kalerkantho


তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি

যে থাকে মনের কোণে, সঙ্গোপনে

শাহিন আহমেদ

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



যে থাকে মনের

কোণে, সঙ্গোপনে

তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি—আল মাহমুদ। প্রকাশক : জয়তী। প্রচ্ছদ : আহমেদ ফারুক। মূল্য : ১০০ টাকা

 

যে থাকে মনের কোণে, সঙ্গোপনে, তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে যদি বোঝা যায়, সে তো নেই—তখন থাকা না-থাকাজুড়ে বিরাজ করে এক বিশাল শূন্যতা। একটু আগের হাসির ঝিলিক কোথায় যে মিলিয়ে যায়! তবু যেন ধরা দেয় দেহের গন্ধমদির। এসব রহস্যময়তা নিয়ে, এসব যত সব ধরা না-ধরা নিয়ে, ‘তুমি’ নামক চিরন্তন মানসীকে হারিয়ে ফের কুড়িয়ে পাওয়ার কাব্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন কবি আল মাহমুদ। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি কাব্যগ্রন্থখানি মেলায় এনেছে জয়তী প্রকাশনী।

ভূমিকায় কবি জানাচ্ছেন, ‘যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে কোনো আত্মপ্রকাশের ইচ্ছা, বাসনা, কামনা এবং সব মিলিয়ে এর নাম কাব্য’। একটুও মিথ্যা বলেননি কবি। পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে, হারিয়ে আত্মহারা হয়ে, কামনায় লীন হয়ে, বাসনায় অধীর হয়ে তিনি লিখেছেন এ কাব্য। এই সব মিলিয়ে কবির ‘আত্মপ্রকাশের ইচ্ছা’ তাঁর অদম্য প্রেমিক সত্তা ও কবিতায় অফুরন্ত দমের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

কবি আল মাহমুদ সেই সার্থক সত্তার অধিকারী।

নানা ধরনের কবিতা রয়েছে গ্রন্থটিতে। মৃত্যুচিন্তাময় কবিতা ‘ফেরার গাড়ি’তেও চিরন্তন গ্রামবাংলার উপস্থিতি। রয়েছে আরোপিত স্রষ্টা নিবেদন। কবিতা কখনোই নামাজান্তের মোনাজাত নয়। এ অংশটুকু বাদ দিলে কাব্যগ্রন্থটিতে যা থাকে তা-ই প্রকৃত আল মাহমুদ। সে আল মাহমুদ প্রকৃত প্রেমিক সত্তা নিয়ে হাজির হন। তার ভেতরে থাকে রহস্যের ইন্দ্রজাল। থাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যঘন অবগাহন। থাকে প্রেমের পেলব স্পর্শ। থাকে যৌনতার রহস্যভেজা দাগ। ‘তোমার কানেই ফিস ফিস করে বলি,/ লও গো যুবতী, পুষ্পের অঞ্জলি। ’ (একি অলৌকিক ছন্দ!)। কিংবা খুঁজতে খুঁজতে বুঝতে পারি তুমি তো নেই,/একটু আগেই ছিলে আমার গতর ঘেঁষেই, /এই ধরেছি তোমার দেহের গন্ধমদির/ আঁচলখানি টানাটানি করলে দেখো/ পড়বে খুলে সোনার খনি, ও সাবধানী। (টানাটানি, ও সাবধানী!) কিংবা গান বেঁধেছি তোমায় নিয়ে মান করো না নারী/ তুমি তো এক সৃষ্টি অবাক; বৃষ্টিভেজা শাড়ি। /আঁচলখানি ধরতে পারি কিন্তু দ্বিধা লাগে/ চোখের কোনায় উপচে ওঠে অশ্রু সবার আগে। (কবির নামে হয় না গড়া কোনো তাজমহল)

