kalerkantho


একাত্তর ও অন্যান্য গল্প

মেলার তৃতীয় সপ্তাহের ৫ বই

জীবনবাস্তবতার নিরঙ্কুশ পাঠ

এমরান কবির   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মেলার তৃতীয় সপ্তাহের ৫ বই

একাত্তর ও অন্যান্য গল্প : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল। মূল্য : ২০০ টাকা

ছোটগল্প তো অক্ষর দিয়ে সাজানো আমাদের জীবন অথবা চিন্তার বিকল্প প্রতিবিম্ব। প্রশ্ন হলো, এই বিকল্প প্রতিবিম্বের কাছে আমরা কী চাই? কাহিনি? ধারাবিবরণী? সংকটের চিত্র? সমাধানের সূত্র? গুজব? ভাষার মারপ্যাঁচ? সরল গরল কথামালা? আধো বাস্তবতার আলেখ্য? এই সিরিজ প্রশ্নের শেষ নেই। এই অন্তহীন প্রশ্নমালার শেষ বিন্দুর পরে যে মহাশূন্যতা বিরাজ করে, সেখান থেকেও উঠে আসে জীবনের আলো। এই আলো বহুবর্ণিল। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সেই গল্পকার, যাঁর গল্পে উঠে আসে জীবনের ওই বহুবর্ণিল আলো।

বইমেলায় প্রকাশিত ‘একাত্তর ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে সূচিবদ্ধ ৯টি গল্পের মাধ্যমে তিনি উপর্যুক্ত কথাগুলো আবারও প্রমাণ করলেন। আমরা জানি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প মানেই ভিন্নতর কিছু। বক্তব্যে, উপস্থাপনায়, প্রাঞ্জলতায়, বুননে—সর্বোপরি গল্পের ভেতরে গল্প বলায় তিনি অনন্য।

আলোচ্য গ্রন্থের সূচিবদ্ধ গল্পগুলোতেও সেই বক্তব্য পাওয়া যায় যা ভিন্নতর; সেই উপস্থাপনা, যা একান্তই মনজুরুলীয়, সেই প্রাঞ্জল ভাষা, যা পাঠককে সহজেই যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয় গল্পের সঙ্গে, গল্পের পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে, সেই বুনন—যেখানে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই। এসবের মাধ্যমে যা তিনি তুলে আনেন, তা প্রতিদিনের জীবনযাপন, তা আমাদের প্রেম-ভালোবাসার পরিণতি, তা আমাদের ক্রোধ, তা আমাদের জিঘাংসাবৃত্তি, তা আমাদের লোভের চিত্র, তা আমাদের হতাশার গ্লানি। তিনি শুধু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উপরিতলের চিত্রই আঁকেন না, নিয়ে যান গভীরে। ফলে তাঁর গল্পগুলো হয়ে ওঠে মনোগ্রাহী। হয়ে ওঠে সংবেদী।

যেমন প্রথম গল্প ‘একাত্তর’-এর কথাই ধরা যাক। চৌদ্দো বছরের এক মেয়ের জবানিতে গল্পটি বলা। তার বাবা বন বিভাগে চাকরি করেন। অন্য মানুষের শুধু একটি জিনিস হারানোর ভয়, জীবন। কিন্তু চৌদ্দো বছরের মেয়ের হারানোর ভয় দুটি জিনিসের। সম্ভ্রম ও জীবন। একাত্তর সালে এ রকম এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানিরা। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার বাবার অফিসের পাশে বনের মধ্যে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। একদিন ভোরে তারা রওনা দেয়। বাবার বিশ্বস্ত চার কর্মী মিলে উঁচু পাটাতনের ওপর ছনের ছাউনি আর বাঁশের বেড়া দিয়ে একটা ঘর করে দিয়েছে। বাবা ঘর দেখে খুব খুশি। হেসে মাকে বলেন, ঘরটা নিরাপদ।

এই ‘নিরাপদ’ ঘরটিতে শুরু হলো তাদের বসবাস। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বাঘ। বনের ভাষায় যাকে বলা হয় মহারাজ। একদিন মেয়েটির সঙ্গে মহারাজের চোখাচোখি হলো। নতুনতর এ আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন মা-বাবা। মেয়েটি অতটা আতঙ্কিত হলো না। কারণ মহারাজের কাছে জীবন হারানোর ভয় থাকলেও সম্ভ্রম হারানোর ভয় নেই।

এর মধ্যে একদিন সকাল এগারোটার দিকে আশ্চর্য হৈচৈ শুরু হলো। হৈচৈয়ের শব্দগুলো আতঙ্কের। ক্রোধের। ভয়ার্ত সব কণ্ঠের। গুলির শব্দও শোনা গেল। বাবা বের হয়ে গেলেন ঘর থেকে। এক ভয়ংকর সময় গেল। একসময় বাবা ফিরে এলেন। জানা গেল, একটা ছোট গানবোটে সাত-আট পাকিস্তানি সেনা এসেছিল। দুটি গ্রাম জ্বালিয়েছে। গোটা দশ মানুষ মেরেছে। হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটি বাঘ। বাঘের আঘাতে পাকিস্তানিগুলো বিপর্যস্ত হয়েছে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে পানিতে। বাঘটা কারো ঘাড় মটকেছে, কাউকে মেরেছে থাবার আঘাতে। যারা পানিতে পড়েছিল, তাদের কেউ কেউ ডুবে মরেছে। বাকিদের লাঠি আর দা দিয়ে মেরেছে পুড়ে যাওয়া গ্রামের বেঁচে যাওয়া মানুষরা। বাবা ধরা গলায় এ কথাও বললেন যে মহারাজও হয়তো মারা গেছে।

বাবা আর পাহারাদাররাসহ গ্রামের কিছু মানুষ  বাঘটাকে খুঁজে পেল। গুলিতে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। বাবা বললেন, এ আমাদের পরম বন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা।

গল্পের শেষ পর্যন্ত না এলে বোঝা মুশকিল যে কী হতে যাচ্ছে। এই গল্প পড়ার সময় মনে হতে পারে, বাঘ বুঝি তাদের আক্রমণ করবে। কিন্তু বাঘ তাদের আক্রমণ করল না। বরং তাদের হয়ে যুদ্ধ করে জীবনটাই দিয়ে দিল। এভাবে তিনি জীবনের অনেক সত্য উন্মোচিত করেন। যেখানে আমরা প্রায়ই ভুল করি শত্রু-মিত্র চিনতে। তিনি গল্পের মাধ্যমে তা চিনিয়ে দেন। যা আপাতত সাধারণ ভাবনায় আমাদের মাথায় খেলে না।


মন্তব্য