kalerkantho


মস্তানের মানব পর্যবেক্ষণ

মঈনুস সুলতান

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মস্তানের মানব পর্যবেক্ষণ

অঙ্কন : মানব

লেখালেখির জিল করা খাতাটা নিয়ে টঙ্গিঘরে ঢুকতেই মস্তানের উৎসাহ রোদ লাগা কাটা ফুলের পাপড়ির মতো মিইয়ে আসে। তার সৃজনশীল রচনার শ্রোতা দুলাভাই বাদশাহ মিয়া ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে রীতিমতো ঘুমিয়ে পড়েছেন।

তাঁর নাক দিয়ে মিহিস্বরে বেরোচ্ছে ঘ-র-র-র আওয়াজ। সাইডটেবিলের তলায় হারিকেন লণ্ঠনটি দাবানো। তার পাশে ক্যাসেটপ্লেয়ারে বেজে যাচ্ছে মৃদু ধ্বনিতে মেহদী হাসানের গজল—‘এতনে আন্ধেরা...চেরাগ জ্বালা দেও। ’ চেয়ার টেনে বসতে বসতে মস্তান বাদশাহ মিয়ার গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট থেকে আলগোছে তুলে নেয় তিন শলা সিগারেট। দুটি ঢোলা ফতুয়ার পকেটে রেখে একটি জ্বালাতেই বাদশাহ মিয়ার ঘরঘরানি থেমে যায়। তিনি কোলবালিশ জাপটে ধরে ইজিচেয়ারে পাশ ফেরেন। মস্তান বুঝতে পারে—বাদশাহ মিয়ার পাকস্থলীতে ক্রিয়াশীল হচ্ছে মিটাংগি নামে পরিচিত কড়া ধাঁচের গুলি। মাত্রাও বোধকরি আজ সন্ধ্যায় একটু বেশি হয়ে গেছে। তা হোক, বেচারা দুলাভাই নানা রকমের রোগব্যাধি এবং হরেক কিসিমের বিষবেদনায় হামেশা ভোগেন। অপারেশনের পর থেকে পাকস্থলীর মাংসপেশি টাটিয়ে উঠলে মিটাংগির কুচকুচে কালো গুলির একটি-দুটি তিনি সেবন করেন, তাতে তাঁর ঝিমানির মতো আসে। এ নিয়ে মস্তান বিশেষ একটা দুশ্চিন্তা করে না। লেখক মানুষ সে, কামরার আধো অন্ধকার তার ভালোই লাগে। নিরিবিলিতে বসে সে চুপচাপ গোল্ডফ্লেক ফোঁকে।

মস্তানের মাথায় বাবরিটি কবিশোভন এবং তা আকারে তুমুল, তার থুতনিতে দীর্ঘ দাড়িও অজস্র। ভগ্নিপতির বাড়ির বাইরের টঙ্গিঘরের একটি কামরায় কিছুদিন হলো সে বসবাস করছে। তার রাতে নিদ্রা হয় অতি অল্প, খুব ভোরবেলা সে ক্যাসেটপ্লেয়ারে শুনে পূরবী মুখার্জির গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান—‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিলে দ্বার/আজি প্রাতে সূর্য উঠা সফল হলো কার। ’ মাঝে মাঝে সংগীতে উদ্দীপ্ত হয়ে মর্নিংওয়াকে বেরোয় সে। দীর্ঘ ঘাসে ছাওয়া আলপথ ধরে ক্রমাগত হাঁটলে শিশির লেগে ভিজে যায় তাঁর পায়জামার পায়া, তাতে বিঁধে অজস্র চোরকাঁটা।