 কবিতার ভাষার জটিলতা নিয়ে যখন বিস্তর অভিযোগ, তখন আল মাহমুদের এ গ্রন্থখানি হতে পারে এক প্রকৃষ্ট জবাব। কারণ তাঁর বলার ভঙ্গিটা আটপৌরে, ক্লান্তিহীন, সাধারণ। রংচংহীন সাদামাটা, মুখের ভাষার কাছাকাছি। অতি চেনা শব্দ দিয়েই তিনি শুরু করেন। বলে যান। তারপর কখনো একটু ব্যাপ্তিতে বিকশিত হন, কখনো খুব তাড়াতাড়িই উপসংহারে পৌঁছে যান। মাঝখানে পরিভ্রমণ করান বিস্তর পথ। পাঠকও তুমুল আকর্ষণ নিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথে ভ্রমণ করতে থাকেন। যখন তাঁর বক্তব্য বিকশিত হতে থাকে, তখন পাঠকও তাতে লীন হয়ে যান, যখন ব্যাপ্তিহীন তাঁর বক্তব্য, যখন খুব অবিকশিত কিংবা যখন হঠাৎ শেষ হয়ে যায় তখনো পাঠক হোঁচট খান না। কারণ সব যাত্রার সব ধরনের গতি-প্রকৃতি তাঁর চেনা। সেই চেনা পথে কিভাবে পাঠককে শীর্ষ সুখ দেওয়া যায় তা খুব ভালো করে জানা। পাঠক তাতে অভিযোজিত হয়ে যান। যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল। মজার বিষয় হলো, এই আত্মলীন করে তোলার পাশাপাশি আসল কাজটিও সেরে ফেলেন। যা বলার তা বলে দেন। যতটুকু দরকার ততটুকুই। মেদহীন, ঝরঝরে।

তাতে মনে হয় অতি সাধারণ এ কাব্য প্রয়াস। এটা যে কেউ-ই পারে। কিন্তু আসলে তা নয়। এটা এত সহজ নয়। এটা যে কেউ-ই পারে না। তাহলে কেন মনে হয় এমনটি? কারণ ব্যবহারিক শব্দ, ঘরোয়া ভঙ্গি আর চেনাজানা উপস্থাপন। কিন্তু তা অবশ্যই নিজস্ব। আল মাহমুদীয়। এবং এই তিনটি বিষয় কেউ আত্মস্থ করতে পারলেও যে জিনিসটি তাঁকে অনন্য করে তোলে সেটা অন্য জিনিস। জিনিসটি হলো যা কিছু দৃশ্যমান ও শ্রুতিগ্রাহ্য, তা ব্যতিরেকে এর অন্তঃস্থ অন্য এক সত্তা রয়েছে, যা পাঠশেষে ভিন্নতর উপলব্ধির ছাঁকনিতে ধৃত হয়। এখানেই প্রকৃত কাব্যসত্তার পরিচয় দিয়ে ফেলেন কবি আল মাহমুদ। ‘আমি তো হাঁটছি তোমাকে ঘাঁটছি অন্তরালে/ পাখি উড়ে যায় গাছ থেকে গাছে শূন্য ডালে/’ (ধূসর গোধূলি)। গাছ থেকে গাছে পাখি উড়ে যায়। কবি আল মাহমুদ পার করে ফেলেন জীবনের দীর্ঘ কাব্য-পথ। একসময়ের বিপরীত মতাদর্শে নিজেকে বিসর্জিত করলেও মাঝেমধ্যে তাঁর কাব্যের অভ্যন্তরে এখনো প্রথম যৌবনের আদর্শের খেল খেলে যায়, অজান্তেই। তাই তো আক্ষেপ জাগে, যদি তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পাওয়ার মতো করে তিনি ঘোষণা দেন তাঁর প্রথম যৌবনের আদর্শের কথা, আরেকবার! তাহলে কাব্যসত্তা ও জীবনসত্তার সমপাতন ঘটে যেত। তাতে জয় হতো কবিতারই। প্রগতিশীলতারই।


মন্তব্য