kalerkantho


বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা

চলচ্চিত্র-ইতিহাসের অনন্য গ্রন্থ

শাহিন কবির

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চলচ্চিত্র-ইতিহাসের অনন্য গ্রন্থ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা : অনুপম হায়াৎ। প্রকাশক : পলল প্রকাশনী।

প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য : ৬৫০ টাকা

চলচ্চিত্রই যে শিল্পমাধ্যমের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী মাধ্যম সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সহজ যোগাযোগ-ক্ষমতার জন্য সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে চলচ্চিত্রের রয়েছে ঐতিহাসিক সখ্য। ইতিহাস-বিনির্মাণে, স্বাধীনতাসংগ্রামে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে, অধিকার আদায়ে প্রণোদনা সৃষ্টিতে চলচ্চিত্রের রয়েছে যুগান্তকারী ক্ষমতা। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করলেও চলচ্চিত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস বললে এক কথায় ঢাকাই সিনেমার কথাই উঠে আসে। যদিও ঢাকাই সিনেমার উন্মেষকাল ত্রিশের দশকে ততকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন সময়ে। এর বিকাশ ঘটে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে, যখন আবার ঢাকা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনে। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের কথা বললে কোনোভাবেই স্বাধীনতা-উত্তর সিনেমার কথা বোঝায় না।

বোঝায় ঢাকায় নির্মিত সিনেমার কথা। তা যে কালেই হোক না কেন।

পুরো চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। কারণ এটি ‘বিজ্ঞানের দান’। বিজ্ঞানের বিকাশ ও প্রয়োগের সঙ্গে চলচ্চিত্র ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহু বিজ্ঞানীর বহু বছরের সাধনা, শ্রম ও মেধার ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষাংশে চলচ্চিত্র মাধ্যমটি আবিষ্কৃত হয়। ভাবতে অবাক লাগে, আবিষ্কারের ৩৫ বছরের মাথায় ঢাকায় নির্মিত হয়ে গেল সিনেমা। এই কর্মযজ্ঞের সামনে-পেছনে রয়েছে কত না কথা। তার আগের কথা, পরের কথা, সংগ্রামের কথা, সমালোচনার কথা ইত্যাদি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গবেষণার পথিকৃত অনুপম হায়াৎ চলচ্চিত্র নামক মায়াবী জগতের এসব কথা নিয়ে হাজির হয়েছেন এবারের বইমেলায়।

গ্রন্থভুক্ত ১৪টি আলাদা শিরোনামের দিকে একনজর দিলেও গ্রন্থভ্যন্তরস্থ উপাদান সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। যেমন, চলচ্চিত্রের আবিষ্কার ও বিকাশ, পুরান ঢাকায় চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমান, চলচ্চিত্রশিল্পের উন্মেষ দেশ বিভাগের পর, ‘মুখ ও মুখোশ’ একটি ইতিহাসের জন্ম, বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের অভিযাত্রা : চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, কত ছবি, কত নাম, চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনা, চলচ্চিত্র উৎসব, প্রদর্শনী পুরস্কার, চলচ্চিত্র সংসদ, চলচ্চিত্র শিক্ষা ও ফিল্ম আর্কাইভ, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব পরিচিতি, মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির তালিকা, সোনালি অতীতের নায়িকারা, সোনালি অতীতের নায়করা।

পুরান ঢাকায় চলচ্চিত্র অধ্যায় থেকে জানা যায় ঢাকায় প্রথম প্রদর্শনীর কথা। জানা যায় ঢাকার বাইরে জেলা শহর ভোলায় প্রদর্শনীর কথা। জানা যায় ঢাকায় নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘দ্য লাস্ট কিস’ নির্মাণের কুশীলবদের কথা। চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমান অধ্যায়ে তিনি বিধৃত করেছেন এই মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের অংশগ্রহণ ও অবদানের কথা। দলিল আহমেদ, যিনি পরিচিত ছিলেন শ্যামল কুমার নামে, ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান, যিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তারপর চলচ্চিত্রে জড়িয়ে পড়েন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আব্বাসউদ্দীন আহমদ, লাল মিয়া, শেখ শামসুদ্দীন প্রমুখের কথাও জানা যায়। গবেষক অনুপম হায়াৎ চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলতে গিয়ে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে আলো ফেলেননি। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা নিয়েও রেখেছেন আলাদা অধ্যায়। সেখানে সে-সময় এ-সময়ের চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনার উল্লেখ করেছেন। এ যাবৎ দেওয়া সব বড় পুরস্কার ও পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা দিয়েছেন। দিয়েছেন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব পরিচিতি। অভিধানতুল্য এ অধ্যায়টি নিঃসন্দেহে নতুন সংযোজন। দিয়েছেন এ যাবৎ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির তালিকা ও পরিচালকের নাম। গ্রন্থটির আরেকটি অলংকার হলো দুর্লভ অনেক ছবি। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে দেওয়া একেকটি ছবি অনেক কথা বলে।

গবেষক অনুপম হায়াৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা বলতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই চলচ্চিত্রের আগাগোড়া সব ধরনের তথ্যের সন্নিবেশ করেছেন। চলচ্চিত্রবিষয়ক এত তথ্যে সন্নিবেশিত কোনো গ্রন্থ এর আগে বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কি না সন্দেহ।


মন্তব্য