kalerkantho


কারাগারের কাব্য

কারাগার যেন ললিতকলা বিদ্যানিকেতন

এমরান কবির

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০




কারাগার যেন ললিতকলা বিদ্যানিকেতন

কারাগারের কাব্য : হো চি মিন—রূপান্তর : মুনীর সিরাজ। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ।

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ২০০ টাকা

 

‘কবিতা আবৃত্তির অভ্যাস নেই আমার/ কিন্তু এ বন্দিশালায় কী আছে অন্য কাজ?/ কয়েদি এ দিনগুলো কাটাব কবিতা লিখে/আর তা গাইতে গাইতেই নিকটে আনব/ স্বাধীনতার দিন’ (ডায়েরির প্রথম পাতা) কবিতার অমোঘ শক্তির প্রতি আস্থা রেখে যিনি এ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন, তিনি বিপ্লবী নেতা হো চি মিন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র দু-তিনজন বিপ্লবীকে পাওয়া যায়, যাঁরা বিপ্লবের একটা অস্ত্র হিসেবে কবিতাকে মান্য করতেন, চর্চাও করতেন। চীনের যেমন মাও জে দং, চিলির পাবলো নেরুদা এবং ভিয়েতনামের হো চি মিন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র কয়েকজন নেতাকে পাওয়া যায়, যাঁরা তাঁদের লক্ষ্যে স্থির থেকে কার্য সম্পাদন করে গেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা, আমেরিকায় মার্টিন লুথার কিং, বাংলায় যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিপ্লব ও ভিয়েতনামের ইতিহাসে তেমনি একটি নাম হো চি মিন। চীনের কোয়াংসি প্রদেশে তেরোটি জেলার তেইশটি কারাগারে বা কারাগারসদৃশ স্থানে চৌদ্দ মাস বন্দি করে রাখা হয়েছিল হো চি মিনকে। সে সময় তিনি লিখে ফেলেন প্রিজন ডায়েরি, যা চীনা ধ্রুপদী ভাষায় রচিত কবিতার প্রতিচিত্রসংবলিত।

১৯৬৭ সালে আইলিন পামার গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ করেন। কবি ও প্রাবন্ধিক মুনীর সিরাজ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার পাঠকদের সামনে নিয়ে এলেন হো চি মিনের কারাগারের কাব্য। গ্রন্থটি চলতি বইমেলায় এনেছে অন্যপ্রকাশ।

সন্ধ্যার পর অন্ধকারে বসে হো চি মিন দৃকপাত করতেন সব ঘুমন্ত ও জাগ্রত বন্দির প্রতি। নিষ্পাপ মুখের মানুষগুলো মাটিতে শুয়ে। দেয়ালে ছারপোকার হামাগুড়ি, আকাশে বিমানের ঝাঁকের মতো মশকের ঝাঁক। বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে স্বদেশ ও কমরেডদের থেকে অনেক দূরে, জেলের একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে তিনি মর্মযাতনায় কাতর। এমন অসম্ভব সময়েই একটি ছোট পুরনো নোট বইয়ে তিনি বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতাগুলো রূপান্তর করেন কবিতায়।

 মূলত ভিয়েতনামের সার্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই হো চি মিনের কবিতার মূল সুর। এতে তিনি যে স্বর ব্যবহার করেছেন, তাও সাধারণ। সাধারণে প্রবেশ্য। বিপ্লব এমন এক জিনিস, যেখানে সাধারণের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হো চি মিন সেটা ভালোভাবেই বুঝতেন। কবিতায় তিনি রাজনীতি-সচেতন এবং স্বদেশের মুক্তির জন্য প্রচণ্ডভাবে বিপ্লবে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসে তিনি ছিলেন আপসহীন। এই আপসহীন বিশ্বাসই তিনি কবিতার মাধ্যমে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন—‘প্রতি সকালেই দেয়ালের ওপর ওঠে সূর্য/ প্রবেশ দরজায় ঠিকরে দেয় আলো/ অথচ দরজা তালাবন্ধ। / জেলের ভেতর ঘরময় অন্ধকার/ তবু আমরা জানি, বাইরে জেগেছে উজ্জ্বল অরুণ। (সকাল)

তাঁর বিপ্লবী চেতনা ছিল সত্যনিষ্ঠ। এই সত্যনিষ্ঠতা তিনি কবিতায় সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। তাতে তাঁর কবিতায় সৃষ্টি করেছে বিশ্বাস্য দৃঢ়তা। বিষয়টি কবিতায় যেমন নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে, তেমনি বিপ্লবে কিংবা বিপ্লবে কবিতার সংশ্লিষ্টতায় যোগ করেছে বিশ্বাস। এই ধারাটি বিশ্বকবিতার ইতিহাসে নতুন। সম্ভবত সে জন্যই ভিয়েতনামি সমালোচকরা তাঁর কবিতাকে উল্লেখ করেছেন স্টিলি স্ট্রাকচার হিসেবে। শব্দগুচ্ছটি বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘ইস্পাত অবয়ব’।

শুধু তা-ই নয়, কারাগারকে তিনি নিছক কারাগারই মনে করেন না—‘সন্ধ্যার আহার শেষে সূর্য ঢলে পড়ে/ লোকগীতি আর বাজনার ধ্বনি বেজে ওঠে/ সহসা চারদিকে,/ বিষণ্ন সিংসি জেল/ নবরূপে মূর্ত যেন ললিতকলা বিদ্যানিকেতন। ’ (সন্ধ্যা)

রূপান্তরক মুনীর সিরাজ রূপান্তরে তাঁর কাব্যচেতনা যথাযথভাবে ব্যবহার করেছেন। ফলে অনুবাদটি হয়ে উঠেছে ঝরঝরে ও প্রাঞ্জল।

অনুবাদে যেমন তিনি মূলানুগ, কাব্যচেতনা প্রয়োগেও তিনি কৌশলী। তাতে অনুবাদের কঠিন গন্ধ যেমন বিরক্ত করে না, তেমনি হয়ে ওঠে না তাঁর নিছক নিজের কবিতা। এসবের সমন্বয়ে অনুবাদকর্মটি হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য।

 


মন্তব্য