kalerkantho


ভালোবাসার খণ্ডচিত্র

সাইদ হাসান দারা

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভালোবাসার খণ্ডচিত্র

অঙ্কন : মানব

পলেস্তারা খসা মাঝারি আকৃতির দালান বাড়িটার ছাদের চারদিকে কারুকার্যের ইট-টালি দিয়ে ঘেরা, রেলিং করা। তার এক কোনায় একটি চতুর্ভুজ মার্কা রুম থাকায় সেটাকে দেখায় সমুদ্রগামী কোনো কার্গোর মতো। অবশ্য জোছনা রাতে। দিনের আলোয় দেখায় পোড়া কোনো ধ্বংসাবশেষের মতো। কেননা বাড়িটা এতই প্রাচীন-প্রাগৈতিহাসিককালের যে রুমুর মতো একটা সাড়ে তিন বছরের মেয়ের দাপটে তার ভিত অব্দি ধিমধিম করে কেঁপে ওঠে।

তার সেই ছাদটার মাঝখানে একটা কাশবনের মাদুর বিছিয়ে নিথর জোছনায় যেন কোনো এক প্রত্ন-প্রহরের প্রলম্বিত মুহূর্তের প্রতীক্ষায় শুয়ে আছে শরিফ। তাকিয়ে দেখছে টলটলে পেটফোলা নধর সব তারা, জোছনায় বিশুদ্ধ ছাই-ধূসর আকাশ। আর অনুভবে বোধ করে সে যেন আর কোনো কিছুই যোগ্য নয়!

ফলে সে কাতরে, যেন কোনো ফাঁস লাগা জন্তুর মতো নিঃশ্বাস ফেলে। জীবন এত মন্থর, এত উগ্র ঠেকেনি তার কাছে আগে কখনো। সেই কবে থেকে নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে, নিজের উষ্ণতায় নিজেই জ্বলতে শুরু করেছে, আর একাকী যতগুলো রাত কাটিয়েছে, তা সময় কেটেছে একই রকম অসুখী, অন্তহীন মন খারাপ করা।

কবে হবে এই টান? বিড়বিড় করে নিজেকে শুধায় সে।

অতঃপর মনে মনে আশা করে, একদিন : নিশ্চয়ই একদিন সব কিছু শেষ হবে। এমন কোনো স্মৃতিও নেই, যত তীব্র প্রখরই হোক না কেন, যা একদিন না একদিন মিলিয়ে যায় না।

—তোমারই জিত হোক প্রভু! ফোঁস করে বয়সী বলদের মতো এক দীর্ঘ আওয়াজে নিঃশ্বাস ছাড়তেই তার মনে পড়ে বাড়িটার গুপ্ত পশ্চাদ্দেশের মেহগনি গাছগুলোর কথা। ওর তলায় রোদ্দুর পৌঁছতে পারত না। তাই সে কোনো ঘাসও দেখেনি তখন। গাছগুলোর ডালে বাস করত একজোড়া হুনুমান। মাঝরাতে প্রায়ই তারা ঝগড়া করত। অনেক দিন ধরে শরিফ তাদের ঝগড়ার বিষয়বস্তু নিয়ে ভেবেছে। তার ধারণা, মেয়ে হুনুমানটা ঘুমিয়ে গেলেই নাক ডাকে। অনেকটা তার বড় ভাবির মতো করে।

কিন্তু দীর্ঘদিন পরে সেই সম্ভাবনাটি বাতিল করে দিল সে। তার আফসোস হতে লাগল, ওদের কারণে সে অমন জোছনাঝরা রাতে খোলা ছাদে ঘুমাতে ভয় পেত। অথচ ঝড়-বৃষ্টির রাতে প্রাণী জোড়ার জন্য তার যেন কেমন লাগত। আর এখনো কষ্ট জাগে ওদের না থাকায়। শরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উথালপাথাল হাওয়া জোছনার মধ্যে রাতের জগত্টাই যেন অন্য রকম হয়ে উঠেছে। সে আবার আরেকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ক্রমশ গভীর অব্যক্ত এক আচ্ছন্নতার মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে শরিফ নখে খুঁটতে থাকে রেলিংয়ের প্রাচীন ইট। আর হঠাৎই যেন তার চেতনার গভীর থেকে স্বপ্নের ক্ষীণ একটা বুদবুদ ক্ষণকালের জন্য জীবনের সমুদ্রে ভেসে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়।

বছর কয়েক আগে সে একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল। তার পর থেকে আজ অব্দি কেন জানি ঘুরেফিরে সেই স্বপ্নের বিভ্রমটাই তার মনে পড়ে যায়। এবং সেটাই তাকে পেড়ে ফেলে, পিষতে থাকে তার আত্মাকে। তখন তার জীবনের সব সমীকরণে জট পাকিয়ে, সব কিছু কেমন এলোমেলো, ছেঁড়াখোঁড়া, বিক্ষিপ্ত, দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে—যার কোনো অর্থ নেই।

