kalerkantho


আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু

মানবিক কিশোর গল্প

এমরান কবির

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মানবিক কিশোর গল্প

আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু : মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স।

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : সাদাতউদ্দীন আহমেদ এমিল। মূল্য : ২৭০ টাকা

একটি জাতির ভবিষ্যৎ মানবিক বিকাশ প্রকৃতার্থে তার শিশু-কিশোরদের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। আজকের শিশু-কিশোর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ—বহুল কথিত ও পুরনো কিন্তু চিরন্তন এই আপ্তবাক্যটি আক্ষরিক যে অর্থকে বহন করে চলে, তার গভীরে ওই বিকাশের বিষয়টিই নিহিত রয়েছে। সাহিত্য ছাড়া মানবিক বিকাশের উজ্জ্বলতম কোনো মাধ্যম হতেই পারে না। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে শিশুদের নিয়ে বিস্তর সাহিত্য রচিত হলেও কিশোরদের উপযোগী সাহিত্যের বড়ই ঘাটতি। মুহম্মদ জাফর ইকবাল সেই ঘাটতির বহুলাংশ পূরণ করে চলেছেন কিশোরদের উপযোগী সাহিত্য রচনার মাধ্যমে।

 চলতি বইমেলায় প্রকাশিত আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু গ্রন্থখানি কিশোরদের উপযোগী করে লেখা একটি চমতকার গ্রন্থ। মাত্র চারটি গল্পের সংকলন এটি। মানবিক বিকাশের দিকে লক্ষ্য করলে গ্রন্থখানি এক বহুকৌণিক হীরক খণ্ডের মতো যেখানে আলোর প্রতিফলন ঘটে সহস্র।

টুনটুনি ও ছোটাচ্চু সিরিজের তৃতীয় সংকলন এটি। পাঠকের বিপুল সাড়া ও অনুরোধ জাফর ইকবালকে বাধ্য করেছে এই সিরিজটি লিখতে। বোঝা যাচ্ছে তিনি এমন কিছু লেখেন, এমন কিছু বলেন এবং এমনভাবে বলেন, যা আমাদের পাঠককুলের হৃদয়কে স্পর্শ করে।

এ সবের সমন্বয়ে যা ঘটে তা কিশোরদের নিয়ে যায় এক যৌথ স্বপ্নের দিকে। করে তোলে কৌতূহলী। আনন্দ ও বেদনার অংশগ্রহণে তারা হয়ে ওঠে সংবেদী। তারা প্রায়ই কোনো বিষয় নিয়ে মতামত প্রদান করে। তাতে তাদের চিন্তার একটা প্রতিফলনও পাওয়া যায়। সেগুলো কখনো গ্রহণীয় হয়, কখনো হয় না। তারা প্রায়ই এমন কিছু ঘটিয়ে ফেলে, যা বড়দের অভিজ্ঞ মস্তিষ্কে খেলে না। শিশু-কিশোরদের বিকাশে এসব উপাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজে নিজেই নিজ ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন যেন।

যেমন ‘একটি দুর্ধর্ষ পেপার চোর’ শিরোনামীয় প্রথম গল্পটির কথাই ধরা যাক। বড় চাচা পেপার পাচ্ছেন না। তিনি এটা নিয়ে চিন্তিত। যৌথ পরিবারটিতে রয়েছে অনেক ছেলে-মেয়ে। তিনি তাদের বলেন। একেকজন একেক মতামত দেয়। একজন বলে পেপারওয়ালাকে বললেই তো হয়। পেপারওয়ালাকে বলা হয়। তিনি বলেন, পেপার প্রতিদিন নিয়মিতই দেওয়া হয়। তার মানে পেপার চুরি হয়। প্রশ্ন হলো, কে চুরি করে পেপার? চোর ধরার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করা হয়। দাদি অথবা নানি থেকে শুরু করে সবাই বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রদান করেন। সিদ্ধান্ত হয় চোরকে চিঠি লেখা হবে। সন্ধ্যায় ছোটাচ্চু এলে তাকে জানানো হয়। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চোর ধরা হবে। কিভাবে? সিসি ক্যামেরা। সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর ছোটাচ্চু আসেন। টিভির স্ক্রিনের সঙ্গে সেট করা হয়। দেখা যায় পেপারটা নিয়ে যাচ্ছে এক কুকুর।

একমাত্র টুনটুনির মাথায় খেলে যায় কুকুর তো পেপার পড়ে না, খায় না, কিছুই করে না। তার মানে এর পেছনে অন্য কেউ আছে। কেউ কুকুরকে দিয়ে কাজটি করাচ্ছে। টুনটুনি তখন পরিকল্পনা করতে থাকে আসল চোরটিকে ধরার জন্য। এটা করার জন্য বিজ্ঞানের ছোট্ট একটি প্রয়োগ ব্যবহার করে টুনটুনি। আর কিছু কৌশল। ধরা পড়ে চোর। দেখা যায় বস্তির ছোট্ট একটি ছেলে গুল্লু কাজটি করায়। টুনটুনি খুবই আন্তরিক হয়ে কথা বলে তার সঙ্গে। জানতে পারে একটা বড় ফ্লাস্ক কিনতে চায় সে। সে জন্য টাকা প্রয়োজন। কুকুর দিয়ে পেপার চুরি করে বিক্রির মাধ্যমে সে টাকা জোগাড় করছে। টুনটুনির ছোট্ট মনটি কেঁদে ওঠে। সে কৌশলে তাদের বাড়িতে থাকা বড় ফ্লাস্কটি গুল্লুকে দিয়ে দেয়। আর শপথ করিয়ে নেয় যেন সে আর চুরি না করে।

এভাবে একটি গল্প শেষ হয়ে যায়। পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে পরবর্তী গল্প পাঠে। একই চরিত্রগুলো। একই পরিবারের, সেই চেনা মুখগুলোই। কিন্তু গল্পগুলো নতুন। সেই নতুন গল্পগুলো আরো কৌতূহলোদ্দীপক, অনুসন্ধিত্সু এবং অবশ্যই মানবিক বিকাশের উপাদানে সমৃদ্ধ।


মন্তব্য