মস্তান নামে বোনের বাড়িতে পরিচিত হলেও এটা তার নাম নয়। তার বড় আপার যখন বাদশাহ মিয়ার সঙ্গে বিবাহ হয়, তখন তার বয়স ছিল সাত কিংবা আট। কী কারণে জানি সে বাদশাহ মিয়ার নেওটা হয়ে পড়ে। তার অগোছালো কাপড়চোপড়, কখনো দুপায়ে অন্যমস্কতায় পরা দুটি ভিন্ন ধরনের স্যান্ডেল এবং সামগ্রিকভাবে আলাভোলা খাসলতের জন্য বাদশাহ মিয়া তাকে স্নেহ করে মস্তান ডাকেন। তার পিতৃদত্ত পোশাকি নাম ছিল আবু জাফর তাহের উদ্দীন মোহাম্মদ মোদাব্বের মজুমদার। তার রচিত একটি-দুটি গল্প যখন লিটলম্যাগাজিনে বেরোতে থাকে, তখন থেকে আকিকা করা নামটির দীর্ঘতা সম্পর্কে সে সচেতন হয়ে ওঠে। একবার একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় লেখা জমা দিতে গেলে রাশভারী সম্পাদক বাইফোকাল চশমার ফাঁক দিকে তাকিয়ে জানতে চান—‘নামটি কী আপনার একার?’ সে জবাব দিতে ইতস্তত করলে তিনি বিড়বিড়িয়ে আবার বলেন, ‘দেখে তো মনে হয় তিনজনের নাম একসঙ্গে জুড়ে আছে। ’ এসব ঝামেলায় বিব্রত হয়ে মস্তান কিংশুক হায়দার ছদ্মনামে লিখতে শুরু করে। কিন্তু কামিয়াবি আসে না। লেখাজোখা তার জন্য সহজ হলেও প্রকাশ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ঘনিষ্ঠজনদের যারা মনোযোগ দিয়ে তার লেখা পাঠ করেছে, তারা মন্তব্য করে—মস্তানের গল্পে কল্পনার আধিক্য থাকলেও বস্তুনিষ্ঠতার বড় অনটন। এ সমালোচনায় প্রভাবিত হয়ে সে সিদ্ধান্ত নেয়, ঢাকা শহর ছেড়ে কিছুদিন গাঁওগ্রামে এসে পর্যবেক্ষণ করবে মানবজীবন। তারপর বাস্তবতার মিশেল দিয়ে মুসাবিদা করবে কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ গল্প।

নিজের গ্রামের বাড়িতে যেতে মস্তান ঠিক সাহস পায় না। ওখানে তার বেজায় ব্যক্তিত্ববান বাবা বড় উৎপাত করেন। দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাস করার পর তিনি তাকে জোর করে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন পলিটেকনিক্যাল কলেজে। কিন্তু কারিগরি বিদ্যার সঙ্গে তার সাহিত্যিক মেজাজের মিশ খায়নি। ড্রপ-আউট হয়ে আওয়ারা ঘুরে বেড়াতে শুরু করলে বাবা তাকে তাঁর নিজস্ব ঠিকাদারি পেশায় যুক্ত করতে জবরদস্তি করেন। বিরক্ত হয়ে মস্তান বাবার তহবিল তছরুপ করে কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা ঝুলিয়ে চলে আসে ঢাকা শহরে এবং উদ্যোগ নেয় সার্বক্ষণিক সাহিত্যচর্চার। বাবার ক্রমাগত খিটিমিটি ছাড়া নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আরেকটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে—তার আলাভোলা স্বভাবের প্রতিশেধক হিসেবে যদি না বাবা তাকে ঘেটি ধরে গাঁয়ের কোনো কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেন। নানা দিক বিবেচনা করে অতঃপর মস্তান দুলাভাই বাদশাহ মিয়ার নিরাপদ আশ্রয়ে কিছুদিন বসবাস করে মানুষকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 বাদশাহ মিয়ার নিদ্রা টুটার কোনো সম্ভাবনা নেই দেখে মস্তান অধৈর্য হয়ে তার স্ট্র্যাপসিলের কৌটা থেকে মিটাংগির চিটচিটে একটি কালো গুলি তুলে নিয়ে টুপ করে গিলে ফেলে। মুখের তিতকুটে স্বাদ ফেরানোর জন্য সে আবার ধরায় একটি গোল্ডফ্লেক। সার্জারির পর থেকে দুলাভাইর শরীর ক্রমাগত কমজোর হচ্ছে দেখে সে চিন্তিত হয়। বাদশাহ মিয়া আজকাল ঘরবৈঠকী হয়ে পড়েছেন, বাড়ির বাইরে কোথাও যানটান না। হাটেবাজারে জমিজমায় তাঁর ধনদৌলত সর্বত্র ছড়ানো। তিনি ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন তাবৎ কায়কারবার। তার কিছু ছুটা ব্যবসা—যেমন অনেকগুলো রিকশা, ঠেলাগাড়ি ও বেবিট্যাক্সির মালিকানা থেকে প্রতিদিন হাতে আসে খুচরা টাকা-পয়সা। এ থেকে দরাজ দিলে তিনি মস্তানকে হাতখরচা দেন। তা দিয়ে প্রতিদিন দু-এক প্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগ্রেট কেনা যায়। বাদশাহ মিয়ার আড়তের সরকার পঞ্চমুখ মিষ্ঠান্ন ভাণ্ডারের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন, ওখানে বসে খিদা পেলে নিমকি-রসগোল্লার সঙ্গে এক পেয়ালা চা খেতে মস্তানের কোনো অসুবিধা হয় না। গ্রামের বাজারে মস্তান দুপুর ও বিকেলের পুরাটা কাটায় আদম সন্তানদের স্রেফ পর্যবেক্ষণ করে। কখনো ঘরে ফিরতে তার বেশ রাত হয়ে যায়।

