kalerkantho


কোনো জোনাকি এ অন্ধকার চেনে না

কুহরিত মায়ায় হেঁটে যায় আপন মানুষ

মুহিল কবির

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০




কুহরিত মায়ায় হেঁটে যায় আপন মানুষ

কোনো জোনাকি এ অন্ধকার চেনে না : আফজাল হোসেন। প্রকাশক : অনন্যা।

প্রচ্ছদ : আফজাল হোসেন। মূল্য : ৩০০ টাকা

 

দেশপ্রিয় অভিনেতা আফজাল হোসেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যখন যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। কী উপস্থাপনায়, কী নাটক রচনায়, কী নাটক নির্মাণে, কী প্রচ্ছদ শিল্পে, কী বিজ্ঞাপনে, কী ছবি তোলায় কিংবা ছবি আঁকায়। এত সব গুণের অধিকারী যিনি তিনি কবিতাতেও সিদ্ধহস্ত হবেন, সেটা বলারও অপেক্ষা রাখে না। তাঁর কাব্যচর্চার বয়সও অনেক। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত হলো তাঁর কাব্যগ্রন্থ কোনো জোনাকি এ অন্ধকার চেনে না। প্রকাশ করল অনন্যা প্রকাশনী।

যাপিত জীবনের দুঃখ, গ্লানি, সমাজের অবিচার, নারীর প্রতি হীনম্মন্য আচরণ প্রভৃতিই তাঁর কবিতার বিষয়। তিনি কবিতাগুলোয় তাঁর মতো করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে বিষয়গুলো খুবই সাধারণ। প্রায় প্রত্যেক কবির কবিতা ঘাঁটলেই উপর্যুক্ত বিষয়ের উপস্থিতি পাওয়া সম্ভব। তাহলে কবি হিসেবে আফজাল হোসেনের বিশেষত্ব কোথায়। কবি আফজাল হোসেনের বিশেষত্ব সেখানেই, সাধারণ বিষয়ভুক্ত কবিতাকে তিনি এমন ঢঙে উপস্থাপন করেন, যা একেবারেই আলাদা। যা একেবারেই আফজাল হোসেনীয়। যেমন, ‘শোনো মেয়ে, আগেই বলি/ সবাই তোমায় দেখবে বলে/ হুড়মুড়ানো কাণ্ড হবে/ নানান রকম মুখের ভিড়ে পড়বে চাপা/ তোমার তুমি। / আসবে যারা, দেখবে গায়ে চিমটি কেটে/ তুমি উফ্্ করলে হেসে কিন্তু...’ আসবে ছুটে, আসবে ধীরে/ তোমায় ঘিরে ঠেলাঠেলি/ খোঁপা খোলার খায়েশ হবে/ চুল টেনেও দেখতে পারে/ আসল নাকি নকল চুলে ফুল গুঁজেছ/ দেখবে তারা দেখতে পারে/ তুমি উফ্্ করলেও হেসে কিন্তু...

নারীর প্রতি হীনম্মন্য আচরণের এক চমৎকার উপস্থাপনা। বোঝা যাচ্ছে কনে দেখার সরল বর্ণনার গভীরে তিনি এ সমাজেরই হীন মানসিকতার চিত্র এঁকেছেন। কনে দেখার প্রচলিত ধারা যে নারীর জন্য কত অবমাননাকর তারই কথা তিনি বলেছেন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে নারীর প্রতিবাদী হতেও তো মানা, যা আমাদের সমাজেরই শিখে দেওয়া শিক্ষা। তিনি পুরো বিষয়টিকেই ব্যঙ্গ করেছেন।

এটা গেল একটা দিক। আরো অন্তত দুটি বিষয়ে কবি আফজাল হোসেন অনন্য। এক. কবিতায় দার্শনিক চিন্তার প্রক্ষেপণে। দুই. প্রেমে।

কবিতার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, ‘পথের শেষে কি পেয়েছো?/ ঘর/ ঘরের ভিতর পেয়েছো কি?/ পর। / হাঁটছে পথে আপন মানুষ/ এখন যাযাবর। (সামান্য কবিতা। )

সামান্য কবিতা শিরোনামীয় এ অসামান্য কবিতায় তিনি দার্শনিক চিন্তার যে প্রক্ষেপণ করেছেন, তা হাজারো প্রশ্নের উদ্রেককারী, হাজারো প্রশ্নের বিশ্লেষক এবং উপসংহারহীন তার যাত্রা। পথ নিয়ে কথা বলছেন তিনি। পথের শেষে কী পেয়েছো। তিনি নিজেই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন। ঘর। পথের শেষে পাওয়া যাচ্ছে ঘর। ঘরের ভিতর কী পাওয়া যাচ্ছে। পর। অথচ ঘরের ভেতর তো পর পাওয়ার কথা নয়! তিনি কবিতা শেষ করছেন মানুষের আপন পথে হাঁটা নিয়ে। বলছেন যাযাবর। তাহলে ঘরের প্রতি এত টান কেন আমাদের! এই গন্তব্য কি এক মোহন আত্মহনন! এই সব প্রশ্ন রক্তাক্ত করে পাঠকের চিন্তা ও মননকে। ক্ষতবিক্ষত হতে হতে মন বলে ওঠে এই একটি প্রশ্নের অনেক উত্তর। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমরা যাযাবর হয়ে যাচ্ছি। দুর্লঙ্ঘ্য অনির্দিষ্টতা আমাদের সঙ্গী হয়ে যাচ্ছে যেন। আবার হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে এটা কোনো পথ নয়। ধারণা মাত্র। তবু আমরা মোহন আত্মহনন বেছে নিই পতঙ্গের মতো। আগুন যার পথের গ্রন্থি এঁকে দেয়। এই সব প্রশ্নের দোলাচলে দুলতে দুলতে একসময় মনে হবে তাহলে সত্যটা কী? মিথ্যাটাই বা কী—‘আমি কিন্তু তোমার মতো/ কিংবা তুমিই আমি। / বলে দেখ/ ছুঁয়ে দেখ/ টের পেলে কি, কাকে ছুঁলে/ মানুষটা কে, তুমি না কি আমি। ’ (একাকার)।

সমাজের অবিচার, নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ, জীবনের দার্শনিক উপলব্ধিতে কিংবা প্রেমের কবিতায় আফজাল হোসেন রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর। এ স্বাক্ষর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত।


মন্তব্য