kalerkantho


প্রদর্শনী

চিত্রকর্মে বিবিধ সুরের ধারা

খান মিজান

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চিত্রকর্মে বিবিধ সুরের ধারা

শিল্পী সুরজিৎ রায়

এই একটি জিনিস, শিল্পকর্ম—যার মাধ্যমে দেখা মেলে দেশ ও বিশ্ব। একই সঙ্গে দৃশ্যমান হয় নানা দেশের নানা জীবনের বাস্তবতা ও স্বপ্ন-কল্পনার প্রতিচ্ছবি। ব্যক্তির নানা সংকট ও সম্ভাবনা, তার ভালো-মন্দ ভাবনার প্রকাশ। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের শিল্পীসমাজের সামষ্টিক শিল্পকর্ম দর্শনে আঁচ করে নেওয়া যায় ওই অঞ্চলের মানুষের অভিব্যক্তি।

বেশ কয়েকটি দেশের শিল্পীসমাজের জোগাড়যন্তর তুলে ধরায় মধ্যস্থতা করে আসছে ফোকাস বাংলাদেশ। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। ‘সেকেন্ড টিউন অব আর্ট’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের ২৫ জন শিল্পী। ভারত থেকে রয়েছে ২০ জন শিল্পীর চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য। রয়েছে থাইল্যান্ডের দুজন শিল্পীর কাজও। তবু প্রদর্শনীতে মূলত দুই বাংলার শিল্পীদের মিলনমেলার আমেজ দৃশ্যমান।

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস বলে, আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলের শিল্পচর্চা আর প্রাচীন ভারতবর্ষের যেকোনো প্রান্তিক ভূখণ্ড থেকে উৎসারিত শিল্পকর্ম পৃথক হলেও আত্মিকভাবে তা একসূত্রে গাঁথা।

নানা ঐতিহাসিক ঘটনার পরম্পরায় আমাদের ভেতরে, বিশেষ করে দুই বাংলায় রয়েছে আত্মিক ঐক্য।

যে শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, তাঁরা বেশির ভাগই বয়সে নবীন। তবু তাঁদের যে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে বস্তুপৃথিবীর বৈচিত্র্য অনুভব করার ক্ষমতা রয়েছে, তা স্পষ্ট। তাঁদের কাজে প্রচলিত মাধ্যমের পাশাপাশি নতুন শিল্পমাধ্যমকে এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও লক্ষণীয়। প্রদর্শিত অনেক চিত্রকর্মে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ও প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। একই দৃশ্য ভাস্কর্যেও।

সেখানে বাদ যায়নি সাম্প্রতিক নানা ঘটনাজাত মানুষের সংক্ষুব্ধতা আর অন্তর্গত রক্তক্ষরণ। শিল্পী মৌপিয়া চক্রবর্তী ছবিতে সমাজের একটি শ্রেণির ভোগবাদী জীবনের নানা অনুষঙ্গ কিংবা মোহাম্মদ রবিনের নেশাগ্রস্ত জীবনের মরণব্যাধি দর্শনে যে প্রতিক্রিয়া তোলে, শিলা এশা জাবিনের ছবির ফিগারটি কি সেই প্রতিক্রিয়াকে সাহচর্য করে হেঁটে চলেছে কোনো এক ভবিতব্যের দিকে! কিংবা রজত শুভ্রর ছবিতে প্রসারিত মেঘমালার নিচে পত্রহীন গাছের ডালে ঝুলে এক জোড়া শুকনো পাতার মর্মর মর্মার্থতার মধ্য দিয়ে কোনো অনন্তলোকের উৎস সন্ধান!

অন্যদিকে শিল্পী শহীদ হোসেন, ভারতীয় শিল্পী তাপসী দাস আর শুক্লা ভট্টাচার্য এবং থাইল্যান্ডের শিল্পী পোল্লায়াত সামিদির কাজে শিল্পীমনের অন্তর্গত ভাবনা প্রকাশ পায় বিমূর্ত চিত্রভাষায়। তাঁদের প্রত্যেকের কাজে সংগীতের মতো ফর্ম আর রং চিত্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ দুই উপকরণের বিন্যাস আবেগের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠা করে। শিল্পী কাওসার হোসেন, লায়লা, লায়লা আঞ্জুমান আরা, মিন্টু দে, সাগর বিশ্বাস, মোনালিসা, ঝুমি আর ভারতীয় শিল্পী অমিত কাপুর, বিশ্বজিৎ, গৌতম দাস, জয়ন্তর ছবির শিল্পভাষা প্রকৃতি থেকে আহূত। ফুল, বৃক্ষ, নৌকা—এসব উপাদানের ভেতর দিয়ে নৈসর্গিক বিস্ময় তাঁদের কাজে।

তপন কুমার, তনিমা, গোবিন্দ, মইয়ুর, রেজওয়ান, আবু সাইয়িদ, সমীর কুমার আর মার্কিন শিল্পী স্টিলা কানফিল্ডের জনজীবনের ছবি। নিজ নিজ দেশের নৈসর্গিক উপাদান নদীনালা, গাছপালা, খালবিল, বাড়িঘর, গ্রামীণ জনপদ—এসব দৃশ্যমান তাঁদের চিত্রমালায়।

অবয়বধর্মী ছবিও রয়েছে বেশ কয়েকজন শিল্পীর কাজে। তাতে সমান গুরুত্ব পেয়েছে নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে যুগল ফর্ম। তবে নারী চরিত্রগুলোই সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। নারীর নানামুখী বঙ্কিম ভঙ্গিমা চমৎকার কুশলতায় ছবিতে ধরা দেয়। ফিগারগুলো আকৃতিনির্ভর। কখনো একক, কখনো যুগল কিংবা ততোধিক ফিগার। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হিসেবে কোনো স্থাপনা, ভিডিও এবং পারফরম্যান্স আর্ট নেই। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এসব ধারায় করণকৌশলে ও কুশলতায় বর্তমানকে অতিক্রম করবে, সে সম্ভাবনাও যথেষ্ট উজ্জ্বল বলে মনে হয়।


মন্তব্য