মানব পর্যবেক্ষণের বিষয়টি তোড়েজোরে চললেও অন্যান্যবার এ বাড়িতে এলে দুলাভাইয়ের সঙ্গে যে ধরনের ফুর্তিফার্তা হতো, এসব আর আজকাল হয়ে উঠছে না। কিশোর বয়সে মাঝেমধ্যে বাবার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে মস্তান এ বাড়িতে এসে আশ্রয় নিত। তখন দুলাভাই তাকে নিয়ে হাওরে যেতেন তার আলঘরা তত্ত্বাবধান করতে। আলঘরা হচ্ছে—হাওরের নিরালা প্রান্তরে তার বুরোধানের জমিজমার মাঝখানে ন্যাড়ার চালের কুটিরবিশেষ। বাদশাহ মিয়া ওখানে শ্যালককে নিয়ে দু-এক রাত কাটাতে ভালোবাসতেন। তাঁর গান শোনার ধাত আছে। রাতে হাওরের মাছমারা মাইমলরা আলপথ ধরে মশালের আলো জ্বেলে চলে আসত আলঘরায়। বাদশাহ মিয়া তাদের কাছ থেকে জিওল মাছ কিনে মটকিতে রাখতেন। মেছো মানুষরা তাদের শোনাত হাওরে জাল ফেলার গান। তা শুনতে শুনতে শ্যালক-ভগ্নিপতিতে মিলেঝুলে সাবাড় করে দিতেন আস্ত এক ঠিল্লা তাড়ি।

ঘরবৈঠকী হয়ে পড়াতে বাদশাহ মিয়ার সাহিত্যের প্রতিও হালফিল আকর্ষণ বেড়েছে। দুপুরে শূলবিষ সামলানোর জন্য হামেশা তিনি কড়া ধাঁচের পেইনকিলার নেন। ওষুধটি সেবনে তাঁর মাঝে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা। টঙ্গিঘরের নিরালায় আগুপিছু পায়চারি করতে করতে শ্যালককে অনুরোধ করেন, ‘মস্তান, বিষাদসিন্ধু একটু পড়বা তুমি?’ সে জোশে বিষাদসিন্ধু পড়তে শুরু করলে—শুনতে শুনতে তিনি বসে পড়েন ইজিচেয়ারে। দ্রুত তার চোখে ঝিমানির মতো আসে। মস্তান সাবধানে বইখানা বন্ধ করে জানালা দিয়ে তাকায়। তখনই মানসচক্ষে দেখতে পায়—বারবাড়ির পুকুরপাড়ে খোঁড়া হচ্ছে একটি কবর। খালি পড়ে আছে সামনের ইজিচেয়ার। আর ভেতরবাড়িতে তার বড়আপা অজোরে কাঁদছেন। ব্যথিত হয় না সে। তবে দূরাগত এক ঘুঘুর বিষণ্ন ডাকের মতো মনের নিভৃতে তৈরি হতে থাকে কবিতার চরণ। বিস্মিত হয়, অনবদ্য এ শব্দগুচ্ছে মৃত্যুর ছোঁয়া প্রতিফলিত হচ্ছে না দেখে। কিছু একটা হারানোর অজানা আকুতিতে মন ভরে উঠলে ভাবে, উঠে গিয়ে কামরা থেকে ডায়রি নিয়ে এসে তাতে টুকে রাখবে চরণগুলো। ইজিচেয়ারে বাদশাহ মিয়ার শরীর থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। সে রংচটা শাল দিয়ে জড়িয়ে দেয় তাঁর গতর। কিছু একটা ভাবতে ভাবতে একটু সময় তব্দিল হয়ে বসে থাকে। আর দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া ঘুঘুর গাঢ় স্বরের মতো তার মন থেকে তিরোহিত হয় কবিতার চরণগুলো।

