kalerkantho


অগ্নিকন্যা

উপন্যাসের অবয়বে ইতিহাসের বিনির্মাণ

তুহিন ওয়াদুদ

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উপন্যাসের অবয়বে ইতিহাসের বিনির্মাণ

অগ্নিকন্যা : মোস্তফা কামাল। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স, ২০১৭। দাম : ৫০০ টাকা।  

‘অগ্নিকন্যা ঐতিহাসিক উপন্যাস; ইতিহাস নয়’ ভূমিকা কথনের শুরুতেই লেখক মোস্তফা কামাল বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাস পাঠে বোঝা যায়, লেখক উপন্যাসের আঙ্গিক বিনির্মাণের পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়েছেন ইতিহাসের পরম্পরায়।

উপন্যাসের নাম ‘অগ্নিকন্যা’। সেই বিবেচনায় মতিয়া হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু উপন্যাসের কলেবর বিবেচনায় মতিয়ার পরিবর্তে যেন অন্য কিছু হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় চরিত্র। চরিত্রটি উহ্য থাকে না। সেটি হচ্ছে সময়।

১৯৪৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কালখণ্ডই একটি চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এ কালখণ্ডের উপরিতল ও ভিতর কাঠামো, উভয় অংশই ছিল উত্তাল। দেশভাগের পরপরই ভাষা প্রশ্নে বাঙালিদের যে অকুতোভয় প্রকাশ, যার ওপর দাঁড়িয়ে একদিন বাঙালিরা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, সেই ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতের শিল্পগত বুনন হয়েছে দক্ষ শিল্পীর হাতে।

সোনালি স্বপ্ন নিয়ে দেশ বিভাগের সকাল রচিত হলেও সেই সকালের আকাশে পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী কালো মেঘের মতো জুড়ে বসে। সেই মেঘলা আকাশের তলে পূর্ব বাংলার স্বপ্নময় দেশবোধে উজ্জীবিত কিছু মানুষ, কখনো ভাষার জন্য, কখনো আর্থসামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই ঐক্যে অনেকবার ফাটল ধরেছে, আবার দৃঢ় হয়েছে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানিদের কূটকৌশল আর ষড়যন্ত্রের প্রতিকূলে পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলার অধিকারকামীদের ইতিহাস এ উপন্যাসে সরল বর্ণনায় সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।

লেখক ইতিহাসের চরিত্রগুলো এমন অবিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন যে কোথাও রূপক-প্রতীক-ইঙ্গিতের আশ্রয় নেননি; বরং উপন্যাসের আঙ্গিকে তিনি পাঠকের কাছে ইতিহাস তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটিতে আমরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলোর প্রকৃত ভূমিকাই পাই। লেখক কখনো কখনো কাহিনি নির্মাণের জন্য চরিত্রগুলোর পারস্পরিক আলাপচারিতায় স্বল্পমাত্রার সংলাপ যুক্ত করেছেন। একজন কথাশিল্পীর সেই স্বাধীনতাটুকু আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের একাংশ এখানে বেশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর অনেক কিছুই এখানে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের অনেকটা সময় জেলে কাটিয়েছেন। সে কারণে তাঁর শিশুসন্তান শেখ কামাল তাঁকে ভালো চিনত না। মনে করত, শেখ হাসিনার বাবা তার বাবা নয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে যা উল্লেখ আছে, ঔপন্যাসিক মোস্তফা কামাল সেখানকার কিছু ঘটনা এখানে উল্লেখ করেছেন— ‘একদিন শেখ মুজিব ও ফজিলাতুননেসা রেনু বিছানায় শুয়ে গল্প করছেন। নিচে হাসিনা ও কামাল খেলছে, খেলার এক ফাঁকে কামাল বলল, হাসু আপু, হাসু আপু, আমি কি তোমার আব্বাকে আব্বা ডাকতে পারি? শেখ মুজিব কথাটা শুনে আবেগাপ্লুত হলেন। তখনই তিনি বিছানা থেকে নেমে কামালকে কোলে নিয়ে বললেন, আমি তোমারও আব্বা। ’ এ ঘটনাটি বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন বর্ণনা করেছেন তখন তা ছিল উত্তম পুরুষে, আর যখন মোস্তফা কামাল বর্ণনা করেছেন তখন তা নাম পুরুষে। পার্থক্য শুধু এটুকুই। লেখক তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি। লেখক যদি এ উপন্যাসের ঘটনাগুলোর তথ্যসূত্র দিতেন, তাহলে গ্রন্থটি ইতিহাস গ্রন্থ হয়ে উঠত। আর পুরো গ্রন্থটি অসংখ্য তথ্যসূত্রে ভরে থাকত। একপ্রকার আড়ষ্টতা কথাশিল্পের সৌন্দর্য নষ্ট করত। শিল্পবিবেচনায় লেখক উপন্যাসটিতে উদ্ধৃতি ব্যবহার থেকে বিরত থেকেছেন।

