kalerkantho


জন্মান্ধ রমজান

প্রতীকী গল্পগুলো

এমরান কবির

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রতীকী গল্পগুলো

 

জন্মান্ধ রমজান—সৈয়দ শামসুল হক। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা।

মূল্য : ১৫০ টাকা

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হলেও এর বিকাশ ও টিকিয়ে রাখার কৌশলটাও ছিল আরেক যুদ্ধ। এই মূল যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন যাঁরা প্রবল প্রতাপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন কলম হাতে, সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন সেই অন্যতমদের অন্যতম। যে কলমের কালি সাদা পৃষ্ঠার ওপর এঁকেছিল কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিল স্বয়ং রাষ্ট্র।

কিন্তু তিনি সাহসী ছিলেন। তাঁর রচিত নিরীহ অক্ষরগুলো যুদ্ধ করেছে প্রবল প্রতাপে তৎকালীন রাষ্ট্রের সব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে। তাঁর রচিত নিরীহ অক্ষরগুলো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে বাংলা ভাষাকে।

মৌনলিপিগুলো এভাবেই দংশন করেছে তৎকালীন তথাকথিত রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া জগদ্দল পাথরকে। তিনি সেই লেখক, যিনি কয়েক দশক ধরে এঁকেছেন বাঙালির ঐতিহাসিক জীবনের বোধ-বিকাশের ক্রমপরম্পরা।

কি কবিতায়, কি উপন্যাসে, কি নাটকে, কি আখ্যানে, কি ছোটগল্পে—কোথায় তাঁর স্বগর্ব বিচরণ নেই?

সদ্যঃপ্রয়াত লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ জন্মান্ধ রজমান। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত এ গল্পগ্রন্থে রয়েছে আটটি ছোটগল্প। অসুস্থ অবস্থায় এ গল্পগুলো তিনি মুখে মুখে বলেছেন। তাঁর সহধর্মিণী লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি ভূমিকায় জানাচ্ছেন, ‘আঠারোই সেপ্টেম্বর থেকে পঁচিশে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের রোগশয্যায় বসে একটি করে গল্পপট রচনা করেন। কিন্তু একবার একটি লেখা শেষ করার পর আবার তাঁকে সেটা পড়ে শোনানোর সুযোগ দিন না। হাত উঠিয়ে বলেন, সময় নেই। ফলে কোনো শব্দ চয়নের ভুলত্রুটি আর শোধরানোর সময় হয়নি। এমনকি কোনো কোনো উক্তি অস্পষ্ট ও স্বগতোক্তির মতো শোনালেও তাকে ফিরে আবার পুনরুক্তি করার অবকাশ দেননি। পড়ে শোনাতে চাইলে বিরক্ত হতেন। ’

এভাবে গল্পগুলো রচনার প্রেক্ষাপট জানিয়ে দেন গল্পগুলোর লিপিবদ্ধকারী আনোয়ারা সৈয়দ হক। কিন্তু গল্পগুলো পাঠে কখনো মনেই হয় না, এগুলো একজন মৃত্যুপথযাত্রী লেখকের মুখে মুখে বলা। বিস্ময়কর যে কোনো কথা তিনি পুনরুক্তি করেননি। গল্প পাঠে কোথাও মনে হয় না অসম্পূর্ণ কোনো কিছু। খাতা-কলমে কিংবা ল্যাপটপে কিংবা মুখের কথা—যেভাবেই হোক না কেন, তিনি যে প্রকৃতই সব্যসাচী, সর্বশেষ গল্পগ্রন্থেও তার স্বাক্ষর রাখলেন।

প্রথম গল্প ‘ঠিকানায় থাকে না আবদুল খালেক’। উত্তমপুরুষে লেখা গল্পটির কথক লেখক নিজেই। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকে মনে পড়ছে তাঁর বাল্যবন্ধু আবদুল খালেকের কথা। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এই আবদুল খালেককে লেখক-কথক বলেছিলেন একসময়, ‘ভালো হয়ে যা। ’ তারপর দীর্ঘ বিরতি। দীর্ঘদিন যোগাযোগহীনতা। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি আবদুল খালেকের খোঁজ করেন। তার তিনটি বাড়িতেই লোক পাঠানো হয়। অপেক্ষা করা হয়। কিন্তু আবদুল খালেককে পাওয়া যায় না। কারণ ঠিকানায় থাকেন না আবদুল খালেক। কথক এরপর টেলিপ্যাথির কথা ভাবেন। এভাবেও যদি যোগাযোগটা হয়ে যেত! শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়। লেখক আবদুল খালেককে বলেন, তোকে তো তোর ঠিকানায় পাওয়া যায় না। কোথায় থাকিস এখন? আবদুল খালেক উত্তর দেন, ‘আমি এখন আমার নিজের ভেতরে থাকি!’ কথক বিস্মিত হন আবদুল খালেকের মুখে এ কথা শুনে। আবদুল খালেক আরো বলতে থাকেন, ‘মেয়ে মানুষ দেখেছি, টাকার পাহাড় দেখেছি, সন্তানের উজ্জ্বল মুখ দেখেছি...তুই আমার সোনার কপাট খুলে দিয়েছিস। সেই কপাট খোলা ঘরের ভেতরে কোনো দুষ্ট-নষ্ট বা ধ্বংসের অধিকার নেই। আছে শুধু তোর সেই কথা, আবদুল খালেক, ভালো হয়ে যা। মানুষের কোনো ঠিকানায় না থেকে আমি সেই ভালো হওয়ার চেষ্টা করেছি। যদি কোথায় থাকি জানতে চাস, তাহলে আমি আমার দাদার সেই ভেঙে পড়া জলেশ্বরীর বাড়িতে যাই। ’

এরপর আবদুল খালেক কাঁদতে থাকে। জগৎ তার চোখের জলে ভেসে যায়।

গল্পটিও শেষ হয়ে যায়। প্রতীকী এ গল্পে দেখা যায় দুষ্ট-নষ্ট মানুষটি শেষ পর্যন্ত ভালো হয়ে যায়। জগতের সব লোভ বিসর্জন দিয়ে শেষ পর্যন্ত পবিত্র শেকড়ে ফিরে যায়।

জন্মান্ধ রমজানের প্রতিটি গল্পই এ রকম প্রতীকী। তিনি আটপৌরে, ক্লান্তিকর ও গ্লানিময় অভিজ্ঞতাকে দিয়েছেন অর্থময়তা, রাজনৈতিক চেতনাকে উপস্থাপন করেছেন আকাঙ্ক্ষার শীর্ষে, বেঁচে থাকার যুদ্ধকে দিয়েছেন অপার মহিমা, ধ্বংসের কিনারায় পতিত হওয়ার পরও দিয়েছেন সৃষ্টির উল্লাস, স্বপ্নের সূর্যের আভাস। নাগরিক জীবনের স্বপ্ন-সংকট-সম্ভাবনাকে এমনভাবে এঁকেছেন, যেন মানুষ এসবের ভেতরে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার আপার সম্ভাবনা। ক্ষতের গভীরে তিনি ঢেলে দিয়েছেন মধু-বৃক্ষের বীজ। পাথর সরানোর সাহস জুগিয়ে জানাচ্ছেন ভেতরে রয়েছে প্লাবন-উন্মুখ ঝরনা। জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও তিনি এভাবেই আশা জাগানোর কাজটি করেছেন জন্মান্ধ রমজানের গল্পগুলোর মাধ্যমে।


মন্তব্য