মস্তানের করোটিতে মিটাংগির আমেজ কুয়াশার মতো ধূসর অনুভূতি ছড়ালে বুঝতে পারে, দুপুরে হারিয়ে যাওয়া কবিতাটি ফিরে এসেছে আবার তার মনে। সে গল্প লেখার জিল খাতায় তা লিখে ফেলে খসখসিয়ে। ক্যাসেটের সবগুলো গান শেষ হয়ে গেলে উঠে তা পাল্টায়। তখনই খুট শব্দে ধড়মড়িয়ে জেগে ওঠেন বাদশাহ মিয়া। তিনি লণ্ঠনের শিখা উসকে দিয়ে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘কী লিখছ মস্তান, পড়বা না গল্পটা?’ সে লণ্ঠনটি কাছে এনে খাতা খুলে পড়তে শুরু করে। যাকে নিয়ে মস্তান গল্পটি লিখেছে, সে মানুষটি গায়গতরে সুস্থ-সবল হলেও মানসিকভাবে বেজায় বিপন্ন। গ্রামের বাজারেই ঘোরাফেরা করে সারা দিনমান। দিনের বেশির ভাগ সময় চুপচাপ থাকলেও তার মন ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে দুপুরবেলা। তখন চড়া রোদে দাঁড়িয়ে থাকে সে, চোখমুখ দারুণভাবে রাগী করে চারদিকে তাকায়। কাঠফাটা রোদে তার কেশবিরল চাঁদিতে জমে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। নিঃশব্দে বিড়বিড়িয়ে কী যেন জপে, তারপর খেপে উঠে অদৃশ্য কারো সঙ্গে মেতে ওঠে কুস্তিতে। মাঝেমধ্যে দেখতে না পাওয়া প্রতিপক্ষকে তাড়া করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে চায়ের দোকানে। চুলা থেকে আধপোড়া চ্যালা কাঠ নিয়ে তা ছুড়ে দেয়। বিপজ্জনকভাবে তা থেকে ছড়ায় ভাঙারোঙা অঙ্গার ও খুচরা ফুলকি।

আর রাতের বেলা এ মানুষটি ধারণ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। খালি গায়ে ময়লা একটি চাদর জড়িয়ে গিয়ে দাঁড়ায় মাছ হাঁটার প্রান্তিকে কদমগাছের তলায়। ছমছমে আন্ধারে দাঁড়িয়ে মাথায় ফকফকে সাদা কিস্তি টুপি পরে নিয়ে—খানিকটা সুর করে ওয়াজ করার ভঙ্গিতে কী যেন বলে। মাছ কিনতে এসে প্রক্ষালনের জন্য কেউ কেউ কদমতলায় গেলে টুপির শুভ্রতা দেখে চমকে ওঠে। মস্তানও মানুষটিকে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনে কখনো কখনো কদমতলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বাচনভঙ্গি অবিকল ওয়াজি মৌলভির মতো হলেও বক্তব্যে নেই নসিহতমূলক কোনো কথাবার্তা। মানুষটি ওয়াজ করার কায়দায় স্রেফ বকে চলে আবোলতাবোল।

