kalerkantho


মানুষের পায়ের আওয়াজ

গল্পে গল্পে প্রাগৈতিহাসিক বিজ্ঞান

সীমান্ত নওশের

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গল্পে গল্পে

প্রাগৈতিহাসিক বিজ্ঞান

মানুষের পায়ের আওয়াজ : মুহাম্মদ ইব্রাহীম। প্রকাশক : অনন্যা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ৬০০ টাকা।

 

ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম বিজ্ঞান লেখক হিসেবে এবং নানা মাধ্যমে বিজ্ঞানের জনপ্রিয়করণের জন্য খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। এবারের বইমেলায় অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর লেখা বই ‘মানুষের পায়ের আওয়াজ’। এটি মূলত প্রাগৈতিহাসিক নানাজনের বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প।

 

মানুষের যখন লিপি ছিল না, ইতিহাস লিখে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, সেটি প্রাগৈতিহাসিক কাল। মানুষের অস্তিত্বের ও অগ্রযাত্রার বেশির ভাগ সময়জুড়ে রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক কাল। এই অগ্রযাত্রার পায়ের আওয়াজ ক্ষীণ থেকে স্পষ্টতর হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছতে পারছে একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও গবেষণার মাধ্যমে। এ গবেষণার ভিত্তিতে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা যুগের মানুষের যে জীবন, যে সংস্কৃতি উদ্ঘাটিত হয়েছে, তার ভিত্তিতেই বইটির গল্পগুলো রচিত।

একেকটি গল্প বহু যুগের ওপারের একেকজন কল্পিত মানুষকে নিয়ে, যার জীবন-বৈশিষ্ট্যের ও সুখ-দুঃখের কাহিনিতে ওখানকার সেদিনের মানুষকে পাঠক দেখতে পাবে।

আধুনিক বিজ্ঞানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এমন সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে যে সামান্য একটু হাড়ের টুকরা অথবা কাদায় আটকানো ক্ষুদ্র পরাগরেণু থেকে সেদিনের পরিবেশ ও জীবন-সংগ্রামের একেকটি দিক উদ্ঘাটিত হতে পারে। অবশ্য পাথুরে নিদর্শন সব সময় মানুষের ভাবনা, স্বপ্ন, কল্পনা ধারণ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ সেই সুদূর অতীত থেকে যেসব নান্দনিক শিল্পকর্ম রেখে গেছে, গল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেখান থেকেও এসেছে। বইটির একেকটি গল্পের পেছনে এসব কী কী উদ্ঘাটন কাজ করেছে তার কিছু ব্যাখ্যা প্রতিটি গল্পের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সেদিক থেকে বইটি আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াসও বটে।

বইটির প্রতিটি গল্প লেখকের বানিয়ে তোলা। গল্পগুলোর পাত্র-পাত্রীর বেশির ভাগের নামও লেখকের দেওয়া। কিন্তু গল্পগুলোর ওপর বিজ্ঞানের কড়া খবরদারি আছে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানটি হলো প্রত্নতত্ত্ব। তখন লিপি না থাকার ফলে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনের কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা আমাদের কাছে নেই। অন্যত্র লিপি উদ্ভাবনের অনেক পরেও বহু মানব গোষ্ঠী এর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে তাদের বর্ণনাও নেই। মানুষের উদ্ভবের পর থেকে অতি দীর্ঘকালজুড়ে এই প্রাগৈতিহাসিক মানুষ সম্পর্কে আমরা একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উদ্ঘাটিত নিদর্শন থেকেই কিছুটা জানতে পেরেছি। সেই জানাটুকুর ওপর ভিত্তি করেই মুহাম্মদ ইব্রাহীম লিখেছেন বইটির এই গল্পগুলো।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সম্পর্কে পড়ার অভ্যাস থেকে, কোনো কোনো নিদর্শন নানা মিউজিয়ামে দেখে, বাকি অনেকগুলোর ফটো দেখে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবন নিয়ে প্রায়ই ভেবেছেন লেখক। নানাভাবে প্রাচীন জীবনকে মনে ধারণ করার একটি রোমান্টিক আনন্দ গল্পগুলো লেখার পেছনে প্রেরণা জুগিয়েছে লেখককে। এসব গল্পের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে পাঠককে নিশ্চিত রাখার জন্য প্রত্যেক গল্পের পর একটি আলাদা অংশে সংক্ষেপে জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কী কী প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ঘাটনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে, তার কোনটি গল্পের কোন অংশে অনুপ্রাণিত করেছে। এভাবে আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের কিছু কিছু কৌশলের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়ার সুযোগ হয়েছে লেখকের।

এসব গল্প পড়ে পাঠক প্রাগৈতিহাসিক নানাজনের গল্পের মধ্যে যুগে যুগে মানুষের অগ্রযাত্রার একটি ধারাবাহিকতা খুঁজে পাবেন। এ যেন সব ছোটগল্প নিয়ে একটি বড় গল্প। সুদূর নানাকাল থেকে ভেসে আসা মানুষের পায়ের আওয়াজের গল্প।

৪১৩ পৃষ্ঠার এ বইটিতে মোট ৩৪টি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্পই সুখপাঠ্য। ভাষার সহজতার কারণে বড়দের পাশাপাশি কিশোররাও বইটি পড়ে অনেক কিছু শিখতে পারবে। জানতে পারবে মানুষের ইতিহাস। মানুষ কোন কোন ধাপ অতিক্রম করে আজকের এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তার বিস্তারিত একটা ধারণা পাবে পাঠক। গল্পগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ছবিও যুক্ত করা হয়েছে। পাঠকের মধ্যে বিজ্ঞান-সচেতনতা জাগিয়ে তোলার জন্য এ ধরনের বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী।


মন্তব্য