kalerkantho


প্রেমিক ভ্যান গঘ

বিচিত্র জীবনের চিত্ররূপ

শাহীন আহমেদ

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০




বিচিত্র জীবনের

চিত্ররূপ

প্রেমিক ভ্যান গঘ : ভিনসেন্টের বেদনা-বিলাস ও শিল্পসত্তার গল্প। জয়নাল হোসেন।

প্রকাশক : অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। প্রচ্ছদ : জোহরা বেগম। মূল্য : ৩৫০ টাকা

ডাচ শিল্পী ভ্যান গঘকে সবাই এক নামেই চেনে। তাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কানে ব্যান্ডেজ বাঁধা লাল দাড়ির স্ট্র হেট পরা সরল এক মুখচ্ছবি। এই সরল মুখচ্ছবির শিল্পমানবকে নিয়ে জীবনছবি এঁকেছেন লেখক জয়নাল হোসেন। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত বইটির প্রকাশক অ্যাডর্ন পাবলিকেশন।

ভ্যান গঘ এমন এক শিল্পী, মৃত্যুর এত বছর পরও যাঁকে নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই, শেষ নেই কৌতূহলের। কিন্তু কেন এত আগ্রহ! কেন এত কৌতূহল! এর অন্যতম কারণ শিল্পীর বিচিত্র জীবনযাপন। তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক, ছিলেন কবিতারসিক, ছিলেন ধর্মপ্রাণ, ছিলেন বাইবেলে নিবেদিত।

চিঠি লিখতেন প্রচুর। তাঁর চিঠি ও দিনলিপি যেন ছিল সমার্থক। ধূমপানের অভ্যাস ছিল। পয়সার অভাবে চুরুট কিনতে পারতেন না। স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনে সংস্পর্শে এসেছেন জগত্খ্যাত জ্ঞানী-গুণীদের। চাকরি করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন, সমাজসেবায় নিবেদিত থেকেছেন; পাদ্রি ছিলেন। এসব পেশায় ঘুরেফিরে ফিরে এসেছেন আঁকাআঁকির জীবনে। সে জীবনও সাফল্যমণ্ডিত ছিল না। মাত্র ১০ বছর ছিল তাঁর শিল্পজীবন। জীবদ্দশায় বিক্রি হয়েছিল মাত্র একটি চিত্রকর্ম। ‘দ্য রেড ভিনিয়ার্ড’ ছবিটি শিল্পী বকের বোন আনা বক মাত্র ৪০০ ফ্রাংক দাম দিয়ে কিনেছিলেন। ওটাই ছিল শিল্পীর জীবনে তাঁর জীবদ্দশায় বিক্রি হওয়া প্রথম ও শেষ চিত্রকর্ম। ভাবতে অবাক লাগে, এ চিত্রকর্মটিই পরবর্তী সময়ে তাঁর শ্রেষ্ঠতম কর্ম বলে বিবেচিত হয়। এখন তাঁর একেকটি চিত্রকর্মই বিক্রি হয় ৮২.৫০ মিলিয়নে। ডাচ সরকার দুটি মিউজিয়াম তাঁর ড্রয়িং দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে সযতনে। আমস্টারডামের ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ মিউজিয়াম একটি, অপরটি ওয়াটারলুর দ্য ক্রয়েলার ম্যুলার মিউজিয়াম। মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে দুঃখীতম কিংবদন্তি শিল্পী চিরকুমার ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আত্মহননের পথ বেছে নেন।

এ রকম বিচিত্র জীবন যিনি যাপন করে গেছেন, ব্যক্তিত্বে ও শিল্পসত্তায় তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহলের সীমা থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক। লেখক জয়নাল হোসেন পাঠকের সে আগ্রহ ও কৌতূহল মেটানোর জন্য শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবন চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

তাতে উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ ভ্যান গঘের জীবনীই। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবন, শিল্পী হওয়ার জন্য সুবিশাল ভ্রমণ শেষে হেগে এসে গুরুর সান্নিধ্য, হেগ থেকে ন্যুয়েনেনে গমন, ন্যুয়েনেন থেকে শিল্পকর্মের স্বর্গ প্যারিসে থিতু হওয়া, পল গগ্যাঁর সঙ্গে পরিচয়, জর্জেস সিউরাতের সঙ্গে ভাবনাবিনিময়, অঁরি রুশোর সঙ্গে পরিচয়, শিল্পী সেজান ও অ্যামিল জোলার সঙ্গে আড্ডা, নরভিনস রেস্তোরাঁয় ছবির প্রদর্শনী, কমিউনিস্ট আর্ট কলোনি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে উদ্যোগ—কোনো কিছুই বাদ রাখেননি লেখক জয়নাল হোসেন। বাদ রাখেননি কিভাবে আর্লস ও ভূমধ্যসাগরের পাগলা হাওয়া কিভাবে শিল্পীকে পাগল করে তুলেছিল। বাদ রাখেননি র‍্যাচেল নামের এক গণিকার প্রেমে পড়ার বিষয়টিও। এমনকি তাঁকে খুশি করার জন্য কান কেটে উপহার দেওয়ার বিষয়টিও তিনি এনেছেন সুন্দরভাবে। ভ্যান গঘের কান কেটে তাঁর প্রেমিকাকে উপহার দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে কে না জানে! জয়নাল হোসেন জানালেন এই কাহিনির ভেতরের কাহিনি।

ভ্যান গঘ বলেছিলেন, ‘ভালোবাসা অনেক সময় সমস্যা নিয়ে আসে, এটা ঠিক; তবে ভালো দিক হচ্ছে, ভালোবাসা শক্তি জোগায়। ’ প্রেমিক ভ্যান গঘের প্রেমিকজীবনী অনুসন্ধান করলেও এ কথাটির সঙ্গে তাঁর একাত্মতা বোঝা যায়। তিনি ভালোবাসা নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়েছেন, সমস্যা তৈরিও করেছেন। কিন্তু এ ভালোবাসা তাঁকে শক্তিও জুুগিয়েছে।

জাঁ ফ্রাঁসোয়া মিলেন বলেছেন, ‘বেদনাকে রুদ্ধ করতে চাই না। কেননা আমি জানি, এই বেদনাই শিল্পীর বলিষ্ঠতর আত্মপ্রকাশের উৎস। ’ নিবিষ্ট লেখক ও গবেষক জয়নাল হোসেন পরম মমতায় ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবন, কর্ম, শিল্প ও প্রেমিকসত্তার স্বরূপ উন্মোচন করতে চেয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে ভিন্নমাত্রার।


মন্তব্য