থাকেন বলে তাঁরা চেতনগুরু।

কোথা আছে রে সেই দিন দরদি সাঁই

চেতনগুরুর সঙ্গ লয়ে খবর কর ভাই

সাধনার চার স্তর—স্থূল, প্রবর্ত, সাধক ও সিদ্ধি। চালপানি দিয়ে পাঠ শুরু আর খেলাফতে শেষ। খেলাফত গ্রহণকে সাধুরা ভেক নেওয়া বলেন। চালপানি নিয়ে শিষ্য গুরুকার্যে মনোযোগী হন এবং গুরুর বাতলে দেওয়া পথে পরম ভক্তি সহকারে চলতে শুরু করেন। কারণ গুরু নামের সুধাসিন্ধুতে বিন্দুরূপে পান করলেই দীনবন্ধু মেলে। লালনকথায়—যারে (গুরু) ভাবলে পাপীর পাপ হলে দিবানিশি ডাকো তারে। সাধক হতে গেলে চাতকস্বভাব থাকতে হবে। কবে অমৃত পাওয়া যাবে, সেই আশায় বসে থাকতে হবে। আর গুরুর কাছেই জানা যায় চাতকস্বভাব।

খাঁচায় যাতে বদ হাওয়া না লাগে, এ জন্য শফি প্রভুর নাম নিয়ে শ্বাস নেন এবং কলব পরিষ্কার রাখার জন্য দমে দমে হরদম আল্লাহ্র নামে জিকির করেন। শিষ্যভেদে কলেমা বা মন্ত্র যা-ই হোক, গুরু শিষ্যকে মানবধর্মের নানা কর্মকরণ পালন করতে বলেন এবং শিষ্যের কার্যধারা পর্যবেক্ষণ করে সময়ে সময়ে আদেশ-উপদেশ দিয়ে থাকেন। ফকিরি ভাষায় এ হলো ‘চক্ষুদান’। সাধু জনমটা শিষ্যের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার। পূর্বসুকৃতির পাওনা না থাকলে সাধু হওয়া যায় না। সাধু হওয়া তাই এক জনমের কাজ নয়—

থাকিলে পূর্বসুকৃতি/দেখিতে শুনিতে হয় গুরুপদে মতি।

যাঁরা বস্তুরক্ষায় মনোযোগী এবং ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হন, কেবল তাঁরাই এগিয়ে যান। এরপর সিদ্ধের চার উপস্তরে রসরতির যোগে চলে প্রেমসাধনা। খেলাফত বা ভেক গ্রহণ এসব সাধনপথাদির উচ্চপর্যায়ের দীক্ষানুষ্ঠান। এ পর্যায়ে গুরু-শিষ্যকে বীজমন্ত্র দেন এবং সাধুবৃত্তির রীতিনীতি ও শরীরবৃত্তীয় নানা কৌশল সম্পর্কে প্রাকটিক্যাল জ্ঞান দান করেন, যা তাঁরা কখনোই প্রকাশ করেন না। দীক্ষা-শিক্ষার সেকশনে এসব মন্ত্র শিষ্যের কাছে সারা জীবনের জন্য অমূল্য বাণী হয়ে থাকে।

সাধুরা সন্তান উত্পাদন থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের বিশ্বাস, সন্তানের মাধ্যমে পিতার পুনর্জন্ম হয় এবং তাঁর আত্মা পৃথিবীতেই রয়ে যাওয়ায় আত্মার মুক্তি হয় না।

লালন নিজেও নিঃসন্তান ছিলেন। খেলাফত নেওয়ার আগে কোনো কারণে সন্তান হলেও খেলাফত গ্রহণের পর তাঁরা কেউ আর সন্তান নেন না। এ রকম জন্মনিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক কারণ হলো—তাদের শারীরবৃত্তীয় আচার পদ্ধতিগতভাবেই ভিন্নতর। দীক্ষাগ্রহণকালে গুরু-শিষ্যকে গুরুমন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে কিভাবে রতিযোগ সাধন করে রতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বা দেহের ভেতরে পুনঃ শোধন করা যায়, তা শিখিয়ে দেন। রতিসাধনের এই গুপ্ত কলাকৌশল পরবর্তী সময়ে কেবল গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রবাহিত হতে থাকে। বিশেষ গোপনীয়তা এবং পরম্পরা বিষয়টি থাকার ফলে অনুসারী ছাড়া অন্যরা কেউ এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানতে পারেন না।


মন্তব্য