kalerkantho


জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ

কথাশিল্পী শওকত ওসমান : শতবর্ষী উন্মোচন ও মূল্যায়ন

মুহিল কবির

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০





কথাশিল্পী শওকত ওসমান : শতবর্ষী উন্মোচন ও মূল্যায়ন

কথাশিল্পী শওকত ওসমান : জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ—সম্পাদনা : আহমদ রফিক। প্রকাশক : জয়তী।

প্রচ্ছদ : শুভজিৎ সরকার। মূল্য : ৩৫০ টাকা

ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের কয়েকজন ছাত্র একদিন প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে গিয়ে অভিযোগ করল। আজিজুর রহমান স্যার ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান না। সিলেবাসের বাইরে কী সব কথাবার্তা বলেন! প্রিন্সিপাল স্যার অভিযোগ শুনলেন এবং দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, তিনি যে এই কলেজে পড়ান, সেটা তোমাদের যেমন ভাগ্য, আমাদেরও। তাঁর যেকোনো কথাই মূল্যবান। শেখ আজিজুর রহমান সাহেব আসলে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। ছাত্ররা এর-ওর মুখের দিকে চেয়ে প্রিন্সিপালের রুম থেকে বের হয়ে এলো। প্রচলিত গল্পটি যাঁর সম্পর্কে বলা হলো, বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনিই একদা আমাদের জাতির অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব শওকত ওসমান। ভাষা আন্দোলনের পর যে কজন কথাসাহিত্যিকের হাত আমাদের কথাসাহিত্যকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, তিনি তাঁদের অন্যতম।

সদ্য রাষ্ট্রভাষা মর্যাদা পাওয়া ভাষাটির ভিত্তি রচনায় সাহিত্যের ছিল অগ্রগণ্য ভূমিকা। শওকত ওসমান ছিলেন তাঁর অন্যতম কুশীলব। সাহিত্যে প্রতীকের মাধ্যমে যিনি দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সাধ। স্বাধীনতা-উত্তর যিনি এ দেশের প্রতিটি কালখণ্ডে রেখেছিলেন অভিভাবকের ভূমিকা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং প্রগতিশীল চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণে তাঁর ভূমিকা সীমাহীন। এই মহান ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি। সে হিসেবে এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। জন্মশতবর্ষে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। সেসব স্মরণাঞ্জলির এক সন্নিবেশ কথাশিল্পী শওকত ওসমান : জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ। প্রকাশ পেল চলতি বইমেলায়। সম্পাদনা করেছেন ভাষাসৈনিক, কবি ও রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক।

ব্যক্তি শওকত ওসমানের বন্ধুত্বে ও সান্নিধ্যে ধন্য এমন নবীন-প্রবীণ বহুজনের নানা রকম রচনা স্থান পেয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। বেশির ভাগই স্মৃতিচারণা। তবে স্মৃতিচারণার সঙ্গে সঙ্গে লেখক শওকত ওসমানের মূল্যায়নও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাঁর উপন্যাস নিয়ে, তাঁর ছোটগল্প নিয়ে, ছোটদের নিয়ে, তাঁর রচনাগুলো নিয়ে এবং তাঁর রচনাশৈলী ও ভাবচেতনা নিয়ে লিখেছেন। এ তালিকায় যেমন রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, কবি আবুল হোসেন; তেমনি রয়েছেন শাহরিয়ার কবির, শান্তনু কায়সার হয়ে তৌহিদ আহমদ পর্যন্ত।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের রচনা থেকে জানা যায় সত্যজিৎ রায়ের সমাপ্তি সিনেমার সেন্সর শো নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা। তখন তাঁরা দুজনই বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য। রবি ঠাকুরের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন অভিনীত সত্যজিৎ রায়ের এ ছবিটি শেষ দৃশ্য নিয়ে সেন্সর বোর্ড বিভক্ত হয়ে গেল। শেষ দৃশ্য ছিল—সৌমিত্র ও অপর্ণা বিয়ের পর ঘরের দরজা বন্ধ করল। পর্দায় ভেসে উঠল সমাপ্তি। সেন্সর বোর্ডের কয়েকজন সদস্য আদি রসের সন্ধান পেয়ে দৃশ্যটির কাটিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। শওকত ওসমান এমন এক নান্দনিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন যে সবাই তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে গেল। কাঁচি থেকে রক্ষা পেল সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা।

এরপর আমরা পাই কবি আবুল হোসেনের মূল্যায়ন। অবশ্য তা বেশির ভাগই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা। সন্তোষ গুপ্তের রচনায় পাই কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের মূল্যায়ন। যতীন সরকার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যিক মূল্যায়নও করেন। হাসান আজিজুল হক, হায়দার আকবর খান রনো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাশেম খান, শাহরিয়ার কবির, পার্থপ্রতিম মজুমদার, রণজিৎ বিশ্বাস, রফিকুল্লাহ খান, ফারুক নওরোজ, আন্দালিব রাশদী, সোহরাব হাসান, মোহাম্মদ আবু হেনা, মোস্তফা তারিকুল আহসান, মাসুদুল হক,  সৌরভ শিকদার, আহমদ রফিক প্রমুখের রচনায় প্রতিফলিত হয় বহুমাত্রিক শওকত ওসমানের বিভিন্ন রকম ভূমিকার কথা। কেউ তাঁকে দেখেন নবজীবনের ধারাভাষ্যকার হিসেবে, কেউ তাঁর গল্পে পেয়েছেন সামাজবাস্তবতার জীবন্ত চিত্র, কেউ তাঁকে দেখেছেন জীবনের প্রকৃত আলোর দিশারি হিসেবে।

এভাবে একজন বহুমাত্রিক শওকত ওসমানের মূল্যায়ন পাই এই গ্রন্থে। জন্মশতবর্ষে এসে তাঁর সমসাময়িক এবং উত্তর প্রজন্মের এ ধরনের মূল্যায়ন নিশ্চয়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সম্পাদক আহমদ রফিক নবীন-প্রবীণ লেখকের সমন্বয় করেছেন। তাতে শওকত ওসমানের প্রকৃত মূল্যায়নের চিত্রই ফুটে উঠেছে।


মন্তব্য