স্বপ্নে সে এমন এক প্রশস্ত খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল, যা তার অপরিসর বিছানায় শুয়ে কল্পনা করাও অসম্ভব। তখন সূর্য একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে চলেছে আর রাতের কুয়াশারা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, গুটিয়ে নিচ্ছে তার ধোঁয়াশা, রেখে যাচ্ছে শিশিরভেজা ঘাসের ডগা, শাদা। কুয়াশা ভেজা সব পাতালতা। দিনটা তখনো ফুটে ওঠার রঙের মধ্যে ঢুলছিল। ঠাণ্ডা মাটি থেকে ভিজে একটা শীতলভাব, কিন্তু তা চোখেই পড়ে না, উঠে যাচ্ছিল ওপরের টানে, মিশে চলছিল মেঘে, আকাশে। শরিফ বুঝতে পারছিল, ওটা হচ্ছে ভোরবেলা।

সে তাকিয়ে দেখছিল স্বচ্ছ, নির্মল সেই ভোরের অদ্ভুত আকাশটাকে। অতঃপর যেন কেমন এক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছিল—গাঢ় সবুজ গাছপালার ওপর সকালের টাটকা রোদ্দুর, তারা ওপর থেকে কেমন করে পিছলে নেমে আসে, আর কেমন করে ছড়িয়ে পড়ে? তারপর তারা ছায়াদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় কেমন করে? অতঃপর যেন মুহূর্তেই বৃত্তাকারে ছাড়িয়ে যায় ওপরে, নিচে, দিগন্তে, সবখানে।

এমনকি ছোট ছোট শিশিরবিন্দুতে। আর কেমন আলোয় মাতিয়ে তোলে, এই আলো-অশ্রুর উপত্যকা যেন স্বপ্নের সবুজ রঙে। তখন কী এক আবেগে-উচ্ছ্বাসে কাকে যেন সে চিতকার করে ডাকতে থাকে—দেখে যাও! গাছেরা এখন এতই সবুজাভ যে ভালোবাসার রং কী তা বোঝানোর কোনো উপায়ই নেই!

স্বপ্নের এই জায়গায় তার ঘুম ভেঙে যায়। তখনো ভোরবেলা। তবে বৃষ্টি পড়ছিল টিপ টিপ। হাওয়া বইছিল মন্থর, উত্তরমুখী। ফলত সঙ্গে সঙ্গে তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, যে মেয়েটিকে সে স্বপ্নে ডেকেছিল, সে কি তার চেনা কেউ? সে কি পাশের বাড়ির বিথু নামের মেয়েটি, যার আজ বিয়ে হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা?

স্বপ্নের ভেতরে কেমন যেন খুব চেনা চেনা আর যেন কতকালের পরিচয়ে আবদ্ধ-ঘনিষ্ঠ লাগছিল মেয়েটিকে। অথচ তাকে সে দেখতেই পায়নি। শুধু মনে হয়েছিল, দেখে যাও বলে ডাক দিলে যে নারীটি আসবে, সে তার চিরচেনা, তার প্রণয়ের দায়ভারে সুখী।

বিথুর সেদিন বিয়ে ছিল। সে ছিল অতিথি। অথচ ও কিন্তু কিছুই না বলে খামখাই মুখ ফেরাল। যেন তার সব কথাই ফুরিয়ে গেছে কিংবা গুটলি পাকিয়ে গেছে আলজিবে, টিয়েদের যেমন হয়। তারপর ঝড়ো-বৃষ্টির সেই ক্ষিপ্ত জগৎ রাত্তিরে শান্ত হয়েছিল, যেন ফিরে গিয়েছিল ঘুমের কাছে।

অতীত স্বপ্নের বিভ্রম থেকে উঠে এসে শরিফ তাকাল কার্নিশের দিকে। এখানে-সেখানে রোদ পোড়া উলু ঘাসের ছোপ, বিবর্ণ ঝাঁক। কোনার দিকে সেই কবের এক বটের চারা বড় হতে গিয়েও পারছে না। শাখা-প্রশাখা চোখে পড়ার মতো হলেই ছেঁটে ফেলা হয় বঁটি দিয়ে। তারপর সে দেয়ালের নোনাটে ইটের ফাটল থেকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়, ছায়া দেবে বলে, পাখিরা নীড় বাঁধবে হয়তো এ আশায়ও। শরিফ ছেলেবেলায় তার হাতের মার্সেলে কচি পাতার কষ দিয়ে নাম লিখে ম্যাজিক দেখাত। রহস্যটা প্রথম যেদিন আবিষ্কার করেছিল সে, সেই দিনই বিথুকে চমকে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। তার বিশ্বাস, এমন প্রতিভায় নিশ্চয়ই আর তার মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না বিথু।

 বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকে একটু এগিয়ে গেলে আতাগাছের ছায়ায় যে খোলা জানালা, সেটাই বিথুর পড়ার ঘর। এক দুপুরে সেই জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে শরিফ উত্তেজনায় কাঁপা কাঁপা চাপা গলায় ডাক দিয়েছিল তাকে—বিথু, দেখে যাও কী আশ্চর্য ব্যাপার...!

