kalerkantho


স্বর্ণমানব

বাস্তব ও কল্পনা মেশা আটটি গোয়েন্দা গল্প

হানযালা হান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাস্তব ও কল্পনা মেশা

আটটি গোয়েন্দা গল্প

স্বর্ণমানব : মইনুল খান। প্রচ্ছদ : মোমিন উদ্দিন খালেদ।

প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ। মূল্য ২৮০ টাকা

বিরাশি বছরের ধনাঢ্য মহিলা ম্যারিয়ন গিলক্রিস্ট। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে বাস করতেন। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাড়ির কাগজপত্র এলোমেলো ও একটি হীরার অলংকার খোয়া যায়। গুজব ওঠে, অস্কার স্ল্যাটার নামে এক জার্মান ইহুদি তাঁকে খুন করেছেন। তিনি একটি হীরার অলংকার বন্ধক রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং ছদ্মনামে আমেরিকা পালিয়ে গেছেন। গ্রেপ্তারের পর বিচারে ১৯০৯ সালের ২৭ মে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন আদালত। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর ৪৮ ঘণ্টা আগে তাঁর শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।

এ মামলা নিয়ে পরে লড়াই করেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। ১৯২৭ সালের ৮ নভেম্বর স্ল্যাটার বেকসুর খালাস পান। এই ১৮ বছর বিনা অপরাধে জেলে ছিলেন তিনি। স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় বিচারিক ভুল বলে মনে করা হয়।

ডয়েল ব্যক্তিগত জীবনে গোয়েন্দা ছিলেন না। তাঁর পেশা ছিল চিকিৎসা। পেশাগত জীবনে ছিলেন ব্যর্থ। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে কাজ করার সময় কিছুদিন ভারতেও ছিলেন। তাঁর নামের চেয়ে তাঁর তৈরি চরিত্র শার্লক হোমস বেশি পরিচিত। হোমসকে নিয়ে তিনি ৫৪টি গল্প ও চারটি উপন্যাস লেখেন। স্ল্যাটার মামলায় তিনি হোমস পদ্ধতির প্রয়োগ করেই সাফল্য পান। খুনের সময় স্ল্যাটার ওই এলাকায় ছিলেনই না। আসলে গোয়েন্দাজীবন ও গল্পের এই হচ্ছে জাদু। একজন গোয়েন্দাকে ঘটনার পরতে পরতে রাখতে হয় তীক্ষ নজর। উদ্ঘাটন করতে হয় সত্য। যা আসলে সুবিধাভোগীরা চিরকাল লুকিয়ে রাখতে চায়।

আমাদের আলোচিত বই ‘স্বর্ণমানবে’র লেখক মইনুল খানও একজন গোয়েন্দা। তিনি বর্তমানে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। পেশাগত জীবনের এই গোয়েন্দা লিখেছেন গোয়েন্দা গল্প। ফলে এতে যে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাপ আছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। ‘কোকেন উদ্ধারের নেপথ্যে’ গল্পের নামের মধ্যেই এর কাহিনির আঁচ পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০৭টি তেলের ড্রামে কোকেন আছে—এমন খবর দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা থেকে ড্রামগুলো পরীক্ষা করতে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে এই লেখকও ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর এ গল্প। পরীক্ষার সময় ১১টি ড্রাম আলাদা করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেমিস্ট পরীক্ষা করে সেদিন জানিয়েছিলেন, ড্রামগুলোয় কোকেন নেই। কিন্তু পরবর্তী সময় ঢাকায় ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিজ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে পরীক্ষায় কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

‘এতো সোনা যায় কোথায়’ গল্পে বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী পরিস্থিতির গল্প বলা হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকরা তখন কী রকম পরিস্থিতি তৈরি করেন, কী কী প্রশ্ন করেন, কতটা প্রাসঙ্গিক হয় সেসব প্রশ্ন—এ নিয়ে এই গল্প। এই গল্পের যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হচ্ছে, দেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশি মুদ্রাপাচার এবং সেই মুদ্রায় অবৈধ পথে সোনা আসার যোগসূত্র।

‘ছদ্মবেশে’ গল্পে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও টাকা উদ্ধার অভিযানের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। একটি অভিযানে যাওয়ার আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কতটা প্রস্তুতি নিতে হয়, এ গল্প পড়ে তার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। গোয়েন্দাবাহিনী কতটা পরিশ্রম করে, তাও জানা যেতে পারে। বিশেষ করে গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর চিশতি ছদ্মবেশে সবজি বিক্রেতা খিজির মিয়া রূপ ধারণ করা অংশটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একটি গলিতে সারা দিন চা, টোস্ট খেয়ে দিন পার করে। তার উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ। সেই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

এ ছাড়া এই বইয়ে ‘স্বর্ণমানব’, ‘চোখে চোখ’, ‘কাইলা চোরা’, ‘যা মিলেছে...’ ও ‘স্বর্ণ কতটুকু ধরা পড়ে?’ নামে আরো চারটি গল্প রয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, লেখকের ভাষাভঙ্গি চমৎকার। ছোট ছোট বাক্যে তিনি অনায়াসে জটিল জটিল বিষয় লিখতে পারার দক্ষতা দেখিয়েছেন।


মন্তব্য