kalerkantho


বাদল ব্রাদার্স

জীবন থেকে নেওয়া দিনযাপনের গল্প

মাসউদ আহমাদ

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০





জীবন থেকে নেওয়া দিনযাপনের গল্প

বাদল ব্রাদার্স : মোস্তফা মামুন, প্রচ্ছদ : নাজির হোসেন। অন্বেষা প্রকাশন : বইমেলা ২০১৭, দাম : ১৬০ টাকা।

‘গরিব হওয়ার হাজারটা অসুবিধা, কিন্তু সুবিধাও আছে কিছু। সামান্যতেই কী আনন্দ পাওয়া যায়। ’

আমাদের প্রতিদিনের জীবন তো এমনই। সরল ও আটপৌরে, বহুমুখী টানাপড়েন ও গ্লানির কুয়াশায় ভরা। মোস্তফা মামুনের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘বাদল ব্রাদার্স’-এর শুরুতেই জীবনের এই সরল ও আনন্দময় গল্পের গন্ধ পেয়ে উঠবেন পাঠক। ‘বাদল ব্রাদার্স’ নামটি শুনলে মনে হতে পারে, এটা হয়তো কোনো দোকান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আদতে তা নয়। একটি চমৎকার পরিবারের গল্প ‘বাদল ব্রাদার্স’। বাদলের পুরা নাম শামসুল করিম বাদল।

সে পরিবারের বড় ছেলে। সংসারে অনেক সদস্য, ভাড়া বাড়িতে থাকে, অভাবের তাপ ও চাপে বেঁকে যেতে যেতে উঠে দাঁড়ায় মানুষগুলো; দিন ফুরায়, রাত ভোর হয়—কিন্তু অভাব তাদের কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। পরিবারটি ভাড়া থাকে কাশেম সাহেবের বাড়িতে। বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় অফিস থেকে লোক এসে লাইন কেটে দেয় (পরে চোরাই লাইন নেওয়া হয়), প্রতি মাসে ঠিকমতো ভাড়া দেয় না, উল্টো টাকা ধার নেয় বাড়িওয়ালার কাছে। নিয়মিত। বাড়িওয়ালাও মানুষ অন্যরকম, মিলেমিশে রাখে তাদের। কখনো ভয়ও পায়। কারণ ভাড়াটিয়া জীবনের দায়ে সুইসাইড করার কথাও বলে যে। আহা, বেচারা। বিশেষ দিনে অবাক আনন্দের উদ্‌যাপন এবং দিনযাপন করে ‘বাদল ব্রাদার্স’-এর সদস্যরা। ছোটদের পাঠকপ্রিয় লেখক মোস্তফা মামুন অনেক দিন পর উপহার দিলেন পাঠানন্দ জাগানিয়া আখ্যান। মামুনের লেখার ভঙ্গিটি বেশ সুন্দর ও ঈর্ষণীয়। তাঁর লেখাতে সেন্স অব হিউমার অসাধারণ। স্বচ্ছ ও সরল গদ্যে এমনভাবে গল্প বলে চলেন, মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। আর জীবন সম্পর্কে তাঁর সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি, রসবোধ। সামান্য গল্পকেও তিনি অসামান্য করে তুলতে পারেন।

গল্পে বিচিত্র চরিত্র আসতে থাকে। স্নিগ্ধা ও ডলির পাহাড় ডিঙানোর আকাঙ্ক্ষা এবং গোপনে পুরুষের মতো শার্ট-প্যান্ট পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করার বাসনা, গোবিন্দ চন্দ্র কলেজের ছাত্র সংসদে প্যানেলে কমলের নির্বাচনে দাঁড়ানো, আগাম হারা ও জেতার উত্তেজনার মুহূর্তগুচ্ছ, মন্টুর বাঁধহীন বাউণ্ডুলেপনা, আঁকাআঁকির স্কুলে রন্টুর প্রথম হওয়া—এমনসব মজার গল্প ঘুরপাক খায়। গল্প তৈরি হয়। গল্প উঁকি দেয়, কখনো মাথা তুলে দাঁড়ায়। বাদল ব্রাদার্সের সদস্যরা অভাব ও সংকটের ভেতরেও আনন্দপূর্ণ জীবন পার করে চলে।

