kalerkantho


বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্য-কাহিনি

রক্তাক্ত ইতিহাসের দলিল

হানযালা হান

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রক্তাক্ত ইতিহাসের দলিল

বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্য-কাহিনি :  খন্দকার মাহমুদুল হাসান। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ।

প্রকাশক : দিব্যপ্রকাশ।

মূল্য ৬০০ টাকা।

বিশিষ্ট গবেষক ও শিশুসাহিত্যিক খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্য-কাহিনি’ বইটি পড়ে চমত্কৃত হয়েছি। এত এত তথ্য যে এতে রয়েছে, ভাবা যায় না। এক অর্থে এ বইটিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তথ্যের খনি বলা যায়। একই সঙ্গে তথ্যের উৎসও দেওয়া হয়েছে। ফলে ইতিহাসকে যতটা বিশ্বাসযোগ্য করা যায়, তা তিনি করেছেন।

পাকিস্তানিরা হঠাৎ করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করেনি। অনেক আগে থেকে তারা এ জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।

বাংলাকে ছোট করার চেষ্টা করেছে। বাংলার ওপর প্রথম আঘাত হানে ব্রিটিশরা। ১৭৭৮ সালে স্যার উইলিয়াম জোনস প্রথম রোমান হরফে (ইংরেজি বর্ণ) বাংলা লেখেন। তখন ইংরেজরা ভারতীয় ভাষাগুলোকে রোমান হরফে লেখার সুপারিশ করে। ইটন কলেজের সহকারী শিক্ষক ড্রু ও প্রফেসর মনিয়র এর পক্ষে ছিলেন। লাহোর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও পাঞ্জাব মহাবিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডাক্তার লাইটনর এবং আরো দুজন ইংরেজ এর প্রতিবাদ করেন। ভেস্তে যায় ইংরেজদের পরিকল্পনা। ১৯৩৯ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেন। এর পক্ষে ছিলেন মওলানা আকরম খাঁ ও কবি গোলাম মোস্তফা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের বিরোধিতায় এ প্রস্তাব ব্যর্থ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ বিশেষ সমাবর্তনে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করেন। এর আগে ১৯ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এটা বলেছিলেন। কার্জন হলে বলার পর ছাত্ররা প্রতিবাদ করেন। বাঙালিদের রক্তঝরা আন্দোলনের মুখে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকার উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ অনুযায়ী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করা হয়। বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। এবার ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছরপূর্তি। কিন্তু, সত্যিকার অর্থে বাংলা আজও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পুরোপুরি প্রয়োগ হয়নি।

মীর মশাররফ হোসেন প্রায় ২০০ বছর আগে বলেছেন, ‘মাতৃভাষায় যাহার আস্থা নাই, সে মানুষ নহে। ’ যে পরিপ্রেক্ষিতে বলে থাকুন না কেন, এ কথা আজও প্রযোজ্য। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজীকরণের প্রবণতা উদ্বেগজনক। মা-বাবারা চান সন্তান ইংরেজিতে কথা বলুক। অথচ, সন্তানের মধ্যে মানবিক গুণাবলি ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটছে কি না, তা তাঁরা তলিয়ে দেখছেন না।

বইয়ের বাকি অর্ধেক অংশ জুড়ে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। পাকিস্তানের গণতন্ত্রহীনতা, ’৫৬-র সংবিধান, সামরিক শাসন, আইয়ুব খানের ক্ষমতা গ্রহণ, ‘৬৩-র সংবিধান, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য, ১৯৬২-র ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ভুট্টোর চক্রান্ত, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা, মুজিবনগর সরকার, শরণার্থী, পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ প্রভৃতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানি বাহিনী যে ২৫ মার্চ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তার ওয়্যারলেস কথোপকথন এই বইতে দেওয়া আছে। এই কথোপকথনের এক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে, ‘বেলালের দলবল মেইন বার্ডকে খাঁচায় ভরা থেকে শুরু করে দুটো টেলিফোন একচেঞ্জ, রমনা থানা, পিপলস ডেইলি, রিজার্ভ লাইন চালাচ্ছে। ’ এখানে ‘মেইন বার্ড’ বা আসল পাখি বলতে শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝানে হয়েছে।

শেষে লেখক একটি গ্রন্থপঞ্জিও জুড়ে দিয়েছেন। বইটিতে কিছু দুর্লভ ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এমন বই পাঠের সুযোগ করে দেওয়ায় লেখককে ধন্যবাদ।


মন্তব্য