kalerkantho


কন্যাকে নিয়ে লেখা

আত্মজার জন্য পিতার প্রার্থনা

স্বকৃত নোমান

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আত্মজার জন্য

পিতার প্রার্থনা

কন্যাকে নিয়ে লেখা : কামাল চৌধুরী। প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ।

মূল্য : ৩৭৫ টাকা

 

কবি কামাল চৌধুরীর ‘কন্যাকে নিয়ে লেখা’ বইটি হাতে নেওয়া মাত্র মনে পড়ে গিয়েছিল বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ইমরে কারতেশের ‘অনাগত শিশুর জন্য শোকগাথা’ উপন্যাসটির কথা। আত্মকথনের ভঙ্গিতে এ কাব্যিক উপন্যাসে নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো এক মানুষের কথা তুলে ধরেছিলেন কারতেশ্। তবে কামাল চৌধুরীর বইটির বিষয় হতাশা নয়, দুঃস্বপ্ন-নির্যাতন নয়, কন্যাকে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি বইটিতে।

সন্তানের উদ্দেশে পিতা লিখেছেন, এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেসব লেখায় আমরা দেখতে পাই সন্তানের জন্য পিতার স্নেহ, ভালোবাসা, আকুতি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি কামাল চৌধুরীর বইটিও অনেকটা সেরকম। আত্মজার প্রতি স্নেহ-মমতা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই তিনি এমন একটি বই লিখে উঠতে পেরেছেন, পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়।

কামাল চৌধুরীর কন্যা প্রতীতি ভর্তি হয়েছে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ‘মাউন্ট হলিঅক কলেজে’। তাকে সেখানে পৌঁছে দিতে সঙ্গী হয়েছেন বাবা কামাল চৌধুরী ও মা ইফ্ফাত।

তাঁরা যাচ্ছেন আকাশযানে চড়ে, ২০১৬ সালের ২ আগস্ট। এই যাত্রার বর্ণনা দিয়ে বইটি শুরু : “...আমাদের মেয়ে নতুন জীবন শুরু করবে—দেশমাটি, চেনা পরিবেশ থেকে দূরে অপাতবিচ্ছিন্ন এক জীবন। আমাদের মন সুদূরপিয়াসী, কিন্তু গৃহকোণ আমাদের অতিপ্রিয়। জীবনের ধর্ম নিকটকে ভালোবাসা আর দূরকে আহ্বান করা। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঁক বদল ঘটে মানুষের জীবনে। নিস্তরঙ্গ নদী তাই আমাদের স্বপ্ন নয়—স্রোত ও গতিময়তার বহমান উচ্ছ্বাসই আমাদের আরাধ্য। আমার কন্যার স্বপ্নে যোগ হয়েছে গতিময়তার বিস্তার। দূর দেশে তার স্বপ্নের কাছে আমরা তাকে রেখে আসব। ”

কবি মাত্রই সংবেদনশীল। কামাল চৌধুরীও এর ব্যতিক্রম নন। বইটির প্রথম কটি পাতা পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়, শব্দগুলো যখন তিনি লিখছিলেন তখন বুঝি খুব কাঁদছিলেন। তাঁর চক্ষুসিক্ত নোনাজল বুঝি গড়িয়ে পড়ছিল লেখার কাগজে। বারবার চোখ-মুছে তিনি লিখেছেন : “...বাবা-মা হিসেবে আমরাই ছিলাম তার প্রকৃত বন্ধু। এখন রাতজাগা পাখির মতো ঘরময় ঘুরে বেড়াবে কে? কে তাকে ঘুম থেকে জাগাতে ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে যাবে? কে তাকে তাড়া দেবে সময়মতো ক্লাসে যেতে। এখন কার সঙ্গে সে রাগ করবে, কাকে প্রয়োজনের কথা বলবে, কাকে বলবে আইপ্যাড, মোবাইল ফোনের টাকা শেষ। এখন নির্ভরশীল এক জীবন স্বাবলম্বী হবে। জীবন মানুষকে শেখায়—সেও শিখবে—পেছনে পড়ে থাকবে স্মৃতিবিস্মৃতি, মায়া ও সম্পর্কের মহাকাব্য। ”

বইটি মূলত লেখকের আমেরিকা ভ্রমণের দিনলিপি। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে তারিখ ও বার দেওয়া। কিন্তু গভীরভাবে পাঠ করলে বোঝা যায় একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লেখক এই দিনলিপি লিখছেন। কী সেই উদ্দেশ্য? কন্যা প্রথমবারের মতো মা-বাবাকে ছেড়ে সুদূরে গেছে। এত দিন তো তার গাইড হিসেবে মা-বাবা পাশে ছিলেন। সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে কে হবে তার গাইড? কে তাকে দেখভাল করবে? এই চিন্তা থেকেই একটি ‘গাইডবুক’ রচনা করে দিলেন লেখক পিতা, যেখানে কন্যাকে জানিয়ে দিচ্ছেন তার দৈনন্দিন কাজ কী হবে, কী পড়বে, কী খাবে, কার সঙ্গে আড্ডা দেবে ইত্যাদি বিষয়। এই হিসেবে বলা যেতে পারে অনবদ্য গদ্যশৈলীতে লেখা এটি আত্মজার জন্য একটি গাইডবই।

কামাল চৌধুরীর কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত। কখনো তাঁর গদ্য পড়িনি। এক লাইনও না। এই প্রথম পড়া হলো ৮৫ পৃষ্ঠার তাঁর এই গদ্যের বই। কবি যখন গদ্য লেখেন তা অনবদ্যই হয়। স্বতঃস্ফূর্ত গদ্য। প্রতিটি শব্দ যেন বুকের গভীর থেকে উঠে আসা। লেখার ফাঁকে ফাঁকে যুক্ত করা হয়েছে আমেরিকা ভ্রমণের কয়েকটি ছবি। নির্মেদ গদ্যের কারণে বইটি এক বসাতেই পড়ে শেষ করা যায়। আমরা কবি কামাল চৌধুরীর এ বইটির বহুল পাঠ কামনা করি।


মন্তব্য