kalerkantho


রফিক আজাদ

প্রথম বইয়ের দিনগুলোতে

শিহাব সরকার

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রথম বইয়ের দিনগুলোতে

প্রথম বই প্রকাশ নিয়ে দৈনন্দিন সব কাজ প্রায় ভুলে একজন কবি কিভাবে ওতে পুরোপুরি ডুবে যেতে পারেন, রফিক আজাদকে না দেখলে আমার ধারণা হতো না। তিনি তখন বাংলা একাডেমিতে ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকা বের করেন রশীদ হায়দারের সঙ্গে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি এবং একই সঙ্গে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করি। সুযোগ পেলেই চলে যেতাম একাডেমির তখনকার নতুন ভবনের দোতলায়। এখন ওটা প্রেস ভবন। একটা রুমে পাশাপাশি বসতেন রশীদ হায়দার, রফিক আজাদ ও সেলিনা হোসেন। প্রথম বইয়ের প্রকাশের সময় রফিক ভাইকে খুব কম সময়ই একান্তে পেয়েছি। দিনের পর দিন দেখতাম কবিতার প্রুফ দেখছেন, প্রকাশকের সঙ্গে বইয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলছেন। নয়তো কোনো শব্দের বানান নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলছেন। বাংলাভাষাটা খুব ভালো জানতেন রফিক ভাই। কিন্তু বড় খুঁতখুঁতে স্বভাব ছিল তাঁর। কোনো বানানে খটকা লাগলে একাধিক ডিকশনারি দেখে নিশ্চিত হতেন।

প্রথম বই নিয়ে তাঁর এই ব্যস্ত সময় দেখেছি বাসায়ও। বইটির প্রস্তুতিলগ্নে তাঁর বাড়ির পরিবেশটাই পাল্টে গিয়েছিল। আদিলা বকুল, আমাদের বকুল ভাবি, ছায়ার মতো থাকতেন তাঁর পাশে পাশে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। ওই সময়টায় আমি ইচ্ছা করেই বেশ কয়দিন রফিক ভাইয়ের অফিসে বা বাসায় যাইনি। হঠাৎ একদিন তিনি আমার অফিসে ফোন করে পরদিন যেতে বললেন বাসায়। দিনটি ছিল রবিবার। আমার ডে-অফ। ১০টা না বাজতেই চলে গেলাম তাঁর ওখানে। ফুরফুরে দেখছিলাম রফিক ভাইকে। তাঁর বাসার গ্রিল দেওয়া বারান্দায় বসে গল্পগুজব হচ্ছিল। ভাবি চা নিয়ে এলেন। রফিক ভাই সিগারেট ধরালেন, আমাকেও দিলেন। অগ্রজ কবি হলেও রফিক ভাই তরুণদের কাছে ছিলেন বন্ধুর মতো। আমরাও খোলামেলাভাবে মিশতাম তাঁর সঙ্গে। কথাবার্তার এক ফাঁকে রফিক ভাই বললেন, ‘শিহাব, একটু বসো। ’ তিনি উঠে গেলেন। ভাবি সামনের চেয়ারে। তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো শান্ত স্বভাবের স্বল্পভাষী শিশুকন্যা লোপা—তাঁদের বড় সন্তান। রফিক ভাই এলেন ঘরের ভেতর থেকে, হাতে ধরা একটা বই। আমার হাতে দিয়ে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বিশুদ্ধ বাংলায় বললেন, ‘বইটা বেরোলো। নাও। পড়ে কেমন লেগেছে জানিয়ো। ’ সে আমার জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত। কোনো প্রধান কবির হাত থেকে কাঁচা কালিতে আমাকে লিখে দেওয়া তাঁর নিজের বই গ্রহণ করা আমার জীবনে ওই প্রথম। বইয়ের নাম ‘অসম্ভবের পায়ে’। কিছুটা গুরুগম্ভীর প্রচ্ছদ, আকারে ক্ষীণ। বইয়ের প্রথম সাদা পাতায় ফাউন্টেনপেনে লেখা, ‘প্রিয় শিহাবকে, রফিক ভাই’।

