kalerkantho


মাটির সম্ভার

বুকের ভেতর ঘাসের ঘুঙুর

কবির আহমেদ

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বুকের ভেতর

ঘাসের ঘুঙুর

মাটির সম্ভার : মহাদেব সাহা। প্রকাশক : অনন্যা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ১২০ টাকা

কবিতায় কবির বেদনার স্বাক্ষর থাকে। এ বেদনা হতে পারে বহুমাত্রিক। কবিতায় তা মূর্ত করে তোলার সক্ষমতার ভেতরেই কবির প্রধান সার্থকতা নিহিত। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত মহাদেব সাহার ‘মাটির সম্ভার’ কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় বেদনার স্বাক্ষর। এ বেদনা বহুমাত্রিক হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বদেশের স্মৃতি। এই স্মৃতি আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রত্যেক ছত্রে সঞ্চারিত। কবিতার ছত্রে সঞ্চারিত এসব বেদনা মন্থন আর স্মৃতিগুলো সহজেই পাঠকের মনন ও স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।

এই একাত্মতার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় মহাদেব সাহা সেই কবি, যিনি আজ বহু বছর হলো জনপ্রিয়।

পাঠকের মননের সঙ্গে এই একাত্মতার জন্য তিনি সহজেই সঞ্চার করতে পারেন তাঁর লুকানো অশ্রু। বেদনাবিধুর একেকটি পঙিক্ত নিয়ে মাটির সম্ভার সন্নিবেশিত। বেদনাহত কবির মনে প্রতি মুহূর্তে জেগে ওঠে মাতৃভূমির পবিত্র স্মৃতি, মাতৃভূমির ধূলিকণার পবিত্র স্পর্শ। এই স্পর্শ কবিকে শিহরিত করে। কবি যেন স্বপ্নচালিত হয়ে যান। আর খুঁজে বেড়ান সেই মাটির গন্ধ, ডুবে যেতে চান হারানো অনুষঙ্গের গভীরে ‘আমার হাতে জোনাকিগুলি সব তারার মতো ফুটে আছে/মেলে ধরো দেখবে সন্ধ্যার আকাশ,/বুকে দ্যাখো কণকচাঁপার গন্ধ, চোখে বর্ষার মেঘ/এই সব নিয়ে আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি;/দীর্ঘ জলপথে আমার সাথে এসেছে একঝাঁক ইলিশ/গাঙশালিকের পাখার শব্দ, জলফড়িংয়ের নৃত্য,/দুপুরবেলার উদাস ঘুঘু পাখির ডাক,/এই চিত্রশালা বুকে নিয়ে আমি এত দূর চলে এসেছি;/আমার বুকের মধ্যে দ্যাখো বাউল গানের মূর্ছনা/ভোরের টুপটাপ শিশির-পড়া, আমি সাথে নিয়ে এসেছি জ্যোত্স্না আর ঝাউবন;/অমি যখন আসি তখন পিছু ডাকতে থাকে দুটি টুনটুনি পাখি/ জাঙাল বেঁধে পিঁপড়েগুলি সব পিছে পিছে ছুটতে থাকে,/আমার দুই চোখ হয়ে ওঠে ভাদ্র মাসের ভেজা বন/আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি বুকে নিয়ে/ এই মাটির সম্ভার (মাটির সম্ভার)

গভীরতম বোধ মথিত এই বেদনা পাঠককে খুব আলোড়িত করে। মুহূর্তের মধ্যে নিয়ে যায় তার শিকড়ে। এই শিকড় আবহমান বাংলার। ফলে কবির এই বেদনা মন্থন পাঠকেরও বেদনা মন্থন হয়ে যায়। আজ নাগরিক জীবনের বিকাশের দরুন এসব দৃশ্য হয়তো বা অনুভবে যখন-তখন ধরা দেয় না। কিন্তু মানুষ যখন তার নিজের কাছে ফেরে, তখন এখানেই ফিরতে হয়। কারণ এটাই তার শিকড়।

এই শিকড় এতই গভীর যে আটলান্টিক কেন, এই ঢাকা শহরকেও কবির কাছে অতটা আপন মনে হয় না। আপন হওয়ার জন্য যেসব উপাদান অনুভব করেন কবি, সেসব উপাদান ঢাকায় খুঁজে পাওয়া তো মুশকিল। কারণ ঢাকা শহর যতটা নাগরিক, ততটা আবহমান বাংলা নয়। ফলে কবি সহজেই বলতে পারেন ঢাকা আমার বাড়ি নয়, ‘না, না ঢাকা আমার বাড়ি নয়, আমি এসেছি নদীর কিনার থেকে/ফুলজোড় নদী, আমার প্রথম দেখা মহাসাগর;/নাইতে নেমে গামছায় ধরেছি খসলা মাছ/এখানেই আমার বাড়ি, এই হাটখোলা/রাই সরিষা খেতের ধারে/কত দিন নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি। /এখানেই আমার বাড়ি, পালানে বেগুন খেতে নাচে টুনটুনি পাখি/এই ঘাস আর জলফড়িঙয়ের দেশে, খড়ের গাদার পাশে স্থলপদ্ম/উঠানে লাল মরিচের ডালে শিশিরের ফোঁটা,/এখানেই মা আমাকে গল্প শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে;/এই নেবুতলায়, পিঁপড়ার জাঙ্গাল দেওয়া ঘরে/হাটবারে বেতের ধামায় উপচে পড়া সবজির সম্ভার,/এই নদী বিল পুকুরের পাড়ে আমার ঠিকানা, এখানেই আমার বাড়ি। (ঢাকা আমার বাড়ি নয়)

কবিতাগুলোতে এভাবেই ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার চিত্র। এবং সবগুলোর সঙ্গে কবির পরম স্মৃতি। আর দূর পরবাসে কবি যখন এসব থেকে অনেক দূরে, তখন এগুলো স্মৃতি হয়ে তাঁকে বেদনাবিধুর করে তুলছে। কবি সেই সব বেদনা কবিতার অবয়বে প্রকাশ করেছেন। এতে একদিকে আবহমান বাংলার সামগ্রিক চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি মূর্ত হয়ে উঠেছে মাতৃভূমির জন্য প্রবল হাহাকার ও পিপাসা।


মন্তব্য