স্বল্প কথায় শেখ ফজিলাতুননেসার ত্যাগেরও পরিচয় উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিভাবে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থানটি অত্যন্ত সুদৃঢ় করে তোলেন, তার একটি সূক্ষ্ম রেখাপাত এখানে আছে। কিভাবে তিনি জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের এবং সমবয়সী কিংবা অনুজদের আস্থায় পরিণত হয়েছেন, তা ইতিহাসের ঘটনার ধারাবাহিকতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বহুবার ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের অবস্থানে থেকেছেন অটল, অনড়। উপন্যাসের শেষ রেখাপাত ছয় দফা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা মূলত বাংলাদেশকে মুক্ত করার সনদ।

সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানীর মধ্যে কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। কৃষক-শ্রমিক দল ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্মও হয়েছে সেসব থেকে। তবে শেষ পর্যন্ত ঐক্যসূত্র রচিত হয়েছে।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে মহিউদ্দিন, নূরজাহান বেগম এবং ছোট্ট কন্যা মতিয়ার পারিবারিক ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে। সেখানেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিল শুনে মতিয়া ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ একা একা বারবার মিছিলের মতো উচ্চারণ করতে থাকে। ঔপন্যাসিক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিলের মধ্য দিয়ে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করেন। এরপর দীর্ঘ কলেবরে চলে ভাষা আন্দোলনের বিচিত্র দিকের আলোচনা। ভাষা আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি মতিয়ার বাবা মহিউদ্দিন এবং মা নূরজাহান বেগম যে দুটি চরিত্র লেখক অঙ্কন করেছেন, তা পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি। মহিউদ্দিন, স্ত্রী নূরজাহান এবং মতিয়া তিনজনই দেশপ্রেমিকের প্রতীক। সৎ পুলিশ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন। পূর্ব বাংলার ভালো খবরে ভীষণ উত্ফুল্ল হন। যেকোনো খারাপ খবরে ভেঙে পড়েন। নূরজাহান বেগমও তা-ই। ছোট্ট মতিয়ার মধ্যেও সেই চেতনাই কাজ করে। একটানা দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে মহিউদ্দিনের পরিবার ভিন্ন স্বাদ নিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে যেন আমরা কোটি কোটি শান্তিকামী বাঙালির প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। লেখক দেশভাগের পরপরই যে মতিয়াকে দেখাচ্ছেন, তা ১৯৫৬ সালে আরো পরিণত। দেশ বিভাগের সময় মতিয়া পুতুল খেলার বয়সে ছিল। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার কথাবার্তাগুলোও বয়স উপযোগী করেই লেখা হয়েছে। শিশু মতিয়া কালক্রমে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে কখনো কখনো প্রধান বক্তা হয়ে উঠেছেন। শোষকযন্ত্রের ভিত নাড়িয়েছেন। উপন্যাসের প্রথম অনুচ্ছেদে যে মতিয়াকে আমরা পুতুল নিয়ে খেলতে দেখি, উপন্যাসের শেষ অনুচ্ছেদে সেই মতিয়াকে আমরা ভাবতে দেখি—‘ছয় দফা নিয়ে আলোচনার জন্য ছাত্রনেতাদের সাথে বসতে হবে। সারা দেশে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ’ 