খুব নির্ভার লাগছে। বেশ ধকল গেছে। রফিক ভাই বললেন। লেখালেখি শুরু করার ১০ বছর পর বেরোলো বই। আমি বললাম।

মাঝখানে কলেজে মাস্টারি না করলে হয়তো আগেই বের হতো। অবশ্য ভালোই হয়েছে। লেখকের প্রথম বই দেরিতে বের হওয়াই ভালো। বই বের করা লেখকের জন্য একটা বড় ব্যাপার। সময় নিয়ে বই করলে অনেক কাঁচা আবেগের কবিতা ছেঁটে ফেলা যায়। ওসব কবিতা কবিকে বিব্রত করে সারা জীবন।

আমি রফিক ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলাম। বেশির ভাগ কবিতা ষাটের দশকে ‘স্বাক্ষর’ আমলে লেখা। অনেকগুলোর নাম শুনেছি, বিচ্ছিন্ন চরণ শুনেছি অন্য কবিদের মুখে। এবার ওগুলো একান্তে পড়া যাবে, আমি ভাবলাম। সময়টা ১৯৭৩। রফিক ভাই তখন পাকাপাকিভাবে ঢাকা চলে এসেছেন, অবশ্যই কবিতার টানে। তত দিনে তিনি ফের ডুবে গেছেন আমাদের কবিতার ভুবনে। ঢাকায় ফিরে আসার আগেই বাংলা একাডেমির বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কবিতা পাঠের আসরে পড়ে গেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রণাঙ্গনে তাঁর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাটি। প্রথম বইয়ের পর একে একে বের হতে থাকে রফিক আজাদের কবিতার বই। মাত্র দুটি বই বেরোবার পরই বেরোয় তাঁর নির্বাচিত কবিতা। তাঁর অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় পরবর্তী চার দশকে। কবিতা ছাড়া আছে তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘কোনো খেদ নেই’। দ্বিতীয়টি শেষ করে যেতে পারেননি।

আপাদমস্তক একজন সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন রফিক আজাদ। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে ছিলেন সংবেদনশীল, পরোপকারী ও নিরহংকারী। ছিল তীব্র আত্মসম্মানবোধ। আবার তাঁর মেধার সঙ্গে চমতকার সম্মিলন ছিল সারল্যের। কিছুটা বিষণ্ন এবং নিভৃতচারীও ছিলেন তিনি। সময় সময় উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ ও হৈ-হুল্লোড়েও মেতে উঠতে দেখেছি তাঁকে। ছিলেন আড্ডাপ্রিয়, হিউমার পছন্দ করতেন। জীবনে অনাবিল শান্তির পর্ব এসেছে, আবার নানা ধরনের বিপর্যয়ের ভেতর দিয়েও দিন পার করেছেন রফিক আজাদ। পরোক্ষ এক স্ববিরোধিতা ছিল তাঁর স্বভাবে, যা তিনি মাঝেমধ্যে স্বীকার করতেন। আসলে আনন্দ ও বিষাদ, বিদ্রোহ ও আত্মমগ্নতা, বাউলের বৈরাগ্য ও বৈষয়িকতা—মানবচরিত্রের এই পরস্পরবিরোধী দিকগুলোর প্রায় সব কয়টির এক অপূর্ব মিশ্রণ ছিল রফিক আজাদের চরিত্রে, তা ব্যক্তিপর্যায়ে হোক অথবা তাঁর কবিসত্তার প্রেক্ষাপটেই হোক। নির্ভেজাল ভালোবাসা ছিল তাঁর জীবনের মূল সঞ্জীবনী শক্তি। জীবনের কোনো কোনো পর্যায়ে আবেগও তাঁকে কাবু করেছে। রফিক আজাদের তুলনা তিনি নিজেই। তিনি অনন্য।


মন্তব্য