ভরদুপুরে সেই জানালায় আচমকা তাকে দেখে ঘরের ভেতরের বিথু খানিকটা ছিটকে সরে গিয়ে ভয়ার্ত স্বরে সতর্ক করে—আম্মাকে ডাকব বলে দিচ্ছি!

শরিফ ফ্যাকাসে পাণ্ডুর মুখে আবেদন জানায়—কী আশ্চর্য! দেখো না, দারুণ এক ম্যাজিক!

বিথু জানালার ধারে না এসে বরং আরো খানিক সরে গিয়ে নিদারুণ বিরক্তভরে বলে, তাড়াতাড়ি দেখো, আমার বৃত্তি পরীক্ষা!

শরিফ আবার করুণ স্বরে মিনতি করে—বাইরে না আসো, প্লিজ! অন্তত একটু কাছে এসে দেখে যাও না কেন। এ হলো গিয়ে অন্য ব্যাপার। সব কিছুর  চেয়ে অনেক জরুরি!

বিথু কঠিন মুখে ক্ষোভ প্রকাশ করে—নাহ, তুই খুব বদ! আবার সে ঠোঁট কামড়িয়ে হাসেও।

শরিফ হতাশ হয়ে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে তার যে হাতের ওপর আগে থেকে বটের কষ লাগানো ছিল, সেখানে একটা কয়লার টুকরো ঘষতে থাকে। তারপর কয়লার গুঁড়ো মাখা জায়গাটি প্যান্টের পাছায় মুছে বস্ফাৎরিত নয়নে তার বাঁ হাতটি বাড়িয়ে ধরে—এই দ্যাখো, কী? কয়লার কালোতে সেখানে জ্বলজ্বল করছে—বিথু, আমি এই পৃথিবীতে তোমাকেই বেশি ভালোবাসি!

এমন একটা আবিষ্কারে, উক্তিতে আর তার মর্মকথায় বিথু মোটেও অবাক-অভিভূত হয় না। বরং তারস্বরে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকে তার মাকে। ফলে সে তাত্ক্ষণিক অতীত-ভবিষ্যৎ ভেবে, ভীতসন্ত্রস্ত কোনো খরগোশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে সেই জঙ্গলে ভরা জানালার ধার থেকে পালিয়ে আসে।

এখনো ঘুম আর জাগার মাঝখানে গিয়ে শরিফ যেন উপলব্ধি করে, সে কখনো ভালোবাসার নাগাল পায়নি। তার জীবনের পেছনে যেন শুধুই ছুটে আসে এক মর্মর ধ্বনি, মৃদু। যেন জীবনে ভালোবাসা এক আলেয়া, বিভ্রম। আর এই বিভ্রমে তার যত দিন বাঁচা উচিত ছিল না, তার চেয়ে ঢের বেশি দিন বেঁচে আছে সে।

 দীর্ঘদিন পরে পুরনো দুঃখের কারণে সে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকায়, তার ডান পাশে, একটু দূরের বাড়িটির দিকে। রাত আরেকটু নিশুতি হলেই সেখান থেকে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসবে বিথু। তার স্বামী ওপি-১ ভিসায় আমেরিকায় চলে গেছে। সে-ও একদিন চলে যাবে।

শরিফের পুুনশ্চ মনে হয়, ভালোবাসা দূরে। হয়তো অতীতের কোনো এক অচ্ছুৎ দূরত্বের পারাপারে। যেখানে কেউ কোনো দিনই পৌঁছতে পারে না। এমনকি বিথুও নয়। সে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোছনার আলোয় দেখে, সেই বটগাছটি প্রায় অতটুকুই আছে। শুধু তার শিকড়বাকড় ছড়িয়ে গেছে বহুদূর, বহু দিকে!

অন্যদিকে সে যদিও জানে, বিথু এখন একটা আধুনিক বাড়ি ও রঙিন শহুরে স্বপ্ন দেখে; তথাপিও সে এখন এমন রহস্যময়ী, যা তার বোধে কুলায় না। কেননা ইদানীং প্রায় রাত্তিরে সে অতি সন্তর্পণে, লুকিয়ে-চুরিয়ে কোনো অলুক্ষণে সাপের ন্যায় ভগ্নপ্রায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে এই ছাদে, ভালোবাসা যদিও তা নয়, বরং কোনো এক গোপন প্রণোদনা আর প্রয়োজনের টানে...!


মন্তব্য