গল্পের মাঝামাঝি এসে মস্তান লেখকের নৈর্ব্যক্তিক জবানিতে হাজির করে বিশ্লেষণ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়—উন্মাদটির আচরণের সঙ্গে আলোর সম্পর্ক নিবিড়। ভরদুপুরে বেজায় উজ্জ্বল হয়ে রোদ ছড়ালে তার মধ্যে সঞ্চার হয় অহেতুক ক্রোধ। আবার কদমতলায় ঘন অন্ধকারে তার মাঝে দেখা যায় পরহেজগার মানুষের বাচনভঙ্গি অনুকরণের প্রচেষ্টা। এ পর্যন্ত শুনে বাদশাহ মিয়া বিরক্ত হয়ে হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মস্তান, তুমি হামিদ মৃধা মাস্টার সাবরে নিয়া একটা গল্প লেখো। ’ খানিক হতাশ হয়ে সে জবাব দেয়, ‘দুলাভাই, মাস্টার সাবকে নিয়া কিছু লেখাটেকা যাইব না, ওনারে আমি ঠিক চিনি না, হের সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানিও না, না জাইন্যা কী ঘোড়ার ডিম লিখব?’ বাদশাহ মিয়া তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘চেতো কেন মস্তান? হামিদ স্যাররে তোমার চিননের তো কিছু নাই, তামাম দুনিয়ার মানুষ তারে এক নামে চিনে। তুমি খাতায় নোট নাও। আমি বলতাছি—হেড মাস্টার হওয়ার আগে এলাকার সবচেয়ে নামজাদা ফুটবলার ছিলেন তিনি। সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলতেন। তাঁর গোল করার কায়দাই ছিল আলাদা। ’ মস্তান মৃদু প্রতিবাদ জানায়, ‘ওনারে তো আমি নিজে পর্যবেক্ষণ করি নাই। ’ বাদশাহ মিয়া বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘তোমার পর্যবেক্ষণের দরকার কী, কী ঘোড়ার ডিমের কবি তুমি, কল্পনা করতে পারো না? ... ইস্ত্রি করা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে স্কুলে যাইতেন, মোটা ফ্রেমের চশমা, ইয়া বড় মোচ, গল্লা বেতের ছড়ি হাতে যখন স্কুলঘরের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতেন, তাঁকে দেখামাত্র ছাত্রদের জান ডরে চৌথা আসমানে উড়াল দিত। তাঁর আমলে স্কুলে ছাত্রবৃত্তি কয়টা আসছিল, তুমি খবর রাখো মস্তান?... হুনো, আমার কথাটা রাখো, লেখো, মাস্টার সাবরে নিয়া একটা গল্প লেখো। ’ প্রতিক্রিয়ায় মস্তান নিরুত্তর থাকলে বাদশাহ মিয়া খানিক খেপে উঠে বলেন, ‘আগল-পাগলরে নিয়া তুমি দেড় হাত লম্বা গল্প লিখতে পারলা, আর তোমারে আমি একজন নামজাদা মানুষের খবর দিতাছি, তুমি হেরে নিয়া কিছু লিখতে চাও না, কী কিসিমের লেখক তুমি তা-ই তো বুঝতে পারতাছি না। ’