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে রন্টু সবার ছোট। সবাই তাকে আদর করে মাথায় তুলে রাখে। একদিন সে তার দুই বন্ধুকে নিয়ে ফেসবুকে ফাঁদ পাতে। মেয়ে সেজে লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করে। ক্লাসের সুন্দরী মেয়েদের ছবি তুলে সেগুলো দিয়ে ওদের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। বড়ভাই বাদলের প্রেমিকা স্নিগ্ধা, রন্টুর এসব বিকৃত কাণ্ড দেখে বিস্মিত হয়ে নিজেকে দোষ দেয়। কারণ সে তাকে স্নেহ করত। রন্টু কৈফিয়ত দেয়—‘জীবন উপভোগ করাই আধুনিকতা। ’

গল্পে অদ্ভুত সব চরিত্র উঁকি দেয়। একদিন রুশো সাহেবকে নিয়ে গোলমাল দেখা দেয়। পুলিশও লেগে যায় পেছনে। কেন? একজন মানুষের স্ত্রী পালিয়ে গেছে, তারপর থেকে স্বামী নিখোঁজ। কী হবে এখন? বাড়িওয়ালাকে পুলিশ থানায় ডেকে নেয়। কথায় আছে—পুলিশ ছুঁলে আঠারো ঘা। বাড়িওয়ালা ফাঁপরে পড়ে যান, কী হয়! দারোগা ঠাণ্ডা গলায় বলেন—রুশো সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে আপনার মেয়ের বেশ খাতির ছিল। ’ বাড়িওয়ালা নিঃশব্দে ঢোক গেলেন। গল্প এগোতে থাকে।

উদয়ন সাহিত্য পরিষদের গল্পটিও মজার। লাতিন সাহিত্য অনুবাদে পড়া আর শাক দিয়ে পোলাও খাওয়া একই ব্যাপার—এসব প্রসঙ্গ পরিষদের আলোচনায় উঠে আসে। ঢাকার প্রকাশনা থেকে বাদলের উপন্যাস বেরোচ্ছে, একদিন চাউর হয়। খবরটি দেন সভাপতি ফজল ভাই। বাদলের প্রেমিকা স্নিগ্ধা অত্যন্ত সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী। উপন্যাস বেরোনোর খবরটি স্নিগ্ধা ও বাবাকে জানানোর পর শুরু হয় অন্য গল্প। বাবা বলেন, ‘বই কী করে বের হয়?’ গল্প এগোতে থাকে। বাবা যখন জানতে পারেন, বই বের হবে সেন্টু করিম নামে, তিনি আহত ও বিস্মিত হন—‘সেন্টু করিম? সে আবার কে?’ বাদল বাবাকে বোঝাতে পারে না যে লেখক হতে গেলে একটা ইউনিক নাম দরকার।

গল্প এগোতে থাকে। মন্টুদের শহরে একদিন বড় ঘটনা ঘটে। লিয়াকত ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশের রাস্তায়। কেউ তাকে গভীর রাতে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। এই ডামাডোলের ভেতরেই একদিন কমল জেল থেকে বেরিয়ে আসে। বিশাল সংবর্ধনা পায়। সালাম-লিয়াকতহীন শহরে এখন থেকে কমলই নেতা। ‘দুনিয়াটা সত্যিই পাগলামি। ফকিরের ছেলে শহরের রাজা। পুরাই পাগলামি’—; গল্পের শেষে দাঁড়িয়ে মন্টুর বাবার মতো পাঠকেরও মনে হয়।


মন্তব্য