kalerkantho


এই কাহিনি শেষ হয়নি

দখল যখন ভিন্নরূপে চলমান

মুহিল কবির

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দখল যখন ভিন্নরূপে চলমান

এই কাহিনি শেষ হয়নি : মঈনুল আহসান সাবের। প্রকাশক : দিব্য প্রকাশনী।

প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর।   মূল্য : ১৫০ টাকা

বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে মঈনুল আহসান সাবেরের উপন্যাস ‘এই কাহিনি শেষ হয়নি’। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে তাঁর কথাসাহিত্যের বিষয় বরাবরই মারাত্মক পর্যায়ের। এই কাহিনি শেষ হয়নির বিষয়ও মারাত্মক, কিন্তু পরিচিত। আমরা অনেকেই এ বিষয় নিয়ে ভাবি, আফসোস করি; কিন্তু কিছু করতে পারি না। কারণ এ বিষয়ের প্রধান কুশীলব থাকে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতাপুষ্টগোষ্ঠী। মঈনুল আহসান সাবের সেই সাহসী লেখক, যিনি যেকোনো ক্ষমতাসীনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।

কী সে বিষয়? বিষয়টি হলো জমি দখল। মঈনুল আহসান সাবের সেই সাহসী কাজটি করলেন।

এ তো গেল বিষয়ের দিক। এ উপন্যাসের বিশেষত্ব আরেক জায়গায়। সেটি বলতে হলে প্রথমে এর কাহিনিতে প্রবেশ করতে হবে।

অনেক আগে সাহানাকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন লেখক। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মারুফের স্ত্রী সাহানা। শহরের প্রান্তে একটি বাড়ি বানিয়েছিল মারুফ। সেখানে সাহানা তার মেয়ে, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী ছেলে আর শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে দিন যাপন করছিল। একদিন এক দখলদার এসে দাবি করে জমি নাকি তার। পত্রিকা অফিস, থানা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিস, এমনকি মন্ত্রী পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি-হাঁটাহাঁটি করেও যখন জমি রক্ষায় ব্যর্থ, তখন মারুফের দূরসম্পর্কের এক ভাই, একাত্তরে যার ভূমিকা ছিল রাজাকার হিসেবে, সে-ই জমিটি সহজে বাঁচিয়ে দেয়।

এর প্রায় ত্রিশ বছর পর লেখক একদিন এক পত্রিকা অফিসে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় স্বপন নামের এক অনুসন্ধিত্সু রিপোর্টারের সঙ্গে। রিপোর্টার লেখককে জানায়, জমি দখল নিয়ে যখন সে প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ফুটপাত থেকে লেখকের বইটি সে কেনে। স্বপন সিদ্ধান্ত নেয়, সাহানার সঙ্গে সে কথা বলবে।

কিন্তু সাহানাকে কোথায় পাওয়া যাবে? সাহানা তো উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র। ফিকশনের চরিত্রের সঙ্গে লেখক কিভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন? লেখক জানান, এটি তো সম্ভব নয়। কারণ সব চরিত্রই কাল্পনিক। রিপোর্টার উত্তর দেয়, কাল্পনিক চরিত্র কি খুঁজে পাওয়া যায় না? লেখক একটু হেঁয়ালি করে ফেলেন, ‘তাহলে খোঁজো তুমি!’

রিপোর্টার শাহানাকে খুঁজতে বের হয়। তার আগে লেখকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে। অনেক বছর আগে লেখা উপন্যাসটি লেখককে আবারও পড়তে দেন রিপোর্টার। লেখকের ধীরে ধীরে মনে পড়ে অনেক কিছু। যে মনস্তত্ত্ব উপন্যাসটি লেখার সময় তাঁর মননে বিরাজ করছিল—সব কিছু বলে ফেলেন লেখক।

শুরু হলো রিপোর্টারের অনুসন্ধান এবং সত্যি সত্যি সাহানাকে পাওয়া গেল। পাওয়া গেল সেই জমি। কিন্তু এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে শুধু তারাই বেরিয়ে আসে না; বেরিয়ে আসে আরেক সত্য।

এই ‘আরেক সত্য’ই এই উপন্যাসের প্রধান প্রাণভোমরা। সত্যটি হলো সাহানার সমস্যা শেষ হয়নি। এখনো দখলের ভয়ে সে অস্থির। এখনো সে ছুটছে এখানে-সেখানে। দখলদারির চেহারা পাল্টেছে শুধু, স্বরূপ পাল্টায়নি।

বিষয়ের দিক থেকে যেমন এ উপন্যাসের বিশেষত্ব রয়েছে, তেমনি বিশেষত্ব রয়েছে এর আঙ্গিকে, উপস্থাপনায়। আখ্যানভাগে লেখকের উপস্থিতিটা বাস্তব। রিপোর্টারও বাস্তব। উপন্যাসের চরিত্র সাহানা তো কাল্পনিক। এ উপন্যাসে বাস্তব ও কাল্পনিক চরিত্রের সাক্ষাৎ ঘটে যায়। অনুসন্ধানের মাধ্যমে রিপোর্টার স্বপন চৌধুরী সাহানাকে খুঁজে বের করে লেখককে নিয়ে যায় তার কাছে। লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে তাঁরই লেখা আপাত-কাল্পনিক চরিত্রের। কিন্তু এ চরিত্র বাস্তবের। কাল্পনিক চরিত্র যখন বাস্তবে এসে ধরা দেয়, তখন সে বিষয়ের গভীরতা ও সংকটটি অকাট্যরূপে প্রমাণিত হয়ে যায়।

লেখক মঈনুল আহসান সাবের আপাত-কাল্পনিক চরিত্রের সংকটটিকে এভাবে বাস্তবে মূর্ত করে তোলেন। এ মূর্ত রূপ বাস্তবের অধিক বাস্তব। এ মূর্তরূপ আমাদের চেনা। এ মূর্তরূপ আমাদের গভীর সংকটের নির্দেশক। এ মূর্তরূপটি চলমান।


মন্তব্য