kalerkantho


মেলার শেষ সপ্তাহের ৫ বই

মহাজীবনের এক স্মৃতিময় আখ্যান

জীবনের স্মৃতিদীপে

শ্যামল চন্দ্র নাথ    

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০





মহাজীবনের এক স্মৃতিময় আখ্যান

জীবনের স্মৃতিদীপে : রমেশচন্দ্র মজুমদার। প্রকাশক : সূচিপত্র। প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি। মূল্য : ৪০০ টাকা।

 

জীবনকে মানুষ নানাভাবে দেখে। নানাজনের নানা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, সেটা অস্বাভাবিক নয়। ‘জীবনের স্মৃতিদীপে’ একটি স্মৃতিচারণা মাত্র। রমেশচন্দ্র মজুমদারের পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনি নয়। বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত ফরিদপুর জেলার খান্দারপাড়া গ্রামে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর এক বৈদ্যবংশে জন্ম নেন রমেশচন্দ্র মজুমদার। মায়ের দিক থেকে তিনি রাজা রাজবল্লভের বংশধর, বাপের দিক রাজা হরিনাথের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি গ্রামের মাইনর স্কুলে ভর্তি হন।

কটকের র‍্যাভন্শ কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এনট্রানস্ (১৯০৫) পাস করে বিভাগীয় বৃত্তি লাভ করেন। এরপর রমেশচন্দ্র মজুমদার সাহিত্যচর্চা শুরু করেন রিপন কলেজ থেকে পাস করে বিএ পড়ার সময়। ওই বয়সে দু-চারটি কবিতা লিখতেন। তাঁর মা তাঁর দেড় বছর বয়সে মারা যান। ওই কবিতাটিতে মাতৃহারা সন্তানের মনের ভাব প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছিলেন। হিন্দু হোস্টেলে থাকাকালীন প্রতিবছর নাটক হতো, তাতে তিনি দু-একবার অভিনয় করেন। ওই সময় তাঁর জীবনে এভাবে সাহিত্যচর্চার যে সূত্রপাত হয়, পরবর্তীকালে তা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল। ‘অধ্যাপনা : কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ট্রেনিং কলেজে প্রভিনশিয়াল সার্ভিসে একটি শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ায় সরকার আমাকে ওই কাজে নিয়োগ করেন। ফেব্রুয়ারি মাসে আমি ওই কাজে যোগ দিই। এখানে বয়স্ক শিক্ষকরাও পড়তেন। আমার দুজন ভূতপূর্ব শিক্ষকও আমার ছাত্র ছিলেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত আমি সেখানে কাজ করি। সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় আমার বাবার খুব অমত ছিল। কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করি এবং ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে লেকচারার হিসেবে অধ্যাপনার কাজে যোগদান করি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে আমি প্রাচীন ও আধুনিক ভারতের ইতিহাস পড়াতাম। এভাবে আমার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ’ তা ছাড়া ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান’ অত্র প্রবন্ধে তিনি উচ্চারিত করেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব কাজে পরিণত হতে অনেক দিন লেগেছিল। ১৯২১ সালের জুন মাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ আরম্ভ হয়। এর কয়েক মাস পূর্বে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার ফিলিপ হার্টগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। এ দেশে এসেই তাঁর প্রথম কাজ হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়োগ এবং নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করা। আমি একদিন স্যার আশুতোষের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বললাম যে আমার বাড়ির সবার ইচ্ছা ঢাকায় চাকরির জন্য আমিও দরখাস্ত করি। স্যার আশুতোষ বললেন, ‘তুমি দরখাস্ত লিখে আমায় দিয়ে যাবে। ’ তাই করলাম। স্যার আশুতোষ বললেন যে তিনিই সেটি পাঠিয়ে দেবেন। সাধারণ নিয়ম হলো যেখানে কাজ করা হয় সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের মারফতেই এ ধরনের দরখাস্ত পাঠাতে হয়। সুতরাং আমি তাঁর হাতেই দরখাস্তটি দিয়েছিলাম। পরে শুনেছিলাম যে কেউ কেউ তাঁকে না জানিয়ে দরখাস্ত করেছে এবং তাতে তিনি খুবই রুষ্ট হয়েছেন। ’ এর পর ‘ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ ও শরত্চন্দ্র’ প্রবন্ধে আরো জানা যায় যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। এবং শরত্চন্দ্রও তাঁদের বাড়িতে থেকেছিলেন। এই বইয়ে রমেশচন্দ্র মজুমদারের কর্মজীবন ছাড়াও তাঁর  ইতিহাস সচেতনতা, সত্যানুসন্ধান ওই সময়কালের কথাই বলছে। যা প্রত্যেকের জানা জরুরি।   বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে এই উপমহাদেশের এবং বিশ্ববরেণ্য মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কের নানা বিশ্লেষণও দেখতে পাই এই গ্রন্থে। তাই এটা বলতে পারি কালের বিচারে এই গ্রন্থখানি সত্যিই এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে, যা একেবারে অমূল্য। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয় এ যেন শিরদাঁড়া সোজা রাখা এক অনমনীয় ব্যক্তিত্বের অনবদ্য রোমন্থন। এক কথায় এটি মহাজীবনের এক স্মৃতিময় আখ্যান।


মন্তব্য