উপন্যাসের নামকরণ আমাদের একটি চরিত্র মতিয়া চৌধুরীর দিকে বিশেষভাবে ইঙ্গিত করে। উপন্যাসের অনেকখানি অংশে আমরা মতিয়াকে পেয়েছি। তার পরও কাহিনির নিয়ন্ত্রক মতিয়া চরিত্রটি নয়। কাহিনির নিয়ন্ত্রক সময়। অগ্নিকন্যা মতিয়া পরিবারের যে বর্ণনা আমরা পাই, সেখানে লেখক মোস্তফা কামালের লেখকসত্তার কিছুটা ব্যবচ্ছেদ করতে পারি। লেখক সেখানে মহিউদ্দিন, নূরজাহান বেগম এবং মতিয়া—তিনটি চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। মেয়ে মতিয়াকে রাজনীতি থেকে সরাতে না পারলে বাবা মহিউদ্দিনের চাকরি থাকবে না। চাকরি না থাকলে তাদের পথে বসতে হবে। কিন্তু মা-বাবা চান না মেয়ে মতিয়া রাজনীতি ত্যাগ করুক। এ রকম পরিস্থিতিতে লেখক সব দিক বজায় রাখার বাস্তবসম্মত পরিণতি দেখিয়েছেন।

     লেখকের অসামান্য কৃতিত্ব—সাবলীল ভাষায় ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে কাহিনির বিনির্মাণ। ইতিহাসের নিপুণ পাঠের সঙ্গে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর ব্যক্তিত্ব-প্রবণতাও জানতে হয়েছে। মুহুর্মুহু সংকটে একেকটি চরিত্রের অন্তর্লোকে ভাবনার জগতে যে উথালপাতাল দিক, তাও পাঠ করতে হয়েছে লেখককে। ইতিহাসের বর্ণনায় এই পাঠ জরুরি নয়। কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে এ পাঠ ছিল অনিবার্য। সে পাঠের কোনো ভাষা নেই। লেখককে আশ্রয় নিতে হয়েছে কল্পনার। লেখক কল্পনায় যে বর্ণনা তুলে এনেছেন, তা গভীর কিছু নয়। ইতিহাসের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এ রকম কোনো কল্পিত বিষয়ের অবতারণা তিনি করেননি। ফলে ইতিহাস থেকেছে অবিকৃত। ইতিহাস থেকে উঠে আসা মতিয়া কিংবা বজলুর রহমানকে চিত্রায়িত করার ক্ষেত্রেও লেখক সতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন। সারকথায় বলা যায়, লেখক উপন্যাসের বয়ন কৌশলে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন।

মোস্তফা কামালের ‘অগ্নিকন্যা’ একটি দুঃসাহসিক রচনা। সময়ের অন্তঃশীলা প্রবাহের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বজায় রেখে লেখক একের পর এক দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। মতিয়া পরিবারের ওপর লেখকের আলোকপাতও ছিল প্রাণবন্ত। তবে পাঠকমাত্রই দাবি করবেন, ছয় দফা-পরবর্তী রাজনীতির একই আঙ্গিকে পরবর্তী খণ্ড। যাঁরা দেশ ভাগ-পরবর্তী ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত নন, তাঁদের ইতিহাস যেমন জানানো হবে, তেমনি ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করে তুলবে ‘অগ্নিকন্যা’ উপন্যাসটি। যাঁরা সাতচল্লিশ-পরবর্তী ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত, তাঁদের কাছে ‘অগ্নিকন্যা’ উপন্যাস পাঠের আনন্দ হবে একপর্যায়ের। তাঁদের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর পারস্পরিক আলাপচারিতা গভীরতর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করবে।

মেধা ও পাণ্ডিত্য-শিল্পের এক অনন্য রসায়ন ‘অগ্নিকন্যা’ উপন্যাসটি। একটিমাত্র উপন্যাসই পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করাবে বাংলাদেশের এক অগ্নিঝরা ইতিহাসের। পাঠক হিসেবে লেখকের কাছে পরবর্তী খণ্ড রচনার দাবি।


মন্তব্য