kalerkantho


তাঁহাদের সঙ্গে কথোপকথন

ব্যতিক্রমধর্মী সাক্ষাৎকারের বই

আরাফাত শান্ত

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ব্যতিক্রমধর্মী সাক্ষাৎকারের বই

তাঁহাদের সঙ্গে কথোপকথন : আহমাদ মোস্তফা কামাল। প্রচ্ছদ : কাব্য কারীম। প্রকাশক : রোদেলা প্রকাশনী। মূল্য : ৩০০ টাকা।

 

এবারের বইমেলায় আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘তাঁহাদের সঙ্গে কথোপকথন’ বইটি অনেক বেশি গভীর ও প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ভরপুর। এটি একটি সাক্ষাৎকারের বই। সব কয়টি সাক্ষাৎকার ব্যক্তিকে বোঝার চেষ্টা, তাঁর সৃজনভাবনা জগৎ কিভাবে চালিত হয় সেদিকেই থেকে গেছে। সাক্ষাৎকারগুলোর বেশির ভাগই ১৮-১৯ বছর আগের। পড়তে গেলে অবশ্য মনে হবে সেদিনই নেওয়া।

প্রথম সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে দিয়ে। সাক্ষাৎকারটি ভালো লেগেছে খুব।

কারণ শামসুর রাহমান আমার প্রিয় কবি আর এই সাক্ষাৎকারে তাঁকে যেমন কল্পনা করি তেমনই কোমল স্নিগ্ধ মনের কবি হিসেবেই দেখতে পেয়েছি। তিনি কবিতার কথা বলেছেন, নিজের সময়ের কবিদের কথা বলেছেন, নিজের জীবনের অপ্রাপ্তি-প্রাপ্তির দোলাচলে থাকা নিয়ে বলেছেন। আহমাদ মোস্তফা কামালের মতো মনস্ক পাঠকের প্রশ্নে মুগ্ধ হয়েছেন। বইটি তুমুল আগ্রহ নিয়ে শুরু করার জন্য যথার্থ।

এরপর সৈয়দ হকের দুটি সাক্ষাৎকার। প্রথমটি এত বেশি ভালো লাগেনি। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটি আগেও পড়েছিলাম। এবার পড়ে মনে হলো অনেক ভালো হয়েছে ব্যাপারটা। সৈয়দ হকও অনেক সময় নিয়ে কথা বলেছেন, আহমাদ মোস্তফা কামালও দারুণ সব প্রশ্ন করেছেন। বিপুল যে লেখার জগৎ সৈয়দ হকের, তা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। উপন্যাস, গল্প, কবিতা তো ছিলই, সঙ্গে সৈয়দ হকের বর্ণাঢ্য জীবন, লেখক হওয়ার শুরুর কাল, ভাষারীতি, আঙ্গিক, লেখার চিন্তাভাবনা, সব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকারটিও ভালো লেগেছে। তাঁর গল্প নিয়েই কথা বলা হয়েছে বেশি। হাসান আজিজুল হকের বিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাধারণ ইন্টারভিউতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবানোর এক চেষ্টা থাকে, হাসান আজিজুল হক সেদিকে হাঁটেননি। নিজেকে বরং ভাবাতে চেয়েছেন, সামাজিক মানুষ অনেক কিছু করতে হয়, লেখাটাও সে রকম, সব সময় তিনি লেখা নিয়ে ভাবতে চান না, সব সময় লেখার নিয়ন্ত্রণও তাঁর কাছে থাকে না। জীবন উপভোগ করতে ভালোবাসেন, জীবনকে তিনি সব সময় উদ্দেশ্যহীন ভাবতে রাজি নন।

মাহমুদুল হকের খুব বেশি সাক্ষাৎকার পড়া হয়নি। তাই এটাকে বলা যেতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা। এক উদাসী কিন্তু সেনসিটিভ মাহমুদুল হককে পাওয়া যাবে এই সাক্ষাৎকারে।

আবদুল মান্নান সৈয়দের সাক্ষাৎকারটি বেশ উত্তেজক। তিনি বাংলাদেশে অন্যতম সেরা সাহিত্য সমালোচক হয়েও যেভাবে সব বড় সাহিত্যিককে তুলাধোনা করলেন ব্যাপারটা সুখকর নয়। যেমন তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বলেছেন মোটিভেটেড, মাহমুদুল হকের গদ্যই হয় না, হাসান আজিজুল হকের লেখাকে খুব বেশি গুরুত্বের ভাবেন না, শওকত আলীর লেখাই হয় না, সৈয়দ হক পলিটিক্যাল  মোটিভেশনে লেখা হারিয়েছেন।  

রাহাত খানের সাক্ষাৎকারটি ভালো। সাক্ষাৎকারটি পড়ে মনে হলো, তাঁকে আমার পড়া হয়নি। শহীদুল জহিরের লেখার ভক্ত হিসেবে তাঁর সাক্ষাৎকারটি আমার মনে দাগ কেটেছে। কেন তিনি এই ভাষারীতিতে লেখেন, কেন তাঁর লেখার পদ্ধতি ভিন্ন, কেন তিনি কালেক্টিভভাবে ‘আমি’র জায়গায় আমরা দিয়ে লেখেন, কেন তিনি কোনো সিদ্ধান্ত পাঠককে চাপাতে দেন না তারও ব্যাখ্যা আছে।

বদরুদ্দীন ওমরের সাক্ষাৎকার বইটি কমপ্লিট করেছে। বাম দল, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এনজিও কাউকে বাদ রাখেননি বদরুদ্দীন ওমর। সবার সমালোচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেমন মতামত পোষণ করেন, তাঁর সম্প্রসারিত রূপ প্রকাশিত হয়েছে। কেন বাম দল দেশে দুর্বল, কেন আওয়ামী লীগ এ রকম, কেন বিএনপি এমন, জামায়াতের শক্তির উৎস কোথায়, কেন দেশ এ রকম, সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।


মন্তব্য