কোনো কথা বলে না মস্তান। বাদশাহ মিয়া ইজিচেয়ারে এপাশ-ওপাশ করে বুকের কাছে কোলবালিশটাকে চেপে ধরেন। মস্তান বুঝতে পারে—আজ মিটাংগির গুলিতে কাজ হচ্ছে না, দুলাভাইয়ের বুকের ব্যথাটা ফিরে আসছে। সে মিনমিনিয়ে বলে, ‘দুলাভাই, দুপুরবেলা হঠাৎ করে মনে একটা কবিতা আইসা পড়ল, তা লিখ্যা ফালাইছি, হুনবেন?’ বাদশাহ মিয়া খুশি হয়ে উঠে সাড়া দেন, ‘পড়ো মস্তান, একটু দরদ দিয়ে পড়বা। ’ পড়তে পড়তে মস্তান যেন কবিতাতে বিভোর হয়ে যায়। সে একই কবিতা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার পড়ে। তার করোটিতে মিটাংগির মেঘ ঘন হয়ে জমে। লণ্ঠনের আলো দপদপ করে নিভে যেতে থাকলে সে তা উসকে দেয়। তখন খেয়াল করে, বাদশাহ মিয়া তার দিকে বোবাদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বলেন, ‘কবিতাটা বালা লেখছ মস্তান, খুব বালা। হুনতে হুনতে মনে অইল তুমি যদি বেগম সুফিয়া কামালের মায়াকাজলের লাহান একটা কবিতা লিখতে পারো, তাইলে তুমি বড় কবি অইতে পারবা। ’ মস্তান এ মন্তব্যে খুশি হয়, কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় কিছু বলে না।

বাদশাহ মিয়া গোল্ডফ্লেক ধরাতে গিয়ে বারবার ম্যাচের কাঠি জ্বালান, তাঁর হাত কাঁপে। মস্তান উঠে গিয়ে তাঁর সিগ্রেট ধরিয়ে দিতে দিতে ভাবে—দুলাভাইয়ের সয়সম্পত্তি, টাকা-পয়সা সর্বত্র ছড়ানো, তাঁর অখন-তখন কিছু হলে এসব সামলাবে কে? তার কোনো ভাগ্নে নাই। তখন বাদশাহ মিয়া গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন, ‘তোমার কবিতা হুনতে হুনতে ঘোরের লাহান চোখ বন্ধ হইয়া আসছিল, তখন খোয়াবে দেখলাম আজমির শরিফের সিঁড়ি। অপারেশনের আগে আমি আজমিরে জিয়ারতের মানত করছিলাম, আমার শরীর-গতর তো আর বালা অইব না মস্তান, তুমি যাইবা আমার বদলি জিয়ারত করতে, টেকা-পয়সা যা লাগে, কোনো চিন্তা করবা না। ’ মস্তান মৃদুস্বরে জবাব দেয়, ‘দুলাভাই, আমার যে একবার শান্তিনিকেতনে যাওনের দরকার ছিল। ’ বাদশাহ মিয়া হেসে মজাক করে বলেন, ‘বুঝতে পারতাছি, শান্তিনিকেতন তোমাগো কবি-সহিত্যিকদের হেডকোয়ার্টার, ওখানে তোমার যাওন লাগবই। তো যাও, কলকাত্তায় নাইমা পয়লা শান্তিনিকেতনে যাও মস্তান, অইখানে কয়েক দিন থাইকা তারপর ট্রেইন ধইরা আজমির শরিফে যাইতে পারবা না?’

জবাবের প্রতীক্ষায় বাদশাহ মিয়া ব্যাকুল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। মস্তান তাঁকে পর্যবেক্ষণ করে, দৃষ্টিটাকে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে, মস্তানের তা ভালো ঠেকে না। সে নার্ভাস হয়ে বলে, ‘দুলাভাই, কী অইল’; কিন্তু কোনো জবাব পায় না। চেয়ে থাকা অবস্থায়ই বাদশাহ মিয়ার মাথা ঢলে পড়ে ইজিচেয়ারের শিথানে। সে উঠে গিয়ে তাঁর শরীর স্পর্শ করে আবার বলে, ‘দুলাভাই’, তিনি মস্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে, কী যেন বলতে চান, ঠোঁট দুটি কাঁপে বাদশাহ মিয়ার; কিন্তু গলা থেকে বের হয় না কোনো স্বর। মস্তান ঠিক বুঝতে পারে না—তবে কি দুলাভাইয়ের জবান বন্ধ হয়ে গেল? সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, দুলাভাইকে একা এখানে ফেলে রেখে ভেতর-বাড়িতে গিয়ে বড় আপাকে খবরটা দেবে কি না?


মন্তব্য